ঢাকা, রোববার 4 December 2016 ২০ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

খুলনায় আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া গুলীবর্ষণ ॥ আহত ৪

খুলনা অফিস : খুলনা জেলা পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী শেখ হারুনুর রশীদ ও বিদ্রোহী প্রার্থী অজয় সরকারের সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় অজয়সহ তার তিন সমর্থক আহত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। তারা খুলনার গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে একটি বাসায় আশ্রয় নেয়। তবে ঘটনার সময় হত্যার উদ্দেশ্যে অজয়কে লক্ষ্য করে গুলী করা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। অপরদিকে হারুনুর রশীদের সমর্থকদের লক্ষ্য করে অজয় সরকারের সমর্থকরা গুলী করেন বলে তার অনুসারীরা দাবি করেছেন। শনিবার দুপুরে জেলা পরিষদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই চলাকালে খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর আওয়ামী লীগের দু’টি গ্রুপের সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছে। যে কোন মুহূর্তে বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশংকা করছে খুলনাবাসী। 
পুলিশ ও প্রতক্ষ্যদর্শীরা জানায়, শনিবার ছিল জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের প্রথম দিন। যাচাই-বাছাইকালে খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী শেখ হারুনুর রশীদের পক্ষে জেলা সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান জামালের নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা এবং দলের বিদ্রোহী প্রার্থী অজয় সরকারের নেতৃত্বে তার সমর্থকরা উপস্থিত ছিলেন। বেলা ২টার দিকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে শেখ হারুনুর রশীদের সমর্থকরা অজয় সরকারের সমর্থক চিন্ময় (৩৫), কাজল (৩২) ও ফারুক হোসেনকে (৩৩) মারধর করে। এ ঘটনার খবর পেয়ে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষ থেকে অজয় সরকার বেরিয়ে আসলে তার উপরে হামলা হয়। এক পর্যায়ে সে পুলিশী পাহারায় ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
জেলা পরিষদের বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী অজয় সরকার অভিযোগ করে বলেন, পুলিশের উপস্থিতিতে হারুনুর রশীদের লোকজন তার সমর্থকদের উপর হামলা করেছে। হামলায় ৪/৫জন সমথর্ক আহত হয়েছে। এর মধ্যে চিন্ময়, কাজল ও ফারুক হোসেনকে গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে নিরাপত্তার অভাবে পাশের একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। তিনি বলেন, শুধুমাত্র আমার সমর্থকদের উপর হামলা করেই তারা ক্ষান্ত হননি। তারা আমার পেটে ছুরি মেরেছে। পরে তারা আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে আমাকে লক্ষ্য করে গুলী করেছে। গুলীটি লক্ষভ্রষ্ট হওয়ায় আমি প্রাণে বেঁচে গেছি।
তবে জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান জামাল বলেন, অজয় সরকার দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে নেতাকর্মীদের সামনে প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে কটূক্তি করায় বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা তার উপর ক্ষুব্ধ হয়। এক পর্যায়ে সে গাড়িতে উঠে নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে গুলী ছুঁড়তে ছুঁড়তে চলে যায়। আমরা সাথে সাথে ঘটনাটি প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলকে জানিয়েছি।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত খুলনা সদর থানার এসআই জহুরুল ইসলাম জানান, বেলা আড়াইটার দিকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অজয় সরকার আসলে তার প্রতিপক্ষের লেকাজন তার উপর চড়াও হয়। আমরা তাকে নিরাপত্তা দিয়ে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে দিই। গুলী করা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ধরনের কোন ঘটনা ঘটেনি।
তবে খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম গুলী বর্ষণের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ঘটনার সময় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে দুই রাউন্ড গুলী হয়েছে বলে শুনেছি। এখনও পর্যন্ত কোন পক্ষই কোন অভিযোগ করেননি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 
এদিকে প্রার্থীতার ক্ষেত্রে কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদে মনোনীত প্রার্থীর পাশাপাশি আরও দুই প্রার্থী মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন, মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার পর থেকে তারা ঘরে বাইরে চালাচ্ছেন নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা। সদস্য পদের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। এপদেও একাধিক আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঠে রয়েছেন। শুধু প্রার্থীরা নয়, তাদের কর্মী সমর্থক অনুসারীরাও পুরো নেমে পড়েছেন নির্বাচনী কাজে। এ অবস্থায় দলীয় সংহতি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। দীর্ঘদিনের চেপে থাকা আন্তঃকোন্দল প্রকাশ্য রূপ ধারণ করছে।
সূত্র জানায়, জেলা পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই সম্ভাব্য প্রার্থীরা নড়ে চড়ে বসেন। তফসিল ঘোষণা পর্যন্ত খুলনা জেলা পরিষদ প্রশাসক পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাবেক হুইপ শেখ হারুনুর রশিদ। ইতোপূর্বে তিনি খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। দলের একজন পরীক্ষিত নেতা হিসেবে তিনি পরিচিত এবং কেন্দ্রে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। সরকার তাকে বিগত সংসদ নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় না রাখলেও জেলা পরিষদ প্রশাসকের পদ দিয়ে মূল্যায়িত করে। প্রত্যাশিতভাবেই এবার তিনি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদে দলীয় মনোনয়ন লাভ করেন।
এদিকে, কেন্দ্রের সমর্থন লাভের জন্য আরও পাঁচজন প্রার্থী জোরালো লবিং করেছিলেন। তারা হলেন- বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন (বিএমএ) খুলনা জেলা শাখার সভাপতি ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ-স্বাচীপ নেতা ডা. শেখ বাহারুল আলম, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক ও তেরখাদা উপজেলা চেয়ারম্যান সরফুদ্দীন বিশ্বাস বাচ্চু, বটিয়াঘাটা উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আশরাফুল আলম খান, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক ও রূপসা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আলী আকবর শেখ, যুবলীগের কেন্দ্রীয় সদস্য নুরুল ইসলাম বাদশা এবং সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা অজয় সরকার।
কেন্দ্র শেখ হারুনুর রশিদকে মনোনীত করলে ডা. শেখ বাহারুল আলম, সরফুদ্দীন বিশ্বাস বাচ্চু, আশরাফুল আলম খান ও নুরুল ইসলাম বাদশা কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান ও দলীয় আনুগত্য প্রকাশ করে নিজেদের গুটিয়ে নেন। নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন শেখ হারুনুর রশিদসহ আলী আকবর শেখ ও অজয় সরকার। অন্যদিকে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে এম এ খাইয়ুম মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও জমা দেননি।
অন্যদিকে, ১৫টি ওয়ার্ডে ১৫ জন সাধারণ সদস্য পদের বিপরীতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ৭১ প্রার্থী। এ পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন ৭৫ জন। এছাড়া সংরক্ষিত নারী ৫টি ওয়ার্ডের ৫টি পদের বিপরীতে মনোনয়নপত্র সংগ্রহকৃত ১৯ জনই দাখিল করেছেন। এ পদগুলোর প্রার্থীরাও অধিকাংশ আওয়ামী লীগ দলীয় নেতা কর্মী।
খুলনা জেলা পরিষদ নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচনের মাঠে থাকা দুই প্রার্থী সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত তারা মাঠে থাকবেন। তাদের সাথে দলের বড় একটি অংশের নেতা কর্মীদের সমর্থন রয়েছে। দলের সাধারণ নেতা কর্মীরা নেতৃত্বে নতুন মুখ দেখতে চান। তাই তারা প্রার্থী হয়েছেন।
খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদ্য সাবেক জেলা পরিষদ প্রশাসক শেখ হারুনুর রশিদ বলেছেন, তিনি দীর্ঘদিন দলের একজন নিবেদিত কর্মী তা সকলেই জানেন। খুলনার সার্বিক উন্নয়নে তিনি অতীতেও ভূমিকা রেখেছেন, আগামীতেও রাখতে চান। তাই তিনি প্রার্থী হয়েছেন। কেন্দ্র তার ওপর ভরসা রেখেছে বলেই তাকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। ভোটাররা তাকে জয়যুক্ত করবেন বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
চেয়ারম্যান প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক ও রূপসা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আলী আকবর শেখ বলেন, তিনি রূপসা উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এলাকার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। দলের জন্য তিনি নিবেদিত। তিনি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে জয়ী হবেন বলে প্রত্যাশা করছেন। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে তিনি খুলনার উন্নয়নে আরো বেশি কাজ করতে পারবেন।
অপরদিকে আরেক প্রার্থী অজয় সরকার জানিয়েছেন, তিনি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। ভোটারদের সমর্থন তার সাথে রয়েছে। নির্বাচিত হলে তিনি জেলার সামগ্রিক উন্নয়নে কাজ করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এদিকে, নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত না থাকলেও ৯৭০ জন ভোটারের একটি অংশ তাদের সমর্থিত। খুলনার একটি সিটি করপোরেশনের ৩১টি ওয়ার্ড, দুটি পৌরসভা, ৯ উপজেলার ৬৮ ইউনিয়নের মোট ৯৭০ ভোটারের মধ্যে আওয়ামী লীগ সমর্থিতদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। কেন্দ্র মনোনীত প্রার্থীর বাইরে প্রার্থী থাকায় ভোটের হিসাব স্বাভাবিকভাবেই এলোমেলো হওয়ার আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, আওয়ামী ঘরানার বাইরে যে সব ভোটার রয়েছেন, তাদের ভোট আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর দিকে নাও যেতে পারে। আবার অন্য যে দুজন দাঁড়িয়েছেন তাদের হাতে বেশ কিছু ভোট রয়েছে।
অপরদিকে, সাধারণ ও সংরক্ষিত সদস্য প্রার্থীদের বেলায়ও একই অবস্থা বিরাজ করছে। মোট ২০টি সদস্য পদে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ৯০ প্রার্থী। এদের মধ্যে কয়েকজন শেষ মুহূর্তে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেবেন এমন আভাস পাওয়া গেলেও মাঠে কোনো পদেই দলীয় একক প্রার্থী থাকছে না এটা অবস্থাদৃষ্টে প্রায় নিশ্চিতভাবে বলা যায়। সেক্ষেত্রে দলীয় বিভেদ আরো প্রকট হয়ে দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা বিভিন্ন মহলের। রাজনৈতিক বোদ্ধাদের তথ্য মতে খুলনায় এবারের নির্বাচনে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদে যেমন তিন প্রার্থীর অবস্থান শক্ত তেমনি, সদস্য ও সাধারণ সদস্য পদে বেশ কিছু আওয়ামী লীগ দলীয় হেভিওয়েট প্রার্থী রয়েছেন নিজেরাই নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে।
খুলনা জেলা পরিষদ নির্বাচনের সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও জেলা সিনিয়র নির্বাচন অফিসার মো. হাবিবুর রহমান জানান, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে। সম্পূর্ণ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ