ঢাকা, শনিবার 26 November 2016 ১২ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ২৫ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

যেভাবে শুরু হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পথচলা

মুহাম্মদ এহছানুল হক মিলন : একটি স্বপ্ন ও মাওলানা ইসলামাবাদী : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পূর্বে তৎকালীন পূর্বে পাকিস্তানে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরপরই চট্টগ্রামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রেরণা চট্টগ্রামবাসীর মাঝে তৈরী হয়। ১৯৪০ সালের ২৮ ডিসেম্বর কলকাতায় সর্বভারতীয় জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে চট্টগ্রামের প্রাণপুরুষ মাওলানা মুনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী শিক্ষাক্ষেত্রে মুসলামানদের ধীরগতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এবং চট্টগ্রামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্নের কথা জানিয়ে তা বাস্তবায়নে সকলের সাহযোগিতা কামনা করেন। জানা যায়, মাওলানা ইসলামাবাদী তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নে আনোয়ারা উপজেলার দেয়াং পাহাড়ে জায়গাও ঠিক করেছিলেন। এছাড়া ১৯৪২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বঙ্গীয় আইন পরিষদে ভাষণ দানকালে চট্টগ্রামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছিলেন চট্টগ্রামের আরেক কৃতীপুরুষ নূর আহমদ চেয়ারম্যান।
এর মধ্যে চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত না হয়ে ১৯৫৩ সালে রাজশাহীতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এ প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রামবাসীর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জোরদার হতে থাকে।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পটপরিবর্তন ও পরিকল্পনা গ্রহণ : ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পট পরিবর্তনের ফলে চট্টগ্রামবাসীর বহুদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ সুগম হতে থাকে। পূর্ব-পাকিস্তানের সাবেক আইজিপি ও চট্টগ্রাম জেলার রাংগুনিয়ার কৃতী সন্তান মোঃ জাকির  হোসেন ১৯৫৮ সালের ২০ অক্টোবর পূর্ব-পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পেলে চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এ সুযোগে সৃষ্টি হয়। সর্বপ্রথম গভর্নর জাকির হোসেনের প্রচেষ্টায় প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের শাসনকালে দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী (১৯৬০-৬৫’) পরিকল্পনায় পূর্ব-পাকিস্তানে প্রস্তাবিত তৃতীয় বিশ্ববিদ্যালয়টি চট্টগ্রাম জেলায় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এবং এ লক্ষ্যে বেশ কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
গুডস্ হিলে বৈঠক : প্রস্তাবিত তৃতীয় বিশ্ববিদ্যালয়টি যাতে চট্টগ্রামেই প্রতিষ্ঠত হয় সে জন্য ১৯৬০ সালের ২০ ডিসেম্মর চট্টগ্রামের বিশিষ্ট রাজনীতিক জননেতা একেএম.ফজলুল কাদের চৌধুরী তাঁর চট্টগ্রাম নগরীস্থ গুডস্ হিলের বাসভবনে চট্টগ্রামের সর্বস্তরের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও ছাত্রনেতৃবৃন্দের এক বৈঠক আহ্বান করেন। বৈঠকে প্রতিষ্ঠিতব্য বিশ্ববিদ্যালয়টি যাতে চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় সে লক্ষ্যে সত্রিুয় তৎপরতা চালানোর জন্য খোলোমেলা আলোচনা হয়।
চট্টগ্রাম-কুমিল্লা-সিলেট ত্রিমুখী প্রতিযোগিতা : দুর্ভাগ্যজনকভাবে ১৯৬১ সালের ২৮ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত
জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিল ও পরিকল্পনা কমিশনের যৌথ সভায় অজ্ঞাত কারণে প্রস্তাবিদ তৃতীয় বিশ্ববিদ্যালয়টি চট্টগ্রাম জেলার পরিবর্তে চট্টগ্রাম বিভাগের যে কোনও স্থানে প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা সংশোধনী আনা হয়। এর ফলে চট্টগ্রামবাসীর সাথে কুমিল্লা এবং সিলেটবাসীও প্রস্তাবিত তৃতীয় বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার দাবিদার হয়ে বসে। এত তৈরি হয় চট্টগ্রাম-কুমিল্লা-সিলেট ত্রিমুখী প্রতিযোগিতা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন : এ ত্রিমুখী প্রতিযোগিতার মধ্যে চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে সফল করার জন্য ১৯৬১ সালের ৭ মে চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে চট্টগ্রামের সর্বস্তরের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট ভাষা বিজ্ঞানী জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়টিকে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় ধাঁচের “ইসলামাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়” নামকরণের প্রস্তাব করে এতে অবৈতনিক শিক্ষক হিসেবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। এ সভায় বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক বাদশাহ্ মিয়া  চৌধুরীকে চেয়ারম্যান এবং চট্টগ্রাম সিটি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রফেসর আহমদ হোসেনকে আহ্বায়ক করে “চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম গরিষদ” গঠিত হয়। এ সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ দাবি আদায়ের জন্য সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে চাপ সৃষ্টি করতে সচেষ্ট থাতেন। তারা পত্র-পত্রিকায় বিবৃতি প্রদান, সরকারকে স্মারকলিপি পেশ, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করাসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ে দেন-দরবার অব্যাহত রাখেন।
লে.জে. মুহাম্মদ আজম খানের সিলেট ঘোষণা : এরই মধ্যে ১৯৬২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা উদ্বোধন করতে যাওয়ার পথে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর লে.জে. মুহাম্মদ আজম খানকে সিলেটের ছাত্রসমাজ ঘেরাও করে প্রস্তাবিত তৃতীয় বিশ্ববিদ্যালয়টি সিলেটে প্রতিষ্ঠার দাবি জানায়। পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য গভর্নর লে.জে. মুহাম্মদ আজম খান তাঁর স্বভাব সুলভ ভঙ্গিমায় গাড়ি থেকে বের হয়ে “এয়ে থার্ড ইউনিভার্সিটি হযরত শাহ্জালাল (রহঃ) কা মুলুক সিলেট মে হুগা” অর্থাৎ হযরত শাহজালাল  (রহঃ) এর স্মতি বিজড়িত সিলেটে প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হবে। বিতর্কিত এ ঘোষণাটি দিয়ে বিষয়টিকে তিনি আরও জটিল করে দেন। এ বিতর্কিত ঘোষণার পর চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং প্রস্তাবিত তৃতীয় বিশ্ববিদ্যালয়টি চট্টগ্রাম প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে পত্র-পত্রিকায় বিবৃতি প্রদান করেন।
জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে ফজলুল কাদের চৌধুরীর প্রতিশ্রুতি : ১৯৬২ সালের ২৮ এপ্রিল পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে রাউজান, রাংগুনিয়া, হাটহাজারী ও পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বিশাল নির্বাচনী এলাকার ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের প্রার্থী হন ফজলুল কাদের চৌধুরী। হাটহাজারীতে নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালে তিনি ঘোষণা করেন “আমি নির্বাচিত হই আর না হই প্রস্তাবিত তৃতীয় বিশ্বাবিদ্যালয়টি চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে স্থাপনের জন্য সকল প্রচেষ্টাই করে যাব এবং আমরা এ প্রচেষ্টায় সফল হবো ইনশাআল্লাহ্”। এ নির্বাচনে তিনি বিপুল সংখ্যক ভোট পেয়ে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ১৯৬২ সালের মে মাসে চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে ফজলুল কাদের চৌধুরীকে চট্টগ্রামবাসীর পক্ষ থেকে এক বিশাল নাগরিক সংবর্ধনা দেয়া হয়। সেই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি প্রত্যয়দৃপ্ত কণ্ঠে বলেন “মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করি আর না করি, তবে চট্টগ্রামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেই ছাড়বো ইনশাআল্লাহ”। জাতীয় পরিষদের নির্বাচনের পর ১৯৬২ সালের ১জুন থেকে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান সামরিক শাসন প্রত্যাহার করে ১৩ জুন ১৯৬২ সালে নির্বাচিত জাতীয পরিষদ থেকে ৭ জুন (পূর্ব-পাকিস্তান-৫, পশ্চিম পাকিস্তান-২) সহ ৯ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা গঠন করেন। এতে চট্টগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরী পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট মন্ত্রি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। মন্ত্রী হিসেবে তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয় সহ ১৩টি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তিনি পাওয়ায় চট্টগ্রামবাসীর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি বাস্তাবায়নে এক অফূরন্ত সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়।
ফজলুল কাদের চৌধুরী বনাম কুমিল্লার মুফিজ উদ্দিন আহমদ : ইতোমধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের পদ থেকে লে.জে. মুহাম্মদ আজম খান বিদায় নেন এবং তাঁর স্থলে নতুন গভর্নর হিসেবে ১৯৬২ সালের ২৮ অক্টোবর নিয়োগ পান আবদুল মোনেম খান। আর তাঁরই ঘনিষ্ঠ আত্মীয় কুমিল্লার মফিজ উদ্দিন আহমদ হলেন পূর্ব-পাকিস্তানের প্রাদেশিক শিক্ষামন্ত্রী। এ সুবাদে প্রস্তাবিত তৃতীয় বিশ্ববিদ্যালয়টি কুমিল্লা জেলায় প্রতিষ্ঠা হওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এ প্রেক্ষাপটে ফজলুল কাদের চৌধুরী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদের তৎপরতা জোরদার করে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি অব্যাহত রাখার পরামর্শ দেন। এরপর প্রস্তাবিত তৃতীয় বিশ্ববিদ্যালয়টি চট্টগ্রামেই প্রতিষ্ঠার জন্য চট্টগ্রামের রাজনীতিক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, শিক্ষানুরাগী সমাজসেবক, ব্যবসায়ী ও ছাত্রনেতৃবৃন্দসহ সকলে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলেন। এমনকি পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত সকল দলের সদস্যবর্গ এ ইস্যুতে প্রয়োজনে একযোগে পদত্যাগ করবেন বলে সরকারকে হুমকি দেন। ১৯৬২ সালের ৯ ডিসেম্বর লালদীঘি ময়দানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে এক বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে অবিলম্বের প্রস্তাবিত তৃতীয় বিশ্ববিল্যালয়টি চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়, অন্যথায় শিক্ষামন্ত্রীসহ সকল জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের পদত্যাগের আহ্বান জানানো হয়।
চট্টগ্রাম কুমিল্লায় ছাত্র ধর্মঘট : এদিকে আন্দোলনকে আরো জোরদার করার জন্য ১৯৬২ সালের ৩০ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের তৎকালীন ছাত্রনেতা একেএম আবু বকর চৌধুরীকে আহবায়ক করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ১৯৬৩ সালের ৮ জানুয়ারি চট্টগ্রামে বিশ্ববিল্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে চট্টগ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এক সফল ধর্মঘট পালিত হয়। ১৯৬২ সালের ২০ ডিসেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম আসার পথে কুমিল্লা রেল স্টেশনে কুমিল্লার ছাত্র সমাজ কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুল কাদের চৌধুরীকে রাত ১টা থেকে ভোর ৫ টা পর্যন্ত মেইল ট্রেন অবরোধ করে রেল লাইনের ওপর শুয়ে পড়ে। অন্যদিকে ১৯৬৩ সালের ২ জানুয়ারি চট্টগ্রামের ছাত্র সমাজ চট্টগ্রাম রেল স্টেশনে প্রাদেশিক শিক্ষামন্ত্রী মফিজ উদ্দিন আহমদকে কালো পতাকা প্রদর্শন করে ও পঁচা ডিম ছুড়ে মারে। সেদিন পুলিশের সাথে বিক্ষুব্ধ ছাত্র সমাজের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়।
জাতীয় পরিষদে ফজলুল কাদের চৌধুরীর ঘোষণা ও পরবর্তী ঘটন-অঘটন : পরবর্তীতে চট্টগ্রাম-কুমিল্লা-সিলেট প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে ১৯৬৩ সালের ১০ মে পাকিন্তান জাতীয় পরিষদে ফজলুল কাদের চৌধুরী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, ‘মাননীয় সংসদ সদস্যবর্গ, যাঁরা চট্টগ্রাম বিভাগ আর চট্টগ্রাম জেলা নিয়ে বিভ্রান্তিকর অবস্থায় আছেন, তাদের  অবগতির জন্য সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছি যে, প্রস্তাবিত তৃতীয় বিশ্ববিল্যালয়টি চট্টগ্রামে জেলাতেই প্রতিষ্ঠা করা হবে।” এরপরও পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আবদুল মোনেম খান এবং প্রাদেশিক শিক্ষামন্ত্রী মফিজ উদ্দিন আহমদের তীব্র প্রতিবন্ধকতায় ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত প্রস্তাবিত তৃতীয় বিশ্ববিদ্যালয়টি ঠিক কোন জেলায় প্রতিষ্ঠা হবে সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিন্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব হয়নি। এরমধ্যে ঢাকা  হাইকোর্টের এক রায়ে সাংবিধানিকভাবে ফজলুল কাদের চৌধুরী সদস্যপদ বাতিল হয় এবং তিনি পদত্যাগ করেন।
ফজলুল কাদের চৌধুরী স্পিকার হিসেবে শপথগ্রহণ : পদত্যাগের ঘটনার একমাস পর ১৯৬৩ সালে ২৬ অক্টোবর উপনির্বাচনে পুনরায় বিজয়ী হয়ে ২৯ নভেম্বর জননেতা ফজলুল কাদের চৌধুরী পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। সংবিধান মতে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার হলো দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ এবং প্রেসিডেন্টের অসুস্থতা বা অপারগতা বা দেশের বাাইরে অবস্থান কালে স্পিকারই অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে ফজলুল কাদের চৌধুরীর সর্বোচ্চ নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ : ফজলুল কাদের চৌধুরী স্পিকার হিসেবে অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন কালে সর্বোচ্চ নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ পান। পাকিস্তানের স্পিকার হিসেবে প্রায়ই ফজলুল কাদের চৌধুরী অস্থায়ী  প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পাওয়া শুরু করেন। ১৯৬৩ সালের ৪ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান এক দীর্ঘ সফরে বিদেশ গেলে স্পিকার ফজলুল কাদের চৌধুরী পাকিস্তানের অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হন।
১৯৬৩ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট হাউজে অনুষ্ঠিত গভর্নর সম্মেলন ও মন্ত্রিসভার বৈঠকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে সভাপতিত্ব করেন ফজলুল কাদের চৌধুরী। উক্ত বৈঠকে প্রস্তাবিত তৃতীয় বিশ্ববিদ্যালয়টি চট্টগ্রামে স্থাপনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণের জন্য কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী এটিএম মোস্তাফাকে তিনি নির্দেশ দেন। ১৯৬৪ সালের ৯ মার্চ অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুনরায় তাঁর সভাপতিত্বে লাহোরে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিলের বৈঠকে চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ মঞ্জুর অনুমোদন করেন।
স্থান নির্বাচন কমিশন গঠন : এদিকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে ফজলুল কাদের চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তদানীন্তন উপাচার্য প্রফেসর ড. এম. ওসমান গণিকে চেয়ারম্যান এবং ড. কুদরত-ই-খুদা, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, এম. ফেরদৌস খান ও ড. মফিজ উদ্দিন আহমেদকে সদস্য করে প্রস্তাবিত তৃতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নির্বাচন কমিশন গঠন করেন। কমিশন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান স্থান পরিদর্শন করে এর নৈসর্গিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে জঙ্গল পশ্চিম পট্টি মৌজায় অবস্থিত স্থানটিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত বলে রিপোর্ট দেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন : ১৯৬৪ সালের ১৭ ও ১৯ জুলাই ইসলামাবাদে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট ফজলুল কাদের চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত গভর্নর সম্মেলন ও জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিলের বৈঠকে কমিশনের সুপারিশকৃত স্থানে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং এতদসংত্রুান্ত চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়।
কুমিল্লা ও সিলেটের পরিষদ সদস্যদের তীব্র বিরোধিতা : অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে ফজলুল কাদের চৌধুরী প্রস্থাবিত তৃতীয় বিশ্ববিদ্যালয়টি চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠার যে সিদ্ধান্তসমূহ নিয়েছেন তা বাতিলের জন্য পূর্ব-পাকিস্তানের গভর্নর আব্দুল মোনেম খান, প্রাদেশিক মন্ত্রী মফিজ উদ্দিন আহমদ, দেওয়ান আব্দুল বাসিত, দেওয়ান আবদুল রব চৌধুরীসহ কুমিল্লা ও সিলেটের জাতীয় পরিষদ সদস্য ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যবৃন্দ বার বার প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের হস্তক্ষেপ কামনা করেও ব্যর্থ হন।
অবশেষে চট্টগ্রামের বিজয় : সকল ষড়যন্ত্রকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে নানা ঘাত-প্রতিঘাত ও চড়াই-উতরাই পেরিয়ে চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়। ১৯৬৪ সালের ২৯ আগস্ট চট্টগ্রামের হাটাহাজারী উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের জঙ্গল পশ্চিম পট্টি মৌজার পাহাড়ি সবুজ উপত্যকায় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদলয়ের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। এ সময় ভিত্তি প্রস্তর অনুষ্ঠানে সাবেক গভর্নর মো. জাকির হোসেনের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য চট্টগ্রাম বাসীর পক্ষ থেকে ২৫ লাখ রুপিয়ার একটি তোড়া প্রেসিডেন্ট উপহার দেয়া হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদলয়ের প্রাথমিক খসড়া পরিকল্পনা ইতোমধ্যে প্রস্তুত হয় এবং ১৯৬৫ সালের ১৭ ও ১৮ জানুয়ারি রাওয়ালপিন্ডির  প্রেসিডেন্ট হাউসে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট ফজলুল কাদের চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত যথাত্রুমে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার  বৈঠক ও কেবিনেক বৈঠকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। এবং প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা হয়।
এরপর সেই অনুযায়ী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ১৯৬৫ সালের ৩ ডিসেম্বর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রফেসর ড. আজিজুর রহমান মল্লিককে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প পরিচালক নিযুক্ত করা হয়। তাঁর সুদক্ষ পরিচালনায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়র গড়ে উঠতে থাকে অল্প সময়ের মধ্যে। ১৯৬৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জারি করা হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়র অধ্যাদেশ-১৯৬৬। এদিনেই প্রফেসর ড. এ.আর মল্লিককে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যায়ের প্রথম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি ১ অক্টোবর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ও ঐতিহাসিক পথচলা : ১৯৬৬ সালের ১৮ নবেম্বর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যায়ের বর্ণাঢ্য উদ্বোধন করা হয়। পূর্ব-পাকিস্তানের গভর্নর ও বিশ্ববিদ্যায়ের চ্যান্সেলর আবদুল মোনেম খান এ ঐতিহাসিক উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের দশদিন পর ২৮ নভেম্বর বাংলা, ইংরেজি, ইতিহাস ও অর্থনীতি এ চারটি বিষয়ে ৭ জান শিক্ষক ও ২০০ জন ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে এমএ প্রথম পর্ব (প্রিলিমিনারি) ক্লাস চালুর মাধ্যমে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পথচলা শুরু হয়।
লেখক, সাহিত্য ও সংস্কৃতি কর্মী ও শিক্ষার্থী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ