ঢাকা, শনিবার 03 December 2016 ১৯ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ০২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর

সাদেকুর রহমান : মহান বিজয়ের মাস ডিসেম্বরের তৃতীয় দিন আজ শনিবার। দীর্ঘ দু’যুগের শোষিত-বঞ্চিত মানুষগুলোর একটাই আকুতি ছিল পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের স্বার্থপরতা ও একচোখা নীতি থেকে মুক্তি পাওয়া। একাত্তরের এদিন থেকেই মূলত স্বাধীনতা যুদ্ধের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী মুক্তিসেনাদের সাথে যোগ হয় ভারতীয় মিত্রবাহিনীর শক্তি ও কৌশল। সেই যুদ্ধ ক্রমেই সম্মুখ যুদ্ধের আকারে ছড়িয়ে পড়ে।

বিজয়ের এ মাসেই রক্তস্নাত জনযুদ্ধের মাধ্যমে সাতান্ন হাজার বর্গমাইল আয়তনের স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতা যে কোনো ব্যক্তির, জাতির পরম আকাক্সক্ষার বিষয় ও গর্বের ধন। স্বাধীন না হলে একটি জাতির স্বাতন্ত্র্য ও কৃষ্টি বিপন্ন হয়ে পড়ে। এর ফলে পরাধীন জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিকভাবে নিপীড়িত, অর্থনৈতিকভাবে শোষিত এবং সাংস্কৃতিকভাবে অপমানিত হতে হয়। যেমনটা হতে হয়েছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানীদের। ডিসেম্বরের প্রথম দু’দিনেই স্পষ্ট হয়ে যায়, ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা দিচ্ছে। তবে রাষ্ট্র হিসাবে ভারতের স্বীকৃতি পায় কিছু পরে।

এদিন ফোর্ট ইউলিয়াম থেকে সঙ্কেত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় সেনাবাহিনী চারদিক থেকে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে। নবম ডিভিশন এগোলা গরিবপুর, জগন্নাথপুর হয়ে যশোর-ঢাকা হাইওয়ের দিকে। চতুর্থ ডিভিশন মেহেরপুরকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল ঝিনাইদহ-কালীগঞ্জের দিকে। বিংশতম ডিভিশন তার দায়িত্ব দু’ভাবে বিভক্ত করে নেয়। একটি অংশ থাকে হিলির পাক ঘাঁটি মোকাবিলার জন্য, আরেকটি অংশ হিলিকে উত্তরে রেখে এগিয়ে চলে সামনে। এভাবে নানা ডিভিশনে বিভক্ত হয়ে পাকহানাদার বাহিনীকে চারদিক থেকে কার্যত ঘেরাও করে ফেলে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা।

অপরদিকে একাত্তরের এ দিনে বাংলাদেশে ভারতীয় বিমান ও নৌবাহিনী এবং বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর একদল চৌকস বীর মুক্তিযোদ্ধা মধ্যরাত থেকে এ্যাকশন শুরু করে। ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে গিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন পাক ঘাঁটির ওপর বোমা বর্ষণ শুরু করে। এদের প্রধান লক্ষ্য ছিল অবশ্য ঢাকা ও চট্টগ্রাম। ঢাকা ছিল পাক বিমানবাহিনীর প্রধান ঘাঁটি। এ ঘাঁটিতেই ছিল তাদের জঙ্গী বিমানগুলো।

রাত ৯টার দিকে একটি অটার বিমান নিয়ে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর দু’জন চৌকস অফিসার ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শামসুল আলম ও ক্যাপ্টেন আকরাম (স্বাধীনতার পর দু’জনই সাহসিকতার জন্য বীরউত্তম খেতাব পান) দু’জন গানার নিয়ে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল জ্বালানি সংরক্ষণাগারে একের পর এক রকেট নিক্ষেপ করে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত করে দেন। সাত ঘণ্টা সফল অভিযান চালিয়ে বিমান নিয়ে ভারতের কৈলা শহর বিমানবন্দরে ফিরে যান তারা।

ঘন কুয়াশার মধ্যে উড্ডয়ন বিপজ্জনক হলেও দেশমাতৃকাকে শত্রুমুক্ত করতে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট বদরুল আলম (স্বাধীনতার পর এ দু’জনও সাহসিকতার জন্য বীরউত্তম খেতাব পান) আরেকটি ‘এলুয়েট’ যুদ্ধ বিমান নিয়ে চট্টগ্রামের জ্বালানি সংরক্ষণাগারে উপর্যুপরি বোমা বর্ষণ করে ধ্বংস করে দেন। অকস্মাৎ বাংলাদেশে বিমানবাহিনীর বীর সেনাদের হামলায় গোদনাইল ও চট্টগ্রামের ফুয়েল পাম্প ধ্বংস হয়ে গেলে মনোবলে চিড় ধরে দখলদারদের। আর বাংলাদেশে নেমেই ভারতীয় বিমানবাহিনীর প্রধান লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানী জঙ্গী বিমানগুলো শেষ করে দেয়া। যাতে লড়াইয়ের শুরুতেই আকাশটা মিত্রপক্ষের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। 

মফিদুল হক তার ‘জেনোসাইড নিছক গণহত্যা নয়’ শীর্ষক গ্রন্থে বর্ণনা করেন, “৩ ডিসেম্বর ভারত-পাক যুদ্ধ শুরু হলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তীব্রতা অর্জন করতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যোগ দেয় ভারতীয় বাহিনী এবং জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে শুরু হয় সর্বাত্মক যুদ্ধ। এই সম্মিলিত আক্রমণ প্রতিরোধে নিয়াজীর যুদ্ধ-পরিকল্পনা ছিল খুবই দুর্বল। পাকিস্তানীরা অস্থির হয়ে ছিল মুক্তিবাহিনীর সাফল্যের ভয়ে। কোনো বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে মুক্তাঞ্চল প্রতিষ্ঠা করলে বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বব্যাপী সংহতি আরো বাড়বে এবং প্রবাসে গঠিত বাংলাদেশ সরকার স্বীকৃত হয়ে উঠবে- এটা ছিল পাকিস্তানীদের আশংকা। তাই তারা ছড়িয়েছিল গোটা সীমান্তজুড়ে। আর ছড়ানো-ছিটানো এসব পাকবাহিনীকে পাশ কাটিয়ে তাদের বিচ্ছিন্ন করে এগোবার পন্থা অবলম্বন করেছিল ভারতীয় বাহিনী। বাংলাদেশ যুদ্ধের ময়দানে ‘বীরত্বের’ খেলাটি জমে উঠলো ৩ ডিসেম্বরের পর থেকে। একে একে পাকবাহিনীর ঘাঁটিগুলোর পতন হতে থাকে এবং পশ্চাদপসারণরত পাকবাহিনী সাধারণ বাঙালিদের ঘৃণা ও প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে থাকে।” 

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভাষ্যকার গাজীউল হাসান খান তার ‘ইতিহাসের অনুঘটক ও অন্যান্য’ শীর্ষক গ্রন্থে একাত্তরে বাংলাদেশকে ভারতের সহযোগিতার নেপথ্য কথা তুলে ধরেন এভাবে, “সে সময়ে ভারতে আশ্রিত তৎকালীন অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের সাথে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সাথে বাংলাদেশের স্বাধীনতার শর্ত নিয়ে একটি বিশেষ এবং গোপন সভা অনুষ্ঠিত হয় বলে জানা যায়। সভায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতীয় সৈন্য বাহিনীকে জড়িত করার ব্যাপারে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী নাকি কিছু পূর্বশর্ত আরোপ করেছিলেন। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী সে শর্তগুলোর অন্যতম প্রধান হচ্ছে, বাংলাদেশ স্বাধীন হলে : ১. তার কোনো নিজস্ব সৈন্য বাহিনী থাকবে না, ২. তার কোনো সিভিল সার্ভিস থাকবে না এবং ৩. তার কোনো স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতি ও বিদেশে কোনো মিশন থাকবে না। তাছাড়া শিল্প-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতের সম্পূরক হয়ে থাকা এবং ভারতের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যে সরাসরি যাওয়ার জন্য স্থলপথে ট্রানজিট প্রদানসহ আরো বেশকিছু শর্ত অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই মর্মে তাজউদ্দিন সাহেব নাকি ভারতের সাথে একটি গোপন চুক্তি স্বাক্ষর করেন। তার ভিত্তিতেই ৩ ডিসেম্বর ভারতীয় সৈন্যবাহিনী আমাদের মুক্তিবাহিনীর সহায়তায় বাংলাদেশে পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হয়, যার পরিসমাপ্তি ঘটে ১৬ ডিসেম্বর।”

আহমাদ মাযহার রচিত ‘বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ শীর্ষক গ্রন্থে এদিনের ঘটনাবলী বর্ণিত হয়েছে এভাবে- “ভারতীয় পূর্বাঞ্চল কমান্ডের লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার অধিনায়কত্বে গঠিত হয় বাংলাদেশ-ভারত যৌথ কমান্ড। ভারতীয় সশস্ত্রবাহিনী দখলদার পাকিস্তানী বাহিনীর সঙ্গে মরণপণ যুদ্ধে রত বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর সহায়তায় কয়েকটি রুটে অবরুদ্ধ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। এদিন গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে. খন্দকারের (পরবর্তীতে বিমান বাহিনীর প্রধান ও মন্ত্রী) নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশ বিমানবাহিনী নারায়ণগঞ্জ এবং চট্টগ্রামে বিমান আক্রমণ করে। সেই সঙ্গে ভারতীয় বিমান ও নৌবাহিনীর যৌথ আক্রমণে পাকিস্তানী বাহিনীর সবগুলো বিমান ও নৌঘাঁটি ধ্বংস হয়ে যায়। চতুর্দিক থেকে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে যৌথ কমান্ডের আওতায় ঢাকা শহরের দিকে অভিযান চালায়। বাংলাদেশ ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ অভিযানে মাত্র তের দিনের যুদ্ধেই ঢাকা অঞ্চল ছাড়া প্রায় সব এলাকা মুক্ত হয়ে যায়।”

বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত প্রতিষ্ঠানটির সাবেক পরিচালক, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কবি আসাদ চৌধুরীর ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’ গ্রন্থে বর্ণনা করা হয়েছে, “৩ ডিসেম্বর ভারতীয় সময় বিকেল ৫টা ৪৭ মিনিটে পাকিস্তান বিমানবাহিনী ভারতের ৭টি বিমান ঘাঁটিতে অতর্কিত হামলা চালায়। মিসেস ইন্দিরা গান্ধী কলকাতায় ছিলেন। তিনি দিল্লী ফিরেই রাত ১২টা ৩০ মিনিটে জাতিকে চরম ত্যাগের জন্য প্রস্তুত হতে আহ্বান জানান। জেনারেল অরোরা, পূর্বাঞ্চলের সামরিক প্রধান, আক্রমণের নির্দেশ দেন। চারদিক দিয়ে মিত্রবাহিনীর সৈন্যরা বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে।”

পূর্বোক্ত গ্রন্থে আরো বলা হয়, “পাকিস্তানের সাবমেরিন পি.এন.এস. গাজী ভারতের নৌঘাঁটি বিশাখা পত্তমের দিকে এগিয়ে যায়, উদ্দেশ্য ভারতের বিমানবাহী জাহাজ, ‘ভীক্রান্ত’কে টর্পেডো দিয়ে খতম করে দেয়া। ভারতীয় ডেস্ট্রয়ার আই.এন.এস. রাজপুত্র গাজীর সন্ধান পায় এবং ডেপথ-চার্জ করে, গাজী টুকরো-টুকরো হয়ে যায়। একইসঙ্গে ভারতীয় সেনাবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী অর্থাৎ মিত্রবাহিনী বাংলাদেশে প্রবেশ করে, লক্ষ্য ঢাকা। ইস্টার্ন ফ্লিটও বঙ্গোপসাগরের দিকে দ্রুত যাত্রা করে। ভারতীয় বিমানবাহিনী পাকিস্তানের সবকটি বিমান ঘাঁটি এবং রাডার কেন্দ্রের ওপর আঘাত হানতে শুরু করে। রাত তিনটায় ভারতীয় বিমানবাহিনী ঢাকা ও কুর্মিটোলায় আঘাত হানা শুরু করে। প্রথম আক্রমণে পাকিস্তানের অর্ধেক স্যাবর জেট বিমান ধ্বংস হয়ে যায়। ক্যান্টনমেন্টও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সকাল দশটার মধ্যে ‘ভীক্রান্ত’ তার নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থলে পৌঁছে যায় এবং ৬টি সী-হক বিমান চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজারের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যস্থলগুলোতে আঘাত করে। চট্টগ্রাম নৌবন্দরের প্রায় অর্ধেকই ধ্বংস হলো। যোগাযোগে বিচ্ছিন্নতা এবং প্রধান প্রধান ঘাঁটির ওপর গোলন্দাজবাহিনীর অবিরাম আক্রমণের ফলে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বুঝতেই পারেনি যে, মিত্রবাহিনী ঢাকার দিকে এগোচ্ছে।”

সাপ্তাহিক ‘বাংলাদেশ’ পত্রিকা ১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর প্রকাশিত বিশেষ সংখ্যায় লিখেছে, “৩ ডিসেম্বর মধ্যরাত থেকে ভারতের স্থলবাহিনী আমাদের মুক্তিবাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করে যাচ্ছে এবং ইতোমধ্যে বিবির বাজার ও কমলপুরসহ বহু শহর মুক্ত করে নিয়েছে। কমলপুরে ১৬০ জন বেলুচ সৈন্য আত্মসমর্পণ করেছে। আখাউড়া এখন সম্পূর্ণ অবরোধ এবং পশ্চিম রণাঙ্গনে আমাদের মুক্তিবাহিনী স্রোতের মতো এগিয়ে আসছে। তারা এখন যশোর ক্যান্টনমেন্ট সম্পূর্ণ অবরোধ করে রেখেছে এবং আগামী ২/১ দিনের মধ্যে যশোর ক্যান্টনমেন্ট আমাদের দখলে আসবে।” আর প্রফেসর মাযহারুল ইসলাম তার ‘বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধ ও অন্যান্য’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, “পাকিস্তান ৩ ডিসেম্বর ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলে ভারত কঠোরভাবে তার মোকাবিলা করে।”

নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য কাজী ফজলুর রহমান তার ‘দিনলিপি একাত্তর’ শীর্ষক গ্রন্থে বলেছেন, “৩ ডিসেম্বর রাত প্রায় দেড়টা। একটু আগে বেতারে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বক্তৃতা শুনলাম। অবশেষে বহু প্রত্যাশিত যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। আসলে বলতে গেলে শুরুটা আগেই হয়েছিল। এখন সেটা আনুষ্ঠানিক রূপ পেলো। প্রথম বেতারে শুনলাম সন্ধ্যা আটটার দিকে পাকিস্তানী বিমান ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে বেশ কয়টি বিমান ঘাঁটিতে বোমা বর্ষণ করেছে। পরে শুনলাম আগরতলা বিমান ঘাঁটিতেও একই রকম আক্রমণ হয়েছে। পাকিস্তানী বেতার থেকে বলা হলো, ভারতীয় সৈন্যরা পশ্চিম পাকিস্তানে আক্রমণ করেছে, সীমান্ত লংঘন করেছে তাই এই বিমান আক্রমণ। তারপর থেকেই বারবার ভারতীয় বেতারে ঘোষণা করা হচ্ছিল যে, রাত বারোটায় ইন্দিরা গান্ধী জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন। আমাদের দেশের রাত সাড়ে বারোটায় সেই ভাষণে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন।” 

স্বাধীনতা অর্জন ও জাতীয় জীবনে এর প্রভাব নিয়ে নানা রকম অংক কষা হয়। বীরমুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিক-অরাজনীতিক, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, আমলা-কৃষক, বৃদ্ধ-যুবা অনেকেই হতাশার স্বরে বলে থাকেন, স্বাধীনতার এতদিনে আমরা কি পেলাম! চলমান রাজনৈতিক বিপর্যয়কালে এ জিজ্ঞাসা আরো জোরালো হয়ে উঠেছে। প্রকৃতপক্ষেই এ দেশের স্বাধীনতার বয়স পঁয়তাল্লিশ বছর পূর্ণ হয়ে ছেচল্লিশে পা রাখতে চললেও দেশবিরোধী একটি মহলের জন্য আমাদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, মানুষের স্বাধীনতা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য তেমনভাবে রক্ষিত হচ্ছে না। বিদেশী সংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে বাঁচতে দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের শিল্পী, পরিচালক, প্রযোজকসহ সর্বস্তরের কলাকুশলীরা তো ইতিমধ্যে রাজপথে নেমেছেন। সার্বভৌমত্ব, গণতান্ত্রিক অধিকারগুলোও আজ নানা কারণে বিপন্ন। সামগ্রিক বিবেচনায় দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও যথাযথ স্বপ্ন পূরণ হয়নি। প্রতিবন্ধকতার বেড়াজালে বন্দী এ দেশের মানুষ। রক্ত, সম্ভ্রম, সর্বোপরি জীবনের দামে অর্জিত স্বাধীনতা আমরা কতটুকু বিপদমুক্ত করতে পেরেছি তা একটিবার হলেও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। কারণ আজো দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে নানামুখী ষড়যন্ত্র চলছে। এসব ষড়যন্ত্রের হাত থেকে প্রাণপ্রিয় দেশকে রক্ষা করতে দেশপ্রেমিক জনতাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। অন্যথায় স্বাধীনতা সৈনিকদের তাজা রক্তস্রোতে ও দুঃখিনী মায়ের অশ্রুধারা ষড়যন্ত্রকারীদের চক্রান্তে হারিয়ে যেতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ