ঢাকা, রোববার 4 December 2016 ২০ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

“বিষ নিজে খাব না ভবিষ্যৎ বংশধরদেরও খাওয়াবো না”

সোলায়মান হোসাইন কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) :  চাতালে ধান। ধান থেকে চাল। চাল থেকে খুদ, সাথে রাইচ পোলিশ। নিজেদের রাইচ মিল থেকেই গরুর খাদ্য খুদ ও রাইচ পোলিশ পাওয়ায় গরুর ফার্ম গড়ে তোলা। গরুর গোবর থেকে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট। প্ল্যান্টের বায়োগ্যাস ব্যবহার করে গরুর খাবার রান্না। শেষে বায়োস্যালারি (গোবরের উচ্ছিষ্ট)  চাড়িতে রেখে কেঁচো কম্পোস্ট সার উৎপাদন। সেই সার প্রয়োগ করে গরুর খাবার নেপিয়ার ঘাস, ধানসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদন। চাক্রিক এই প্রোজেক্টের পরিধি ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে, সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের।
পরিকল্পিত এই প্রোজেক্টটি করেছেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের বলিদাপাড়া গ্রামের মৃত আব্দুল ওয়াদুদের ছেলে নাসিম উদ্দিন (৩৬)। ‘বিষ নিজে খাব না, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও খাওয়াবো না’ এই ভাবনা থেকে একটি প্যাকেজ কর্মসূচী হাতে নিয়ে এগিয়ে চলেছেন ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের এই তরুণ উদ্যোক্তা।
কালীগঞ্জ শহর থেকে মাত্র ২ কি:মি দূরে বাবরা গ্রামে ১১২ শতক জমিতে এ প্রোজেক্ট গড়ে তুলেছেন উদ্যোক্তা নাসিম। ধান চালের ব্যবসা থেকে গড়ে তোলা আরাবিয়া রাইচ মিল ও চাতাল এখন জৈব সার ও ঔষধ উৎপাদনের কারখানায় পরিণত হতে যাচ্ছে। নাসিম জানান, ২০০৪ সালে ৭৪ শতক জমিতে আরাবিয়া রাইচ মিল গড়ে তোলা হলেও প্যাকেজের অন্যান্য কার্যক্রম বৃদ্ধির সাথে সাথে জমির পরিমাণও বাড়ানো হয়। ২০১৬ সালের জানুয়ারী মাসে গরুর ফার্ম গড়ে তোলা হয়। প্রথমে ২৭টি গরু নিয়ে শুরু করলেও ৮জানুরয়ারী ২০১৬ খেকে ১৮ সেপ্টেম্বর’১৬ এই ৭ মাসে ৬৮টি গরু ক্রয়-বিক্রয় করা হয়। ফার্মের গরুকে নিজেদের জমিতে উৎপাদিত ধান থেকে পাওয়া খড় (বিচালী), চাতালে উৎপাদিত চালের খুদ ও রাইচ পোলিশ খাওয়ানো হয়। গরুর ফার্মটি শুরু থেকেই লাভে আছে বলে তিনি জানান। তিনি জানান, গরু পালন শুরু করার পর পর্যাপ্ত গোবর পাওয়া যাবে, সেই গোবরকে কাজে লাগানোর জন্য বায়োগ্যাস প্লান্ট তৈরী করা হয়। বায়ো গ্যাস প্ল্যান্ট থেকে পাওয়া বায়ো স্যালারি প্রথমে সরাসরি কৃষি জমিতে প্রয়োগ করলেও বর্তমানে ওই বায়ো স্যালারি দিয়ে কেঁচোর সাহায্যে ভার্মি কম্পোষ্ট সার তৈরী করা হচ্ছে। নাসিম বলেন, গ্যাস প্ল্যান্ট ও কেঁচো সার তৈরীতে বেসরকারী সংস্থা হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করছে। মুলত হাঙ্গার ফ্রি ওয়াল্ডের পরামর্শেই চলতি বছরের জুলাই মাস থেকে ভার্মি কম্পোষ্ট সার উৎপাদন শুরু করা হয়েছে। উৎপাদিত সার দিয়ে এবছর ২ বিঘা জমিতে ধানের চাষ করা হয়েছে। জৈব এই সার প্রয়োগে ভালো ফলাফল পেয়েছেন বলে নাসিম জানান। তিনি এখন এই সার নিজের ফলের বাগানেও ব্যবহার করা শুরু করেছেন এবং গাছের ছাল বাকল ও পাতা দিয়ে বালাই নাশকও উৎপাদনের চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
গরুর ফার্ম নিয়ে তিনি বলেন, গরু থাকার সেড, বায়োগ্যাস প্লান্ট ও সার উৎপাদনের সেড তৈরীতে এককালীন প্রায় ১০লাখ টাকা খরচ হয়েছে। গরু ক্রয় বাবদ প্রায় ১০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। শুরুতে ছোট বড় গরু মিলিয়ে ২৭টি গরু ক্রয় করার পর তা বছর জুড়ে গরু বিক্রি করা হয়।
এ বছরে ক্রয় করা গরুর মধ্যে একটির মূল্য ছিল ৪৫ হাজার টাকা। গরুটি প্রতিদিন ১শ ২০ টাকার খাবার খেয়েছে। ৯৯দিনে খাবার শ্রমিকের বেতন ও অন্যান্য বাবদ ওই গরুর জন্য ব্যয় হয়েছে ১২ হাজার ১৭৭টাকা। ৯৯দিন পরে গরুটি ৬৫ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। এক গরু বিক্রি করে ২০ হাজার টাকা লাভ হয়েছে। তবে খরচের ১২ হাজার ১৭৭টাকা বাদ দিলে নীট লাভ হয় ৮হাজার টাকা। অর্থ্যাৎ ৩ মাসে একটি গরুতে ৮ হাজার টাকা লাভ হয়েছে।
নাসিম কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেন তারই চাচাতো ভাই কানাডা প্রবাসি তৌফিক ইলাহীর প্রতি। কারণ তিনি তার সকল চিন্তা চেতনা ও পরিকল্পনা শেয়ার করতেন তার সাথে।  নাসিম বলেন, ‘ভাই আমাকে বিশ্বাস করে আমার ভাবনাগুলোকে বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক সহযোগিতা করেছেন। ভাইয়ের সাড়া না পেলে আমার পক্ষে কিছুই করা সম্ভব হতো না। এছাড়া বেসরকারী সংস্থা হাঙ্গার ফ্রি ওয়ার্ল্ড ও কালীগঞ্জ উপজেলার রায়গ্রাম ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা নুরুজ্জামানের পরামর্শে জৈব সার ও ঔষধ উৎপাদন করে তা কৃষি জমিতে প্রয়োগের মাধ্যমে বিষ মুক্ত ফসল উৎপাদন শুরু করতে পেরে মানষিক সন্তুষ্টি অর্জন করতে পেরেছি।’  নাসিম আরো বলেন, ‘আমার এই প্রোজেক্টটিকে সবার কাছে একটি মডেল হিসেবে দাঁড় করাতে চাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ