ঢাকা, শনিবার 03 December 2016 ১৯ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ০২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে দখল ও দূষণমুক্ত করা যাচ্ছে না

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল: রাজধানী ঢাকার চারপাশ ঘিরে থাকা প্রধান চারটি নদীকে কোনভাবেই দূষণমুক্ত রাখা যাচ্ছে না । বরং দিনে দিনে তা আরো বেশি মাত্রায় দূষণের কবলে পড়ছে। এর কারণে হুমকির মুখে পড়ছে জীববৈচিত্র্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীদূষণের প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপরও। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও সরকারের নানামুখী পদক্ষেপও ভেস্তে যাচ্ছে। সরকারের নদী সুরক্ষাকেন্দ্রিক বিশেষ টাস্কফোর্সের সুপারিশ ও পরামর্শ মুখ থুবড়ে পড়েছে। অধিকাংশই এর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী করছেন ঢাকার শিল্প-কারখানাগুলোকে। যাদের সামলানোই মুশকিল হয়ে পড়েছে সরকারের পক্ষে। এর পাশাপাশি জনসচেতনার অভাবও নদী দূষণের অন্যতম কারণ। এছাড়া রাজনৈতিক প্রভাবে দেদারছে চলছে নদী দখলের উৎসব। গবেষণা থেকে জানা যায়, এক যুগের কিছু বেশি সময়ে বুড়িগঙ্গা, বালু, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যা নদীর ২৫০ একরের বেশি জায়গা দখল হয়েছে।

সূত্র মতে, ঢাকার চারপাশের নদ-নদী দূষণের জন্য প্রধানত দায়ী শিল্প-কারখানা ও ট্যানারি। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ বর্জ্য আসে শিল্প-কারখানা থেকে, ৩০ শতাংশ আসে ট্যানারি থেকে, বাকিটা আবাসিক বর্জ্য। এ ক্ষেত্রে শিল্প-কারখানাগুলোর জন্য নিজস্ব ইটিপি বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ইউনিট স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হলেও অনেকেই এখনো ইটিপি করেনি, আবার যারা করেছে তাদের মধ্যে অনেকগুলোই তা চালু রাখে না। ফলে এতে খুব একটা সফলতা আসছে না। পাশাপাশি ট্যানারি সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও ট্যানারি মালিকরা এখনো খামখেয়ালিপনা করছে। মাস কয়েক আগে এক বৈঠকে ছয়জন মন্ত্রী ও দুজন মেয়রসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিরা ঢাকার চারপাশের নদীদূষণ রোধের জন্য দায়ী ও নিয়ম ভঙ্গকারী শিল্প-কারখানাগুলোকে বন্ধ করে দেওয়ার উদ্যোগ নেন।। একই সঙ্গে হাজারীবাগ থেকে যেসব ট্যানারি কারখানা সাভারে স্থানান্তর করবে না সেগুলোও প্রয়োজনে বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়। সেই সঙ্গে চার নদীর সমন্বিত সার্কুলার নৌপথ সচল করার জন্য পুনরায় কাজ শুরু হবে। বিশেষ করে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগের দূষণরোধে নতুন একটি প্রকল্প গ্রহণ করবে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। প্রকল্প গ্রহণের পর ফিজিবিলিটি স্টাডি করার জন্য কনসালন্ট্যান্ট নিয়োগ করা হবে। সংশ্লিষ্ট অন্য মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলো পরস্পর সহায়তা দেবে। বৈঠকে উপস্থিত মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে এ কাজে নেতৃত্ব তুলে দেওয়া হয় নৌপরিবহন মন্ত্রীর ওপর। কিন্তু গত কয়েক মাসেও সেই বৈঠকের উল্লেখযোগ্য কোনো সফলতা দেখা যায়নি। 

সূত্র জানায়, দেশের নদ-নদী রক্ষায় উচ্চ আদালত থেকে সরকারের প্রতি নির্দেশনা প্রদানের পর ২০০৯ সালের ২৪ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদের সভায় ‘দেশের গুরুত্বপূর্ণ নদ-নদীর নাব্যতা এবং নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে পরামর্শ প্রদান, সুপারিশ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য গঠিত টাস্কফোর্স’ শিরোনামে একটি জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করা হয়, যা ওই বছরই ২৭ আগস্ট গেজেট আকারে প্রকাশ পায়। এর সভাপতি করা হয় নৌপরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খানকে। কমিটির সদস্য তালিকায় আছেন আইনমন্ত্রী, পানিসম্পদমন্ত্রী, ভূমিমন্ত্রী, বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী, ঢাকার মেয়র, ঢাকার চারপাশের নদ-নদী সংশ্লিষ্ট এলাকার ১১ জন সংসদ সদস্য, অ্যাটর্নি জেনারেল, ১০ জন সচিব, ভূমি জরিপ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বিআইডাব্লিউটিএর চেয়ারম্যান, তিনজন সাংবাদিক, পাঁচজন পানি, নদী ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং পাঁচজন জেলা প্রশাসক। এ ছাড়া প্রয়োজনমতো আরো সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ আছে। ফলে এখন পর্যন্ত সদস্যসংখ্যা ৪০ জন ছাড়িয়ে গেছে।

জানা গেছে, দুই বছর আগেও বুড়িগঙ্গা পরিষ্কারসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও সে সময় সিটি কর্পোরেশন থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করা হতো। কারণ তখনকার মেয়র ছিলেন বিএনপির। আর এখনকার দুই সিটি কর্পোরেশনের মেয়রই হচ্ছেন আওয়ামী লীগের। তাহলে এখন নদী দূষণ রোধে বাধা কোথায়? সম্প্রতি এমন প্রশ্নের জবাবে নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান বলেন, দুই মেয়র ইতিমধ্যে অনেক ভালো ভালো কাজ করে দেখিয়েছেন। ফলে এবার আমাদের এ উদ্যোগে তারাও অংশীদার হবেন এবং আমরা একযোগে নদীগুলোকে দূষণমুক্ত করব। এ সময় তিনি বলেন, ঢাকার চারপাশের নদীগুলো যেভাবে দূষণের শিকার হয়েছে এবং হচ্ছে তাতে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। এর আগেও অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল টাস্কফোর্সের মাধ্যমে। এখন আরো বড় ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। 

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হক বলেন, আমরা ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনই ইতিমধ্যে জাতীয় পরিবেশ কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছি। অনেক কাজ এগিয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে ‘ইকো রেস্ট্ররেশন অব রিভারস অ্যারাউন্ড ঢাকা সিটি’ নামে একটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন চলছে। বিশেষ করে ২২০ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীর তীরবর্তী কঠিন বর্জ্য অপসারণে ক্রাস প্রোগ্রাম নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন স্থাপনের কাজও চলছে। তিনি বলেন, বাসাবাড়ির বর্জ্য অপসারণে ইতিমধ্যে পরিকল্পিতভাবে কাজ শুরু হয়েছে। হাসপাতালগুলোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও একটি শৃঙ্খলার মধ্যে এসেছে। এখন শিল্প-কারখানাগুলোকে আরো কার্যকর অবস্থায় নিয়ে আসতে হবে। 

জানতে চাইলে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, আমরা যতটুকু জানি, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে যখনই নদীদূষণ বা দখল বন্ধে তাগিদ দেওয়া হয় তখনই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলো তৎপর হয়ে ওঠে। বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু কিছু দূর এগিয়েই তা আবার ঝিমিয়ে পড়ে। ফলে এ ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত মাত্রায় অগ্রগতি মিলছে না। 

এদিকে সরেজমিনে দেখা গেছে, নদী দূষণের পাশাপাশি একটি মহল পাড় ছাড়িয়ে নদীর ভিতর গড়ে তুলছে বিভিন্ন স্থাপনা। ফলে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে ঢাকার চারপাশের এ নদীগুলো। ক্রমেই সরু হচ্ছে এসব নদী। সম্প্রতি ঢাকার চারপাশের এসব নদী নিয়ে গবেষণা করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আমির হোসেন ভূঁইয়া ও তার ছাত্র মো. আশরাফুল ইসলাম চৌধুরী সাগর। এসব নদী নিয়ে তাদের এক বছরের এই গবেষণা প্রতিবেদনে পাওয়া গেছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা (জিআইএস), স্যাটেলাইট ইমেজ ও সরেজমিন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নিরূপণ করা হয়েছে নদীগুলো দখলের চিত্র। পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে ঢাকার চারপাশে নদীর পাড় ধরে প্রায় ২০.৯৪ মাইল এলাকা। 

গবেষণা থেকে জানা যায়, এক যুগের কিছু বেশি সময়ে বুড়িগঙ্গা, বালু, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যা নদীর ২৫০ একরের বেশি জায়গা দখল হয়েছে। যদিও রাজধানীর ভিতর সাড়ে তিন দশকে খাল, জলাশয় ও নিম্নভূমি দখল হয়েছে প্রায় ১০ হাজার ২৪৫ হেক্টর। ২০০১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এ চার নদীর দখলের চিত্র তুলে ধরতে পাড়ে জনবহুল আটটি এলাকার তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে এই গবেষণা প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, ঢাকার চারপাশে সবচেয়ে বেশি দখল হয়েছে তুরাগ নদ। আবদুল্লাহপুর থেকে গাবতলী পর্যন্ত ৫ দশমিক ৭৬ মাইল এলাকাজুড়ে নদটির দখল হয়েছে ১২০ দশমিক ৭৯ একর। এরপর সবচেয়ে বেশি দখল হয়েছে বুড়িগঙ্গা। কামরাঙ্গীরচর থেকে বসিলা পর্যন্ত ৭ দশমিক ৪১ মাইল এলাকায় নদীটি দখল হয়েছে ৯৭ দশমিক ১৭ একর। কাঁচপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত ৩ দশমিক ৫৭ মাইলজুড়ে শীতলক্ষ্যা এবং ডেমরা থেকে নন্দীপাড়া পর্যন্ত ৪ দশমিক ২ মাইলজুড়ে বালু নদ দখল হয়েছে। নদ-নদী দুটির যথাক্রমে ২৩ দশমিক ৮৩ ও ৮ দশমিক ৮৪ একর দখল করা হয়েছে। সব মিলিয়ে দখল করা হয়েছে ২৫০ দশমিক ৬৩ একর নদী। 

ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব জিওম্যাট্রিকস অ্যান্ড জিওসায়েন্সে প্রকাশিত এই গবেষণা প্রতিবেদনে নদী দখলের কিছু পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আবাসিক ভবন, শিল্প-কারখানা, ইটভাটা, মোবাইল টাওয়ার, কয়লা ও সিমেন্ট ব্যবসা, মার্কেট এবং দোকানপাট। সড়ক, নৌঘাট, জাহাজ নির্মাণ কারখানাও রয়েছে এর মধ্যে। নদী দখল করে বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো সবচেয়ে বেশি গড়ে তোলা হয়েছে কামরাঙ্গীরচর ও বসিলায় (৫০ থেকে ৫৬ শতাংশ)। এ ছাড়া আবদুল্লাহপুর, গাবতলী, ডেমরা, কাঁচপুর ও নারায়ণগঞ্জ এলাকায় নদী দখল করে ৩৮-৪৮ শতাংশ স্থানে বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। গাছপালা ও কৃষিজমি হিসেবে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে নন্দীপাড়ায় ৭৩ শতাংশ জমি। আর পরিত্যক্ত জমি হিসেবে বেশি অংশ রয়েছে বসিলায় প্রায় ৩১ শতাংশ। 

জানা গেছে, চারটি নদ-নদীর মধ্যে তুরাগের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। পাড়ে বিভিন্ন ধরনের শিল্প-কারখানা গড়ে তুলে এটিকে এমনভাবে দখল করা হয়েছে, যা পরিণত হয়েছে সরু খালে। অভিযোগ রয়েছে, নদীর সীমানা নির্ধারণেও যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে না। টঙ্গী ব্রিজ থেকে আশুলিয়া হয়ে মিরপুর পর্যন্ত বেশ কিছু স্থানে নদীর পাড় থেকেও ৭-১০ মিটার ভিতরে সীমানা পিলার নির্ধারণ করেছে গাজীপুর জেলা প্রশাসন, যা বেআইনি। নদীদূষণে সবচেয়ে দূষিত নদী বুড়িগঙ্গা। এরপর তুরাগ ও শীতলক্ষ্যা। রাজনৈতিক কৌশলে এসব নদী দখল করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পাশাপাশি কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে স্থায়ী সীমানা নির্ধারণ করা উচিত সরকারের। নদী দখল ও এর দূষণ প্রতিরোধে মন্ত্রণালয়গুলোও তাদের সঠিক দায়িত্ব পালন করছে না বলে মনে করেন তারা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ