ঢাকা, বুধবার 30 November 2016 ১৬ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ২৯ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

‘ডিএনএ’কে ঘিরেই কম্পিউটার সিস্টেমের স্বপ্ন

জাফর ইকবাল: বিজ্ঞানের কল্যাণে প্রতিনিয়ত সর্বত্র নতুনত্বের ছোঁয়া লাগছে। যোগ হচ্ছে নতুন অনেক কিছুর। য়ার ফলে কিছুদিন আগের ব্যবহার করা যন্ত্র এখন অচেনা মনে হচ্ছে। সবই হচ্ছে বিজ্ঞানের কল্যাণে। আজ সবার হাতে হাতে মোবাইল ফোন, ঘরে ঘরে টেলিভিশন-কম্পিউটারের মতো নানা ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রপাতি শোভা পাচ্ছে। এই যন্ত্রগুলো যখন প্রথম আবিষ্কার হয় তখন এদের আবিষ্কারকরা কি বুঝতে পেরেছিলেন এর বিপুল সম্ভাবনার কথা? কিংবা তারা কি অনুমান করতে পেরেছিলেন এর ভবিষ্যত রূপ কেমন হতে যাচ্ছে সে বিষয়ে?  তারা যে রকম রেখে গেছেন আজ তার চিত্র পাল্টে গেছে। আবিষ্কারক হয়ত নিজেই চিনতে পারবেন না। যদ্রি তার হাত ধরেই আজকের এই পথ চলা।
কম্পিউটার সবার পরিচিত। আবিষ্কারের পর কেমন ছিল আর এখন কেমন। তা ভাবলই কেমন জানি মনে হয়। আজ থেকে এক শ’ বছর পরের কম্পিউটারের টেকনোলজি কেমন হবে তা নিয়েও শুরু হয়ে গেছে গবেষণা।  সেই শুরুর দিকের বিশালাকৃতির কম্পিউটার থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী সুপার কম্পিউটারের ক্ষমতার দিকে তাকালে দেখা যাবে, সময়ের সঙ্গে ক্ষমতার এই বৃদ্ধির গ্রাফটি আসলে একটি এক্সপোনেনশিয়াল সম্পর্ক বজায় রেখেছে। আর যে ব্যক্তি এই ব্যাপারটি প্রথম খেয়াল করেছিলেন তিনি হলেন মাইক্রোপ্রসেসর কোম্পানি ইন্টেলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা গর্ডন মুর। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার থেকে শুরু করে ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, কম্পিউটার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো সবাই গর্ডন মুরের এই সূত্রকে এক বাক্যে মেনে নিয়েছেন।
কিন্তু কি এমন বলেছিলেন এই মুর, যা সকলেই মেনে নিলেন? খুব সহজ করে বলতে গেলে, তিনি বলেছিলেন-১ ইঞ্চি ব্যাসের একটি সিলিকনের ওপর বসানো ট্রানজিস্টরের সংখ্যা একটি নির্দিষ্ট সময় পর পর দ্বিগুণ হবে। এই ‘নির্দিষ্ট সময়’ বিষয়টি আসলে মাইক্রোপ্রসেসরের বাজারের ওপর নির্ভরশীল। তবে অধিকাংশ সময় তা ১৮-২৪ মাসের মাঝে ঘোরাফেরা করে। অনেকে আবার বলে থাকেন, গর্ডন মুর এই সূত্রটি দিয়ে কম্পিউটারের ক্ষমতা দ্বিগুণ হওয়া বোঝাতে চেয়েছেন, ট্রানজিস্টরের সংখ্যা নয়।
প্রশ্ন হলো- মুরের এই সূত্রটি কতদিন টিকে থাকবে? অনন্তকাল নাকি অতি অল্পকাল? যদি ধরেও নেই যে প্রতি দুই বছর পরই কম্পিউটারের ক্ষমতা দ্বিগুণ হবে, তাহলে আজ থেকে ১০০ বছর পর আমাদের কম্পিউটারের ক্ষমতা কেমন হবে? খুব বেশি না, এখনের তুলনায় মাত্র ১,১২৫,৮৯৯,৯০৬,৮৪২,৬২৪ গুণ প্রায়! কল্পনা করতেও তো কষ্ট? ...কিন্তু সব কিছুরই যেমন একটা শেষ আছে, তেমনি গর্ডন মুরের এই কালজয়ী সূত্রেরও আছে সীমাবদ্ধতা। যখন এই সীমার কাছে আমরা পৌঁছে যাব তখন আর নির্দিষ্ট জায়গার মাঝে ট্রানজিস্টরের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হবে না। তবে কি থমকে যাবে কম্পিউটারের অগ্রযাত্রা? যারা সাধারণ মানুষ, তারা হয়ত এক অট্টহাসি দিয়ে বলবে-এ আর এমন কি? প্রসেসর চিপ আগের থেকে বড় করে বানালেই তো হলো। তাহলেই তো ট্রানজিস্টরের সংখ্যা বাড়ে!!!
এখানেই বিজ্ঞানের সঙ্গে সাধারণ চিন্তা-ভাবনার পার্থক্য! ট্রানজিস্টর কাজ করার সময় গরম হয়ে যায়, ফলে গরম হয় প্রসেসর। আর প্রসেসর যদি অত্যধিক গরম হয় তবে তা কম্পিউটারের জন্য ক্ষতিকর। যেসব কম্পিউটারে দ্রুতগতির প্রসেসর ব্যবহার করা হয় তাদের কুলিং সিস্টেম অবশ্যই বেশ ভাল হতে হয় এই অতিরিক্ত উত্তাপ দূর করার জন্য। এক্ষেত্রে হয়ত মাল্টি-কোর প্রসেসর সিস্টেমের দিকে যাওয়া যেত। কিন্তু বড় বড় গাণিতিক সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে এই সিস্টেমেও আছে কিছু সমস্যা। বিজ্ঞানীরা তাই এখন পুরো সিস্টেমটাই পরিবর্তনের কথা ভাবছেন। তারা এখন চিন্তা করছেন আগের সেই সিলিকন ট্রানজিস্টর ভিত্তিক মাইক্রোপ্রসেসর ছেড়ে নতুন রাস্তায় হাঁটার কথা। কিন্তু সেই নতুন রাস্তাটা যে অনিশ্চয়তা আর নানা সীমাবদ্ধতায় পরিপূর্ণ... ফাইবার-অপটিক প্রযুক্তি আমাদের কম্পিউটার সিস্টেমে নিয়ে এসেছে অন্যরকম এক বিপ্লব। এর মাধ্যমে তথ্য বিনিময়ের প্রক্রিয়া যেমন পেয়েছে অত্যধিক দ্রুত গতি, তেমনি সাধারণ কেবল সিস্টেমের মতো Electromagnetic Interference নামক অসুবিধাও এই সিস্টেমে নেই। তাহলে কেমন হয়- যদি এমন এক কম্পিউটার বানাই যেটা বিদ্যুতের পরিবর্তে তথ্য আদান-প্রদানে ব্যবহার করবে আলো? মজার বিষয় হলো, এমন ‘কিছু একটা’ কিন্তু সত্যি সত্যিই আবিষ্কৃত হয়ে গেছে। এই অপটিক্যাল সিস্টেম থেকে নির্গত তাপের পরিমাণ যেমন সাধারণ ইলেক্ট্রনিক ট্রানজিস্টরের তুলনায় বেশ কম তেমনি এর কাছ থেকে পাওয়া গেছে কাক্সিক্ষত দ্রুতগতি। কিন্তু এখানেও আছে কিছু সমস্যা। এর একদল বিজ্ঞানী এমন একটি অপটিক্যাল ট্রানজিস্টর তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন যার আকৃতি একটি মাত্র অণুর সমান (ঠিকই পড়েছেন)! কিন্তু এই সিস্টেমকে কার্যকর করে তুলতে তাদের তাপমাত্রা কমিয়ে আনতে হয়েছিলো -২৭৩ ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত! ফলে আমাদের মতো সাধারণ কম্পিউটার ব্যবহারকারীদের জন্য তা ব্যবহার করা এখন পর্যন্ত অসম্ভবই বলা চলে।
এই অপটিক্যাল বা ফোটনিক ট্রানজিস্টরগুলোকে কিন্তু কোয়ান্টাম কম্পিউটার সিস্টেমে ব্যবহার করা যায়। এখন প্রশ্ন হলো- সাধারণ কম্পিউটারের সঙ্গে এই কোয়ান্টাম কম্পিউটারের মূল পার্থক্যটা কোথায়? সহজ করে বলতে গেলে- নানা রকম অপারেশনের ক্ষেত্রে আমাদের কম্পিউটারগুলো যেখানে ব্যবহার করে বাইনারি সংখ্যা অথবা বিট, কোয়ান্টাম কম্পিউটার সেখানে ব্যবহার করে কোয়ান্টাম বিট অথবা কিউবিট। বিট মানে- ‘হয় ০ অথবা ১’, যা অনেকটা সুইচ অন-অফের মতো। কিন্তু কিউবিট ‘একই সময়ে ০ এবং ১ অথবা এ দুয়ের মাঝে যা আছে’-এর সবই হতে পারে! কিন্তু এই কোয়ান্টাম কম্পিউটারেরও রয়েছে অপটিক্যাল ট্রানজিস্টরের মতো ‘অত্যধিক নিম্ন তাপমাত্রাজনিত সমস্যা’! আবারও সমস্যা? চিন্তা নেই, যেখানে সমস্যা আছে সেখানে সমাধানও আছে। খুঁজে পেতেই যা একটু দেরি হয় আর কি! নিজেদের অজান্তেই আমরা আসলে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পিউটারের কাঁচামালগুলো আমাদের দেহে বহন করে চলেছি সৃষ্টির আদিকাল থেকে। কি সেই কাঁচামাল? ‘ডিএনএ’। হ্যাঁ, ডিএনএ’ হলো সেই ব্যক্তি যাকে ঘিরেই এখন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়াররা ভবিষ্যত কম্পিউটার সিস্টেমের স্বপ্ন দেখছেন, নিরলস কাজ করে চলেছেন গবেষণাগারে। এই ডিএনএ কম্পিউটারের কিছু মজার বৈশিষ্ট্য চলুন জেনে নেয়া যাক। মাত্র এক পাউন্ড ডিএনএ তে আজ পর্যন্ত তৈরি করা সব ইলেক্ট্রনিক কম্পিউটারে রাখা তথ্যের চেয়ে বেশি রাখা সম্ভব হবে।
চোখের এক ফোঁটা অশ্রুর সমান একটি ডিএনএ কম্পিউটারের ক্ষমতা হবে এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে শক্তিশালী সুপার কম্পিউটারের চেয়েও বেশি। মাত্র ১ ঘন সেন্টিমিটার পরিমাণ জায়গায় রাখা যাবে ১০ ট্রিলিয়ন এর মতো ডিএনএ অণু। আর এখানে রাখা সম্ভব হবে প্রায় ১০ টেরাবাইট পরিমাণ তথ্য! দুঃখের বিষয়, এই কম্পিউটারটি এখনও ল্যাবরেটরিতেই আছে। সুখের বিষয়, ভবিষ্যত প্রজন্ম  হয়তো ঠিকই পাবে... আশার কথা হলো- তখন আমাদের কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেম এমন শক্তিশালী হবে যার ফলে পাওয়া যাবে অত্যন্ত দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগ। বিশ্বের যেকোন প্রান্তে বসেই যোগাযোগ করা যাবে যে কারো সঙ্গে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, এই কম্পিউটিং সিস্টেমের ফলে সরকারী গোয়েন্দা সংস্থা এবং এ ধরনের অন্যান্য সংস্থাগুলো আমাদের ওপর সর্বক্ষণ নজর রাখার চেষ্টা করবে। যার ফলে ব্যাহত হবে  ব্যক্তিগত জীবন আর গোপনীয়তার মতো বিষয়গুলো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ