ঢাকা, শনিবার 03 December 2016 ১৯ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ০২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নির্বাচন কমিশন গঠনে বিএনপি’র প্রস্তাব আলোচনার ভিত হতে পারে

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, দেশের একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় আইনবিদ। সম্পতি তিনি বলেছেন, দেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমি বলব, শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন চাই, সুষ্ঠু নির্বাচন চাই এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ চাই। এজন্য আলোচনা ও সমঝোতা দরকার। বিএনপি একটি প্রস্তাব দিয়েছে, অন্যান্য দলের উচিত এ ব্যাপারে তাদের প্রতিক্রিয়া জানানো। সরকারি দল দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। আমি বলব, এটা ভালো লক্ষণ। আমি মনে করি, ওবায়দুল কাদের রিজনেবল রাজনীতিক। তিনি বলেছেন, নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়ে রাষ্ট্রপতিই ঠিক করবেন কাকে রাখবেন বা রাখবেন না। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ইসি গঠন করবেন, তার এ বক্তব্য সত্য। কিন্তু যখন আলোচনা ও সমঝোতার প্রসঙ্গ আসে, তখন অনেক কিছু মেনে নিতে হয়। কথা হচ্ছে, বিএনপি প্রস্তাব দিয়েছে, আওয়ামী লীগের এগিয়ে আসা দরকার। বিএনপি’র প্রস্তাব তো আর ফাইনাল নয়। আমি মনে করি, বাছাই কমিটির পাঁচ সদস্যের যেসব যোগ্যতার কথা বিএনপি বলেছে, তা যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য।

আরেক বিশিষ্ট ব্যক্তি সুশাসনের জন্য নাগিরক সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও ভোট সুরক্ষায় বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া যে প্রস্তাবনা তুলে ধরেছেন, আমি তাকে সাম্প্রতিককালে যেসব বিতর্ক এসেছে তার আলোকে দেখতে চাই। যেমন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিতর্কমুক্ত নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সংবিধানের আলোকে ইসি পুনর্গঠন করা হবে। এরই ধারাবাহিকতায় এসেছে খালেদা জিয়ার ইসি পুনর্গঠনের প্রস্তাবটি। 

আমি মনে করি তার বক্তব্যগুলো ও প্রস্তাবটি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা জরুরি।  এটাকে তামাশা, অন্তঃসারশূন্য বা গৎবাঁধা বলে উড়িয়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। মনে রাখতে হবে বিএনপি একটি বড় দল। আর সেই দলের প্রধান হিসেবেই প্রস্তাবনা তুলে ধরেছেন খালেদা জিয়া। তাই তার বক্তব্য বিবেচনায় নেয়া জরুরি। আমাদের নির্বাচন কমিশন নিয়ে বিতর্ক সব সময়ই ছিল। আগেও ছিল, এখনও আছে। তাই বিতর্ক এড়াতে বিএনপি’র প্রস্তাব বিবেচনা করতে হবে।

জানিপপ চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ’র মতে, নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়াসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে গত ১৮ নবেম্বর বিএনপি চেয়ারপার্সন যে রূপরেখা তুলে ধরেছেন তাতে বিএনপি’র আগামী জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তার এ প্রস্তাবনার পর নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়াসহ আগামী জাতীয় নির্বাচন ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য সৃষ্টি হবে, এটাই সবার প্রত্যাশা। তবে ১৪ দলের নেতৃবৃন্দ তাতে সাড়া দেবেন কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়াসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে সেভাবে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছাতে সক্ষম হবে, এটাই কাম্য।

সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় নির্বাচন কমিশন পূনর্গঠন। নতুন বছরের শুরুতেই বর্তমান কমিশনের মেয়াদ শেষ হবে। তাই সবার কাছে একটি গ্রহণযোগ্য ও নিরেপক্ষ নির্র্বাচন কমিশন গঠনের দাবি সর্ব মহলের। গত ১৮ নবেম্বর বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া প্রেস কনফারেন্সের মাধ্যমে ‘নির্বাচন কমিশন গঠন এবং শক্তিশালীকরণ’ প্রসঙ্গে জাতির সামনে বিএনপি’র প্রস্তাবাবলী উপস্থাপন করেছেন। প্রেস কনফারেন্স শেষ হওয়ার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই খবর বের হলো, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং অন্যতম মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রস্তাবগুলো প্রত্যাখ্যান করেছেন। 

তিনি বলেছেন, প্রস্তাবগুলো অন্তঃসারশূন্য। সরকারি দল যাই বলুক না কেন প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় এখন পর্যন্ত সে প্রস্তাবনা নিয়ে চূলছেরা বিশ্লেষণ চলছে।  সবাই বরছেন, বিএনপি’র পক্ষ থেকে খালেদা জিয়া কর্তৃক উপস্থাপিত প্রস্তাবের মধ্যে দুর্বলতা থাকতেই পারে। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অসংলগ্নতা থাকতেই পারে। না থাকলে হতো অস্বাভাবিক ও অনেকটা দৈব আদেশের মতো এবং বলাই হয়েছে এগুলো প্রস্তাব। প্রস্তাব মানে আলোচনার বিষয়। প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় কোনো লজ্জা নেই। কিন্তু প্রস্তাবটি বিবেচনার আগেই প্রত্যাখ্যান করার কাজটিকে বলা যায় অবিবেচনাপ্রসূত, অহমিকাপ্রসূত এবং সুবিধাবাদী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।  রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি রাজনৈতিক দলগুলোর একচ্ছত্র মালিকানাধীন সম্পত্তি নয়। রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের পক্ষে নির্বাচিত হওয়ার পর সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে রাষ্ট্রকে ব্যবস্থাপনা করে। সেই ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা থাকলে ওই দুর্বলতা তুলে ধরা অন্য সবার দায়িত্ব। 

বিএনপি প্রস্তাবগুলো উপস্থাপন করে ওই দায়িত্ব পালন করেছে। এখন অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব হল, এ প্রস্তাবগুলোকে আলোচনার জন্য পরিবেশ সৃষ্টি করা; আন্তরিক পরিবেশে গঠনমূলক আলোচনা করা। আলোচনার পাশাপাশি, বিএনপি কর্তৃক উপস্থাপিত প্রস্তাব বা প্রস্তাবাবলীর সম্পূরক প্রস্তাবও অবশ্যই স্বাগতম। তাহলে আলোচনা আরও অর্থবহ হবে। বিএনপি’র প্রস্তাবে নির্বাচন কমিশন গঠন সম্পর্কিত কথা ছাড়াও, নির্বাচন পরিচালনা বা নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার প্রসঙ্গেও কিছু কথা আছে। নির্বাচনের আগে এবং নির্বাচনকালীন ভয়ভীতিহীন পরিবেশ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। গত সাত-আট বছরে অনেক নির্বাচন চলাকালীন রাজনৈতিক মাস্তানদের দৌরাত্ম্য, ভোটকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তায় দুর্বলতা ইত্যাদি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। মোটা দাগে আমরা বলবই, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী আন্তরিক থাকলেও বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে পূর্ণ সাফল্য দেখাতে পারেনি। বাংলাদেশের ভোটাররা লক্ষ্য করেছেন, ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসের পার্লামেন্ট নির্বাচন এবং তৎপরবর্তী অন্য সব নির্বাচনে বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীকে মোটামুটিভাবে দূরে রাখা হয়েছিল। অথচ বাংলাদেশের ইতিহাসে একাধিক ভালো ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান হয়েছে সামরিক বাহিনীর সহযোগিতায়। সহযোগিতা বলতে নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টির অন্যতম বিষয় হচ্ছে, আইনশৃংখলা পরিস্থিতির উন্নয়ন করা এবং ভোটাররা যেন নিঃশঙ্ক চিত্তে ভোট দিতে পারেন, এরূপ পরিবেশ সৃষ্টি করা। 

সমালোচকরা মনে করেন, নতুন ইসি গঠনে বড় দু’দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসে সমঝোতার মন নিয়ে এগোতে হবে। জনগণেরও প্রত্যাশা, খালেদা জিয়ার প্রস্তাব নতুন ইসি গঠনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনার ভিত হিসেবে কাজ করবে। দেশে ক্ষমতাসীন দল কর্তৃক বিরোধী দলের প্রস্তাব গ্রহণের নজির খুবই কম। 

এরই ধারাবাহিকতায় শাসক দল আওয়ামী লীগ ইসির পুনর্গঠন সম্পর্কে দেশের অন্যতম বৃহৎ ও জাতীয় সংসদের বাইরে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি’র প্রস্তাব শুধু প্রত্যাখ্যান করেনি, বরং ইসি গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে অনেকটা অসত্য তথ্য প্রচার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। 

নতুন ইসি গঠনে খালেদা জিয়ার প্রস্তাবে দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে- নিবন্ধিত ও বিভিন্ন সময় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ বা আলোচনার মাধ্যমে ইসি গঠন, সিইসি ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগদানে সুপারিশ প্রদানের জন্য অবসর গ্রহণের পর সরকারের লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত না থাকা অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি, সচিব, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং দলনিরপেক্ষ সৎ, দক্ষ ও যোগ্য জ্যেষ্ঠ নারীর সমন্বয়ে সার্চ কমিটি গঠন, সিইসি ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার পদে নিয়োগের যোগ্যতা ও অযোগ্যতা নির্ধারণ, ইসিতে একজন নারী কমিশনার নিয়োগ করা ইত্যাদি। 

ই-মেইল: [email protected]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ