ঢাকা, রোববার 4 December 2016 ২০ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মানবতার মৃত্যুতে বিশ্ববিবেক নীরব কেন?

মোঃ তোফাজ্জল বিন আমীন : মানুষ মানুষের জন্য জীবন জীবনের জন্য। মানুষ কি পারে না একটু সহানুভূতি দেখাতে? এটি ভপেন হাজারিকার জননন্দিত একটি গান। মানবিকতার প্রসঙ্গ এলেই মনের অজান্তে গুনগুন করে এই গানটি কম বেশি সবাই গেয়ে থাকে। মানুষ মানুষের জন্য জীবন জীবনের জন্য এই কথাটি মিথ্যে পরিণত হতে যাচ্ছে। কারণ এখন আর মানুষ মানুষের জন্যে তো নয়! উল্টো জীবন কেড়ে নেয়। মানুষের বড় পরিচয় যে মানুষ সেটা আমরা ভুলে যেতে বসেছি। যার ফলে আরকানের নিরীহ মুসলমানদের নির্মম নির্যাতন দেখেও না দেখার ভান করে দিনপাত করছি। একটা সময় তো এমন ছিল যখন কেউ কষ্ট পেত সবাই এগিয়ে যেত সান্ত¦না দিতে, এখন আর তেমনটা দেখা যায় না। জীব হত্যা মহাপাপ যে ধর্মের অনুসারীরা মনে করে সে ধর্মের অনুসারীরা আজ পৃথিবীর জঘন্যতম হত্যা নির্বিচারে চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ মুসলিম নামধারী শাসকেরা নিশ্চুপ। নিবন্ধনের শুরুতে ধিক্কার জানাই সেই সব মানুষরূপী নরপশুদের, যাদের নিষ্ঠুর নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা ভিটে বাড়ি ছেড়ে অজানা গন্তব্যে পাড়ি দিচ্ছে। প্রতিবাদ করার যখন কেউ থাকে না বা প্রতিবাদ করার সাহস যখন কেউ করে না, তখন অসহায় মানুষের উপর জুলুমবাজদের জুলুমের মাত্রা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। এটা ইতিহাসে প্রমাণিত। তবে এটাও জালেমবাজদের মনে রাখা দরকার নমরুদ ফেরাউনের শাস্তি যিনি নিশ্চিত করেছেন তিনি আজোও আছেন।
প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের নিরীহ রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর যা চলছে তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। সে দেশের সামরিক বাহিনী ও উগ্রবাদী বৌদ্ধারা নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে গেলেও নীরব মানবতাবাদীরা। কিন্তু কেন? সেই প্রশ্নের উত্তর মুসলিম স্কলারদের ভেবে দেখা দরকার। অসহায় নারী পুরুষ ও নিষ্পাপ শিশুদের করুণ আর্তনাদ আর হাহাকারের আওয়াজ মুসলিম নামধারী শাসকের ঘুম ভাঙ্গাতে পারেনি। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হওয়া সত্ত্বেও শাহজালাল-শাহপরানের এই পূণ্যভূমিতে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই করতে মাথা ঠুকতে হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের এ সমস্যা নতুন নয় বরং পুরাতন। সরকার ইচ্ছে করলে অসহায় রোহিঙ্গাদেরকে একটু মাথা গোঁজার জায়গা করে দিতে পারে। প্রতিবেশী দেশ ভারতও পারতো নিরীহ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে। ১৯৭১ সালে ভারত বাংলাদেশের জন্য সীমান্তের দরজা খুলে দিয়ে উদারতার পরিচয় দিয়েছিল। কিন্তু রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দিতে বাধা কোথায়? আমরা আশা করব ভারত সরকার বিষয়টি ভেবে দেখবে। আরাকানকে রোহিঙ্গা মুসলমান শূন্য করতে নানা অজুহাতে প্রদেশটিতে বার বার অভিযান চালাচ্ছে মিয়ানমারের বর্বর বাহিনী। ১৯৯২ সাল থেকে চলা এই দমন পীড়ন নির্যাতনের ধারা আজও বহমান। মুসলিম রোহিঙ্গাদের চোখের পানিতে শুধু মিয়ানমার নয় পৃথিবীর আকাশ ভারী হয়ে উঠছে। অসহায় মুসলিম নারী পুরুষ আর ফুলের মতো শিশুদেরকে মিয়ানমার সরকার হত্যা করে গহীন সাগরে ভাসিয়ে দিচ্ছে। অথচ রাষ্ট্রনায়কেরা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সরকার প্রধানের উচিত ছিল মিয়ানমার সরকারকে কঠোরভাবে সাবধান করে দেয়া। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোন উচ্চবাচ্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। যা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক। এ পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের শত শত গ্রাম পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়েছে অসংখ্য নারী পুরুষ ও শিশুদের। ঘড়বাড়ি ছাড়া করা হয়েছে দেড় লাখেরও বেশি মানুষকে। অনেকে প্রাণের ভয়ে ছুটছে দেশ থেকে দেশান্তরে।
বিশ্ব বিবেক জেগে উঠলেও মিয়ানমার সরকারের সাথে আর্থিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থের কারণে মার্কিন প্রভাবাধীন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরব ভূমিকা পালনের কারণে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন বেড়েই চলছে। হত্যা করা হচ্ছে নিষ্পাপ শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধাদেরকে। অসংখ্য মা বোনের ইজ্জত কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। সন্তানহারা করা হচ্ছে অসংখ্যা মমতাময়ী মাকে। স্বামীহারা করছে হাজারো স্ত্রীকে। ভাইয়ের সামনে বোনের ইজ্জত লুটে নিয়ে উল্লাস করলেও ভাই তার বোনের ইজ্জতকে রক্ষা করতে পারছেন না। মজলুম মুসলিম রোহিঙ্গাদের চোখের পানিতে ভাসছে মিয়ানমার। পৃথিবীতে দেড়শ কোটি মুসলমান থাকার পরও দেশে দেশে মুসলিম নিধন চলছে। তাহলে কি আমরা ধরেই নিব রোহিঙ্গারা মুসলিম হওয়াটাই অপরাধ? গণহত্যা,ধর্ষণ,নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে তা কিন্তু নয়। বাড়ি থেকে জোর করে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। নিজ দেশে জন্ম গ্রহণ করেও তারা ভিটে বাড়িতে না থাকতে পেরে জীবন বাঁচানোর তাগিদে সমুদ্র পথে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে পাড়ি জমাচ্ছে অজানা গন্তব্যে।
জাতিসংঘের তথ্যমতে মুসলিম রোহিঙ্গারা বিশ্বের সবচেয়ে ভাগ্যাহত জনগোষ্ঠি। শত শত বছর ধরে তারা নির্যাতিত ও নিপীড়িত হচ্ছে। অথচ তাদেরকে জুলুমের হাত থেকে রক্ষা করতে কেউ এগিয়ে আসেনি। মজলুম রোহিঙ্গাদের বীভৎস চেহারাগুলো মিডিয়ার সংবাদে বা পত্রিকার পাতায় দেখে অশ্রু ধরে রাখা যায় না। যাদের হৃদয়ে ভালোবাসার কোন স্থান নেই, তাদের কথা আলাদা। মায়ানমারের সরকারের নিষ্ঠুর নির্যাতনের অব্যহত জুলুমের ধারা দেখেও যাদের মনে একটুও দাগ কাটেনা, বিনয়ের সাথে তাদেরকে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছে, আপনার সামনে আপনার প্রিয় ভাই-বোন, মা-বাবা, ছেলে-মেয়েদের যদি জ্বলন্ত আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে, শরীরের উপর কামান তুলে মাথার মগজ বের করে ফেলে, চোখের সামনে প্রিয়জনের তাজা দেহ দ্বিখন্ডিত করে ফেলে তখন আপনার কেমন লাগবে? এই বিষয়টি সবারই ভেবে দেখা প্রয়োজন। আশা করব মুসলিম রাষ্ট্রনায়কেরা এ ব্যাপারে ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণ করে নিরীহ রোহিঙ্গাদেরকে নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করবেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ