ঢাকা, শুক্রবার 25 November 2016 ১১ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ২৪ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নোবেলজয়ী সাহিত্যিক ভিএস নাইপল সেদিন এসেছিলেন ঢাকায়

সাদেকুর রহমান : ॥অ॥
একটা পুঁজিবাদী গন্ধ থাকলেও উদ্যোগটা নিঃসন্দেহে ছিল আবেগমথিত, আয়োজনটা ছিল জম্পেশ। বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির নানা দিক নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন ও সমালোচনার এমন বর্ণাঢ্য কলেবর! প্রশংসা না করে উপায় নেই। এ আয়োজনের পোশাকী নাম, ‘ঢাকা লিট ফেস্ট ২০১৬’ বা ‘ঢাকা সাহিত্য উৎসব ২০১৬’। আয়োজকরা পূর্বাহ্নেই দাবি করেছিল, বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতিকে বিশ্বময় পরিচিত করতেই তারা এমন কাঠখোট্টা আয়োজনের দিকে ঝুঁকেছেন। ঘোষিত লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে, আদৌ সে লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে কিনা তার জন্য ব্যাপক পরিসরে গবেষণা না করেই বলা যায়, আয়োজনটি অনবদ্যরূপেই সম্পন্ন হয়েছে। ‘হে উৎসব’ যেখানে অনেক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল, তারই পরিবর্ধিত সংস্করণ ‘ঢাকা সাহিত্য উৎসব’ সেখানে পাচ্ছে সাধুবাদ, সমীহ। ‘হে উৎসবের’ উত্তরসূরি হিসেবে ষষ্ঠবারের মতো অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো শিল্প-সাহিত্যপ্রেমীদের সর্ব বৃহৎ উৎসব। ১৭-১৯ নবেম্বর এই তিনদিনব্যাপী উৎসবে বাংলা একাডেমি চত্বর বিশ্ব সাহিত্য অঙ্গনের বহু রথী-মহারথীর মিলন মেলায় পরিণত হয়েছিল। তাদের পদচারণায় বাংলা একাডেমি চত্বরই কেবল মুখর ছিল তা নয়, বিশ্বের নানা প্রান্তে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির শক্তিমান দিকটির দ্যূতিও ছড়িয়ে পড়ার এক অনন্য মাধ্যম হিসেবে উৎসবের ভূমিকা বলিষ্ঠরূপেই স্বীকৃত হয়েছে। এ উৎসবের মধ্যমণি ছিলেন সাহিত্যে নোবেলজয়ী বৃটিশ সাহিত্যিক ভি. এস. নাইপল। সঙ্গে ছিলেন তার অর্ধাঙ্গিনী লেডি নাদিরা নাইপল। প্রথমবারের মতো কোনো নোবেল বিজয়ী লেখকের যোগদান, তাও আবার ‘অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস’ এর লেখক নাইপল, ঢাকা সাহিত্য উৎসবকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ঢাকায় কোন নোবেলজয়ী সাহিত্যিকের এটাই প্রথম পদার্পন। এর আগে গুন্টার গ্রাস এসেছিলেন, তবে তিনি তখনও নোবেলজয়ী হননি।
ভি. এস. নাইপল নামেই তার পরিচিতি সমধিক। তবে তার পুরো নাম বিদ্যাধর সূর্যপ্রসাদ নাইপল। নামটি যেমন বড়, খ্যাতিও তার তেমনি বিশাল। উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্যের অন্যতম পুরোধার অর্জনের ঝুলিতে রয়েছে নোবেল পুরস্কারসহ কয়েক ডজন উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন পুরস্কার এবং বৃটিশ নাইটহুড। নোবেল পাওয়ার আগেই ১৯৯০ সালে ‘স্যার’ উপাধি পেয়ে যান। আর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান ২০০১ সালে। তাঁর লেখা উপন্যাস এবং ভ্রমণকাহিনি চমৎকার। গদ্যের প্রশংসা করেন সবাই। কাহিনী বলার ঢংটিও বেশ চমকপ্রদ। আরেক নোবেল বিজয়ী দক্ষিণ আফ্রিকান লেখক জি. এম. কোয়েটজি ২০০১ সালে দ্য নিউইয়র্ক রিভ্যিউ অব বুকস-এ নাইপলকে ‘আধুনকি ইংরেজি গদ্যের একজন মাস্টার’ বলে প্রশংসা করেন। নোবেল কমিটি নাইপলকে তুলনা করেন জোসেফ কনরাডের সাথে, বলেন ‘কনরাডের উত্তরসূরী’। ১৯৩২ সালের ১৭ আগস্ট ক্যারাবিয়ান দ্বীপরাষ্ট্র ত্রিনিদাদে জন্মগ্রহণকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই বিশ্বনামজাদা লেখক উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনি, আত্মজৈবনিক রচনা ইত্যাদি মিলিয়ে প্রায় ৫০টি গ্রন্থের রচয়িতা। জন্মভূমি ত্রিনিদাদ এবং আফ্রিকা, ভারত, ইসলামি বিশ্বের কয়েকটা দেশের মানুষ, তাদের সংস্কৃতি, ধর্মবিশ্বাস, রাজনীতি, ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে তিনি লিখেছেন।
॥আ॥
রাজধানীর কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউয়ে বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে এ উৎসবের পর্দা উঠে সস্ত্রীক ভি. এস. নাইপলের হাতে। এ সময় নাইপলের সঙ্গে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এবং বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানও ছিলেন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতায় ‘যাত্রিক’ আয়োজিত এই উৎসবে আঠারোটি দেশের ৬৬ জন বিদেশি এবং দেড় শতাধিক বাংলাদেশি সাহিত্যিক-লেখক-গবেষক তিনদিনে ৯০টি বিশেষ অধিবেশনে অংশ নেন। ২০১৬ সালের ম্যান বুকার পুরস্কার বিজয়ী ও ২০১৪ সালে ‘ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন প্রাইজ ফর লিটারেচার ইভ উইল্ড’ জয়ী ডেবোরাহ স্মিথ, উত্তর কোরিয়ার লেখক হাইয়েনসিও লিসহ নেপাল, ভুটানসহ অনেক দেশের সাহিত্যিকরা এই উৎসব মাতিয়ে রাখেন। অংশ নেয় সময় প্রকাশ, বুক ওয়ার্ম, বেঙ্গল পাবলিকেশন, বৃটিশ কাউন্সিলসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান।
উৎসবের পুরো আয়োজন বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে সাতটি জায়গায় পৃথক পৃথক পর্বে সম্পন্ন হয়। মূল মঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত হয় আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তন। এ উৎসবে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম একরকম উপেক্ষিত ছিলেন। তবে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটিই শুরু হয় সংগীতশিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার নির্দেশনায় ‘সুরের ধারা’র শিল্পীদের দলীয় পরিবেশনার মধ্য দিয়ে। রোজ সকাল সাড়ে নয়টা থেকে রাত সাড়ে সাতটা পর্যন্ত চলা উৎসবের দরজা সাহিত্য-সংস্কৃতিপ্রেমী, আমোদী, চর্চাকারী সকলের জন্য উন্মুক্ত ছিল।
কৌতূহলোদ্দীপক এবাবের উৎসবে প্রায় ২০ হাজার দর্শনার্থী যোগ দিয়েছেন বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে সগর্বে প্রচার করা হয়েছে। উৎসবে বিষয়ভিত্তিক বিভিন্ন সেশনে আলোচনায় অংশ নেন ভারতের এনডিটিভির প্রধান সম্পাদক সাংবাদিক বারখা দত্ত, মার্কিন কবি জেফরি ইয়াং, বৃটিশ সাংবাদিক বেন জুডাহ, আরব সাহিত্যের কিউরেটর মার্সিয়া লিন্যাক্স কিউলি, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কবি জহরসেন মজুমদার, প্রাবন্ধিক সেমন্তী ঘোষ (কবি শঙ্খ ঘোষের কন্যা) ও আহমেদ রেজা, ভ্রমণপিপাসু অস্টেলিয়ান লেখক টিম কোপ কেকে, পুলিৎজার বিজয়ী ভারতীয় বংশোদ্ভূত কবি বিজয় শেষাদ্রি, বাংলাদেশের সাহিত্যিক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম, কবি সাজ্জাদ শরিফ, প্রাবন্ধিক আহমাদ মাযহার, গারো কবি মিথুন রাকসাম, জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক জাহানারা আলম, বিদেশি লীগে খেলতে যাওয়া দেশের প্রথম ফুটবলার সাবিনা খাতুন, নৃতত্ত্ববিদ সামিয়া হক, অধিকারকর্মী তাসাফি হোসেন, গবেষক আমিনা ইয়াকিন, লেখক-সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফ ও মাহবুব আজিজ, সাহিত্যিক আকিমুন রহমান, কবি আহসান আকবর, দৃক গ্যালারির প্রতিষ্ঠাতা শহীদুল আলম, ক্রাফটস বিশেষজ্ঞ রুবি গজনবী প্রমুখ। উৎসবের আলোচনায় ঘুরেফিরে আসে বিশ্ব সাহিত্য, রাজনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি, শিল্প, সর্বেপরি এসব ঘিরে মানুষের জীবনের কথা।
॥ই॥
অনেক দিন থেকে পারকিন্সন রোগে ভুগছেন চুরাশি বছর বয়সী নাইপল। হুইল চেয়ারে বসেই তিনি যে আভা ছড়িয়ে গেছেন, তা অসাধারন। উৎসবটির উদ্বোধনে ফিতা কাটার আনুষ্ঠানিকতার পর নাইপলকে কিছু বলতে বলা হলে তিনি বলেন, ‘কেউ কি আছেন যে আমার হয়ে বক্তৃতাটা দিয়ে দেবেন? তবে এমনভাবে দেবেন, যাতে আমি শুনতে পাই।’ তাঁর এ কথায় হেসে ওঠে পুরো মিলনায়তন। তেমন কিছুই বললেন না তিনি, তবে আরেকটি অধিবেশনে একটি প্রামাণ্যচিত্রে তাঁর সম্পর্কে জানা গেল অনেক কিছু। সাহিত্যসুধায় নয়, জীবনগল্পে ঢাকা মাতিয়ে গেলেন নাইপল। সৃষ্টি করে গেলেন নতুন এক জীবনযাত্রা। এ সময়েই নাইপলের প্রেমে পড়ে গেছেন বহুজন, যারা হয়তো কখনো নাইপলকে পড়েননি কিংবা পড়বেনও না। তারপরও ইংরেজি তথা বিশ্ব সাহিত্যের অন্যতম মহারথীর সাক্ষাৎ গল্প বলাটা মনের গহীনে ছবি হয়ে থাকবে।
বিবিসি প্রযোজিত প্রামাণ্যচিত্র ‘দ্য স্ট্রেঞ্জ লাক অব ভি এস নাইপল’ থেকে জানা যায়, তার পিতামহ ভারত থেকে পাড়ি জমান ত্রিনিদাদ ও টোবাগোতে। সেখানেই জন্ম হয় নাইপলের। তার বাবা ছিলেন লেখক-সাংবাদিক। পরে সেই পথে হাঁটেন তিনিও। ভারত, ত্রিনিদাদ ও যুক্তরাজ্যে চিত্রায়িত এ প্রামাণ্যচিত্রে নাইপল বলেন তার পরিবার, বেড়ে ওঠা, তার জীবনে বিভিন্ন সময়ের প্রভাবের কথা। এ ছাড়া তাকে ঘিরে বিতর্কিত বিষয়গুলো নিয়েও কথা বলেন তিনি।
নাইপল বলেন, ‘ঢাকা এসে খুব ভালো লাগছে আমার। উৎসব উদ্বোধন করেও আমি আনন্দিত।’ নোবেলের আগে বুকার পুরস্কারজয়ী নাইপল উদ্বোধনের সময় খানিকটা রসিকতা করে বলেন, ‘আমি বোধহয় এবারও তাড়াতাড়ি ফিতা কেটে ফেলেছি। ফিতা তো কাটলাম। এখন আমার হয়ে কেউ বক্তৃতাটা দিক।’
উৎসবের দ্বিতীয় দিন (১৮ নবেম্বর) শুক্রবার বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে বিকেল সাড়ে পাঁচটার কিছু পরে ব্রেক্সিট নিয়ে চার বিদেশি অতিথির আলোচনা শেষ হলে যখন মাইকে ঘোষণা করা হলো, পরবর্তী অধিবেশন শুরু হবে পনেরো মিনিট পরে, তখন কেউ আসন ছাড়লেন না। বরং বাইরে থেকে আরও লোকজন ঢুকতে শুরু করল। কিন্তু চেয়ার ফাঁকা নেই। লোকজন মেঝেতে বসতে শুরু করে এবং অচিরেই মিলনায়তনের ভেতরে পা রাখার জায়গাও অবশিষ্ট থাকে না।
হলভর্তি মানুষের অপেক্ষার অবসান ঘটল সন্ধ্যা সোয়া ছটায়। স্ত্রী নাদিরা নাইপলসহ তিনি মঞ্চে হাজির হলেন হুইলচেয়ারে বসে। মিলনায়তনের সবাই দাঁড়িয়ে সম্মান জানালেন নাইপলের প্রতি। মঞ্চের উজ্জ্বল আলোয় তার তামাটে মুখমন্ডল প্রশান্ত। অধিবেশনের নাম রাখা হয়েছে ‘দ্য রাইটার এন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ভি এস নাইপল উইথ আহসান আকবর’। বাংলাদেশি কবি আহসান আকবর, যিনি কবিতা লেখেন ইংরেজিতে, প্রথমে লেখকের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে কিছু পরিচয়মূলক কথাবার্তা বললেন। তারপর তিনি লেখকের সঙ্গে গল্প শুরু করলেন, যা থেকে দর্শক-শ্রোতারা ভি এস নাইপলের পূর্বপুরুষের দেশান্তর থেকে শুরু করে তাঁর জন্ম, বেড়ে ওঠা, ইংল্যান্ডে পড়তে যাওয়া এবং লেখকজীবনের শুরুর কাহিনি সংক্ষেপে জানতে পারেন। আলাপচারিতায় নাইপল বললেন, তার বাবা লেখক ছিলেন, তিনিও স্থির করেছিলেন যে লেখক হবেন। কিন্তু যখন লেখার সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন তিনি দেখতে পেলেন যে তাঁর লেখার কিছু নেই। তিনি খুঁজতে লাগলেন, কী নিয়ে লেখা যায়। লেখক হব, কিন্তু লেখার বিষয় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না-এটা খুবই যন্ত্রণাদায়ক। নাইপলের একাধিক লেখায় এ প্রসঙ্গ এসেছে। লেখার বিষয়বস্তু খুঁজে পাওয়াই লেখকের কাজের অর্ধেক।
নিজের লেখা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বললেন, নিজের লেখা ব্যাখ্যা করা যায় না। ‘আপনি কীভাবে লেখেন?’ এ রকম প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন, ‘আমি যদি বলতে পারতাম আমার মন কীভাবে কাজ করে, তাহলে এটা নিয়েই আর একটা বই লিখে ফেলতে পারতাম।’
 মাঝখানে তাঁর স্ত্রী লেডি নাদিরা বিদ্যা নাইপল বলেন, এই প্রথম বাংলাদেশে আসেননি, তিনি ঢাকাতেই পড়াশোনা করতেন যখন তার বয়স ছিল তেরো বছর। ছোট্ট বয়সে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মিছিলের পেছনেও ছুটেছেন। বাংলা ও বাংলাদেশের প্রশংসায় পঞ্চমূখ তিনি। বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রতি ভালোবাসা ছিল বলেই এখানে এসেছি। কিছু বন্ধন কখনই ছিন্ন করতে হয় না। ভৌগোলিক কারণে অনেক কিছুর পরিবর্তন হয় কিন্তু ভালোবাসা সেই একই থেকে যায়। আমি প্রত্যেক শনিবার ঢাকা আর্ট কলেজে (বর্তমান চারুকলা ইনস্টিটিউট) যেতাম। সেখানের সব ভাস্কর্য আমাকে মুগ্ধ করতো। সময়ের সঙ্গে সব বদলে গেছে কিন্তু ভালবাসাটা আগের মতই আছে। আপনারা সত্যিই অসাধারণ, আমি বাংলাকে অত্যন্ত ভালোবাসি, তাই আমি বিদ্যাকে বলেছি আমাদের অবশ্যই বাংলাদেশ এবং তার মানুষকে দেখতে যাওয়া উচিত।’
তিনি নাইপলের সস্পর্কে বলেন, ‘বিদ্যা সারা জীবন শুধু কাজ, কাজ আর কাজই করেছেন। তিনি সবসময় একটা কথা বলতেন, মানুষের তিনটি জীবন প্রয়োজন। একটি কাজের জন্য, একটি অভিজ্ঞতার জন্য আর একটি নিজের মত করে বাঁচার জন্য।’
অশীতিপর লেখকের শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে তাঁকে দর্শক-শ্রোতাদের প্রশ্ন করার সুযোগ তেমন রাখা হয়নি। তবু শেষে দু’জনকে প্রশ্ন করতে দেয়া হলে প্রথম প্রশ্নকারী বললেন, ‘আপনি বলছেন লেখার কাজটা খুবই যন্ত্রণাদায়ক, তাহলে কিসের জোরে বা প্রেরণায় আপনি সারা জীবনই লিখে গেলেন?’ নাইপলের চোখে-মুখে কৌতুকের আভাস দেখা দিল। তিনি বললেন, ‘যদি না লিখতাম, তাহলে জীবনে কিছুই করা হতো না।’ শেষ প্রশ্নকারীর প্রশ্ন: আপনাকে আনন্দ দেয় কী? উত্তরে নাইপল বললেন, ‘সেটা ভেবে দেখতে হবে।’
নাইপল অসুস্থ থাকার কারণে মঞ্চে খুব বেশি কিছু বলতে পারেননি। তাকে নিয়ে বলেছেন বেশি লেডি নাইপল। লেডি নাদিরা বিদ্যা নাইপল তার স্বামী প্রসঙ্গে বলেন, নাইপল এতবেশি বিড়ালপ্রেমী যে তাকে বিড়ালের কাছে সবসময় বন্দি মনে হয়।
সাহিত্য উৎসবের বাইরেও নাইপল ছিলেন প্রানবন্ত ও উজ্জ্বল। দেশের একমাত্র পাবলিক আবাসিক উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) ঘুরতে গিয়ে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে যারপর নাই মুগ্ধ হয়েছেন। উৎসব শেষে ২০ নবেম্বর তিনি সস্ত্রীক জাবি ক্যাম্পাসে পা মাড়ান। জাবির বন্য প্রজাতি সংরক্ষণ কেন্দ্র সংলগ্ন পুকুরে দেশি এবং পরিযায়ী পাখিদের পানিক্রীড়া, ডানা ঝাপটানো আর আকাশে উড়াউড়ি দেখে বিমুগ্ধ হন তিনি। সবশেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত প্রজাপতি পার্ক পরিদর্শন শেষে বিকেলে ঢাকার উদ্দেশ্যে ক্যাম্পাস ত্যাগ করেন। তিনি বলেন, ‘এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ও পাখি তার স্মৃতিতে আজীবন থাকবে।’ এ সময় জাবি ভিসি ড. ফারজানা ইসলাম, স্বামী কথা সাহিত্যিক আখতার হোসেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. আবুল হোসেন, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আবুল খায়ের, বিভিন্ন অনুষদের ডিন ও রেজিস্ট্রার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। ভিসি স্যার ভিএস নাইপল ও নাদিরা নাইপলকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা উপহার প্রদান করেন। এর আগে নাইপল ও লেডী নাইপল সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে গিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ