ঢাকা, বুধবার 30 November 2016 ১৬ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ২৯ সফর ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নরসিংদীতে ও শরীয়তপুরে খুনের মামলায় ৭ জনের ফাঁসি

সংগ্রাম ডেস্ক : গতকাল মঙ্গলবার নরসিংদীতে হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ৮ বছর পর আইয়ূব হত্যা মামলার রায়ে ৬ জনের ফাঁসি এবং শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার জোড়া খুনের মামলায় এক আসামীকে ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়েছে।
নরসিংদী সংবাদদাতা : হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ৮ বছর পর নরসিংদীর চাঞ্চল্যকর আইয়ূব হত্যা মামলার রায় ঘোষিত হয়েছে। বরফকলের চাকরি চলে যাওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে আইয়ূব (২৪) নামের অপর এক কর্মচারীকে শিরশ্ছেদ করে হত্যা করার দায়ে সুজন ওরফে বাঘা সুজন (৩৪), সোহাগ (৩০), সাদ্দাম (২৮), সমীর (৩২), এরশাদ (৩০), বিমল (২৩) নামে ছয় খুনিকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ এবং প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। একই মামলায় হত্যাকাণ্ডের পর লাশ গুম করার দায়ে প্রত্যেককে ৩ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ডাদেশ দেয়া হয়েছে। গতকাল (মঙ্গলবার) দুপুরে নরসিংদীর অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ শাহীন উদ্দিন এক জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন। মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তাদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করার জন্য রায়পত্রে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রাপ্ত সুজন ওরফে বাঘা সুজন ময়মনসিংহ জেলার গৌরিপুর থানার রামনাথপুর দক্ষিণপাড়া গ্রামের লাল উদ্দিন মোল্লার পুত্র সোহাগ ওরফে সাহাগ চন্দ্র দাস নরসিংদী শহরের পশ্চিম কান্দাপাড়া মহল্লার শীতল চন্দ্র দাসের পুত্র। সাদ্দাম নরসিংদী জেলা শহরের বৌয়াকড় মহল্লার আব্দুর রাজ্জাকের পুত্র। সমীর ওরফে সমীর চন্দ্র দাস একই মহল্লার সুধীর চন্দ্র দাসের পুত্র। এরশাদ চাঁদপুর জেলার মতলব থানার আম্মাকান্দা গ্রামের মৃত সাদেক মিয়ার পুত্র এবং বিমল বৌয়াকুর মহল্লার কালাচান দাসের পুত্র বলে জানা গেছে। রায় ঘোষণার সময় আসামীরা সকলেই পলাতক ছিল। তাদেরকে গ্রেফতারের পর তাদের সাজা কার্যকর হবে বলে জানা গেছে।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ থেকে জানা গেছে, নরসিংদী জেলা শহরের মুসলেহ উদ্দিন সুপার মার্কেটে মোঃ কবির হোসেনের বরফকলে সুজন ওরফে বাঘা সুজন ওরফে টাইগার নামে এক যুবক চাকরি করত। কিন্তু সুজন বরফকলের মালিক মোঃ কবির হোসেনের কথাবার্তা ঠিকমত শুনতো না বলে এক পর্যায়ে তার চাকরি চলে যায়। সেইস্থলে নিয়োগ দেয়া হয় নিহত আইয়ূবকে। এই ঘটনার পর চাকরিচ্যুত সুজন ওরফে বাঘা সুজন আইয়ূবের প্রতি খুবই ক্ষিপ্ত হয়। সে সুকৌশলে আইয়ূবের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে। তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। সুজন প্রায়ই আইয়ূবের মোবাইলে ফোন করে তাকে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যেত এবং তার সাথে গল্পগুজব করে বিদায় দিয়ে দিত। এমনিভাবে ২০০৮ সালের ২৯ আগস্ট বিকেলে মোবাইল ফোনে ফোন করে আইয়ূবকে অজ্ঞাত স্থানে ডেকে নিয়ে যায় সুজনগংরা। এরপর আইয়ূব আর বাড়িতে ফিরেনি। তার পিতা মোঃ আব্দুল হেকিম সরকার বিভিন্ন জায়গায় তালাশ করে তাকে কোথাও খুজে পায়নি। পরদিন দুপুর ১২.০০ টায় লোকমুখে খবর পায় যে, সদর উপজেলার দামের ভাওলা গ্রামের জয়নাল মোল্লার বাড়ির পাশে মেঘনা নদীতে মস্তকবিহীন একটি লাশ ভাসছে। খবর পেয়ে পিতা আব্দুল হেকিম ও আত্মীয়-স্বজনরা পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে। পরে লাশের গায়ের জামা ও হাতের আংটি দেখে লাশটি আইয়ূবের লাশ বলে শনাক্ত করে। এ ব্যাপারে আব্দুল হেকিম বাদী হয়ে নরসিংদী সদর মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। মামলা নং- ১ (৯)০৮। পরে পুলিশ দীর্ঘ তদন্ত শেষে আসামীদেরকে গ্রেফতার করে। পুলিশী জিজ্ঞাসাবাদের জবাবে সুজন, সোহাগ, সাদ্দাম ও সমীর পুলিশের নিকট ও আদালতে ১৬১ ও ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে। এ ব্যাপারে পুলিশের দেয়া চার্জশীট, আসামীদের স্বীকারোক্তি ও ৯ জন স্বাক্ষীর স্বাক্ষ্য এবং এসব ঘটনাসমূহের আইন ও যৌক্তিক পর্যালোচনা শেষে দীর্ঘ ৮ বছর পর বিজ্ঞ আদালত আসামীদের মৃত্যুদণ্ড, অর্থদন্ড ও কারাদন্ডাদেশ প্রদান করেন। বিজ্ঞ বিচারক আসামীদেরকে ৭ দিনের মধ্যে উচ্চাদালতে আপিল করার সুযোগও প্রদান করেছেন।
শরীয়তপুর সংবাদদাতা জানান, শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার একটি জোড়া খুনের মামলায় ১ আসামীকে ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়েছে। গত মঙ্গলবার দুপুরে শরীয়তপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক আতাউর রহামান এ আদেশ দেন।
মামলার বিবরণে জানাযায়, ২০১০ সালের ২৮ জুলাই আসামী গোবিন্দ চন্দ্র কবিরারজ ভেদরগঞ্জ উপজেলার রামভদ্রপুর গ্রামের বাড়ির মন্দিরে পুজা করার সময় ছেলের বউ অর্চনা কবিরাজকে বাশ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে। হত্যার দৃশ্য দেখে ফেলায় ভাইয়ের বউ রানী বালাকেও একই লাঠি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে গোবিন্দ। ওই দিনই নিহত রানী বালার স্বামী লাল মোহন কবিরাজ বাদী হয়ে ভেদরগঞ্জ থানায় ভাইয়ের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করে। মামলার তদন্ত শেষে ২০১১ সালের ৩১ অক্টোবর আদালতে অভিযোগ পত্র দাখিল করে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। বাদী ও আসামী পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ আতাউর রহমান অভিযুক্ত গোবিন্দ কবিরাজের মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রদান করেন।
রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়োজিত আসামী পক্ষের আইনজীবী এড্যাভোকেট জাহাঙ্গীর আলম কাসেম বলেন, আসামী ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এ আদেশে আমরা খুশি নই। আসামী পক্ষের লোকজনের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে আমরা এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করার চিন্তা করছি।
শরীয়তপুর জেলা জজ আদালতের প্রসিকিউটর এ্যাডভোকেট মির্জা হজরত আলী সাইজী বলেন, দীর্ঘ সারে ছয় বছর পর হলেও আদালতে অভিযোগটি প্রমান করতে সক্ষম হয়েছি। আদালত হত্যাকাণ্ডে জরিত থাকার অভিযোগে গোবন্দি কবিরাজকে সর্বোচ্চ শাস্তির আদেশ দিয়েছেন। মৃত্যুদণ্ডের আদেশে নিহতের স্বজনরা সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। এ রায়ের মাধ্যমে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ