ঢাকা, বুধবার 30 November 2016 ১৬ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ২৯ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নির্বাচন কমিশন প্রশ্নে মার্কিন রাষ্ট্রদূত

ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা ব্লুম বার্নিকাট বলেছেন, তার দেশ যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন দেখতে চায়। গত সোমবার কূটনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠন ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ- ডিকাব আয়োজিত এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট আরো বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র চায় পরবর্তী সংসদ নির্বাচন এমন হবে যেখানে প্রত্যেক ভোটার নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারবে এবং তাদের প্রতিটি ভোট গণনা করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, অমন নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত দলীয় প্রভাবমুক্ত একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন করা। রাষ্ট্রদূত প্রসঙ্গক্রমে জানিয়েছেন, এ বিষয়ে এরই মধ্যে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। দু’জনই তাকে আশ্বাস দিয়েছেন, তারাও কোনো প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন দেখতে চান না। ক্ষমতাসীনদের এই মনোভাবের পরিপ্রেক্ষিতেও তিনি নির্বাচন কমিশনের ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট।
মতবিনিময় অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান, নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্ভাব্য সম্পর্ক এবং সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কার্যক্রম ছাড়াও রোহিঙ্গা সমস্যা প্রসঙ্গেও বক্তব্য রেখেছেন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট। কিন্তু অনেক বেশি গুরুত্ব অর্জন করেছে পরবর্তী সংসদ নির্বাচন এবং নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে তার মন্তব্য, পরামর্শ ও আশাবাদ। কারণ, এমন এক জটিল সময়ে তিনি দলীয় প্রভাবমুক্ত ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য পরামর্শের আড়ালে আহ্বান জানিয়েছেন, যখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিষয়টি নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এ ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা রেখেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন ও ২০ দলীয় জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। উল্লেখ্য, গত ১৮ নভেম্বর বেগম খালেদা জিয়া সকল দলের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠনের উদ্দেশ্যে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছেন। ঠিক কোন পর্যায়ের কতজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে সে কথা তো রয়েছেই, প্রস্তাবে নির্বাচনের দিন করণীয় সম্পর্কেও বলেছেন খালেদা জিয়া। যেমন আইন-শৃংখলা বাহিনীর সঙ্গে ভোট কেন্দ্রগুলোতে ম্যাজিস্ট্রেসির তথা বিচারিক ক্ষমতাসহ সশস্ত্র বাহিনীকে নিয়োজিত রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। আরো বলেছেন, ভোট কেন্দ্রে বাড়তি বা অতিরিক্ত ব্যালট বাক্স পাঠানো হলে সেগুলোকে আগে থেকেই প্রকাশ্য স্থানে রাখতে হবে। কোনো ব্যালট বাক্স ভোটারদের দেয়া ভোটে ভর্তি হয়ে গেলে সেটাকে ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভোটকেন্দ্রের বাইরে আনা চলবে না এবং ভোট গণনা শেষে বিভিন্ন দলের প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টদের কাছে স্বাক্ষরিত বিবরণী না দিয়ে প্রিসাইডিং অফিসার কেন্দ্র ছেড়ে চলে আসতে পারবেন না। 
যে কোনো মূল্যায়নে বিএনপি চেয়ারপারসনের এই দাবি ও প্রস্তাব যথেষ্ট বাস্তবসম্মত ও সম্ভাবনাময় হলেও ক্ষমতাসীন আওয়াামী লীগের পক্ষ থেকে ‘অন্তঃসারশূন্য’ হিসেবে চিহ্নিত করে এক কথায় নাকচ করে দেয়া হয়েছে। দৃশ্যপটে এসে গেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও। তিনি শুধু বিরোধিতাই করেননি, এ কথা পর্যন্ত বলেছেন যে, যেহেতু সংসদের বাইরে রয়েছেন সেহেতু নির্বাচন কমিশন নিয়ে কোনো কথা বলারই অধিকার নেই বেগম খালেদা জিয়ার। এ পর্যন্ত এসেও থেমে যাননি সাবেক  স্বৈরশাসক। তিনি একই সাথে ঝামেলা বাধানোর পরিষ্কার উদ্দেশ্য নিয়ে পাঁচ দফা নতুন প্রস্তাবও হাজির করেছেন। মূল কথায় বলেছেন, নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে বর্তমান সংসদের ভেতরে আইন তৈরি করে। এ ক্ষেত্রেও বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীসহ ২০ দলীয় জোটের সকল দলকে বাইরে ঠেলে দিয়েছেন জনাব এরশাদ। নতুন নির্বাচন পদ্ধতি সম্পর্কেও প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। কিন্তু সে আলোচনায় যাওয়ার পরিবর্তে এখানে জানিয়ে রাখা দরকার, বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে, এরশাদকে আসলে ক্ষমতাসীনরাই মাঠে নামিয়েছেন। আর উদ্দেশ্য হলো বেগম খালেদা জিয়ার দাবি ও প্রস্তাবকে নাকচ করে দেয়া।
অমন কৌশল তারা নিতেই পারেন, অন্যদিকে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য ও পরামর্শের মধ্য দিয়ে কিন্তু এ সত্যেরই প্রকাশ ঘটেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে শুধু সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনই চায় না, একই সঙ্গে দলীয় প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনও দেখতে চায়। আমরা মনে করি, জনাব এরশাদের মতো পরীক্ষিত দোসরদের দিয়ে কৌশলী পদক্ষেপ নেয়ার পরিবর্তে সরকারের উচিত বেগম খালেদা জিয়ার দাবি ও প্রস্তাব মেনে নেয়া এবং কাল বিলম্ব না করে স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন করা। কারণ, মার্কিন রাষ্ট্রদূত হঠাৎ করে বা বিচ্ছিন্নভাবে কোনো কথা বলেননি। বাস্তবে নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার এবং দেশে আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র সব সময় বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে এসেছে। মাস কয়েক আগে ঝটিকা সফরে এসে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিও একই পরামর্শ ও তাগিদ দিয়ে গেছেন। এর মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে এ সত্যই প্রকাশিত হয়েছিল যে, সরকার দাবি করলেও বাংলাদেশে গণতন্ত্র রয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে না। স্মরণ করা দরকার, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বৈধতা দেয়নি। বর্তমান সরকারের সঙ্গে ওয়াশিংটনের শীতল সম্পর্কের বিষয়টিও বিভিন্ন সময়ে জানাজানি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সব সময় জানিয়ে এসেছে, সব দলকে সঙ্গে নিয়ে নতুন করে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ব্রিটেনসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নও বিভিন্ন সময়ে একই তাগিদ দিয়েছে। অন্যদিকে সরকার কেবল সংশয়ের কারণই সৃষ্টি করে চলেছে। দেশের জনপ্রিয় দুই প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দল ও সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানানো হলেও ক্ষমতাসীনরা জানিয়ে রেখেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন আয়োজিত হবে। প্রশ্ন ও সংশয়ের কারণ শুধু এটুকুই নয়। মাঝখানে জেলা পরিষদ নির্বাচনের জন্য ইলেক্টোরাল কলেজ নামের এমন এক ভোটার গোষ্ঠী তৈরি করার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে যার ফলে গণতন্ত্র তো বিতাড়িত হবেই, গোটা নির্বাচনী ব্যবস্থাও ধ্বংস হয়ে যেতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে।
আমরা মনে করি, যুগের পর যুগ ধরে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত জনগণের ভোটাধিকার নিয়ে ধ্বংসাত্মক তামাশা করার পরিবর্তে সরকারের উচিত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পরামর্শ ও আহ্বান অনুযায়ী উদ্যোগী হয়ে ওঠা এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত এমন একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন করা, যার অধীনে সুষ্ঠু ও অবাধ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারবে। এ ব্যাপারে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে সমঝোতায় আসার জন্য আমরা সরকারের প্রতি আহবান জানাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ