ঢাকা, শনিবার 03 December 2016 ১৯ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ০২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

দরকার শক্তিশালী স্বাধীন নির্বাচন কমিশন

আবু মুনির : নির্বাচন কমিশন ইংরেজি হলো Election Commission সংক্ষেপে বলা হয় EC. নির্বাচন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া প্রবর্তনের সোপান। নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটারগণ ভোটাধিকার প্রয়োগ করত: তাদের প্রতিনিধি মনোনীত করেন। রফিকুল ইসলাম বনাম মোস্তফা কামাল মোকদ্দমায় ৪২ ডিএলআর (আপীল বিভাগ) ১৩৭-এ নির্বাচনকে একটি সামগ্রিক প্রক্রিয়া হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে-যা মনোনয়নপত্র আহ্বানের মাধ্যমে শুরু হয় এবং ফলাফল ঘোষণার মাধ্যমে শেষ হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ মোতাবেক গঠিত নির্বাচন কমিশন নির্বাচন সংক্রান্ত যাবতীয় কর্মকান্ড পরিচালনা করেন। নির্বাচন কমিশন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ একটি প্রতিষ্ঠান। ৪১ ডিএলআর (আপীল বিভাগ) ৬৮-তে বলা হয়েছে নির্বাচন কমিশন ভোটগ্রহণ তথা একটি বিশেষ কোনো নির্বাচন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আইনানুযায়ী পরিচালিত হয়েছে কিনা তা দেখার এখতিয়ার রাখেন এবং সে লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন পুনঃ ভোট গ্রহণসহ যে কোনো আদেশ পুনর্বিবেচনা করতে পারেন। কিন্তু নির্বাচিত প্রার্থীর নামে গেজেট প্রকাশিত হওয়ার পর নির্বাচন কমিশন নির্বাচিত প্রার্থীর নির্বাচন বাতিল করতে পারেন না-যা বলা হয়েছে হযরত আলী বনাম নির্বাচন কমিশন ৪১ ডিএলআর ৪৮৬- তে।

অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন জাতীয় জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্য নির্বাচনী আইন ও আচরণ বিধি যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি দরকার শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন; যেখানে একজন দৃঢ়চেতা, দক্ষ ও অনেস্ট CEC  থাকবেন। কারণ বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমা বিশ্বে দেখে চেয়ারটা কীসের আর আমরা দেখি সেখানে বসে আছে কে। এখানে ব্যক্তি বিশেষে চেয়ারের রঙ পাল্টায়। জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী দিয়ে মাঠে নামছে এনজিওগুলো। 

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হবে ২০১৭ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। বর্তমান নির্বাচন কমিশন দার্য়িত্ব নিয়েছিল ২০১২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে নতুন নির্বাচন কমিশনের অধীনে। বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছিল একটি সার্চ কমিটির মাধ্যমে। রাষ্ট্রপতি এ কমিটি গঠন করেছিলেন।

দল নিরপেক্ষ শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র-বলেছেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্টদূত মিজমার্শা ব্লুম বার্নিকাট।

সফররত ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বাণিজ্য দলের প্রধান বারল্ড লাঙ্গা বলেছেন ‘বাংলাদেশে স্বাধীন ও সক্ষম নির্বাচন কমিশন প্রয়োজন।” যোগ্য ও নিরপেক্ষ  ব্যক্তিদের নিয়ে ইসি চায় ইইউ। নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষমতা সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে দিলেও তা চর্চার কোনো সুযোগ নেই-বলেছেন বি-চৌধুরী। কারণ তিনি প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হিসেবে এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ। নির্বাচন কমিশন গঠনে খালেদা জিয়ার প্রস্তাবিত রূপরেখাকে বিশিষ্টজনেরা ইতিবাচক বলেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাক্তন গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহম্মেদ বলেছেন- সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্যতম শর্ত নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন। ড. শাহদীন মালিক বলেছেন-সংবিধানেই নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয় বলা আছে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত এম. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন-খালেদা জিয়ার রূপরেখা নাকচ করার কিছু নেই। ব্যারিস্টার রফিকুল হক বলেছেন-প্রস্তাবে অনেকগুলো ভাল দিক আছে। ড. আকবর আলী খান বলেছেন-আরও দুইবার তত্ত্বাবধায়কে নির্বাচন হতে পারে। ড. তোফায়েল আহম্মেদ বলেছেন-সরকার খালেদা জিয়ার উত্থাপিত প্রস্তাবকে ধরে আলোচনা করতে পারে। অধ্যাপক তারেক শামছুর রেহমান বলেছেন-বিএনপি’র প্রস্তাব ইতিবাচক। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে এবং ১৯৭২ সালে থেকে অদ্যাবধি সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সমন্বয়ে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা হতে পারে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খালেদা জিয়ার প্রস্তাব নাকচ করার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় দেশের গুণীজন ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা হতবাক হয়েছেন। ১৯৮৬ সনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১০টি আসন নিয়ে জামায়াতে ইসলামী সংসদীয় দল গঠন করে। এটি আওয়ামী লীগ ভাল করেই জানে-কারণ তখন তারা তাদের সাথেই ছিলেন। 

জিলা পরিষদ (সামরিকীকরণ) বিলের প্রতিবাদে জামায়াতে ইসলামী জাতীয় সংসদ বর্জন করেছিল ১২ই জুলাই ১৯৮৭ সালে। বিক্ষোভ সমাবেশ, মিছিলের মাধ্যমে বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনকে তীব্র করার লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করেছিল-যা দৈনিক পত্রিকা নিউ নেশনে ১৩ই জুলাই প্রতিবেদন আকারে বের হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এডভোকেট সুলতানা কামাল লিখিত মানবাধিকার সুশাসন ও গণতন্ত্র বইয়ের শেষের সংযোজন ১৮৪ পৃষ্ঠায় সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন করা হয়েছিল নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, সঠিক ভোটার তালিকা, প্রশাসন নিরপেক্ষকরণ এসব কাজ করার জন্য আপনাদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার গুরুত্ব সহকারে উদ্যোগ নিয়েছিল-কিন্তু পারেনি। এ সরকার কি তা পারবে? আপনার অভিজ্ঞতা থেকে একটু খোলে বলুন। তিনি বলেছিলেন আমি আশাবাদী, পারবে-কিন্তু পারেনি। উক্ত বইয়ের ১৮৫ পৃষ্ঠায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম সুরক্ষা হচ্ছে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো। বর্তমানে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো বলিষ্ঠতর হয়েছে না ক্ষয়িষ্ণু হয়েছে? সুলতানা কামাল বলেছিলেন ভয়ঙ্করভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে-ক্ষয়িষ্ণু বলা যাচ্ছে না। উক্ত বইয়ের ১৮৬ পৃষ্ঠায় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সংবিধান ও আইনের অনেক কিছুই অকার্যকর হয়ে পড়ার একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। 

অকার্যকর হয়ে পড়ার কারণগুলো কোথায় সৃষ্টি হয়েছে বলে আপনার ধারণা? তিনি দীর্ঘ উত্তরের মধ্যে বলেছিলেন আগে আমরা দেখেছি নেতা হয়ে মন্ত্রী হয়েছেন; এখন মন্ত্রী হয়ে নেতা হন- এটাই অকার্যকর হয়ে পড়ার মূল কারণ হিসেবে আমি মনে করি। তিনি বলেছিলেন এদের দেখে একটা বচন মনে পড়ে যায়, ‘অরাঁধুনির হাতে পড়ে কৈ মাছ কাঁদে, না জানি রাঁধুনি মোরে কেমন করে রাঁধে।’ এরাতো দেশ চালানোর যোগ্যই নয়, কিভাবে তা করবে? এবং প্রতিষ্ঠান, সংবিধান ও আইন বাঁচাবে? গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অনেক সংশোধনী আনা হয়েছে এবং উপজেলা ও জেলা লেভেলে সার্ভার স্টেশন/নির্বাচন অফিস স্থাপন করা হয়েছে। সংবিধানের সংশোধনীর পর নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাহী বিভাগের কর্ম ও ক্ষমতা পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু অবস্থার কোন উন্নতি হচ্ছে না। এ যেন মানবদেহের জ্বরের ন্যায় অন্য উপসর্গের লক্ষণ হিসাবে প্রকাশিত হচ্ছে। গ্রামের বাড়ীতে সন্তানের জ্বর হলে পিতা-মাতা প্রাথমিকভাবে সন্তানের মাথায় ও শরীরে পানি ভিজানো গামছা বা তোয়ালে দিয়ে পট্টি দেয়। হাঙ্গেরী বুদাপেস্টে ওয়াটার সামিট-এ জাতির জরাক্রান্ত দেহে পানি ভিজানো তোয়ালে দিয়ে মাখছে-এটাই মনে হচ্ছে। 

নির্বাচন কমিশনের জন্য আলাদা সচিবালয় নির্মাণ এখন অপরিহার্য। এছাড়া ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) এম. সাখাওয়াত হোসেন প্রস্তাব দিয়েছেন ‘যেন একই সাথে কমিশনের সকল সদস্যগণ পদত্যাগ বা অপসারণ না হন।’ এটার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া অপরিহার্য। পাশ্চাত্য গণতন্ত্র জনগণ বা জনগণের নির্বাচিত আইনসভাকে সার্বভৌম মনে করে। ইসলাম একমাত্র আল্লাহ্কেই সার্বভৌম মালিক মনে করে। সুতরাং সরকারি ক্ষমতা নির্বাচিত লোকদের হাতে থাকাই উচিত। এ বিষয়ে ইসলাম ও গণতন্ত্রে কোন মতবিরোধ নেই। ‘রাসলুল্লাহ (সাঃ) উমর (রাঃ) নামায পড়ানোর তাকবির শুনলেন তখন বললেন আবু বকর কোথায়? আল্লাহ্ ও মুসলমানগণের নিকট আবু বকর (রাঃ) ছাড়া অন্যের ইমামতি গ্রহণযোগ্য নয়।’ 

বস্তুত: উমর (রাঃ) যদি তাঁর ইন্তেকালের প্রাক্কালে একটি কথা না বলতেন তাহলে মুসলমানগণ সন্দেহাতিতভাবে বিশ্বাস করত যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আবু বকর (রাঃ)কে খলিফা নিযুক্ত করে গেছেন। কিন্তু উমর (রাঃ) এর মৃত্যুর পূর্বে এ ধারণা বাতিল করে দিয়ে যান। তিনি বলেন আমি যদি খলিফা নিয়োগ করে যাই, তাহলে (বোঝে নিও যে) যিনি আমার শ্রেষ্ঠতর ছিলেন তিনিও খলিফা নিয়োগ করে গিয়েছিলেন, আর আমি যদি ব্যাপারটা মুলসমানদের স্বাধীন বিবেচনার উপর ছেড়ে দিয়ে যাই (তাহলে বুঝে নিও যে) যিনি আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠতর ছিলেন তিনিও ওটা তাদের স্বাধীন বিবেচনার উপর সোপর্দ করে গিয়েছিলেন।” অতঃপর উমর (রাঃ) খলিফা নিয়োগ না করে মারা যাওয়ায় মুসলমানরা বুঝল যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আবু বকর (রাঃ)-কে খলিফা নিয়োগ করে যাননি (সীরাতে ইবনে হিশাম পৃৃঃ ৩৪৩)।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ