ঢাকা, শুক্রবার 02 December 2016 ১৮ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ০১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নজরুলের কবিতা-গানে কুলসুম

শফি চাকলাদার : ‘ব্যথার দান’ গ্রন্থের উৎসর্গ এবং নজরুল’ বিষয়ে আমি অধুনালুপ্ত সাহিত্য পত্রিকা ‘নতুন কলম’-এ অনেক গবেষণা করে লিখেছিলাম। সেটা ছিল ১৯৯৭-এর আগস্ট। তখন আমার হাতে আর কিছু তথ্য ছিল না। এখন আরও তথ্য জড় হয়েছে। গবেষণা করছি এবং আবারও বলব নজরুলের হৃদয়কে যত বিরহ-মধুরে আপ্লুত করার কারণ ‘ব্যথার দান’ গ্রন্থের উৎসর্গের পেছনে যার ছায়া এবং কায়া ভেসে ওঠে সেই হচ্ছে কুলসুম নামের একজন কিশোরী। আমি তখন প্রায় ষাট-অধিক কবিতা গল্প সঙ্গীত থেকে তথ্য সংগ্রহ করে প্রবন্ধ প্রকাশ করেছিলাম। কে ছিলেন এই কিশোরী? যতটুকু সংগ্রহ হয়েছে চিন্তা-ভাবনা এবং গবেষণায়- এই কুলসুম নজরুলের চুরুলিয়া বাড়িতেই অন্য হিসস্যার। সম্ভবত ওরা একটু ধনী ছিলেন এবং এটাই ছিল নজরুল-কুলসুম প্রেমের শক্ত বাধা। পারিবারিক সদস্যদের এটা পছন্দ ছিল না। নজরুলের বাউন্ডুলে জীবনের এটি একটি প্রধান কারণ। পিতার মৃত্যুর পর নজরুলের মা বিয়ে করেন নজরুলের চাচা বজল-এ-করিমকে। এটাও একটা অন্যতম প্রধান কারণ নজরুলের ঘর-বিমুখ হওয়ার। তবে নজরুলের ‘ব্যথার দান’ গ্রন্থের উৎসর্গ এবং চুলের কাঁটা যতœ করে রাখাটা প্রমাণ রাখে ঐ কিশোর বয়সী প্রেম কতটা গভীর ছিল। ‘চুলের কাঁটা’র একটা বিশ্বস্ত তথ্য পাওয়া যায় নজরুলের ঐ লেটোদলের একটি নজরুল রচিত সাধারণ সং ‘কুলসুম’ থেকে। কিছুটা উদ্ধৃতি এখানে তুলে ধরলাম-
[বৈকাল বেলা। আম বাগান। জ্যৈষ্ঠ মাসে ঝড় উঠেছে। কিছু কিশোর-কিশোরী ছোটাছুটি করে আম কুড়াচ্ছে।]
[কালুর প্রবেশ] ঐ-ঐ সিঁদুরী আম গাছটার গোড়ার কাছে একটা আম আছে। ঐ আমটা আমাকে কুড়াতে হবে। [প্রস্থান]
[কিশোরী কুলসুমের প্রবেশ]
কুলসুম: ঐ দূরে সিঁদুরী আম গাছটার নামুতে একটা আম পড়ে আছে। ঐ গাছটার আম টক-মিঠে। নুন কাঁচা লঙ্কা দিয়ে খেতে যা ভাল লাগে। যাই ছুটে যাই। [প্রস্থান]
[গাছতলায় প্রথমে কালু ও পরে কুলসুমের প্রবেশ]
[আমটা দু’জনেই ধরে ও কাড়াকাড়ি করে।]
কালু : ছেড়ে দে কুলসুম, আমটা আমি আগে ধরেছে।
কুলসুম : না ছেড়ে দাও, আমটা আমি আগে ধরেছি (দু’জনে আমটা কাড়াকাড়ি করার সময় কালু সুকৌশলে অন্য হাত দিয়ে টুক করে কুলসুমের মাথার একটা চুল-কাঁটা খুলে নিয়ে নিজের মাথার ঘন চুলে ঢুকিয়ে দেয়।)
: এটি! তুমি আমার চুলে হাত দিলে!!
কালু: না রে না, আম কাড়াকাড়ি করতে গিয়ে, তোমার মাথার চুলে হাতটা লেগে গেল। তা আমটা তুই নে, আমাকে একটু দিস্॥
কুলসুম : দাঁড়াও। মাথায় হাত দিয়ে দেখে) ওমা আমার মাথার খোঁপায় একটা চুল-কাঁটা নাই। সখীরা চুল বেঁধে, চুলের খোঁপায় নয়টা চুল-কাঁটা গেঁথে দিয়েছিল। খোঁপায় আটটা চুল-কাঁটা আছে।
কালু : তুই ভুল করছিস, চুলের খোঁপায় যা কাঁটা ছিল, তাইই আছে। আমি তোর চুল-কাঁটা নিয়ে কি করবো?
কুলসুম: না, না, নয়টা চুল-কাঁটা ছিল। তুমি একটা খুলে নিয়েছ।
কালু: তা ঝাড়া-কুড়া হলো। (জামার পকেট দেখায়) এই দেখ, আমি তোর চুল-কাঁটা নিই নাই।
কুলসুম: ঝাড়া-কুড়া তুমি দিলে বটে। কাঁটাটা তো মেঝেতে পড়ে নাই। কাঁটাটা তুমি অন্য কোথাও লুকিয়ে রেখেছ। তুমি আমার চাচাতো ভাই। আম কুড়ানোর ছলে তুমি আমার চুল-কাঁটা চুর করলে?
: কাঁটা চুরি করে আমার, যাবে কোথা যাদুধন।
সিঁদুর-আম কুড়ানোর ছলে,
খোঁপার কাঁটা খুলে নিলে,
টের পাইনি বুঝি ভাবিলে, চুলে টান পড়ল যখন।
কালু: ছাড়্্ ওসব কথা, চ এখন বাড়ী চ।

আরো কথা বলতে হয়, চা-পানমূলক সং-এ ‘এক কন্যা-তিন বর’-এও ‘কুলসুম’ রয়েছে। দু’টি পালা’র মধ্যে মিল রয়েছে। ঐ ‘কালু’ চরিত্রটাই হচ্ছে আমাদের নজরুল। চুলের কাঁটার তথ্য নজরুল থেকেই জানা গেল, শুধু তাই নয়, ঐ বয়সী প্রেম অর্থাৎ কিশোরবয়সী প্রেম-কখনো ভোলা যায় না। আর তাই নজরুল তার একটি গানে বাণী বাঁধেন- ‘স্মৃতি কি তার যায় ভোলা’।
পরবর্তী জীবনে নজরুল অসংখ্য কবিতা-গান-গল্পে কুলসুম-এর ছায়া নিয়ে লেখা পাই। এখানে বেশি কিছু লিখব না। আমার ঐ নিবন্ধটি আমার ‘জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম: নানা প্রসঙ্গ’ গ্রন্থে স্থান দিয়েছি। ‘চির জনমের প্রিয়া’ কবিতা নিয়ে সামান্য কথা কুলসুম বিষয় সাক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরা যাবে-
কবিতাটি ১৩৪৭-এর ফাল্গুনে ‘সওগাত’-এ প্রকাশ পায়। এই একটি কবিতার মধ্যে সাতটি নজরুল-সঙ্গীতকে পাই-১। আরো কতদিন বাকি? ২। আমি চাঁদ নহি অভিশাপ ৩। দীপ নিভিয়াছে ঝড়ে ৪। গভীর নিথিথে ঘুম ভেঙে যায় ৫। তব মুখখানি খুঁজিয়া ফিরিগো ৬। মনে পড়ে আজ সে কোন জনমে ৭। ফোটালে না কেন ফোটালে না ভীরু এ মনের কলি। উল্লেখ্য, এই সাতটি গানই বিরহ-মধুর মথা। শ্রুতিকে আকর্ষণ করে। নজরুল মানেই বিরহ-মধুর, নজরুল মানেই দ্রোহ-প্রেম, নজরুল মানেই সুর-ফুল এবং নজরুল মনেই ‘দারিদ্র্য মোর পরমাত্মীয়। নজরুল বিরহ-মধুরে ঢাকা ঐ কুলসুমের জন্য- অন্য কারো জন্য নয়। কিশোর বয়সের অনেক বছরের প্রেম। চিরজনমের প্রিয়া’র পঞ্চম গানটি যেন কুলসুম-নজরুল প্রেমের অসংখ্য রচনার এক প্রধান সাক্ষী-
না পাওয়া বেদনার আর্তনাদ- নয় কি?
শান্ত হইনু প্রলয়ের ঝড়, মলয়-সমীর রূপে
যেখানে দেখেছি ফুল সেইখানে ছুটে গেছি চুপে চুপে।
পৃথিবীতে যত ফুটিয়াছে ফুল সকল ফুলের মুখে
তব মুখখানি খুঁজিয়া ফিরেছি- না পেয়ে উগ্র দুখে
ঝরায়েছি ফুল ধরার ধূলায়। ঝরা ফুল-রেণু মেখে
উদাসীন হাওয়া ফিরিয়াছি পথে তব প্রিয় নাম ডেকে!
সদ্য¯œাতা এল কু-ল শুকাইতে যবে তুমি
সেই এলোকেশ বক্ষে জড়ায়ে গোপনে যেতাম চুমি।

তোমার কেশের সুবভি লইয়া দিয়াছি ফুলের বুকে
আঁচল ছুঁইয়া মূর্ছিত হয়ে পড়েছি পরম সুখে!
তোমার মুখের মদির সুরভি পিইয়া নেশায় মাতি,
মহুয়া বকুল বনে কাটায়েছি চৈত্রী চাঁদিনী রাতি।
তব হাত দুটি লতায়ে রহিত পুষ্পিত লতা সম
কত সাধ যেত যদি গো জড়াত ও লতা কণ্ঠে মম।
তব কঙ্কণ চুড়ি লয়ে আমি খেলেছি, দেখোনি তুমি,
চলিতে মাথার কাঁটা পড়ে যে, আমি তুলিতাম চুমি।
চোরের মতন চুরি করিয়াছি তব করবীর ফুল
সে সব অতীত জনমের কথা আজ মনে হয় ভুল!
হ্যাঁ নজরুল সঠিক কথাটাই বলেছে, ‘আজ মনে হয় ভুল’। তাঁর বাউন্ডেলে জীবনের ছোঁয়া পাওয়া যায় “উদাসীন হাওয়া ফিরিয়াছি পথে তব প্রিয় নাম ডেকে’। কুলসুম-নজরুল প্রেম যখন সাপোর্ট পাচ্ছিল না তখন পথে পথে প্রান্তরে ঘুরে সময় কাটানোই যেন মূখ্য ভূমিকা পায়। পিতার মৃত্যুর মাতা জাহেদা খাতুনের বিয়েও নজরুল মেনে নেননি। যে মাকে নজরুল সবচেয়ে বেশি আপন মনে করতেন এই ঘটনায় নজরুল দারুণ মর্মাহত হয়, শুরু হয় বাউন্ডেলে জীবনের পথ-পরিক্রমা। পরবর্তীতে কুলসুমকে না-পাওয়া নজরুলকে দারুণ আঘাত করে। কুমিল্লার নার্গিস ঘটনা ছাপিয়ে নজরুল এমন রচনা রচেন। কুলসুমকে নজরুল তাঁর স্মৃতি থেকে লিখেনÑ একটি প্রসিদ্ধ সঙ্গীতে ‘নিশিরাতে রিমঝিমঝিম বাদল ঝরে’
দ্বার খুলি পড়শি কৃষ্ণা মেয়ে আছে চেয়ে
মেঘের পানে আছে চেয়ে
কারে দেখি আমি কারে দেখি
মেঘলা আকাশ না ঐ মেঘলা মেয়ে।
একই ভিটায় পাশের বাড়িতে পাশাপাশি থাকতেন নজরুল এবং কুলসুম। তাই এমন বাস্তব দৃশ্যের সাথে একাধিকবার মুখোমুখি হয়েছেন তারই স্মৃতির এভাবে প্রকাশ। কতটা গভীর ছিল প্রেম। আমার গবেষণায় দৃঢ়তা এসেছে গানটি ১৩৪৭ এর দিকে রচিত। কত গভীর প্রেম ছিল যা নজরুলের হৃদয় ক্ষত সৃষ্টি করে রেখেছিল। আর তাইতো নজরুল রচেন ‘গভীর নিশীথে ঘুম ভেঙ্গে যায়, কে যেন আমারে ডাকে’। কুলসুম প্রেম তাকে তাড়িয়ে বেড়াত। তাই ‘চির জনমের প্রিয়া’র সুর এ গানটিতে ধ্বনিত হয়Ñ
তব মুখখানি খুঁজিয়া ফিরিগো সকল ফুলের মুখে,
ফুল ঝরে যায় তব স্মৃতি জাগে কাঁটার মতন বুকে ॥
তব প্রিয় নাম ধরে ডাকি
ফুল সাড়া দেয় মেলি আঁখি
তোমার নয়ন জাগিল না হায় ফুলের মতন সুখে ॥
আকাশে বাতাসে তব নাম লয়ে ওঠে রোদনের বাণী
কানাকানি করে চাঁদ ও তারায় জানি গো তোমারে জানি।
খুঁজি বিজলি প্রদীপ জ্বেলে
কাঁদি ঝঞ্জার পাখা মেলে
অন্ধ গগনে আঁধার মেঘের ঢেউ ওঠে মোর দুখে ॥
তাই অনায়াসে বলা যায় নজরুলের ‘বিরহ মধুর’-এর মাধুর্য এই কুলসুম-এর কারণেই। নার্গিস বিষয় উপচে যায় কুলসুম কারণে। ‘চিরজনমের প্রিয়া’ রচিত হয় ১৩৪৭ এ নার্গিস বিষয়ের সমাপ্তি হয়ে যায় এর মধ্যেই। তবুও মনে পড়ে মনে গেঁথে থাকে কুলসুম। লেটো দলে কুলসুম, এক কন্যা তিন বর, চুলের কাঁটা এবং মা’র সাথে সম্পর্কে ভাঙ্গন-মা’র বিবাহ এবং কুলসুম নিয়ে গভীর ভাবে উপলব্ধি করলে সমাপ্তি হবে ‘কুলসুম’-এ এসে। ‘চির জনমের প্রিয়া’ কবিতাখানি তো সেই উপলব্ধিকে পূর্ণত্বে নিয়ে যায়। এছাড়াও ১৯৯৭ তে প্রকাশিত আমার গবেষাতে প্রায় সত্তুর অধিক নজরুল-রচনাতে যা পেয়েছি তার উল্লেখ জড় করলে নজরুরের প্রেম-ভালবাসা সমস্তই ছিল কুলসুমকে ঘিরে। ‘সন্ধ্যা গোধূলী লগনে কে’-এর  (কে?) এই কুলসুমই। ১৩৪৭ এর কবিতা- যার শুরু ‘লেটো’ সময় থেকে দীর্ঘকাল, সেখানে মাত্র কমাস ‘নার্গিস’ এবং আকবর সাহেবের প্রতারণার স্থান কিছুতেই নয়।
দেওঘরে তখন নজরুল ১৩২৭ পৌষ। রচনা করেন ‘ছল কুমারী’ গীতি কবিতাটি। ১৩২৭ থেকে ১৩৪৭ দীর্ঘ ২০ বছর সময়। চুলের কাঁটা’র স্মৃতি দুটো কবিতাতেই পাওয়া যায়। এই ২০ বছরের মধ্যে ‘নার্গিস’ অধ্যায় পেরিয়ে গেছে। ১৩৪৪ এ নার্গিস হিজ-মাস্টার্স-এর অফিসে গিয়েছিল তাই তাৎক্ষণিক একটি গান রচেছেন ‘যারে হাত দিয়ে মালা’ কিন্তু এসব ডিঙ্গিয়ে কুলসুম’ তার স্মৃতিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল
কত ছল করে সে বারে বারে দেখতে আসে আমায়।
কত বিনা-কাজের কাজের ছলে চরণ দুটি
        আমার দোরেই থামায় ॥
জানলা-আড়ে চিকের পাশে
দাঁড়ায় এসে কিসের আশে,
আমায় দেখেই সলাজ ত্রাসে
অনামিকায় জড়িয়ে আঁচল গাল দুটিকে ঘামায় ॥
সবাই যখন ঘুমে মগন দুরু দুরু বুকে তখন
        আমায় চুপে চুপে
দেখতে এসেই মল বাজিয়ে দৌড়ে পলায়,
    রঙ খেলিয়ে চিবুক গালের কূপে!
দোর দিয়ে মোর জলকে চলে
কাঁকন হানে কলস গলে।
অমনি চোখাচোখি হলে
চমকে ভুঁয়ে নখটি ফোটায় চোখ দুটিকে নামায় ॥
মইরা হাসে দেখে তাহার দোর দিয়ে মোর
নিতুই নিতুই কাজ অকাজে হাঁটা,
করবে কি ও? রোজ যে হারায় আমার দোরেই শিথিল বেণীর দুষ্টু মাথার কাঁটা।
একে ওকে ডাকার ভানে
আনমনা মোর মনটি টানে,
কি যে কথা সেই তা জানে,
ছল-কুমারী নানান ছলে আমারে সে জানায়।
পিঠ ফিরিয়ে আমার পানে দাঁড়ায় দূরে
উদাস নয়নে যখন এলোকেশে,
জানি তখন মনে মনে আমার কথাই ভাবতেছে সে,
মরেছে সে আমায় ভালোবেসে।
বই-হাতে সে ঘরের কোণে
জানি আমার বাঁশিই শোনে,
ডাকলে রোষে আমার পানে
নয়না হেনেই রক্ত-কমল-ঝুঁড়ির সম চিবুকটি তার নামায় ॥
উল্লেখ্য আলি আকবর-এর সাথে কুমিল্লা প্রথম যাওয়া ১৩২৭ এর চৈত্রতে নার্গিসকে লেখা শেষ পত্র ১লা জুলাই ১৯৩৭। নজরুলের বিরহ মধুর দিনগুলো বাউন্ডুলে জীবন সকল কারণের ছায়া ‘মাথার কাঁটা’ নিঃসন্দেহে ॥

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ