ঢাকা, শনিবার 03 December 2016 ১৯ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ০২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

৫ বছরে বিজেএমসির লোকসান ২ হাজার ৫শ’ কোটি টাকা 

কামাল উদ্দিন সুমন: ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশে জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) এই ৪৪ অর্থবছরের মধ্যে ৪০ অর্থবছরেই লোকসান দিয়েছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের এ প্রতিষ্ঠান। ধারাবাহিক এ লোকসানে কোন ‘রা’ নেই। বরং লোকসান যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। লোকসান কমাতে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অনেক উদ্যোগই নেয়া হয়েছে । কিন্তু কাজের কাজ কোনটাই হয়নি। বরং প্রতি অর্থবছরেই লোকসান বাড়ছে। সর্বশেষ গত ৫বছরে বিজেএমসির লোকসান গুনতে হয়েছে আড়াই হাজার কোটি টাকা। 

বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম দাবি করেছেন, বিজেএমসিকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রুপান্তরের জন্য সব ধরনের কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। শিগগিরই বিজেএমসির দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এজন্য ব্যবস্থাপনাগত উন্নতি ছাড়াও সব দুর্বলতা দূর করা হবে। সোনালি আঁশ পাটের উৎপাদন ও বহুমুখী ব্যবহার উৎসাহিত করার মাধ্যমে পাট আবাদ বাড়ানোরও পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এজন্য পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন ২০১০-এর বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এছাড়া ওভেন পলি প্রপিলিন ব্যাগের উৎপাদন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে গঠিত হয়েছে বিশেষ কমিটি। পণ্যে পাটজাত মোড়কের ব্যবহার নিশ্চিত করণে সব ধরনে চেষ্টা চলছে। সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে বিজেএমসি ও পাট খাতের সুদিন ফিরিয়ে আনতে সরকার বদ্ধপরিকর।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সূত্র মতে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৬১৯ কোটি টাকা লোকসান হয় বিজেএমসির। এর আগের অর্থবছরে লোকসানের পরিমাণ ছিল ৭২৬ কোটি টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৫১০ কোটি, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৩৯৬ কোটি ও ২০১১-১২ অর্থবছরে প্রায় ৬৬ কোটি টাকা লোকসান করে প্রতিষ্ঠানটি। সব মিলিয়ে গত পাঁচ অর্থবছরে বিজেএমসির লোকসান দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩১৭ কোটি টাকায়। 

সূত্র বলছে, রাষ্ট্রয়ত্ত এ প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক লোকসানের অন্যতম কারণ পাট ক্রয় ও পরিবহন খাতে দুর্নীতি ও অনিয়ম, অলস মজুরি প্রদান, সক্ষমতা অনুসারে মিলের কার্যক্রম পরিচালনা না করা এবং অলস পাট ক্রয়কেন্দ্র পরিচালনা। এছাড়া কাঁচা পাট ক্রয়ে অদক্ষতা, উৎপাদনে সিস্টেম লস, বেশি খরচে পুরনো মেশিন পরিচালনা, কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, পরিচালনা ব্যয় ও বিপণন অদক্ষতায় ক্ষতি থেকে বের হতে পারছে না বিজেএমসি। প্রতিষ্ঠানটির এ ধরনের অদক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে স্বয়ং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। সম্প্রতি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে বিজেএমসিকে ঢেলে সাজানোর সুপারিশ করেছে কমিটি।

এদিকে লোকসানের অন্যতম কারণ হিসেবে কারখানাগুলোয় প্রয়োজনাতিরিক্ত শ্রমিক থাকার বিষয়টি জানিয়েছে বিজেএমসি কর্তৃপক্ষ। তাদের মতে, বাহ্যিক বিভিন্ন সমস্যার কারণে পাটজাত পণ্য রফতানি ব্যাহত হচ্ছে। ফলে মজুদ থাকলেও পণ্য বিক্রি করতে না পারায় অর্থ সংকটে পড়তে হচ্ছে। আর এ অর্থ সংকটের কারণে যথাসময়ে কাঁচা পাট ক্রয়ও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে মওসুম শেষে পাট ক্রয়ের কারণে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এসবের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও অদক্ষতাও ধারাবাহিক লোকসানের জন্য দায়ী।

 বেসরকারি পাটকল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিজেএমএ) সূত্রে জানা গেছে, ব্যক্তিমালিকানা খাতে দেশে ১৩১টি পাটকল রয়েছে। এর মধ্যে ৯৩টি পাটকলই চালু ও লাভজনক অবস্থানে রয়েছে। এসব কারখানায় উৎপাদিত পণ্যের ৮২ শতাংশ আন্তর্জাতিক বাজারে ও ১৮ শতাংশ দেশীয় বাজারে বিক্রি হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিজেএমএ প্রতি বছর গড়ে দুই লাখ টন পণ্য উৎপাদন করছে। আর এ পণ্য উৎপাদনে নিয়োজিত রয়েছেন মাত্র ৫২ হাজার শ্রমিক। অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত বিজেএমসিতে প্রতি বছর গড়ে উৎপাদন হচ্ছে ১ লাখ ৮৭ হাজার টন পণ্য। আর এ পণ্য উৎপাদনে নিয়োজিত রয়েছেন প্রায় ৮০ হাজার শ্রমিক। মোটা ও পাতলা পাটের বস্তা, সুতা কিংবা ব্যাগ উৎপাদনে প্রতি মণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর গড় ব্যয় সর্বনিম্ন ২ হাজার ৫০০ টাকা হলেও এক্ষেত্রে বিজেএমসির ব্যয় হয় প্রায় ৫ হাজার টাকা। এ বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের অন্যতম কারণ অলস মজুরি।

বিজেএমসির চেয়ারম্যান ড. মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, লোকসানের পরিমাণ শূন্যে নামিয়ে আনতে আওতাভুক্ত প্রতিটি মিলের জন্য দক্ষতা অনুসারে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া দুর্বলতাগুলোকে চিহ্নিত করে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। পরিপূর্ণ সক্ষমতা বাড়াতে যন্ত্রাংশ মেরামত ও দক্ষ শ্রমিক সরবরাহ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পাট ক্রয়কেন্দ্রগুলোর পাশাপাশি পাট ক্রয়ের প্রক্রিয়াকেও দক্ষ করে তোলা হচ্ছে। বন্ধ করা হচ্ছে অলস শ্রমিকের মজুরি প্রদান। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি স্বল্প সময়ের মধ্যেই লোকসান কমিয়ে ব্রেক ইভেনে চলে আসতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, গত অর্থবছরে বিজেএমসির সব কারখানা মিলিয়ে দিনে গড় উৎপাদন ছিল ৩৩৬ টন। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে ২২টি কারখানার মাধ্যমে দিনে গড়ে ৬৫০ টন উৎপাদন হচ্ছে। এছাড়া সরকারের উদ্যোগ বাস্তবায়নে চলতি অর্থবছরের শুরুতেই ২৫ লাখ ৪২ হাজার ৪৩১ কুইন্টাল (প্রতি কুইন্টাল ১০০ কেজি) কাঁচা পাট ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এর বিপরীতে গত চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) পাট ক্রয় হয়েছে ১১ লাখ ৭৩ হাজার ৪৪ কুইন্টাল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ