ঢাকা, রোববার 4 December 2016 ২০ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সাহসের অনড় পাহাড়

ইকবাল কবির মোহন : মক্কায় গোপনে চলছে ইসলামের কাজ। চারদিকে শত্রুর আনাগোনা। কাফেরদের সতর্ক দৃষ্টি। ইসলামের কাজ হচ্ছে জানতে পারলে আর রক্ষে নেই। সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে কাফেররা। চালাচ্ছে সীমাহীন নিপীড়ন। আরবের সমাজে তখন হানাহানি। মানুষে মানুষে করছে রক্তারক্তি। সামান্য কিছু বিরোধ হলো তো খুনের নেশায় মেতে উঠে মক্কার মানুষ। মনুষত্ব আর মানবিকতার কোনো লেশমাত্র নেই আরবে। চারদিকে অন্ধকার। ঘোর অন্ধকার সমাজকে ঘিরে ধরেছিল। এমন সময় একজন মানুষের মনে আঁধারের দেয়াল ভাঙার স্বপ্ন জাগলো। কিন্তু কিভাবে? অস্থিরভাবে ভাবছেন তিনি। নাম মিকদাদ। হযরত মিকদাদ ইবনে আমর।
এক সময় তিনি জানতে পারলেন এক মহামানবের কথা। নাম তাঁর মুহাম্মদ (সাঃ)। আবদুল্লাহ্র পুত্র। মক্কার সর্দার আবদুল মুত্তালিবের নাতি। তিনি গোপনে ইসলামের কথা বলছেন। এক আল্লাহ্র পথে মানুষকে ডাকছেন। তবে অতি গোপনে। তাই মিকদাদ ছুটে গেলেন নবীজীর কাছে। মেনে নিলেন ইসলামের অমীয় বাণী। কালেমা পড়ে আল্লাহ্র কাছে নিজেকে সঁপে দিলেন। ফলে তাঁর দেহমনে খেলে গেল অলৌকিক এক আলোড়ন। বুকে বয়ে গেল প্রশান্তির সুবাতাস। মিথ্যার কুহক থেকে বেরিয়ে তিনি লাভ করলেন সত্যের পথ। ফলে বদলে গেল মিকদাদের জীবন। সমাজের আর কটা মানুষ থেকে তিনি এখন আলাদা। নতুন জীবন নিয়ে তিনি নতুনভাবে ভাবতে লাগলেন। সত্যের যে আবেশ তাঁকে বদলে দিয়েছে তা নিয়ে তিনি চুপ থাকতে চাইলেন না।
সত্যকে প্রকাশ করার তীব্র নেশা তাঁকে পেয়ে বসলো। ইসলামের কথা মানুষের কাছে তুলে ধরতে তিনি পাগলপারা হয়ে উঠলেন। তবে আরব সমাজের অবস্থা তখন ইসলামের অনুকূলে ছিল না। অধিকাংশ মানুষ ছিল পাপিষ্ঠ। পাপ ও অনাচারে তারা ছিল আকুণ্ঠ নিমজ্জিত। এই পথহারা মানুষদের পথের দিশা দিতে মিকদাদ আগ্রহ প্রকাশ করলেন। সকল ভয়, শঙ্কা ও দ্বিধা পায়ে ঠেলে মিকদাদ কাজ শুরু করলেন। ইসলামের শত্রুরা এতে চমকে উঠলো। তারা প্রচ- রেগে গেল। যারা মিকদাদের কাছের মানুষ ছিল তারাও বাদ পড়লো না। এমনকি আত্মীয়-স্বজনরাও মিকদাদের ওপর ক্ষিপ্ত হলো। মিকদাদের যারা প্রশংসা করতো, তারাও মিকদাদের ওপর অশ্রাব্য ভাষা ব্যবহার করতে লাগলো। একদিন যারা মিকদাদকে ভালোবাসতো, তারা খাপ থেকে তরবারি বের করলো। এ যেন এক নিষ্ঠুর ও ভয়ানক পরিবেশ!
তবে মিকদাদ এসবের পরোয়া করলেন না। বুকে তাঁর প্রচ- সাহস। শরীরে তীব্র উত্তেজনা। কারণ তিনি বুকে ধারণ করেছেন সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্র অমীয় বাণী। বিশ্বাসকে মজবুত করেছেন মহান সৃষ্টিকর্তার নির্দেশে। তাই ভয় কিসের। এ জন্য মিকদাদ বর্বর নির্যাতন ও প্রাণনাশের ভয়কে তুচ্ছ জ্ঞান করে প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা দিলেন। ফলে তাঁর ওপর নেমে এলো সীমাহীন নিপীড়ন। মহানবী (সাঃ)-এর চোখের সামনে মিকদাদকে অত্যাচারে জর্জরিত করা হলো। রাসূল (সাঃ) নিজ চোখে দেখলেন মিকদাদের রক্তমাখা দেহ। এতে তিনি প্রচ- ব্যাথা পেলেন। দিনের পর দিন নিপীড়নে মিকদাদও বেহাল অবস্থার মধ্যে পড়লেন। নবীজীর তা সহ্য হলো না। তাই তিনি মিকদাদকে হিযরত করার নির্দেশ দিলেন। মিকদাদ নবীজীর নির্দেশে মক্কা ছেড়ে একদিন মদিনায় গিয়ে হাজির হলেন।
এরই মধ্যে মহানবী (সাঃ) নিজেও মদিনায় হিযরত করেছেন। হিজরী দ্বিতীয় সন। মদিনার আকাশে দেখা দিলো কালো মেঘের ছায়া। বেজে উঠলো বদর যুদ্ধের দামামা। কুরাইশ কাফেররা মদিনার মুসলমানদের শায়েস্তা করার জন্য বদরের প্রান্তরে গিয়ে হাজির হলো। নবীজীর সাহাবীরা এই লড়াই মোকাবিলা করার জন্য দৃপ্ত শপথ নিলেন। তারা আত্মত্যাগ ও কুরবানির বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করার ইচ্ছাপোষণ করলেন। মিকদাদও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি এ সময় আবেগপূর্ণ একটি ভাষণ দিলেন। মিকদাদ বললেন,
‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আল্লাহ্ আপনাকে যে নির্দেশ দান করেছেন তা আপনি পালন করুন। আমরা আপনার সাথে আছি। আল্লাহ্র কসম, আমরা আপনার সাথে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো। আমরা আপনার ডানে, বায়ে, সামনে ও পেছনে সকল দিক থেকে লড়াই চালিয়ে যাবো। আর আমরা লড়াই করবো যতক্ষণ না আল্লাহ্ আপনাকে বিজয় দান করেন।’
হযরত মিকদাদের এই দুঃসাহসী উচ্চারণ আরবের বাতাসে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হলো। একজন প্রচ- সাহসী সাহাবীর দৃঢ়তা নবীজীর মনকে নাড়া দিলো।
এক অনুপম প্রেরণায় আল্লাহ্র নবীর চোহারা মুবারক উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। দেখতে দেখতে শুরু হলো বদরের যুদ্ধ। হযরত মিকদাদের সাহসের তীব্রতা ফুটে উঠলো বদর প্রান্তরে। দুর্দান্ত সাহস নিয়ে তিনি লড়াই চালিয়ে গেলেন। তিনি ছিলেন অশ্বারোহী সৈনিক। বদরের লড়াইয়ে মিকদাদের অবদান বলে শেষ করা যাবে না। তিনি খন্দক ও অন্যান্য যুদ্ধেও অসীম সাহস, ত্যাগ ও কুরবানির পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছেন।
হযরত মিকদাদের জীবন নানা প্রতিকূলতা ও পরীক্ষার মধ্য দিয়ে এগিয়ে গেছে। ইসলাম গ্রহণের কারণে সীমাহীন নির্যাতন তাঁকে সহ্য করতে হয়েছে। অভাব-অনটন ও দারিদ্র্যতার কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে হয়েছে।
যুদ্ধ-লড়াইসহ কাফেরদের তীব্র প্রতিরোধ মোকাবেলা করে জীবনের কঠিন সময় পার করেছেন মিকদাদ (রাঃ)। এ যেন এক মহাবিজয় লাভ করার জন্য কঠিন সংগ্রাম। আল্লাহ্র দ্বীনের বিজয় এবং আখেরাতের অনন্ত জীবনের সুখ ও প্রশান্তির জন্য মিকদাদের সংগ্রাম সত্যিই বিরল। ঈমানদৃপ্ত লড়াকু মিকদাদ সাহসী মানুষদের একজন। তিনি ছিলেন সাহসের এক অনড় পাহাড়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ