ঢাকা, শুক্রবার 25 November 2016 ১১ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ২৪ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

স্বতন্ত্র কাব্যভাষা নির্মাণে ফররুখ আহমদ

মুহম্মদ মতিউর রহমান : প্রত্যেক মানুষের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য থাকে। একজনের চেহারার সাথে অন্যজনের চেহারার যেমন হুবহু মিল হয় না, একজনের স্বভাব-বৈশিষ্ট্যের সাথেও তেমনি অন্যজনের স্বভাব-বৈশিষ্ট্যের সম্পূর্ণ মিল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকের বেলায়ও একই কথা। তাঁদের প্রত্যেকের মধ্যে স্বাতন্ত্র্য রয়েছে। এ স্বাতন্ত্র্যকে তাঁদের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য বলে গণ্য করা চলে। এ স্বাতন্ত্র্যের বিচারে সৃজনশীল প্রতিভার বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য নিরূপিত হয়। ব্যক্তির ক্ষেত্রে এটাকে তার ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্য এবং সৃজনশীল প্রতিভার ক্ষেত্রে এটাকে তার প্রতিভার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হিসাবে গণ্য করা হয়। এক অর্থে এটাকে তাঁর প্রতিভার মৌলিকতা হিসাবেও চিহ্নিত করা চলে।
প্রতিভার আরেকটি ধর্ম হলো তা বিভিন্নভাবে, বিচিত্রভাবে প্রকাশের চেষ্টা করে। সৃজনশীলতার ধর্মই বৈচিত্র্য-সাধন। যে কোন নতুন সৃষ্টির স্বভাব-বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একধরনের নতুনত্ব থাকে। সৃজনশীল প্রতিভাবান ব্যক্তিরা চান তাদের সৃর্ষ্টিকর্ম একান্তভাবে তাদের নিজস্ব হয়ে উঠুক, অন্যদের থেকে তা আলাদা রূপ পরিগ্রহ করুক। কবিদের ক্ষেত্রে এ নতুনত্ব ও বৈচিত্র্য সাধনের প্রয়াসের অর্থ তাদের ভাব-বিষয়-কল্পনা, প্রকাশ-রীতি, শব্দ-চয়ন, ছন্দ, অলংকার ব্যবহার এবং ব্যঞ্জনা সৃষ্টির ক্ষেত্রে নিজ-নিজ কুশলতা ও অভিনবত্ব প্রদর্শন। এক্ষেত্রে যে যতটা বৈচিত্র্য ও নতুনত্ব নিয়ে আসতে পারেন, তিনি ততটা সার্থক।
কবিতা মূলত শিল্প। শিল্পী যেমন ইজেলে রং-তুলির সাহায্যে কল্পনার আমেজ মিশিয়ে নিজস্ব সৃষ্টি-কর্ম সম্পন্ন করেন, কবিরাও তেমনি শব্দ-অলংকার-ছন্দ ও উপমা-রূপক-চিত্রকল্পের মাধ্যমে নিজস্ব কল্পনার রং মিশিয়ে কাব্যের বিচিত্র ভুবন সৃষ্টির প্রয়াস পান। এক্ষেত্রে প্রত্যেক কবিই যে সমান দক্ষ, তা নয়। আবার এসবের ব্যবহারে প্রত্যেক কবিরই আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বতন্ত্র স্টাইল বা সৃজন-ভঙ্গী রয়েছে। সকলেই তার সৃষ্টি-কর্মকে নিজের মনের মতো করে নিজস্ব রুচি ও দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী গড়ে তোলার প্রয়াসী। এটাই তাঁর স্বকীয়তা, বৈশিষ্ট্য বা স্টাইল। এখানেই ঘটে নানা বৈচিত্র্য। এভাবে নানা বৈচিত্র্যের সমাহারে প্রত্যেক কবির কাব্য-ভুবন নিজস্ব স্বকীয়তায় সমৃদ্ধ ও সৌন্দর্যময় হয়ে ওঠে। নানা বর্ণ-গন্ধময় ফুলের সমাহারে বাগানের বর্ণাঢ্য রূপ যেমন বৃদ্ধি পায়, নানা সৃষ্টি-বৈচিত্র্যের মধ্যে কাব্যের সুরম্য ভুবনও তেমনি বিচিত্র রূপ ও সৌন্দর্যে সুশোভিত হয়ে ওঠে।
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান মৌলিক প্রতিভাধর কবি ফররুখ আহ্মদও (জন্ম ১০ জুন ১৯১৮, মৃত্যু ১৯ অক্টোবর ১৯৭৪) তেমনি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও বৈচিত্র্য-প্রয়াসী একজন সৃজনশীল প্রতিভা। অন্যদের থেকে তিনি বহুলাংশে স্বতন্ত্র এবং তাঁর সৃষ্টি-কর্মে নানা বৈচিত্র্য ও স্বকীয়তার পরিচয় সুস্পষ্ট। কোন কবির ক্ষেত্রে নিজস্বতা ও বৈচিত্র্য যখন স্বতন্ত্র মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, তখন সেটাকে বলা যায় তাঁর মৌলিকতা। এদিক দিয়ে প্রত্যেক কবিই কমবেশি মৌলিকতার অধিকারী। তবে বড় প্রতিভার ক্ষেত্রে মৌলিকতা আরো বেশি তাৎপর্যপূর্ণ, বহুমাত্রিক ও স্পষ্টগ্রাহ্য। ফররুখ আহ্মদও একজন মৌলিক প্রতিভাধর কবি। মৌলিকতা প্রকাশে তিনি সবিশেষ উজ্জ্বল। তাই তিনি বাংলা সাহিত্যের একজন প্রধান মৌলিক কবি হিসাবে পরিগণিত। তাঁর কাব্য-প্রতিভার স্বাতন্ত্র্য ও অভিনব বৈচিত্র্যের ফলেই এ মৌলিকতার সৃষ্টি। শিল্প-কর্মে তাঁর অসাধারণ নৈপুণ্য সর্বজনবিদিত। এ স্বাতন্ত্র্য ও বৈচিত্র্য সহজেই শনাক্তযোগ্য।
প্রথমত, ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাঁর স্বাতন্ত্র্যের উল্লেখ করা চলে। তিনি তাঁর নিজস্ব কাব্য-ভাষা নির্মাণে অসামান্য দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর কাব্য-ভাষা সম্পূর্ণভাবে তাঁর নিজস্ব ও সুস্পষ্টভাবে শনাক্তযোগ্য। ফররুখ আহ্মদের মধ্যে নজরুলীয় ভাষার অনুসৃতি লক্ষ্য করা গেলেও ফররুখের ভাষাভঙ্গি সম্পূর্ণ নজরুলীয় নয়। ফররুখ মূলত পুঁথির ভাষার অনুসরণে এক নতুন প্রাণবন্ত আধুনিক কাব্য-ভাষা নির্মাণ করেছেন। যেটাকে যথার্থ অর্থে ফররুখীয় ভাষা বলে অভিহিত করা চলে। এ কাব্য-ভাষা নির্মাণে তাঁর কৃতিত্ব অপরিসীম। ফররুখের কাব্য-ভাষা অন্যদের থেকে যেমন আলাদা, তেমনি শোনা মাত্রই এটাকে ফররুখের ভাষা হিসাবে শনাক্ত করতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয় না। এ স্বতন্ত্র কাব্য-ভাষা নির্মাণের দক্ষতা কবিকে বিরল বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্যে সমুজ্জ্বল করে তুলেছে। দু’একটি উদাহরণ দিচ্ছি :
কেটেছে রঙিন মখমল দিন, নতুন সফর আজ,
শুনছি আবার নোনা দরিয়ার ডাক,
ভাসে জোরওয়ার মউজের শিরে সফেদ চাঁদির তাজ,
পাহাড়-বুলন্দ ঢেউ ব’য়ে আনে নোনা দরিয়ার ডাক;
নতুন পানিতে সফর এবার, হে মাঝি সিন্দবাদ।
        (সিন্দবাদ : সাত সাগরের মাঝি)

জঙ্গি জোয়ান দাঁড় ফেলে করি দরিয়ার পানি চাষ,
আফতাব ঘোরে মাথার উপরে মাহ্তাব ফেলে দাগ,
তুফান ঝড়িতে তোলপাড় করে কিশ্তীর পাটাতন;
মোরা নির্ভীক সমুদ্রস্রোতে দাঁড় ফেলি বারো মাস।
    (ঐ : ঐ)

মোরা মুস্লিম দরিয়ার মাঝি মওতের নাই ভয়,
খিজিরের সাথে পেয়েছি আমরা দুরিয়ার বাদশাই,
খাকে গড়া এই ওজুদের মাঝে নিত্য জাগায় সাড়া,
বাºাদী মাটি; কিশ্তীর মুখ এবার ঘোরাও ভাই।
    (দরিয়ায় শেষ রাত্রি : ঐ)
কত যে আঁধার পর্দা পারায়ে ভোর হলো জানি না তা’।
নারঙ্গী বনে কাঁপছে সবুজ পাতা।
দুয়ারে তোমার সাত-সাগরের জোয়ার এনেছে ফেনা।
তবু জাগলে না? তবু তুমি জাগলে না?
    (সাত সাগরের মাঝি : ঐ)

সেদিন তমসা শিখরে নূরানী জয়তুন চারা করি রোপণ
প্রোজ্জ্বল দীপ এলে সিরাজাম মুনীরা জাগায়ে অযুত মন।
  (সিরাজাম মুনীরা মুহম্মদ মুস্তফা স. : সিরাজাম মুনীরা)

উপরোক্ত উদ্ধৃতিসমুহে ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে ফররুখের বৈশিষ্ট্য সহজেই শনাক্তযোগ্য। নজরুলের মত তিনিও আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছেন, সেদিক দিয়ে তিনি নজরুলের সমগোত্রীয়। কিন্তু সে সব শব্দ চয়ন ও ব্যবহারে ফররুখের নিজস্ব কৌশল, নৈপুণ্য ও স্বাতন্ত্র্য ফুটে উঠেছে।
দ্বিতীয়ত, উপমা, রূপক, রূপকল্প ব্যবহারে ফররুখ বিশেষ নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছেন। উপরের উদ্ধৃতিসমূহেই তার প্রমাণ বিদ্যমান। এক্ষেত্রে ফররুখ যেমন আধুনিক তেমনি অসাধারণ কবিত্ব-শক্তির অধিকারী। প্রসঙ্গত বলা যায়, রূপক-উপমা রূপকল্পের ব্যবহারে ফররুখের নিজস্ব ঐতিহ্যানুভুতি ও অভিনবত্ব সকলকে বিস্ময়াবিভূত করে। বাংলা কাব্যে এটাকে এক নতুন দিগন্ত ও সম্ভাবনার দ্বার-উন্মোচনকারী হিসাবে গণ্য করা চলে।
তৃতীয়ত, ভাব, বিষয় ও কল্পনার ক্ষেত্রে ফররুখ আহ্মদ অনুপম বৈচিত্র্য ও স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টির প্রয়াস পেয়েছেন। ফররুখের পূর্বসুরী ত্রিশোত্তর যুগের প্রধানতম কবি জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) প্রকৃতির কবি হিসাবে ব্যাপকভাবে পরিচিত ও জনপ্রিয়। নিরীশ্বরবাদী হওয়া সত্ত্বেও তিনি হিন্দু ঐতিহ্যের অনুসারী, ভারতীয় পৌরাণিক আদর্শে বিশ্বাসী এবং ভাবের দিক থেকে উদার-মানবিক কিন্তু কিছুটা পলায়নবাদী। তিনি পাশ্চাত্যপন্থি এবং ইংরাজি-সাহিত্যের রূপরীতির অনুসারী। ত্রিশোত্তর অন্যতম প্রধান কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (১৯০১-৬১) জীবনানন্দ দাশের মতোই উদার মানবিকতায় বিশ্বাসী ও নিরীশ্বরবাদী। তবে রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করা সত্ত্বেও ভাষার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রানুসারী, এমনকি মধুসূদনের মতোই অনেকটা ক্লাসিকধর্মী। তিনিও পাশ্চাত্যপন্থি ও ইংরাজি-সাহিত্যের রূপরীতির একান্ত অনুসারী। অমিয় চক্রবর্তী (১৯০১-৮৬) পাশ্চাত্য কাব্য-কলার অনুসারী হলেও জার্মান দার্শনিক হেগেলের দ্বান্দ্বিক মতবাদে বিশ্বাসী কবি। প্রেমেন্দ্র মিত্র (১৯০৪-৮৮) রবীন্দ্র-বিরোধী, পাশ্চাত্য কাব্যাদর্শের অনুসারী। বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-৭৪) মূলত প্রেমের কবি। তিনিও রবীন্দ্র-বিরোধী, পাশ্চাত্য কাব্যাদর্শের অনুসারী। বিষ্ণু দে (১৯০৯-৮২) সমাজ-সচেতন, মার্কসপন্থি কবি। পাশ্চাত্য-সাহিত্যের রূপরীতির অনুসারী হলেও তিনি মার্কসীয় তত্ত্বকে কাব্যে রূপায়িত করার প্রয়াস পেয়েছেন। তাই মার্কসীয় তত্ত্বের জটিল ও ভ্রান্ত মতবাদের জটাজালে তাঁর কবিতা আকীর্ণ। ফলে পাঠকের রুচি ও রসবোধে তা অনেকটাই পীড়াদায়ক। সমর সেন (১৯১৬-৮৭), সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬-৪৭) উভয়েই মার্কসবাদী কবি। তাঁদের নাস্তিক্যবাদী পলায়নপর মার্কসীয় দর্শন সাধারণ বাঙালি জীবনে সাময়িক চমক সৃষ্টি করলেও দীর্ঘ প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়নি।
ত্রিশ দশক বা চল্লিশ দশকের উন্মেষ-লগ্নে উপরোক্ত কবিদের যখন বিপুল প্রতাপ লক্ষ্য করা যায়, তখন বা তার একটু পরেই বাংলা কাব্য-ক্ষেত্রে ফররুখ আহমদের বর্ণাঢ্য আবির্ভাব। লক্ষণীয় যে, কাব্য-জীবনের শুরুতে ফররুখও তাঁর সমকালীন কবিদের চিন্তা-চেতনা বা বামপন্থি ধ্যান-ধারণার সাথে অনেকটা একাত্মতা অনুভব করলেও পরবর্তীতে তিনি তাঁদের থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র পথে অগ্রসর হন। ইসলামী আদর্শ, ঐতিহ্য, ভাব-চেতনা, মানবিকতা ও মুসলিম নবজাগরণের প্রেরণা এ-সময় তাঁর কাব্যের প্রধান উপজীব্য হয়ে ওঠে। চিন্তা-চেতনা পরিবর্তনের সাথে সাথে তাঁর কাব্য-ভাষা ও কাব্যের বিষয়বস্তুও পরিবর্তিত হয় এবং তিনি এ-সময় থেকেই তাঁর নিজস্ব কাব্য-ভাষা নির্মাণে তৎপর হয়ে ওঠেন। ভাব-বিষয়, ঐতিহ্যিক চেতনা ও আবেদনের ক্ষেত্রে তাঁর কাব্য হয়ে ওঠে স্বতন্ত্র মহিমায় উজ্জ্বল।
ফররুখ আহমদ কাল-সচেতন, শিল্প-সচেতন ও জাতিপ্রেমে উদ্বুদ্ধ উদার মানবতাবাদে বিশ্বাসী অমিত সম্ভাবনার অবিনাশী কবি-সত্তা। সমকালীন স্বাধীনতা আন্দোলন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সমকালীন সামাজিক অবক্ষয়, দুর্ভিক্ষ ও হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা ইত্যাদি সম্পর্কে কবি ফররুখ আহ্মদ যথেষ্ট সচেতন ছিলেন এবং তাঁর এ-সময়কার কাব্য-কবিতায় তাঁর প্রকাশ লক্ষণীয়। এটা প্রত্যেক কবির একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। কোন সৃজনশীল কবি-শিল্পীই সমাজ ও কাল-নিরপেক্ষ হতে পারেন না। সমাজের বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত, আন্দোলন-আলোড়ন অবশ্যই তাঁদের মনে বিভিন্ন প্রভাব-প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। সংবেদনশীল মানুষ হিসাবে তাঁরা তাঁদের সৃষ্টি-কর্মে তা প্রকাশ করে থাকেন। এটাকে তাঁর সমাজ বা কাল-সচেতনতা বলে উল্লেখ করা যায়। প্রখ্যাত ইংরাজ কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের (১৭৭০-১৮৫০) সময়কালে তাঁর পার্শ্ববর্তী দেশ ফ্রান্সে যে ঐতিহাসিক বিপ্লব (ফ্রেঞ্চ রেভ্যুলেশন : ১৭৯৩-১৮০২) সংঘটিত হয়, তাঁর প্রতি সমর্থন ও বিপ্লব সংঘটনকারীদেরকে অভিনন্দন জানাতে ফ্রান্সে গিয়েছিলেন তাঁর সমকালে সংঘটিত ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে একাত্মতা প্রকাশের জন্য। কোন সংবেদনশীল ব্যক্তিই সমকালীন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও সমস্যা উপেক্ষা করতে পারেন না। ফররুখ আহ্মদও পারেন নি। তাই তাঁকে একজন বাস্তববাদী, কাল-সচেতন ও সমাজ-সচেতন কবি হিসাবে অভিহিত করা চলে।
নজরুলের সাথে ফররুখের বহুলাংশে সাজুয্য রয়েছে। বিষয়ের দিক থেকে ফররুখ ইসলাম ও মুসলিম ঐতিহ্যের অনুসারী, ভাবের দিক থেকে আধ্যাত্মিক ও মানবতাবাদী এবং কল্পনার দিক থেকে সম্পূর্ণ রোমান্টিক। ফররুখ আহ্মদের রচনাবলী অধ্যয়ন করলে আমরা এর যথার্থতা সহজেই উপলব্ধি করতে পারি। ফররুখ আহ্মদ ঐতিহ্যবাদী, ইসলামের নিষ্ঠাবান অনুসারী, উদার মানবতাবাদী, নিগৃহীত-নিপীড়িত মানুষের একান্ত দরদি এবং সর্বোপরি দেশাত্ম ও স্বাজাত্যবোধে উদ্বুদ্ধ স্বাধীনতাকামী সৃজনশীল কবি। সমকালীন বিশেষত ত্রিশোত্তর যুগের অধিকাংশ কবিই যেখানে পরাধীনতার বিরুদ্ধে নিশ্চুপ থেকেছেন, ফররুখ সেখানে ছিলেন অতিশয় সোচ্চার। স্বাধীনতার সপক্ষে তিনি অনেক গান ও কবিতা লিখে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তাই স্বভাবতই মুসলিম নবজাগরণের কবি হিসাবে তাঁর পরিচিতি ঘটেছে।
চতুর্থত, প্রকাশ-রীতির ক্ষেত্রে ফররুখ শিল্প-সচেতন ও বৈচিত্র্য-প্রয়াসী আধুনিক কবি। বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব ক্ষেত্রে তাঁর অনায়াস বিচরণ। গীতি-কবিতা, সনেট, মহাকাব্য, শিশুতোষ কাব্য, ব্যঙ্গকাব্য, নাট্যকাব্য, গীতিকাব্য, গান-গজল, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস, অনুবাদ ইত্যাদি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। কোন ক্ষেত্রে বেশি, কোন ক্ষেত্রে কম, কিন্তু সকল ক্ষেত্রেই তাঁর অবদান বৈশিষ্ট্যমন্ডিত, বর্ণাঢ্য ঔজ্জ্বল্যে দীপ্তিমান। গীতি-কবিতা, সনেট ও মহাকাব্য রচনার ক্ষেত্রে ফররুখের অবদান সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে অধিক আলোচনা হলেও তাঁর শিশুতোষ-কাব্য, ব্যঙ্গ-কবিতা, নাট্য-কাব্য, গীতিনাট্য, ব্যঙ্গনাট্য ইত্যাদি ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ঈর্ষণীয়ভাবে সফল ও নানা বর্ণাঢ্যতায় উজ্জ্বল।
প্রকাশ-রীতির ক্ষেত্রে ফররুখের বৈচিত্র্য সর্বজনবিদিত। এক্ষেত্রে তাঁর নিজস্ব উজ্জ্বল ভঙ্গি বা স্টাইল সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাঁর পূর্বসূরিদের থেকে তিনি এক্ষেত্রে আলাদা, নিজস্ব স্টাইল তৈরিতে নৈপুণ্য প্রদর্শন করে সকলের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। শব্দ-চয়ন, বিভিন্ন ছন্দের অনুশীলন, অলংকার ব্যবহার, রূপক-উপমা-রূপকল্প ইত্যাদির স্বচ্ছন্দ ব্যবহারে ফররুখ তাঁর কাব্যের নিজস্ব রং, বর্ণ, ভঙ্গি ও সৌন্দর্য সৃষ্টিতে পারঙ্গমতা প্রদর্শন করেন। এক্ষেত্রে তিনি শুধু একজন দক্ষ শিল্পী নন, বৈচিত্র্য-প্রয়াসী এক অনন্যসাধারণ শিল্পী-কবি। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাহিত্য-সমালোচক মুজীবুর রহমান খাঁ বলেন : “ফররুখ আহ্মদের আসল পরিচয় হলো, তিনি একজন শিল্পী-কবি। রং ও রূপের, বর্ণ এবং তার সাথে গন্ধের আলো, ছায়া এবং মোহের আবিষ্টতা নিয়ে যে-কবি খেলার চাতুরী দেখান, তারাই শিল্পী-কবি। তাঁদের কবিতা চিত্রধর্মী এবং তাঁরা আরো কিছু। ফররুখ আহ্মদের কবিতা পড়তে পাঠক-মন অলক্ষ্যে ইংরেজি-সাহিত্যের রোমান্টিক ও তার পরবর্তী প্রি-র‌্যাফেলাইট  কবিদের রাজ্যে চলে যায়। রোমান্টিক কবিদের মধ্যে কীট্সের কবিতার রং-প্রাচুর্যের তুলনা নাই। প্রি-র‌্যাফেলাইটদের মধ্যে মরিস, সুইনবার্ণ প্রমুখ কবি রং আলো, সুগন্ধীর জাল বুনে কবিতায় যে ছবি আঁকতেন এবং দেহাভিসারী স্পর্শাতুরতা আনতেন তার সাথে ফররুখ আহ্মদের গভীর সাদৃশ্য আছে।” (মুজীবুর রহমান খাঁ : সাত সাগরের মাঝি - নারঙ্গী বনে কাঁপছে সবুজ পাতা)।
শব্দ-চয়ন, অলংকার, উপমা, রূপক, প্রতীকের ব্যবহার ও রূপকল্প নির্মাণের ক্ষেত্রেও ফররুখের বৈশিষ্ট্য সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। এক্ষেত্রে তাঁর মধ্যে ইংরাজ কবি টি.এস.এলিয়টের অনুসৃতি লক্ষণীয়। ত্রিশোত্তর যুগের প্রধান কবি জীবনানন্দ দাসের সাথেও এক্ষেত্রে তাঁর কিছুটা সাযুজ্য রয়েছে। তবে জীবনানন্দের ঐতিহ্য-চেতনা আর ফররুখের ঐতিহ্য-চেতনা ভিন্ন। নিরীশ্বরবাদী হওয়া সত্ত্বেও জীবনানন্দ হিন্দু-পৌরাণিক ঐতিহ্যের অনুসারী। অন্যদিকে, ফররুখ আহ্মদ ইসলামী আদর্শে নিষ্ঠাবান ও ইসলামী ঐতিহ্যানুশ্রয়ী কবি। তাই উভয়ের কাব্যে ভিন্ন ঐতিহ্যের প্রতিফলন ঘটেছে। মূলত উভয় কবির ঐতিহ্য ও ভাব-প্রেরণা ভিন্ন হলেও নিজ-নিজ ঐতিহ্য ও ভাব-সম্পদে উভয় কবিই দীপ্ত-সমুজ্জ্বল। আধুনিক বাংলা কাব্যে নিঃসন্দেহে তাঁরা দুই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন প্রধান কবি-ব্যক্তিত্ব।
প্রতীকের ব্যবহারেও ফররুখের স্বাতন্ত্র্য সুস্পষ্ট। প্রতীক সাধারণত দু’প্রকার- বুদ্ধিজাত ও ঐতিহ্য-লালিত। এ উভয় প্রকার প্রতীকের ব্যবহারেই জীবনানন্দ ও ফররুখ আহ্মদের সাফল্য অনুন্যতুল্য। এক্ষেত্রে উভয় কবির মধ্যে আদর্শগত চেতনা ও ঐতিহ্যিক প্রেরণার কারণে ভিন্নতা ও স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টি হয়েছে। এ স্বাতন্ত্র্য উভয়কেই বড় কবির মর্যাদা দিয়েছে। তাই তুলনামূলক আলোচনা না করে শুধু এটুকু বলা যায় যে, কবিতার শিল্প-সৌকর্য সম্পর্কে উভয়েই ছিলেন অতিমাত্রায় সচেতন ও সফল। তবে জীবনানন্দ যেমন নিরানন্দ, বিষণ্নতা, নির্জনতা ও পলায়ণবাদী কবি হিসাবে পরিচিত, ফররুখ আহ্মদ সেখানে ইতিবাচক স্বপ্ন-কল্পনা, অমিত সম্ভাবনা ও জাগরণের কবি হিসাবে খ্যাতিমান।
ভাবের দিক থেকে ফররুখ আহ্মদ আধ্যাত্মিক চেতনা-সমৃদ্ধ মানবতাবাদী কবি। ইসলামী বিশ্বাস, তৌহিদবাদ ও ইহ-পারলৌকিক চিন্তা-চেতনায় তিনি ছিলেন একান্ত সমর্পিত ও উদ্বুদ্ধ। তাঁর উদার মানবতাবোধ ও বিশ্বজনীন চেতনা প্রকাশের ক্ষেত্রে ইসলামী আদর্শের প্রভাব সুস্পষ্ট। ইসলামের সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, উদার মানবতাবাদ সর্বদা তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁর কাব্য-চর্চায় এর যথার্থ প্রতিফলন ঘটেছে। এক্ষেত্রে অযৌক্তিকভাবে তাঁকে অনেকে সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন কবি বলে মনে করেন। কিন্তু ইসলাম কোন সম্প্রদায়ের জন্য নয়। বিশ্ব-স্রষ্টার বিধান বিশ্বের সকল মানুষের জন্য। ইসলামে মানুষে-মানুষে কোন ভেদাভেদ নেই। ইসলাম মানুষের মধ্যে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বাণী প্রচার করে। তাই ইসলামে সাম্প্রদায়িকতার স্থান নেই। ফররুখ আহ্মদেও সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্ন সম্পূর্ণ অবান্তর। নিজ ধর্মের মহিমা প্রকাশে উদগ্রীব হওয়া সত্ত্বেও তিনি কখনো অন্য ধর্মের নিন্দা করেননি। স্বকীয় আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে কাব্যচর্চা করা আর সাম্প্রদায়িকতা এক জিনিষ নয়। মহাকবি হোমার, মিল্টন, ফেরদৌসি, ইকবাল প্রমুখ স্বকীয় আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে কাব্যচর্চা করলেও তাঁরা কেউ সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। তাঁর রচিত ‘হাতেম তা’য়ী’, ‘নৌফেল ও হাতেম’, এমনকি, ‘সিরাজাম মুনীরা’ কাব্য পাঠেও আমরা এর যথার্থতা উপলব্ধি করতে পারি।
ফররুখ আহ্মদ স্বাজাত্যবোধে উদ্বুদ্ধ স্বদেশপ্রেমী মানবতাবাদী স্বাধীনতাকামী এক উজ্জ্বল কবি-প্রতিভা। বড় ও মহৎ কবিরা মূলত স্বাপ্নিক, স্বসমাজ ও স্বদেশের অনাগত ভবিষ্যতের পথ-প্রদর্শকরূপে কাজ করেন। দেশ ও জাতিকে তাঁরা স্বপ্ন দেখান, নতুন পথের হদিস বাতলে দেন। ফররুখ আহ্মদও এ স্বপ্নের কথা বলেছেন, দেশের জনগণকে তাঁর লেখার মাধ্যমে পথের দিশা দেখিয়েছেন। এভাবে জাতীয় আশা-আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন-অভীপ্সার প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর সাহিত্যে।
নিজস্ব জীবন-পরিমন্ডল, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিবরণ ও আবহ সৃষ্টির ক্ষেত্রে ফররুখের বৈশিষ্ট্য সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। তাঁর কল্পনার দিগন্তচারী অনন্ত বিস্তার সকলের বিস্ময় উৎপাদন করে। অনেকে শুধুমাত্র ফররুখ আহমদের ‘সাত সাগরের মাঝি’, ‘আজাদ করো পাকিস্তান’ ও ‘সিরাজম মুনীরা’ কাব্য পাঠ করে তাঁর মূল্যায়ন করেন, তারা তাঁর ‘হে বন্য স্বপ্নেরা’, ‘কাফেলা’, ‘মুহূর্তের কবিতা’, ‘নৌফেল ও হাতেম’, ‘হাতেম তা’য়ী’ ব্যঙ্গকাব্য ও শিশুতোষ কাব্যসমূহ পাঠ করলে অনেকটা বিস্ময়-বিমুগ্ধচিত্তে বলতে বাধ্য হবেন যে, তাঁর লেখায় বাংলার বিচিত্র, সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি যেমন বর্ণাঢ্যরূপে ধরা দিয়েছে, অন্যদিকে, তেমনি দিগন্ত-বিস্তারী উদার নীলাকাশ, তরঙ্গ-বিক্ষুব্ধ সীমাহীন অতল সমুদ্র, সমুদ্রগামী নৌপোত, ধূসর বিধীর্ণ মরুভূমি, সবুজ-শ্যামল মনোরম খেজুর বীথি, ‘মরুভূমির জাহাজ’ নামে খ্যাত ধূসরবর্ণের উটের বহর, নিঃসীম-নীলাকাশে উড়ে বেড়ানো মুক্ত ঈগল পাখি ও মরুচারী দুরন্ত বেদুইন আরব প্রভৃতি বিচিত্র দৃশ্যপট, জনপ্রাণী ও প্রান্তরের অপরূপ বর্ণনা তাঁর কাব্য-কবিতাকে অসাধারণ মহিমায় দীপ্ত করে তুলেছে। এমন দিগন্ত-বিস্তারী কবি-কল্পনার অধিকারী কবি বাংলা সাহিত্যে নিতান্ত দুর্লভ। এক্ষেত্রেও ফররুখ আহ্মদ অনন্য। তিনি যেমন বৈচিত্র্য-প্রয়াসী, তেমনি সর্বজনীন ও সর্বকালীন।
ফররুখ-কাব্যে এ সর্বজনীনতা ও চিরন্তনত্বের অবিনাসী সুর প্রতিধ্বনিত। এ সুর মানবতার, এ সুর আধ্যাত্মিকতার, দেশাত্মবোধেপূর্ণ এ সুর নবজাগরণ ও নিপীড়িত-লাঞ্ছিত-ভাগ্যাহত মানুষের মুক্তির সংরাগে পূর্ণ। ফররুখ প্রতিভা তাই যেমন বৈচিত্র্যময় তেমনি কালজয়ী।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ