ঢাকা, রোববার 4 December 2016 ২০ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ক্রান্তিকালে স্টিফেন হকিংয়ের বার্তা

বর্তমান সময়ে সভ্যতা যেভাবে চলছে, বিশ্ব রাজনীতি যেদিকে ধাবিত হচ্ছে, তাতে বিশ্বনেতাদের প্রশংসা করা যায় না; বরং ব্যর্থতার কারণে তাদের নিন্দাবাদ করতে হয়। বিশ্বনেতাদের ভাবমর্যাদা তথা ইমেজ এতটাই নিন্মগামী যে, তাদের কথায় আস্থা রাখা যায় না, তাদের কথামালা শুনতেও ভাল লাগে না। তাহলে মানুষ কাদের কথা শুনবে, কাদের কথায় আশাবাদী হবে? দুঃখময় এমন এক সময়ে কিছু কথা বলেছেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং। তিনি শুধু বিশ্ব-রাজনীতি, অর্থনীতি, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, বণ্টন ব্যবস্থা এবং সামাজিক সংকট নিয়েই কথা বলেন নি, সংকট সমাধানের পথও নির্দেশ করেছেন। ফলে বৃটেনের দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত তাঁর বিশ্লেষণটি আমাদের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে।
স্টিফেন হকিং বলেছেন, বৃটেনে ও যুক্তরাষ্ট্রে অভিজাত সম্প্রদায় প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। বৃটিশ জনগণের ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ এবং মার্কিন জনগণের ট্রাম্পকে নির্বাচিত করার ঘটনায় পর্যবেক্ষকরা যাই বলুন না কেন, এ দু’টি ঘটনায় মানুষের ক্রোধের প্রতিফলন হয়েছে। তারা মনে করেছেন, নেতারা তাদের ছুঁড়ে ফেলেছেন। এটা আসলে এমন একটা সময় যখন বিস্মৃত মানুষরা উচ্চকণ্ঠে কথা বলছেন। তারা বিশেষজ্ঞ ও অভিজাতদের পরামর্শ উপেক্ষা করেছেন। স্টিফেন হকিং আরো বলেন, ব্রেক্সিটের আগে আমি সতর্ক করে দিয়েছিলাম যে, এতে বৃটেনের বৈজ্ঞানিক গবেষণা ব্যাহত হবে। এটা হবে পেছনে যাওয়ার সামিল। কিন্তু বেশির ভাগ ভোটারই আমার কথা শোনেননি। ঠিক যেমন তারা রাজনীতিক, শিল্পী, বিজ্ঞানী, ব্যবসায়ী ও সেলিব্রিটিদের কথা শোনেননি। মানুষ তো ভোট দিয়েই ফেলেছেন, কিন্তু অভিজ্ঞরা কি করেন সেটাই এখন দেখার বিষয়। আমরা কি ভাববো, এটা জনপ্রিয়তার নির্জলা বিস্ফোরণ যেটা আসলে বাস্তবতা আমলে নিতে পারেনি, অথবা আমরা কি তাদের এ পছন্দ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবো? আমি বলবো, সেটা হলে আমরা মারাত্মক ভুল করবো। স্টিফেন হকিং আরো বলেন, এই ভোটের পেছনে বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির বিকাশ নিয়ে মানুষের মনে যে উদ্বেগ ছিল, তার প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। কারখানাগুলো স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাওয়ায় অনেক মানুষ কাজ হারিয়েছেন। এর সঙ্গে আবার যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যার কারণে মধ্যবিত্তের চাকরি হারানোর আশঙ্কা আরো বাড়বে। আসলে বর্তমান পৃথিবীতে বৈষম্যের মাত্রা বেড়েই চলেছে। ইন্টারনেটের বিভিন্ন প্লাটফর্মের মাধ্যমে স্বল্পসংখ্যক মানুষকে কাজে লাগিয়ে প্রচুর মুনাফা অর্জন সম্ভব। আর এ মুনাফার সিংহভাগ ভোগ করবে তার চেয়েও কম সংখ্যক মানুষ। এটা এক ধরনের অগ্রগতি বটে, কিন্তু সমাজের জন্য ধ্বংসাত্মক। এমন ব্যবস্থায় অল্প কিছু মানুষ বিপুলভাবে লাভবান হচ্ছেন, আর এই সব লাভবানদের লোভের কারণে পুরো ব্যবস্থা কলুষিত হবে, আর এর জের টানতে হবে সেই আমজনতাকেই। অর্থাৎ আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি, যেখানে মানুষের মধ্যে বৈষম্য শুধু বাড়ছেই, যেখানে বিপুল মানুষের শুধু যাপিত জীবনের মানই নয়, জীবিকা অর্জনের সক্ষমতাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে তারা যে নতুন সামাজিক চুক্তির সন্ধান করছেন তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ট্রাম্প ও ব্রেক্সিট হয়তো তাদের বিবেচনায় সম্ভাবনার একটা ইঙ্গিত দিয়েছেন।
মানুষের মনে এখন প্রশ্ন, ক্রমবর্ধমান অসমতা থেকে বাঁচার কি কোনো উপায় নেই? বাঁচার লক্ষ্যে গ্রামের গরীব মানুষরা শহরে ভিড় জমাচ্ছে। ঠেসাঠেসি করে বস্তিতে মানবেতর জীবন যাপন করছে। অনেকে উন্নত জীবনের সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। কিন্তু বিদেশে স্থানীয়রা অভিবাসীদের প্রতি তেমন সহিষ্ণু নন। ফলে সেখানকার রাজনীতিতে জনপ্রিয় ধারা প্রবল হয়ে উঠছে। অথচ এমন, বাস্তবতায় সবার একত্রে কাজ করার বিষয়টি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের কাছে এমন প্রযুক্তি আছে যা দিয়ে আমরা পৃথিবী ধ্বংস করতে পারি, কিন্তু সেই ধ্বংসযজ্ঞ এড়ানোর প্রযুক্তি আমরা নির্মাণ করতে পারিনি। তাই আমাদের একত্রে কাজ করে এই পৃথিবীকে রক্ষা করতে হবে। জাতিতে-জাতিতে যে বৈরীতা ও বিভেদের দেয়াল তৈরি হয়েছে তা ভেঙে ফেলতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের বিশ্বনেতারা ব্যর্থ হয়েছেন। তারা নানাভাবে প্রতিনিয়ত ব্যর্থ হচ্ছেন এবং অন্য অনেক মানুষকে ব্যর্থ করেছেন। পৃথিবীর সম্পদ ক্রমাগত অল্প কিছু মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত হচ্ছে। এই সম্পদ কী করে আরও বেশি ভাগাভাগি করা যায় তা আমাদের শিখতে হবে। প্রসঙ্গত স্টিফেন হকিং আরো বলেন, আমাদের সমাজ ও অর্থনীতি যদি অভিবাসীদের স্রোত সামলাতে না পারে, তাহলে আমাদের সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হবে। সেটা করা গেলে মানুষ তার ঘর ছেড়ে অভিবাসী হবে না, নিজ দেশেই কাজ পেয়ে যাবে। পরিশেষে স্টিফেন হকিং বলেছেন, সব অভিজাতকে অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হবে। তবে সবার ওপরে তাদের সংযম শিখতে হবে, নম্র হতে হবে। কিন্তু হকিংয়ের এমন গুরুত্বপূর্ণ আহ্বানে প্রশ্ন জাগে, অভিজাতরা সংযম ও নম্রতা শিখবেন কোত্থেকে? তাঁদের পারিবারিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক সিলেবাসে কি ওই বিষয়গুলো আছে? বিষয়গুলো যে একান্তভাবে নৈতিক তথা ধর্মীয় শিক্ষার সাথে জড়িত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ