ঢাকা, রোববার 4 December 2016 ২০ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রাজধানীতে চুক্তিতে চলে ৮৬ ভাগ অটোরিকশা

স্টাফ রিপোর্টার : অটোরিকশায় যাত্রী হয়রানি ও ভাড়া নৈরাজ্য অব্যাহত রয়েছে। সিংহভাগ অটোরিকশা যাত্রীর পছন্দের গন্তব্যে যায় না, মিটারে চলে না, মিটারে গেলেও অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করে। যাত্রীর সঙ্গে অস্বাভাবিক দুর্ব্যবহারসহ নানা অভিযোগ রয়েছে অটোরিকশা চালকদের বিরুদ্ধে। এক লাফে সিএনজি চালিত অটোরিকশার ভাড়া ৬০ ভাগ বাড়ে বছর খানেক আগে। কিন্তু এখনও এই সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায়নি বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি।
যাত্রীকল্যাণ সমিতি জানায়, গত এক মাসব্যাপী বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির গণপরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্য পর্যবেক্ষণ উপকমিটির ১৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল নগরীর যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, কমলাপুর, গুলিস্তান, সদরঘাট, প্রেসক্লাব, পল্টন, ফার্মগেট, কলাবাগান, মহাখালী, মালিবাগ, রামপুরা, মিরপুর-১১, মিরপুর-১২, আগারগাঁও, গাবতলী, জুরাইন রেলগেট, পোস্তগোলা, উত্তরা আবদুল্লাপুর, বাড্ডা, এয়ারপোর্ট, উত্তরা, শ্যামলী, খিলগাঁও, মগবাজার, নাবিস্কো, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর, ডেমরা, ভাটারা, বনানী, কাকলী, গুলশান-১, গুলশান-২, শাহজাদপুর, বারিধারা, শাহবাগ, মতিঝিল, ধানমন্ডি, ঝিগাতলায় প্রায় দুই হাজার ১৬৬টি অটোরিকশার ওপর এক জরিপ পরিচালনা করে। এতে দেখা যায়, এসব এলাকায় চলাচলকারী অটোরিকশার ৮৬ ভাগ চুক্তিতে চলাচল করছে। যারা মিটারে চলে তাদের ৯৭ ভাগ ২০ টাকা থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত মিটারের অতিরিক্ত ভাড়া বা বকশিস দাবি করছে। এছাড়াও যাত্রী পছন্দের গন্তব্যে যেতে রাজি হয় না ৮২ শতাংশ অটোরিকশা।
জরিপকালে যাত্রীর ইচ্ছায় চুক্তিতে চলতে দেখা গেছে ২২ শতাংশ অটোরিকশাকে। সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, মতিঝিল থেকে গুলিস্তান ১০০ টাকা, সদরঘাট থেকে ধানমন্ডি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, কমলাপুর থেকে ফার্মগেট ২০০ টাকা, প্রেসক্লাব থেকে মিরপুর-১২ পর্যন্ত ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা, প্রেসক্লাব থেকে বসুন্ধরা ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, শাহবাগ থেকে কলাবাগান ১৫০ থেকে ২০০ টাকা, সদরঘাট থেকে বাড্ডা ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, মহাখালী থেকে যাত্রাবাড়ী ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, গুলিস্তান থেকে এয়ারপোর্ট ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, বাড্ডা থেকে ধানমন্ডি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা, মোহাম্মদপুর থেকে মতিঝিল ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা, রামপুরা থেকে গুলিস্তান ২৫০ টাকা থেকে ২৮০ টাকা, সদরঘাট থেকে গাবতলী ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা, সদরঘাট থেকে মিরপুর ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা, সদরঘাট থেকে পল্লবী ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা ভাড়ায় চুক্তিতে চলতে দেখা গেছে। অথচ এসব পথে মিটারে যাতায়াত করলে কোনো কোনো গন্তব্যে এসব চুক্তিকৃত ভাড়ার ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়ায় যাত্রীরা যাতায়াত করতে পারতো।
এছাড়াও পর্যবেক্ষণকালে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ রোডে, মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ থেকে তিন রাস্তার মোড়, খিলগাঁও জোড়া পুকুর থেকে খিলগাঁও খেলার মাঠ, ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার থেকে নন্দীপাড়া ব্রিজ, কেরানীগঞ্জে ইকুরিয়া থেকে নয়াবাজার, জুরাইন রেলগেট থেকে হাসনাবাদ, পোস্তগোলা থেকে ডায়না সিনেমা হলের সামনে, পোস্তগোলা থেকে নারায়ণগঞ্জ রোডের মুখে রাজাবাড়ী, যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা, উত্তরা আবদুল্লাহপুর, গাবতলী বেড়িবাঁধ রোড, মিরপুর মাজার রোড, মিরপুর-১২ থেকে পল্লবী, গুলশান নয়াবাজার থেকে বনানী কাকলি ইত্যাদি রোডে গাজীপুর জেলা, ঢাকা জেলা, নারায়ণগঞ্জ জেলা, নরসিংদী জেলা ও মুন্সীগঞ্জ জেলা নিবন্ধিত অটোরিকশা অবৈধভাবে প্রবেশ করে চুক্তিতে ও শেয়ারে যাত্রী বহন করছে।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ঢাকা মহানগরীতে চলাচলরত প্রায় ১৪ হাজার বাণিজ্যিক অটোরিকশার সাথে পাল্লা দিয়ে অটোরিকশার চাহিদা ও সংকটকে কাজে লাগিয়ে চলাচল করছে ৪০৫০টি ঢাকা জেলার নিবন্ধিত প্রাইভেট অটোরিকশা। এর মধ্যে ১৫৪৬টি প্রাইভেট অটোরিকশা ভাড়ায় যাত্রী বহনে বাধা না দেয়ার জন্য হাইকোর্টের নির্দেশনা রয়েছে।
এছাড়াও গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী হতে নিবন্ধিত প্রায় ৫০০০ অবৈধ বাণিজ্যিক অটোরিকশা, ঢাকা জেলায় নিবন্ধিত বাণিজ্যিক নাম্বারধারী প্রায় ৬০০০ অবৈধ অটোরিকশা। এসব অটোরিকশা পারমিট ও নীতিমালার শর্ত লঙ্ঘন করে প্রাইভেট ও বাণিজ্যিক অটোরিকশা মিটারবিহীন চুক্তিতে চলাচল করছে এবং বাণিজ্যিকভাবে যাত্রী বহন করছে।
যাত্রীকল্যাণ সমিতি জানায়, ঢাকা মহানগরীতে প্রতিদিন বৈধ-অবৈধ মিলে প্রায় ২৯ হাজার অটোরিকশা চলাচল করছে। এসব অটোরিকশার সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৫৬ শতাংশ মিটারবিহীন চলাচল করার কারণে বৈধ বাণিজ্যিক অটোরিকশাগুলো মিটারে চালাতে আগ্রহী নন। পর্যবেক্ষণকালে আরও জানা গেছে, কতিপয় অসাধু দুর্নীতিবাজ পুলিশ সার্জেন্ট, টিআই, পিআই, সাংবাদিকের নামে ১৫ হাজার ৫০টি অটোরিকশা ঢাকা মহানগরীতে বছরের পর বছর অবৈধভাবে রাস্তায় চলাচলের কারণে সরকার নানাভাবে চেষ্টা করেও এই সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বার বার ব্যর্থ হচ্ছে।
জানা গেছে প্রতিটি অবৈধ অটোরিকশা নগরীতে চলাচলের জন্য এসব পুলিশ সার্জেন্ট, টিআই, পিআই ও সাংবাদিককে প্রতিটি অটোরিকশা থেকে প্রতি মাসে আট হাজার টাকা হারে মাসিক চাঁদা দিতে হয়। এতে করে এই ১৫ হাজার অবৈধ অটোরিকশায় প্রতি মাসে প্রায় ১২ কোটি চার লাখ টাকা হিসেবে বছরে ১৪৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা অবৈধ লেনদেন এই সেক্টরের সুশাসন প্রতিষ্ঠায় প্রধান প্রতিবন্ধকতা বলে পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
পর্যবেক্ষণে আরও জানা গেছে, প্রতিটি অটোরিকশার সরকার নির্ধারিত জমা ৯০০ টাকার হলেও সিংহভাগ মালিক এক হাতে বা এক চালক দিয়ে দৈনিক ১০৫০ টাকা এবং দুই শিফটে বা দুইজন চালক দিয়ে দুই বেলায় দৈনিক ১৪০০ টাকা থেকে ১৮০০ টাকা পর্যন্ত জমা আদায় করছে। এছাড়াও ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে এসব অটোরিকশায় যাত্রী উঠাতে ১০/২০ টাকা হারে চাঁদা দিতে হয় বলে পর্যবেক্ষকদের কাছে অভিযোগ করেছে চালকরা। অভিযোগ অনুযায়ী গুলিস্তান সার্জেন্ট আহাদ পুলিশ বক্সের বিপরীতে ঢাকা ট্রেড সেন্টারের সামনে, গোলাপ শাহ মাজার, বায়তুল মোকাররম  দক্ষিণ গেইট, সদরঘাট, নয়াবাজার ইউসুফ মার্কেট, পোস্তগোলা ১নং বুড়িগঙ্গা সেতুর ঢাল, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ইজারাদাররা প্রতি ট্রিপে যাত্রী নিতে ১০ টাকা হারে ইজারা আদায় করছে। এছাড়াও শনিরআখড়া, যাত্রাবাড়ী, শহীদ ফারুক সড়ক, রায়েরবাগ এলাকায় একটি শ্রমিক ইউনিয়নের নামে প্রতি ট্রিপে ১০ টাকা হারে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে রেলওয়ের ইজারাদাররা প্রতি ট্রিপে ২০ টাকা হারে চাঁদা আদায় করছে। বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে একটি শ্রমিক ইউনিয়নের নামে প্রতি ট্রিপে ১০ টাকা হারে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। গাবতলী বিউটি সিনেমা হলের সামনে থেকে আমিন বাজার ব্রিজের ঢাল পর্যন্ত যেকোনো স্পটে অটোরিকশায় যাত্রী নিলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ইজারার নামে প্রতি ট্রিপে ১০ টাকা হারে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা চিড়িয়াখানা এলাকায় প্রতিটি অটোরিকশায় যাত্রী উঠালে বা নামালে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের ইজারার নামে প্রতি ট্রিপে ১০ টাকা হারে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। সরকার কর্তৃক অটোরিকশার ভাড়া ও জমা নির্ধারণী ব্যয় বিশ্লেষণে মালিকের ৯০০ টাকা দৈনিক জমার মধ্যে ৪৮ টাকা গ্যারেজ ভাড়া সংযুক্ত থাকলেও গ্যারেজ মালিকরা প্রতিটি অটোরিকশা থেকে দৈনিক ৫০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত গ্যারেজ ভাড়ার নামে চাঁদা আদায় করছে। এইভাবে বছরে প্রায় ৩০ কোটি ২৪ লক্ষ টাকা গ্যারেজ মালিকরা চালকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত আদায় করছে। এতে করে চালকরা চুক্তিতে অটোরিকশা চালাতে এবং যাত্রীর কাছ থেকে মিটারের অতিরিক্ত ভাড়া বা বকশিস দাবি করতে বাধ্য হচ্ছে বলে পর্যবেক্ষকদের জানিয়েছে।
পর্যবেক্ষণকালে আরও দেখা গেছে, ঢাকা মহানগরীতে চলাচলকারী অটোরিকশা চালকের প্রায়ই ৬২ ভাগের বৈধ লাইসেন্স থাকলেও ২২ ভাগ চালক ভুয়া লাইসেন্স দিয়ে অটোরিকশা চালিয়ে থাকে। তবে ১৬ ভাগ চালকের হাতে বৈধ বা অবৈধ কোনো লাইসেন্স নেই। তারা বছরের পর বছর সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে অটোরিকশা চালায় বলে পর্যবেক্ষকদের কাছে জানিয়েছে।
প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। এতে বক্তব্য দেন সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক হুমায়ুন কবির হিরু, বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহবুব আলম তালুকদার, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন একাংশের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কুদ্দুস আফ্রাদ,সহ-সভাপতি আতিকুর রহমান চৌধুরী, নাগরিক সংহতির সভাপতি শরিফুজ্জামান শরিফ, ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি মো. বরকত উল্লাহ ভুলু, ঢাকা অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হানিফ খোকন প্রমুখ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ