ঢাকা, সোমবার 5 December 2016 ২১ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

শিল্প-কারখানায় তীব্র হচ্ছে গ্যাস সংকট

কামাল উদ্দিন সুমন : গ্যাসের চাপ বৃদ্ধির পরিবর্তে সংকট আরো তীব্র হচ্ছে রাজধানীর আশেপাশের শিল্প এলাকায়। ফলে আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দুটি গ্যাস কম্প্রেসার কোন কাজে আসছে না।  নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরসহ আশেপাশের শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ বাড়ানোর জন্য ২০১৪ সালের শেষ দিকে  ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় দুটি কম্প্রেসার স্থাপন করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ দিন ধরে শিল্পাঞ্চল এলাকার কারখানাগুলোতে গ্যাস সংকটের পাশাপাশি গ্যাসের চাপ খুবই কম ছিল। এ থেকে উত্তরণের জন্য দুই কম্প্রেসার বসানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কথা ছিল কম্প্রেসার দুটি স্থাপন হলে জাতীয় সঞ্চালন লাইনে গ্যাসের চাপ বাড়বে, শিল্প-কারখানাও কাক্সিক্ষত চাপে গ্যাস পাবে। দীর্ঘ দুই বছর পর দেখা গেলো ঠিক উল্টো চিত্র। কম্প্রেসার স্থাপনের পরও স্বাভাবিক চাপে গ্যাস পাচ্ছে না গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, আশুগঞ্জ ও সাভার এলাকার শিল্প-কারখানা। ফলে বেশিরভাগ সময়ই বন্ধ রাখতে হচ্ছে এসব এলাকার অধিকাংশ কারখানার বয়লার। যদিও কম্প্রেসার স্থাপনে ব্যয় হয়েছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা।
সূত্র জানায়, সাভার, গাজীপুর, কোনাবাড়ী ও সফিপুর এলাকায় পোশাক ও বস্ত্র কারখানা রয়েছে তিন হাজারের মতো। এছাড়া নারায়ণগঞ্জে রয়েছে প্রায় দেশ হাজার ছোট-বড় কারখানা। এসব কারখানার ডায়িং, ওয়াশিং ও আয়রনিংয়ের কাজে বয়লার চালু রাখতে হয়। স্বাভাবিক মাত্রায় এসব বয়লার চালু রাখতে সঞ্চালন লাইনে গ্যাসের চাপ থাকতে হয় ৭০০ থেকে এক হাজার পিএসআই (পাউন্ড পার স্কয়ার ইঞ্চি)। এর বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৫০০-৬০০ পিএসআই। কখনো আবার তারও নিচে। এর প্রভাব পড়ছে কারখানাগুলোর উৎপাদনে।
নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন বস্ত্র ও পোশাক কারখানায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, এলাকার প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই গ্যাসের চাপজনিত সমস্যায় ভুগছে। একই চিত্র গাজীপুরে। গাজীপুরের এশটি গার্মেন্টস মালিক বলেন, গ্যাসের মেইন লাইনে ১৫০ থেকে ২৫০ পিএসআইয়ের মতো চাপ থাকে। কখনো তা ৮-১০ পিএসআইতেও নেমে আসে। এ অবস্থা প্রতিদিন অন্তত  ১০-১২ ঘণ্টা থাকে। এতে উৎপাদন চরমভাবে বিঘিœত  হচ্ছে।
গ্যাসের চাপ না থাকার কারণে কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে বলে ঐ গার্মেন্টস মালিক বলেন, কোনো কোনো সময় গ্যাসের চাপ এক বা দুই পিএসআইয়ে নেমে আসে । উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজন যেখানে ১০-১৫ পিএসআই। বাধ্য হয়ে ঐ এলাকার অনেক সোয়েটার,  টেক্সটাইল ও ওয়াশিং বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ডিজেল জেনারেটর দিয়ে রাতে অনেক গার্মেন্টস ও নিটিং চালালেও তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
মণিপুর গিলাগাছিয়ার এশটি গার্মেন্টসের প্রজেক্ট ম্যানেজার অহিদুল ইসলাম বলেন, গ্যাসের চাপ প্রায়ই ভারসাম্যহীনভাবে ওঠানামা করে। এতে শিল্প-কারখানা চালু রাখা যায় না। সময়মতো পণ্য সরবরাহ দিতে না পারায় নতুন করে অর্ডার নিতে পারছি না।
বিষয়টি নিয়ে উদ্যোক্তারা একাধিকবার সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা করেও কার্যকর সুরাহা হয়নি। পরিস্থিতি সামাল দিতে কোনো কোনো উদ্যোক্তা শ্রম আইন অনুযায়ী কারখানা সাময়িক বন্ধ রাখারও চিন্তা করছেন বলে জানিয়েছেন অনেক শিল্পোদ্যোক্তা।
সূত্র জানায়, দেশের পূর্বাঞ্চলের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদিত গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয় গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানির ম্যানিফোল্ড স্টেশনে। এখান থেকে পাইপলাইনে তা ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। গ্যাস উত্তোলনের পর এক হাজার পিএসআই চাপে গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর কথা থাকলেও সরবরাহ লাইনে বিপরিতমুখী শক্তি ও বাধায় দূরত্ব অনুসারে এ চাপ ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এভাবে চাপ কমার ফলে গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটে।
জানা গেছে, গ্যাসের চাপ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০৬ সালে আশুগঞ্জ ও এলেঙ্গায় দুটি গ্যাস কম্প্রেসার স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়। ওই সময় থেকেই কম্প্রেসার স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল)। পরে ২০১১ সালের ২১ অক্টোবর কোরিয়ার হুন্দাই ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে জিটিসিএল। ২০১৪ সালে কম্প্রেসার স্থাপনের কাজ শেষ হয়। আশুগঞ্জের কম্প্রেসারটি চালু হলেও এলেঙ্গারটি এখনো অলস পড়ে আছে। কোনো কাজেই আসছে না ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত এ কম্প্রেসার। ফলে গ্যাসের চাপও প্রায় আগের মতোই রয়েছে।
জিটিসিএল সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালে আশুগঞ্জ পয়েন্টে গ্যাসের চাপ ছিল ৬০০-৭০০ পিএসআই। কম্প্রেসার স্থাপনের পর তা এক হাজার পিএসআইয়ে দাঁড়াবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। যদিও ঢাকা ও আশপাশ এলাকায় এ চাপ ৫০০-৬০০ এবং খুলনা-রাজশাহী অঞ্চলে ৪০০ পিএসআই বা তারও নিচে রয়েছে। জিটিসিএলের কম্প্রেসার থেকে ফল না পাওয়ার কারণ হিসেবে যথাযথ স্থান নির্বাচনে জরিপ পরিচালনা বা পর্যালোচনা না করার বিষয়টিকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি স্থাপিত কম্প্রেসারের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন তারা।
গ্যাসের চাপ না বাড়লেও কম্প্রেসার স্থাপনে ব্যয় বেড়েছে ঠিকই। আশুগঞ্জ ও এলেঙ্গায় কম্প্রেসার স্থাপনে প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩০৪ কোটি টাকা। অর্থায়নসহ নানা জটিলতায় ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকায়। প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করেছে সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. দিল আফরোজা বেগম বলেন, সুনির্দিষ্ট স্থানে ও মানসম্পন্ন কম্প্রেসার না বসালে কম্প্রেসার থেকে সুফল পাওয়া দুরূহ। এলেঙ্গা ও আশুগঞ্জেও এমনটি হয়ে থাকতে পারে।
 পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান ইশতিয়াক আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, চাহিদা না থাকায় এলেঙ্গায় স্থাপিত কম্প্রেসার কাজে লাগছে না। আশুগঞ্জেরটি খুবই কাজে লাগছে। চাপ নিয়ে যে ধরনের সমস্যার তথ্য জানা যায়, তা মূলত গ্যাসের অপ্রতুলতার কারণে। তার পরও সমস্যা কমিয়ে আনতে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ