ঢাকা, শনিবার 03 December 2016 ১৯ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ০২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মিয়ানমারের নরককুণ্ডু মংডুতে আশ্রয়হীন নারী শিশুরা খোলা আকাশের নিচে

কামাল হোসেন আজাদ, কক্সবাজার : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মুসলিম অধ্যুষিত আরাকানে পালাক্রমে চলছে মগ সেনা ও উগ্র গোষ্ঠীদের নৃশংসতা। রোহিঙ্গারা কোনভাবেই রেহাই পাচ্ছে না এ নির্যাতন থেকে। সেইসাথে দেখা দিয়েছে খাদ্যসংকট। চিকিৎসা ও ওষুধ সেবা পাচ্ছে না বেপরোয়া নির্যাতনে আক্রান্তরা। চিকিৎসার অভাবে বিপন্ন হতে চলেছে মানবতা। নরকখণ্ডে পরিণত হয়েছে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত জনপদ মংডু। সেনা সদস্যদের গুলীতে একের পর এক মৃত্যুর পাশাপাশি পরিবারের পুরুষ সদস্যদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে অন্যত্র। জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে ঘরবাড়ি। বসতবাড়ি ছেড়ে আসা আশ্রয়হীন নারী-শিশুরা খোলা আকাশের নিচে চরম মানবেতর জীবন যাপন করছে। রাতের আঁধারে শিশুদের কোলে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে লুকিয়ে আছেন মায়েরা। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার ভোরে হোয়াইক্যংয়ের খোয়াংখালী এলাকার একটি পাড়ায় সেনারা আক্রমণ চালায়। তারা পুরুষদের না পেয়ে নারীদের ওপর চালায় পাশবিক নির্যাতন। পরে নারীদের ঘরের বাইরে নিয়ে এক স্থানে জড়ো করে বিবস্ত্র করে বসিয়ে রাখে। আর যাওয়ার সময় পরেরবার এসে পুরুষদের না পেলে হুমকি দিয়ে যায় ওইসব নারীর ওপর নির্মম অত্যাচার চালানোর। এদিকে সেনাবাহিনী কর্তৃক নৃশংসতার খবর বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার ব্যাপারটি সহজভাবে নিচ্ছে না মিয়ানমার সরকার। সেনা তা-বের খবর মোবাইল ফোনের মাধ্যমে এপারে আসছে ধারণা করে রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে বন্ধ করে দেয়া শুরু করেছে বিদ্যুৎ সংযোগ। এসব ন্যক্কারজনক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিচ্ছে মগ সেনারা। চার্জের অভাবে যেন নির্যাতিতরা মোবাইল ফোনে সংবাদ দিতে না পারে উদ্দেশ্য এমনটাও। মংডুতে অবস্থানরত বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার বেশ কয়েকজন কর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে আলাপকালে এমন সব লোমহর্ষক তথ্যের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। পাশাপাশি এপারে অনুপ্রবেশকারীদের কাছ থেকেও অভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তারা প্রায় অভিন্ন সুরে ‘নরকের’ লোমহর্ষক বর্ণনা দেয়। মিয়ানমারে অবস্থানরত একটি এনজিওর ভিন্ন দেশের কর্মী আলাপকালে বলেন, ‘১০ বছর ধরে মংডুতে বেসরকারি সংস্থায় (এনজিও) কাজ করছি। এমন হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনা অতীতে দেখিনি। ওখানে মিয়ানমার সরকারের বাহিনী রীতিমতো গণহত্যা চালাচ্ছে। আর সেখানে এনজিও কর্মীদের কাজ করতে দেয়া হচ্ছে না। তাদের মংডু থেকে বের করে দেয়া হয়েছে।’ স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করা এই এনজিওকর্মী বলেন, ‘মংডুতে এখন স্বাস্থ্যসেবা বলে কিছু নেই। সরকারি চিকিৎসকরা রোহিঙ্গাদের ঠিকমতো চিকিৎসাসেবা দেন না। স্থানীয় চিকিৎসকরাও সরঞ্জামের অভাবে চিকিৎসাসেবা দিতে পারছেন না।’ এনজিও সংস্থাটির স্থানীয় প্রতিনিধির বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ‘সেনারা রোহিঙ্গাদের ঘর পোড়ানোর পাশাপাশি খাদ্য নষ্ট কিংবা লুট করে নিচ্ছে। ফলে ঝোপ-জঙ্গলে রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিয়ে জীবন রক্ষার চেষ্টা চালাচ্ছে। ওখানে মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে। গুলীতে মরার চেয়েও ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে খাদ্য ও চিকিৎসা সংকট। দ্রুত চিকিৎসা ও খাদ্যের জোগান দেয়া না গেলে হাজার হাজার রোহিঙ্গা অনাহার ও বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে।’ মংডুর আরেক বাসিন্দা ‘নরকের’ বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘আমার চোখের সামনে হাতিপাড়ার ঘরগুলোতে আগুন দেয়া হলো। আমি কিছু দূরে গিয়ে প্রাণে রক্ষা পেয়েছি। পুরুষদের মধ্যে যাদের ধরতে পেরেছে তাদের অনেককে হত্যা করা হয়েছে, অনেককে বেঁধে নিয়ে গেছে। যুবতীদের ধরে প্রকাশ্যে গণধর্ষণ করেছে। মা-মেয়ে বাছ-বিচার নেই। একের পর এক গ্রাম ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে। ধর্ষিতার রক্তের সঙ্গে গুলীবিদ্ধ, ছুরিকাহত কিংবা মৃত বাবা-ভাইয়ের রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে একাকার হয়ে। এককথায় মংডু নরকখণ্ডের বর্ণনা সহজভাবে দেয়া অসম্ভব। মংডু থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী এক মা জানান, তার চার মেয়ে ও তিন ছেলে সন্তান রয়েছে। স্বামী আগেই মারা গেছেন। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। তাদের সংসারে নাতি আছে। সেনারা তার এক সন্তান ও মেয়ে জামাইকে গুলী করে হত্যা করেছে এবং দুই মেয়েকে প্রকাশ্যে ধর্ষণ করেছে। টেকনাফের লেদা অনিবন্ধিত ক্যাম্পের চেয়ারম্যান দুদু মিয়া জানান, সেনা নৃশংসতায় যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। নারীদের এক স্থানে জড়ো করে বিবস্ত্র অবস্থায় বসিয়ে রাখা হচ্ছে। চলছে প্রকাশ্য ধর্ষণ। এমন নারকীয়তায় বিপন্ন হচ্ছে মানবতা। ক্ষোভ প্রকাশ করছে বাংলাদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গারা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ