ঢাকা, মঙ্গলবার 29 November 2016 ১৫ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ২৮ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বেফাক মহাসচিব মাওলানা আবদুল জব্বার জাহানাবাদীর ইন্তিকাল

মোঃ আবদুল লতিফ নেজামী : বাংলাদেশ কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড-বেফাক-এর মহাসচিব মাওলানা আবদুল জব্বার জাহানাবাদীর ইন্তিকালে শোকাহত চিত্তে তাঁর আদর্শ, চেতনা, নেতৃত্ব ও কৃতিত্ব স্মরণ করা হচ্ছে। তাঁর ইন্তিকালে ব্যথিত মানুষের শোক ও শ্রদ্ধা অভিব্যক্ত হচ্ছে। এই লেখাটিও শোকবিহ্বল চিত্তের আবেগঘন প্রকাশ। কেননা তাঁর ইন্তিকালে দুঃখ, বেদনা ও শোক আবেগে রূপান্তরিত হয়েছে। কারণ তাঁর চরিত্রের প্রধান গুণ হলো সততা, নিষ্ঠা ও আত্মত্যাগ। তাঁর ইন্তিকালে যেন ক্ষণিকের জন্যে ডুবলো সূর্য। চারদিকে নেমে এল ঘন অন্ধকার। উঠলো ক্রন্ধনের ঝড়-তুফান। কেননা বেফাকের মঙ্গলের জন্যে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি কাজ করেছেন। বেফাকে মাওলানা আবদুল জব্বারের মতো আর কেউ এতো দীর্ঘ সময় অবস্থান করেননি। মোটামুটি তিনিই ছিলেন বেফাকের কর্ণধার। কারণ বেফাকের জনক মাওলানা আতহার আলী(রহ.), ১৯৭৮ সালে বেফাকের পুনঃপ্রতিষ্ঠাতা আল্লামা হাজী ইউনুছ, মাওলানা হারুন ইসলামাবাদী, মাওলানা নুরুদ্দিন গওহরপুরী ও বর্তমান চেয়ারম্যান আল্লামা আহমদ শফি প্রমুখ সকলেই রাজধানী ঢাকার বইরে অবস্থান করতেন। ফলে বেফাক মূলত মাওলানা আবদুল জব্বারের নেতৃত্বেই পরিচালিত হয়ে আসছে।
বাংলাদেশ কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড গঠনের পর এতে নতুন উষার অরুণ আলোকের মতো জাগরণ সৃষ্টি করে সকলকে উজ্জীবিত করার কাজে সচেষ্ট হন মাওলানা আবদুল জব্বার জাহানাবাদী। তিনি দুর্জয় সাহস, অসীম আত্মবিশ্বাস, দৃঢ় সংকল্প, অব্যর্থ সন্ধান ও নির্ভীকতার মাধ্যমে বেফাকের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে প্রয়াস চালিয়ে গেছেন। কওমী জগতের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বেফাককে অবারিত করা ও স্ফুরণ সৃষ্টি জন্যে দুর্বার গতিবেগ সৃষ্টির প্রয়াস চালিয়ে গেছেন তিনি। তিনি একাগ্রতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, দৃঢ় মনোবল, আত্মবিশ্বাস, নিঃস্বার্থ সেবার আদর্শ নিয়ে কওমী মাদরাসা শিক্ষার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন এমন এক বেফাকের যেখানে থাকবে কওমী মাদরাসা শিক্ষা বিকাশের পূর্ণ সুযোগ। তিনি বেফাকের মাধ্যমে এদেশে ইসলামী আন্দোলনের তরঙ্গ তোলার স্বপ্ন দেখতেন। সেখানে ভাবাবেগ ও হৃদয়বৃত্তির কোন স্থান ছিল না।
মাওলানা আবদুল জব্বার জাহানাবাদী সমস্ত লোভ-লালসার ঊর্র্ধ্বে উঠে জীবনের একতৃতীয়াংশের ও বেশি সময় ব্যয় করে গেছেন এদেশে কওমী মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচার ও প্রসারের জন্যে। তিনি ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বেফাকের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। বেফাক জীবনে তাঁর দৃঢ় সততা ও নিষ্কলুষতার ছাপ ছিল। তিনি দ্বৈতাচার, খলতা ও প্রতরণার ঊর্ধ্বে ছিলেন। তিনি ক্রোধের বশবর্তী হয়ে কর্কশ স্বভাব ও মেজাজ প্রদর্শনে অভ্যস্ত ছিলেন না, বরং নম্রতা ও আত্মসংবরণ করাকে তিনি শ্রেয় মনে করতেন। যা জীবনের সকল ক্ষেত্রে যথাযথভাবে অনুশীলন করা হলে যেকোন সমস্যার উদার, নীতিগত ও সদুদ্দেশ্যপ্রণোদিত একটা সমাধান সহজেই হতে পারে।
এদেশে ইসলামের তাওহিদ সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও সুবিচারের আদর্শ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে লোক তৈরির জন্যে যারা কাজ করে গেছেন, মাওলানা আবদুল জব্বার তাঁদের মধ্যে অন্যতম। বুদ্ধিবৃত্তিক কলাকৌশল অবলম্বন করে বেফাকের চেতনাকে এক নতুন খাতে প্রবাহিত করতে শুরু করেন তিনি । তিনি কওমী শিক্ষা জগতের চিন্তা-চেতনায় গভীর ও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় কওমী শিক্ষার জগতে আবেগ-উদ্দীপনা, উচ্ছ্বাস এবং এই শিক্ষার স্বরূপ প্রতিভাত হয় সহজ ও আন্তরিক মর্মস্পর্শীতায়। তাঁর সহজ-সরল কর্ম-পদ্ধতি প্রেরণা যুগিয়েছে কওমী জগৎকে, সাড়া জাগিয়েছে চৈতন্যে। বেফাক পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর অধ্যায়টির ওপর আলোকপাত হবে একদিন। তাঁর প্রচেষ্টায় কওমী অঙ্গনে বেফাকের বীজ ধীরে ধীরে অংকুরিত হয়ে বর্তমান অবস্থায় উপনীত হয়েছে। তিনি আত্মনিয়োগ করেন বিচ্ছিন্ন কওমী সমাজকে একীভূত করতে। চেষ্টা চালিয়ে গেছেন, কওমী মাদরাসা শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত সকলকে বেফাকের পতাকাতলে সংঘবদ্ধ করতে। বেফাকের মাধ্যমে কওমী শিক্ষার কাফেলা নিয়ে সচেষ্ট ছিলেন তিনি । কত ঝড়-ঝঞ্চার মোকাবেলা করতে হয় তাঁকে । তবে সকল ঝড়-ঝঞ্ঝার মোকাবেলাসহ সকল ক্ষেত্রে তাঁর ধৈর্য, পরমতসহিষ্ণুতা ও সহনশীলতার বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠতো।
অনৈসলামী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে মাওলানা আবদুল জব্বারের মানসিক দৃঢ়তা স্বভাবতই তাঁর সমগ্র চরিত্রে প্রতিফলিত হতো। তিনি জাতীয় জাগ্রত জনতা নামক একটি অরাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে ইসলাম বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন। কারণ ইসলামের শ্বাসরোধের চেষ্টা করা হয় বার বার। এখনও হচ্ছে। তাদের সম্পর্কে তাঁর অত্যন্ত সতর্ক ও সজাগ দৃষ্টি ছিল। তিনি মনে করতেন এদেশে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় অনেক দূর অগ্রসর হতে হবে। একান্ত আলাপচারিতায় তাঁর এধরনের মন-মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যেতো।
মাওলানা আবদুল জব্বার শুধু একজন নিষ্ঠাবান আলেমই ছিলেন না, লেখালেখিতেও তিনি অবদান রেখে গেছেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে, ১. ইসলাম ও আধুনিক প্রযুক্তি ২. মাদরাসা শিক্ষার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ৩. ভারত উপমহাদেশে মুসলিম শাসন ও তাদের গৌরবময় ইতিহাস ৪. ইসলামে নারীর অধিকার ও পাশ্চাত্যের অধিকার বঞ্চিতা লাঞ্ছিতা নারী প্রভৃতি বইপত্র লিখে ইসলামের আদর্শ, আমল-আখলাক, ইতিহাস-ঐতিহ্য, রীতি-নীতি, তাহযিব-তমদ্দুন, ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধ এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের চেতনা বিকাশের প্রয়াস চালিয়ে গেছেন। তাঁর লেখায় ফুটে উঠেছে ইসলামের রাষ্ট্রিক, সামাজিক, আর্থিক ও নৈতিকসহ মানবলোকের অনন্ত জীবনায়ন। মানবাত্মার কল্যাণ, মুনষ্যত্বের প্রতিষ্ঠা, সামাজিক, রাষ্ট্রিক ও আর্থিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে আমরা যতই মাওলানা আবদুল জব্বার জাহানাবাদীর লেখার মর্ম অনুভব করবো ও তার মর্যদা দেব, ততই এই মানবলোক সুখের নীড় হবে, মানবজীবন ততোই সহজ, সুন্দর ও মহিমময় হয়ে উঠবে। কারণ তিনি ছিলেন, ত্যাগী, প্রেমিক, কর্মী ও আকাশের মতো উদার। ত্যাগে কর্মে ও ঔদার্যে তা প্রতিফলিত হয়। সবার জন্যে তাঁর দুয়ার ছিল উন্মুক্ত। বেফাকের জন্যে ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর ছিলেন মাওলানা আবদুল জব্বার।
তিনি কখনো তাঁর মত-পথ-নীতি ও আদর্শ থেকে বিচ্যুৎ হননি। তাঁর সততা, নীতিনিষ্ঠা, কর্ম-শৃংখলা, আত্মবিশ্বাস ও আদর্শের জন্যে ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতা এবং তাঁর অনুসৃত নীতি, আদর্শ ও কর্মপন্থা আমাদের জীবনে অনুসরণীয়। মাওলানা আবদুল জব্বারের স্মৃতির প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা নিবেদনের একমাত্র উপায়- তাঁর আদর্শের অনুসারী হওয়া। তাঁর সততা, আত্মবিশ্বাস, কর্তব্যনিষ্ঠা ও অধ্যবসায়ের আদর্শে অনুপ্রাণিত হওয়া। তিনি বেফাক প্রতিষ্ঠা ও এর বিকাশের ক্ষেত্রে যে আশার প্রদীপ জেলে গেছেন, তা নব প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা। আমি আশা ও বিশ্বাস করি অনাগত ভবিষ্যতে প্রয়োজনে মাওলানা আবদুল জব্বারের নীতি-আদর্শের ব্যক্তি জন্ম নেবেন। যিনি হবেন তাঁর অবিকল প্রতিমূর্তি।
তাঁর ইন্তিকালে কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে তাঁর অভাব দীর্ঘদিন অনুভব হবে। কারণ তিনি কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডকে গড়ে তোলার লক্ষ্যে দীর্ঘ ৩৮ বছর যাবৎ নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে গেছেন। পরিশেষে আমি মাওলানা আবদুল জব্বারের রূহের মাফিরাত কামনা করছি এবং তাঁর শোক সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।
-লেখক : ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ