ঢাকা, শনিবার 26 November 2016 ১২ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ২৫ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ভয়াবহভাবে হ্রাস পেয়েছে আন্তর্জাতিক ইনকামিং কল

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : ভয়াবহভাবে হ্রাস পেয়েছে আন্তর্জাতিক ইনকামিং কল। গেল বছর এই সময়ে যেখানে দিনে গড়ে ১২ কোটি মিনিট ইনকামিং কল দেশে আসত, সেখানে তা এখন মাত্র ৭ কোটি মিনিটে নেমে এসেছে। অনেকেই বলছেন, ২০১৫ সালের আগস্টে কল টার্মিনেশন রেট দেড় সেন্ট থেকে বাড়িয়ে দুই সেন্ট করার পর আন্তর্জাতিক ইনিকামিং কল কমেছে। তবে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) বলছে, মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্কাইপ, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপের মতো অবৈধ ভিওআইপি অ্যাপের মাধ্যমে ভয়েস কলের সুবিধাও জনপ্রিয়তা পাওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈধ ভয়েস কলের ওপর।
জানা গেছে, ২০১৪ সালে যেখানে বিশ্বে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ২০০ কোটির মত, চলতি বছর শেষে তা ৩৯০ কোটি ছড়িয়ে যাবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে প্রযুক্তি কোম্পানি এরিকসন। আর স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের ৪৫ শতাংশই ওটিটি অ্যাপ ব্যবহার করেন। তুমুল এই জনপ্রিয়তার কারণে বিশ্বে ‘ওভার দ্য টপ’ ব্যবসার আকার ২০২০ সাল নাগাদ ৬২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিপণন গবেষণা প্রতিষ্ঠান মার্কেটস অ্যান্ড মার্কেটস। ভিওআইপি ও ওটিটির কারণে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে কোনো তথ্য বিটিআরসি দেয়নি। তবে এই পরিমাণ প্রতিদিন দুই কোটি টাকার কম নয় বলে বাজার সংশ্লিষ্টদের ধারণা। ক্ষতি যে কেবল সরকারের হচ্ছে তা নয়, মোবাইল অপারেটর ও আইআইজি অপারেটরগুলোও কল কমে যাওয়ায় লাভের ভাগ হারাচ্ছে। ভয়েসের সঙ্গে ডেটা ব্যবসায় গুরুত্ব দিয়ে বিশ্বজুড়েই এ পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে মোবাইল অপারেটরগুলো।
অ্যাসোসিয়েশন অফ মোবাইল টেলিকম অপারেটর অব বাংলাদেশের (অ্যামটব) সাধারণ সম্পাদক টি আই এম নুরুল কবির বলেন, ওটিটি বিষয়ে টেলিযোগাযোগ খাতে বর্তমানে কোনো নীতিমালা নেই। এ ধরনের নীতিমালা করতে হলে অপারেটরদের সাথে আলোচনা করেই তা করা উচিত, যাতে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করা যায়। দেশে জঙ্গি তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ‘নিরাপত্তার কারণ’ দেখিয়ে গত বছর জানুয়ারিতে সরকার ভাইবার, ট্যাঙ্গো, হোয়াটস অ্যাপসহ কয়েকটি ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং ও ভিওআইপি অ্যাপ্লিকেশন বন্ধ করেছিল। তবে কয়েকদিন পর সেগুলো খুলে দেওয়া হয়।
গতকাল শুক্রবার বিটিআরসি কার্যালয়ে ‘অবৈধ ভিওআইপি ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে’ আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদ বলেন, অবৈধ ভিওআইপির পাশাপাশি ইমো, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপের মতো স্মার্টফোন অ্যাপে ভয়েস কল সুবিধার কারণে আন্তর্জাতিক ফোন কলের ব্যবসায় মার খাচ্ছে বাংলাদেশ। শাহজাহান মাহমুদ জানান, আন্তর্জাতিক কল টার্মিনেশন রেট বাড়ানোর আগে বৈধ পথে দিনে গড়ে ১২ কোটি মিনিট ইনকামিং কল দেশে আসত। ২০১৫ সালের আগস্টে কল টার্মিনেশন রেট দেড় সেন্ট থেকে বাড়িয়ে দুই সেন্ট করার পর এখন তা দৈনিক গড়ে ৭ কোটি মিনিটে নেমে এসেছে। তিনি বলেন, মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্কাইপ, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপের মতো ভিওআইপি অ্যাপের মাধ্যমে ভয়েস কলের সুবিধাও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈধ ভয়েস কলের ওপর।
শাহজাহান মাহমুদ বলেন, এটি একটি বিরাট সমস্যা আমাদের সামনে। শুধু যে অবৈধ ভিওআইপি হচ্ছে তা নয়, অনেক কল ওটিটি। যেমন ভাইবার, ইমো বা হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে হচ্ছে। ‘মোবাইল ফোনে এ ধরনের ‘ওভার দ্য টপ’ অ্যাপ ব্যবহার করে ভয়েস কলের সুবিধা নিয়ে আগামী দুই এক মাসের মধ্যে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান বিটিআরসি চেয়ারম্যান।
এ বিষয়ে সরকার কী পদক্ষেপ নেবে সাংবাদিকেদের এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপরে কোনো নীতিমালা এখনও প্রণয়ন করা হয়নি। প্রথিবীর অন্যান্য দেশ উদাহরণ নেয়ার চেষ্টা করছি। কোনো কোনো দেশে এসব অবৈধ ঘোষণা করেছে, অনেক দেশ বলেছে শুধুমাত্র ডেটা সরবরাহ করা যাবে, ভয়েস নয়।’ অবৈধ ভিওআইপি বন্ধে সরকারের উদ্যোগে ঘাটতি রয়েছে এমন এক প্রশ্নের উত্তরে শাহজাহান মাহমুদ বলেন, এটি সম্পূর্ণ বন্ধ করা যাবে না, কিছু না কিছু থাকবেই। তবে আগের থেকে অনেক কমিয়েছি, আরও কমে যাবে।
সাংবাদিক সম্মেলনে ভিওআইপি’র অবৈধ ব্যবসা বন্ধে গণমাধ্যমে ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ জানিয়ে বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেন, সম্প্রতি একটি দৈনিকে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা বন্ধে ব্যর্থ তারানা হালিম’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এতে বিটিআরসির সূত্র ব্যবহার করে বিভিন্ন উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হয়েছে, যা আমাদের কোনো কর্মকর্তা প্রদান করেননি। ওই সংবাদে ব্যবহৃত বক্তব্যের সঙ্গে বিটিআরসির কোনো সংযোগ নেই। আর ভিওআইপি কল বন্ধের বিষয়টি চলমান প্রক্রিয়া। এখানে ব্যর্থতার প্রশ্ন আসে না। ফলে প্রকাশিত সংবাদটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ বলেন বিটিআরসি চেয়ারম্যান।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফয়জুর রহমান চৌধুরী ব্রিফিংয়ে বলেন, ভিওআইপি’র অবৈধ ব্যবসা বন্ধের বিষয়টি চলমান প্রক্রিয়া। এর কাজ চলছে। প্রতিমন্ত্রী অবৈধ ভিওআইপি বন্ধে ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে ২০১৫ সালে থেকে কাজ করে যাচ্ছেন। এছাড়া প্রতিমন্ত্রী নিজে মোবাইল ফোন, ফেসবুকসহ সামাজিক মাধ্যমে হুমকি বন্ধে টাক্সফোর্স পরিচালনা করে যাচ্ছেন।’
এক প্রশ্নের উত্তরে ফয়জুর রহমান বলেন, আমরা সব অপারেটরকে সমানভাবে দেখি। কারো বিরুদ্ধে ভিওআইপি কলের অভিযোগ পেলে জরিমানা করা হয়। এক্ষেত্রে টেলিটককে কোনো ছাড় দেয়া হয় না। বিটিআরসির ভাইস চেয়ারম্যান আহসান হাবিব খান, কমিশনার ও মহাপরিচালকরা সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিটিআরসির পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক ইনকামিং কল এ স্মার্টফোন অ্যাপকে দায়ী করা হলেও মূলত: অবৈধ ভিওআইপির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই স্মার্টফোন অ্যাপে কথা হচ্ছে। তাদের সেখানে সমস্যা হচ্ছেনা। সমস্যা কেবল বাংলাদেশেই। ব্যবসায়ীরা বলেন, শুধুমাত্র অবৈধ ভিওআইপির কারণেই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। এর সাথে বিটিআরসির শীর্ষ পদের অনেকেই জড়িত। এছাড়া এই অবৈধ ভিআইপির কেন্দ্রে রাষ্ট্রীয় মোবাইল ফোন অপারেটর টেলিটক। অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা বন্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কড়া নির্দেশও বাস্তবায়ন হচ্ছেনা। বিটিআরসির প্রায় অভিযানে দেখা যায়, অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসায় ব্যবহৃত হয় টেলিটকের সিম। যার সংখ্যা সাড়ে পাঁচ লাখেরও বেশী।
জানা গেছে, দৈনিক তিন থেকে সাড়ে চার কোটি মিনিট অবৈধভাবে ভিওআইপি করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বয়ং টেলিটক অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার কারণে নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও এ অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ করা যাচ্ছে না। সব প্রচেষ্টাই আটকে দিচ্ছেন টেলিটকের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা। টেলিটকের সিম ব্যবহার করেই তারা দিনের পর দিন এ অনিয়ম করে যাচ্ছেন। তবে অন্যান্য মোবাইল অপারেটরের সিমও কম নয়। এতে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। বৈধ ব্যবসায়ীরা হচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত। তাদের লোকসান গুণতে হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। তারা ব্যবসা হারাচ্ছেন। নানারকম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে তাদের।
এক হিসাবে দেখা যায়, প্রতিদিন অবৈধ ভিওআইপি কলের জন্য রাষ্ট্রের ক্ষতি হচ্ছে প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন কোটি টাকা। এ হিসাবে মাসে ক্ষতি হচ্ছে একশ কোটিও বেশী টাকা। এক হিসাবে দেখা গেছে, অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা বন্ধ করা হলে সরকার প্রতিবছর এক হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করতে পারতো। বৈধভাবে ভিওআইপি ব্যবসা চললে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মদ্র্রা অর্জন করা সম্ভব। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রতি মিনিটে ৩.৪৫ সেন্ট রাজস্ব আদায় হলে প্রতিবছর বৈদেশিক মুদ্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ