ঢাকা, মঙ্গলবার 29 November 2016 ১৫ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ২৮ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

প্রত্যাবর্তন

আফরোজ ইসলাম : ॥ পূর্বপ্রকাশিতের পর ॥
-সেসব দোষগুণের হিসাব-নিকাশ তোমাকে দিতে যাব, সেই বা ভাবলে কি করে! নোংরা আবর্জনা একবার চোঁখে দেখা গেলেও ও নিয়ে নাড়ানাড়ি করা যায় না! এসবের পরও লাজ লজ্জার মাথা খেয়ে এখানে পড়ে থাকো, তো থাকো, কিন্তু আমার ধারে কাছেও ঘেঁষবে না বলে দিচ্ছি..! শীতের শেষের দুপুরগুলো একটু আলসে রকমের হয়। সুতপা পা ঝুলিয়ে খাটে হেলান দিয়ে শরৎবাবুর গৃহদাহ নিয়ে বসেছে। বাড়িতে বৃদ্ধা দাদী ছাড়া আর আছে দু’জন চাকর। সুতপা ওবাড়ি থেকে সেদিন রাতেই গোসাইকে সাথে নিয়ে চলে আসে। তিনমাস হয়ে গেলেও কেউ আসেনি, সুতপা অবশ্য সে আশা ছেড়েও দিয়েছে।
-আম্মা আফনারে ডাকে একজন। বাইরের ঘরে বইতে দিছি, কইল জরুলী দরকার।
-নাম জানতে চেয়েছিস?
-না আম্মা।
-আচ্ছা, তুই চা দে, আমি আসছি। মাঝদুপুরে সাধারণত এবাড়ি চুপচাপ থাকে, চাকর নেকুর ডাকে একটু অবাক হয় সুতপা। পড়ার শাড়িখানা গুছিয়ে নিয়ে বের হয়।
-একি! অরুণদা আপনি? এতদিন পর এদিকে কোন ভাগ্যে?
কোন রোগীর খোঁজে! তা আমার সখীটিকে আনলেই পারতেন!
-সে পরে আনব। আপনার উদ্দেশ্যেই এলাম বউদি। আপনাকে নিয়ে
যেতে এলাম।
-আমাকে নিয়ে যেতে? ও বাড়ী থেকে এলেন বুঝি? সে কি আর হয় দাদা বলুন? কারও চোখে নর্দমা হয়ে থাকার চাইতে না থাকা ভালো।
-আপনার দুঃখ আমি বুঝি! কিন্তু যার সাথে এত অভিমান তারই যে চেতনা নেই এখন! বসন্তে ধরেছে, তারউপর মৌসুমের ঠাণ্ডাটা একেবারে বসে গেছে, জ্বরতো আছেই।
-তার? কবে থেকে? ওবাড়ির লোক কি সব মরেছে? বলেই ধপ করে গদিআটা চেয়ারে বসে পড়ে।
-সপ্তাহ খানেক হল। ওখানে দেখাশোনা, যত্নের লোক নেই। এমন রোগে ওষুধের সাথে যত্নও দরকার। কথাবার্তার শব্দ শুনে ওপাশ থেকে বৃদ্ধা দাদী এসে সব শুনে বললেন-
-দিদি, অসুখের সময় অভিমান করতে নেইরে, সেবা করাও যে পরম কাজ! তুই এখনি ছেলেটার সাথে বের হয়ে যা। সুতপা চলে আসার পর পুরো বাড়ি খালি লাগে শেফায়েতের। যেন শত্রু সামনে থাকার চেয়ে দূরে থাকাই বেশি বিঁধছে! দিনে দিনে সর্বত্র রুচিবোধের সজ্জাপূর্ন বাড়ির অন্দর বাহির, অন্নভোজের জীর্ণ মাতৃহীনা অনাদরের দশা তীব্র হয়ে চোঁখে পড়তে থাকে। কবে যে রোগ বাসা বাঁধে টেরও পায় না। শেফায়েত ঘুমাচ্ছে। বসন্ত কমেছে, জ্বরটাও তেমন নেই, কিন্তু ঠাণ্ডাটা ঠিক হচ্ছে না। টানা দশ বারো দিন রাত জেগে সুতপাও কাহিল হয়ে পড়েছে। এ কদিন দিন রাত এক করে সেবা করেছে শেফায়েতের। ঘুমাচ্ছে বলে সুতপা শেফায়েতের জন্য পাতলা ঝোল আর ভাত রান্নার ব্যবস্থা করতে রান্নাঘরের দিকে যায়। বকুল খালা পেছন থেকে ডেকে ওকে থামিয়ে দেয়।
-বউ, এবেলা গা ধুয়ে তুমি একটু জিরোওগে। তোমার শরীর দেখে ভালো ঠেকছেনা। যাওতো, আমরা আছি, এবেলা একটু ঘুমিয়ে নাও।
-না খালা, আজ উনাকে ভাত ঝোল দেব ভেবেছি, এ কদিনে পেটেতো তেমন কিছু পড়েনি। আমি একাতো নই, হলা’র মা তো আছে। আমি করে রেখে গা ধোব।
-হ্যাঁ রে মা...ছেলেটা কোন জনমে পুণ্য করেছিল তাই তোর মত বউ পেয়েছে। কিছু বলে না সুতপা, হাঁফ ছেড়ে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায়। বকুলবিবি জানে মুখে যাই বলুক, শেফায়েতের রান্নায় ও দাসীদের হাতও দিতে দিবে না। দু’দিন পর। শেফায়েত সেরে উঠেছে প্রায়। তারও রোগে ভুগে ভগ্নদশা হয়েছে। বাড়ির এখানে ওখানে হেঁটে বেড়ায়। সকালটায় বহুদিন পর আজ ওর পড়ার ঘরটায় এসে বসে। চারপাশে তাকিয়ে বুঝতে পারে কার হাত পড়েছে এ ঘরে। তকতক ঝকঝক করছে ঘরের সবকিছু, ঘরের সজ্জায়ও এসেছে পরিবর্তন। পুরান বইয়ের তাকে বেশকিছু নতুন বই এসেছে। বোঝা যায়, এসব যার কাজ, বই এ সে বেশ দক্ষ!
-কিহে রোগী, কেমন আছ আজ?
-আছি বেশ, তোমরা যেভাবে ধরলে তাতে আর মন্দ
থাকি কোন সাহসে?
-আমরা নই, বল বউদি ধরেছে। ওমন হাতে পড়লে রোগ না পালিয়ে বাঁচে! কি খাটাটাই খাটল! নিজের চোঁখে না
দেখলে বিশ্বাস করতাম না।
-বেশ, তাই।
-এবার মাফ চেয়ে ধরে রেখো ওমন রত্নকে।
-কি বলছ? আমি যা ভেবে রেখেছি তাই করব, একটুও এদিক
ওদিক হবে না।
-দেখ, বন্ধু বলে এতদিন চুপ ছিলাম। কপাল গুণে পেয়েছ তাকে। যেমন হয়েছিলে তাতে ওই কালোপেত্নী দয়া করে সেবার হাত না বাড়ালে ফিরে চাইতে না তুমি আজ। তোমাকে বুঝোনোর আর কিছু নেই। ধপধপ শব্দ তুলে চলে যায় অরুণ।
বকুল খালা- বউ, কি বলে তোকে আটকাব, যাচ্ছিস যা।
অরুণ- বউদি, চেম্বার ফেলে শুধু বন্ধুর রোগ সারানোর জন্য আসিনি, ঘর জুরবার জন্যেও পড়ে রয়েছি। ও ন হয় একগুয়ে বোঝেনা, সংসার ফেলে তুমি যেওনা। তুমি গেলে সব বারোভূতে খাবে।
সুতপা: -এসব রক্ষার অধিকার আর নেই আমার অরুনদা। আমি পাড়াগাঁয়ের মেয়ে, এতসবের মর্যাদা আমি ছাই কি বুঝব!
অরুণ: - নিজে মরতে বসে যাকে বাঁচিয়ে তুললে তাকে বারো ভূতের মাঝে রেখে চলে যাবে?
সুতপা- আমি তো এসেছিলাম নার্স হয়ে, দায়িত্ব শেষ, এখন আর এক মুহূর্তও আমাকে মানায় না। হ্যাঁ রে, নেকু ব্যাগগুলো তোল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা...মাঘের শেষ আর ফাল্গুনের শুরু... হালকা শীতের আমেজ মেশোনো ঝিরঝিরে বাতাস। মনে হচ্ছে কেউ বুঝি হঠাৎ করেই কনকনে ঠাণ্ডাকে দমিয়ে দিয়ে পাতলা বরফকুচি মিশিয়েছে বাতাসে। সুতপার পরনে সোনালী পাড় দেয়া কালো শাড়ি আর নয়নকোণের ভ্রমরকালো কাজলের সাথে মিলিয়েই যেন আজকের সন্ধ্যাটা বেশি কালো হয়ে নেমে এসেছে।
 কালো মেয়ের কালোতেই যেন পূর্ণ সৌন্দর্য ফোঁটে। কারও পদশব্দ মনে হল! কেন যেন বুকটা ধ্বক করে উঠে হাতুড়ি পেটানো শুরু করে দিল! পেছন ফিরে অবাক হয়ে যায় সুতপা- খাদির পাঞ্জাবির উপরে কাঁধে কোনরকমে কালো চাদর ফেলে শেফায়েত দাঁড়িয়ে। রোগে ভুগে চেহারা বিধ্বস্ত! সারা গালে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি! এমন ভগ্নদশা আগে কখনও হয়নি! শেফায়েতকে এমনিভাবে দেখে সুতপার মন কেঁদে উঠে, অবাধ্য অশ্রুও হয়ত গড়িয়ে পড়ে, তার আগেই সামলে নেয় নিজেকে সুতপা। মুখ ঘুরিয়ে রাখে।
-বাঁচিয়েই যদি তুললে তবে একলা ফেলে এলে কেন?
-আপনি এ শরীরে এখানে কেন? কোন প্রয়োজন হলে খবর পাঠিয়ে দিলেই হত।
-প্রয়োজন? তুমি ওমন মরা বাঁচাতে নিজে কষ্ট করে কোন প্রয়োজনে গিয়েছিলে? আমার অনেক ভুল হয়েছে, তার জন্য ক্ষমা চাইবার অধিকার আমার নেই, তুমিতো মহান, ক্ষমা করে আরেকটিবার ও বাড়ির পড়ার ঘরটা দখল করা যায় না?
-মাফ করবেন, অনুমতি না নিয়েই ওঘরে ঢুকেছিলাম।
-অভিমান তুমি করতে পার, কাল সকলে থাকবার জন্যে এত জোর করল, কারও একটা বাক্য তুমি শুনলে না। তা কি শুধু এই নড়বড়ে শরীরটাকে এতদূর টেনে এনে কষ্ট দেবার জন্যেই? শাস্তি যা দেবার দাও। তুমি সেরাতে চলে আসবার পর থেকে প্রতিটা ক্ষণ তোমার অভাব বোধ করেছি, কতবার চেয়েছি তোমাকে ফিরিয়ে আনতে
চেয়েছি কিন্তু অর্থহীন আত্মমর্যাদায় বারবার আটকে গেছি।
-তবে এখন কি কমেছে?
-এত কথা বলবার জো নেই, বাঁচানো দেহ মনটাকে আবারও মারতে চাও তো একলাই চললাম!
-হুম ঠাট দেখছি কমেনি! এখন থেকে পড়ার ঘর আমারও, ওতে এত অগোছালোপনা চলবেনা! মুখ টিপে হাসে সুতপা।
   -কেবলই ওই? আর এই একগুয়ে?
-ও আমি গুছিয়ে রাখব!
 দোতলা বাড়ির ছাদের মাঝখানটায় সুতপা আর শেফায়েত। বহু প্রতীক্ষিত এমন মুহর্তের সাথে বাস্তব বসবাসে দু’জনই অভিভূত! কেবলমাত্র ওই দু’জোড়া চোখ, অক্ষিপত্রের উঠা নামার নিঃশব্দ চলাচলের সাথে লজ্জাবতীর ন্যায় ওষ্ঠ-অধরের পুষ্পকোমল সংঘর্ষ মিলিত হয়ে কিরণ স্ফূরিত করে চন্দ্রালোকের অভাব পূরণে ব্যস্ত! নির্বাক তাতেই যেন মনের সকল কথার বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে! অক্ষিযুগল যেখানে ভাব আদান প্রদানের মাধ্যম, সেখানে মুখভাষ্যের প্রয়োজনটা নিতান্তই গন্য! ওই নীরবতাই বাকময়তার প্রকাশ....তাতে মানবদ্বয়ের কত কথা, কত আবেগ, প্রেম, প্রেমময় চঞ্চলতায় মুখর হয়ে আছে তা বাইরের বর্বর ক্লেশপূর্ণ পৃথিবী কালেভদ্রেই বুঝতে পারে! কার্ণিশে ফোঁটা নয়নতারার বুনো গন্ধ আর ধোঁয়া উঠা লিকারের মিশেলে একরকমের আদি-নব্য পরিবেশ! হাতের চুড়ির রিন ঝিন শব্দ বেশ মানিয়েছে! হাতে হাত আর চোঁখে চোঁখ রেখে এই নীরব কথার খই ফোটানো কথোপকথন অনন্তকাল সময় দিলেও হয়তো চলতেই থাকতো, যদি না খসখস শব্দের বিভ্রাট তৈরি করে মাথার উপর দিয়ে ডানা ঝাপটাত! চেতনা ফেরে যেন! সুতপার বেঁধে রাখা চুলগুলো খুলে দেয় শেফায়েত .... আহা!
চুলেরও এমন গন্ধ হয়! নতচোখে হাসে সুতপা...এ যেন চেনা কে নতুন করে চেনা...কার্নিশের বুনো নয়নতারার কয়েকগোছা এনে শেফায়েত শোভিত করে তার স্বপ্ননারীর কেশবিন্যাস-ভাবে-বুনো, অকৃত্রিম সৌন্দর্যের স্বপ্নকন্যাকে বুনো ফুলেই মানায় বেশ!!! মানব হৃদয়ের সুখী হতে এর চেয়ে বেশী কিছু লাগে কি? সুখ পাওয়াটা যেমন সৌভাগ্যের, সুখ পেতে চাওয়া কিংবা সুখী হতে চাওয়াটা তেমনি ইচ্ছের! বস্তুগত অহেতুক নামমাত্র মোটা অর্থমূল্যের সুখ নাম্নী ঝোলাতে সুখ গরহাজিরের দলে! ফের নীরব কথার খই ফোটে... [সমাপ্ত]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ