ঢাকা, রোববার 4 December 2016 ২০ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

সীমান্তে রোহিঙ্গা বোঝাই নৌকায় বিজিপির গুলী ॥ নদীতে ভাসছে অসংখ্য লাশ

কামাল হোসেন আজাদ, কক্সবাজার: মিয়ানমার মংডুর রোহিঙ্গা অধ্যুষিত জনপদে চলছে সেদেশের সেনাবাহিনী ও রাখাইন সম্প্রদায়ের উগ্র গোষ্ঠীদের তা-ব। ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ ও রক্তের হোলিখেলায় পর্যুদস্ত হচ্ছে সেখানকার নিরীহ মুসলমানদের মানবতা। আর সীমান্তে রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞে নেমেছে সে দেশের বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি)। বুধবার দিবাগত রাতে নাফ নদীতে রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু বোঝাই করা নৌকায় নির্বিচারে গুলী চালিয়েছে তারা। এতে গুলীবিদ্ধ হয়ে ও ভয়ে নৌকা থেকে লাফিয়ে পড়ে পানিতে ডুবে মারা গেছে কমপক্ষে ৪৩ জন। নৌকা থেকে লাফ দেওয়ার পর কোনোক্রমে প্রাণে বেঁচে যাওয়া এক রোহিঙ্গা যুবক এমন মর্মান্তিক ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। সীমান্তের ওপার থেকেও এমন তথ্যের সত্যতা পাওয়া গেছে। নাফ নদীর ওপারের বাসিন্দা ও এপারে অনুপ্রবেশকারীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মিয়ানমারের মংডুতে সে দেশের সেনাবাহিনীর তা-ব থেকে বাঁচতে হাজারো রোহিঙ্গা শিশু, নারী ও পুরুষ নাফ নদীর ওপারে অবস্থান করছে। নদীর উভয় তীরে থাকা দুই দেশের দালালরা অর্থের বিনিময়ে তাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের সুযোগ করে দিচ্ছে। আর এপারে বিজিবির পাহারা নেই এমন স্থান দিয়ে অনুপ্রবেশ করিয়ে দালালচক্র হাতিয়ে নিচ্ছে নগদ টাকা। ওপারের প্রাংপ্রো এলাকার বাসিন্দা এক নারী (নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ করা হলো না) জানান, বুধবার রাতে নাফ নদের মিয়ানমার অংশ থেকে একটি বড় নৌকা বোঝাই হয়ে লোকজন নদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের জন্য রওনা হয়। নৌকাটি লক্ষ্য করে সেদেশের সীমান্ত রক্ষী বিজিপির সদস্যরা উপর্যুপরি গুলীবর্ষণ করতে থাকে। নদীর ধারে বাড়ি হওয়ায় তিনি স্পষ্টই গুলীর শব্দ শুনতে পান। আর গত শুক্রবার তিনি নদীর ওই অংশে সারি সারি লাশ ভাসতে দেখেন। তিনি ও স্থানীয় অনেকে গণনা করে ভাসমান অবস্থায় কমপক্ষে ৪৩টি লাশ পেয়েছেন। ওই নারী আরো জানান, বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকালে বিজিপি ৬৬ জনকে আটক করে মংডু শহরে নিয়ে গেছে বলে তিনি শুনতে পেয়েছেন। বিজিপি যে নৌকাটিতে গুলী চালিয়েছে সেটিতেই ছিলেন বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী ইমান হোসেন। তিনি মংডুর ওয়াবেক এলাকার মৃত কালু মিয়ার ছেলে। তিনি বলেন, বুধবার রাত ৮টায় নাফ নদীর মিয়ানমার প্রান্ত থেকে মগ সেনাদের অব্যাহত অত্যাচার থেকে বাঁচতে একটি নৌকাযোগে অনেক শিশু, নারী ও পুরুষ বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। দুই ছেলে সলিম উল্লাহ (১৮) ও সালামত খান (১৪)কে নিয়ে তিনিও ওই নৌকায় ছিলেন। নৌকাটি সামনের দিকে অর্ধ কিলোমিটার আগালে আকস্মিক মুহুর্মুহু গুলীর শব্দ শোনা যায়। গুলী ছুঁড়তে ছুঁড়তে নৌকাটির দিকে একটি স্পিডবোট ছুটে আসতে থাকে। এসময় নৌকার আরোহীদের অনেকে গুলীবিদ্ধ হয়। পরক্ষণে তিনি বুঝতে পারেন যে, গুলীবর্ষণকারীরা বিজিপির সদস্য। উপর্যুপরি গুলীবর্ষণের মুখে তাঁদের বহনকারী নৌকাটি আংশিক ডুবে গিয়ে পানি প্রবেশ করতে থাকে। এ সময় অনেকেই নাফ নদী লাফিয়ে পড়ে। আবার শিশুসহ কেউ কেউ নৌকায় রয়ে যায়। তিনিও নদীতে লাফ দেন। ওদিকে বিজিপি সদস্যরা কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে নৌকাটি তাদের স্পীডবোটের সঙ্গে বাঁধে এবং সেটি মিয়ানমারের দিকে নিয়ে যায়। নৌকাটি বিজিপি নিয়ে গেলেও যারা নদীতে লাফ দিয়েছিল তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা ইমাম হোসেন জানেন না। তবে তাঁকে উদ্ধার করেছে নাফ নদীতে মাছ ধরার একটি নৌকা। ওই নৌকার মাঝি রশিদ আহমদ তাঁকে টেকনাফের কেরুনতলী এলাকার একটি বাড়িতে পৌঁছে দেন। ওই বাড়িতেই বৃহস্পতিবার উদ্ধার হওয়া ইমাম হোসেনের সাথে আলাপকালে এসব তথ্য জানা যায়। তাঁর দুই ছেলে সলিম উল্লাহ ও সালামত উল্লাহর ভাগ্যে কী ঘটেছে তা তিনি জানেন না। বিজিপির গুলিতে ৪৩ জনের মৃত্যু এবং ৬৬ জনকে আটকের বিষয়ে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মৃতদের মধ্যে কতজন গুলীবিদ্ধ আর কতজন পানিতে ডুবে মারা গেছে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যও পাওয়া যায়নি। নাফ নদীতে গুীলর শব্দের বিষয়ে জানতে চাইলে কোস্ট গার্ড টেকনাফ স্টেশন কমান্ডার লে. আতাউর রহমান বলেন, ‘বুধবার রাতে লোকজনের কাছে নাফ নদীতে চিৎকার হচ্ছে শুনে একটি টিম পাঠানো হয়। কিন্তু কোস্ট গার্ড টিম গিয়ে কোনো রোহিঙ্গা বোঝাই নৌকা পায়নি। রোহিঙ্গারা অন্য স্থানে সরে গেছে বা তাদের বিজিপি নিয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমি নিজে গুলীর শব্দ শুনিনি, তবে স্থানীয়রা শুনেছে বলে জানিয়েছে।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ