ঢাকা, সোমবার 5 December 2016 ২১ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মানুষের চিরায়ত কর্তব্য

দ্বন্দ্বমুখর পৃথিবী যতই উগ্র ও উত্তপ্ত হোক না কেন, মানুষ আসলে শান্তি, স্থিতি ও নিরাপত্তা চায়। যদিও কতিপয় মাথামোটা ও রগচটা নেতার কারণে দ্বন্দ্ব-সংঘাত-যুদ্ধ লেগে যায়, তথাপি সাধারণ মানুষ শান্তিরই পক্ষে। এ কারণেই হিটলার বা স্ট্যালিন প্রমুখ উগ্রদের মানুষ শ্রদ্ধার বদলে ঘৃণাই করে। এখনো যারা যুদ্ধবাজ ও হিং¯্র বলে পরিচিত, তাদেরকে নিন্দা জানায়। কারণ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত-যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের। যুদ্ধবাজ নেতারা মানুষকে রক্ত ও মৃত্যুর মধ্যে ফেলে দিয়ে  লম্ফঝম্প করলেও সাধারণ মানুষকে বিপদ থেকে বাঁচাতে পারে না। ফলে সাধারণ মানুষ উগ্র, যুদ্ধবাজকে সন্দেহ ও ঘৃণা করে।

পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা শুরু হলে দুই দেশের সাধারণ মানুষই আতঙ্কিত হয়। মানুষ তখন যুদ্ধের বদলে শান্তি স্থাপনের জন্য চাপ দেয়। যুদ্ধবাজ নেতারা বাধ্য হন শান্তি ও সংলাপের পথে অগ্রসর হতে। সাম্প্রতিক আমেরিকাতেও দেখা যাচ্ছে, জনগণের চাপ ও প্রতিবাদের মুখে উগ্রপন্থী বলে পরিচিত নেতারা লেজ গুটিয়ে আনেন। যত হুঙ্কার ও হুমকী দিয়েছিলেন, সেগুলোকে হজম করে নিয়মের পথে আসতে বাধ্য হন তারা। ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, জনগণের ঐকান্তিক চাপে বহু উগ্র ও যুদ্ধবাজ নেতা চুপ থাকতে বাধ্য হয়েছেন।

আবার এর বিপরীত চিত্রও দেখা গেছে। বহু তথাকথিত শান্তিবাদী নেতা বা নেত্রী অকস্মাৎ রুদ্রমূর্তি ধারণ করে উগ্র ও সহিংস চরিত্রে আবির্ভূত হয়ে মানুষের রক্তে নিজের হাত ভিজিয়েছেন। অং সান সূচি নামক যে মহিলা কারাভোগ ও গণতন্ত্রের আন্দোলনের কারণে একদা নন্দিত ছিলেন, এখন তার অধঃপতন খুবই মর্মান্তিক হয়েছে। নিজের দেশের একটি জনগোষ্ঠীকে নিধনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। জাতিগত হিংসার কারণে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী বর্মী জনগোষ্ঠীর তা-বকে তিনি সমর্থন করছেন সংখ্যালঘু মুসলিম-রোহিঙ্গা গণগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে। আধুনিক বিশ্বে বর্বরতম গণহত্যা, নিপীড়ন ও নির্যাতনের তিনি হয়েছেন নেত্রী। একজন নারী হয়ে এবং তথাকথিত গণতান্ত্রিক হয়ে তিনি কেমনভাবে ধর্ষণ, নারী ও শিশু হত্যা, পুড়িয়ে মানুষ মারার কাজ করছেন, সেটাই এক প্রশ্ন। শুধু সমর্থনই নয়, তার সরকার হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্ব দিচ্ছে। মানুষকে মারছে এবং দেশ থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছে। পৃথিবীর ইতিহাসের স্বৈরিণী নারীদের মতো তাকেও ঘৃণা ও নিন্দার মালায় নিগৃহীত হতে হবে, এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। অমানবিকতার মাধ্যমে কেউ মহত্ত্ব অর্জন করতে পারবে না।

প্রবন্ধের শুরুতে যে কথা বলা হয়েছে যে, উগ্র ও যুদ্ধবাজরা নিবৃত্ত হয় জনগণের চাপে এবং জনগণ মূলত শান্তির পক্ষে; বার্মা বা মিয়ানমারের ক্ষেত্রে এ কথাটি সত্য বলেও মনে হচ্ছে না। কারণ আরাকান অঞ্চলের গণহত্যা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সে দেশের জনগণ প্রতিবাদ করছে না। সোৎসাহে গণনির্যাতনে অংশ নিচ্ছে এবং সমর্থন দিচ্ছে। রাষ্ট্র হিসাবে বার্মা এমনিতেই একটি রহস্যময় দেশ। গণতন্ত্র ও মানবিকতা সেখানে সুদূরপরাহত। তাদের এই গণবিরোধী কার্যক্রম বিশ্বের মানচিত্রে দেশটির ললাটে আরো কালিমাই লেপন করবে।

একই সঙ্গে লক্ষণীয় বিষয় হলো, বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে প্রাণ রক্ষার্থে আগত আরাকানি নারী-শিশুদের ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। জীবন বাঁচাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকা বা পদব্রজে নারী ও শিশুদের ফিরিয়ে দেয়ার খবরও আমরা পত্রিকায় পড়েছি। আবার এমন খবরও আমরা পড়েছি যে, সংঘাতময় সিরিয়ার শরণার্থীদের স্বাগত জানাতে ইউরোপের বহুদেশ সীমান্ত খুলে দিয়েছে। বহু মানুষ ও পরিবার তাদের ঘরে আশ্রয়প্রার্থীদের জায়গা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। অতএব মানুষের ভূমিকা কখনোই গৌণ নয় প্রধান।

মানুষ বলতে যদিও একজনকে বুঝানো হয়, তথাপি মানুষ মানে প্রাণীজগতের একটি প্রজাতি। মানুষ জাতি ও রাজনৈতিক পরিচয়ের পরেও একটি মহামানবজাতির অংশ। বিশ্বের সকল মানুষই তার স্বজন। সমগোত্রীয়। এমন বৈজ্ঞানিক সত্য জানার পরেও মানুষে মানুষে মৈত্রী সব সময়  সম্ভব হয় না। প্রধানত রাজনৈতিক ও জাতিগত হিংসার কারণে মানব সমাজের একটি অংশ আরেকটি অংশকে হনন করতে চায়। শক্তি ও ক্ষমতার বলে হত্যা ও নিধনের চেষ্টা চালায়। রাজনৈতিক ও মতাদর্শগত পার্থক্যের কারণে ফাঁসি দেয়, জেলে পাঠায়, দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়। এমনটি যে কেবল আদি বা মধ্যযুগে হয়েছে, তা নয়, অতি আধুনিক বর্তমানকালেও বিশ্বের দেশে দেশে ঘটছে। আমাদের চারপাশে এবং চোখের সামনেই ঘটছে। অথচ এমনটি ঘটা মোটেও উচিত নয়; এমনটি ঘটার কথাও নয়। কিন্তু উগ্র রাজনীতিবিদগণ প্রতিনিয়ত হিংসা, বিদ্বেষ প্রচার করে জনগণকে বিষাক্ত করে ফেলে। জনগণকে উগ্রতার দিকে ঠেলে দেয়। মানুষকে বাধ্য করে প্রতিপক্ষ নিধনে। এসবই করা হয় এমন একটি রাজনৈতিক ফন্দিতে যে মানুষ ন্যায়-অন্যায় বোধ হারায়। হত্যা ও নিধনকেই মনে করে বৈধ। অপরাধকে মনে করে পুণ্য। এক বারও চোখ খুলে প্রকৃত ঘটনাটি দেখতে চায় না বা দেখতে চাইলেও কর্তৃপক্ষ মানুষকে সব দেখতে বা জানতে দিতে চায় না। একটা প্রচ্ছন্ন গুজব, প্রচারণার প্রবল আচ্ছন্নতা ইত্যাদির দ্বারা এমনই একটি পরিবেশ আরোপ করা হয় যে, যুক্তি বোকা ও বোবা হয়ে যায় আবেগের তীব্রতার সামনে। নৈতিকতার কথা বলতে ভয় পায়। ন্যায়-অন্যায় বোধ বলতে কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। এক প্রবল উন্মাদনায় সবাই তখন উগ্রতারই অনুসরণ করে। মানুষের আর্তনাদ শুনতে পায় না। সত্যের পরাজয় দেখতে পায় না। এ রকম অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতি ও পরিবেশে প্রতিপক্ষের ক্ষুদ্র জাতি, দল বা ব্যক্তিকে নিধন ও নির্মূল করার উৎসব চলে। 

এ রকম উগ্রতার বিকাশ, পৃষ্ঠপোষকতা ও চর্চার কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ আছে। প্রথমত ও প্রধানত যে কারণটির কথা বলা যায়, তা হলো, নিজের অপরাধ ও অপকর্মকে আড়াল করার প্রবণতা। মানুষের দৃষ্টি ও আগ্রহ সরিয়ে দেয়ার জন্য এমন উগ্রতা ও সেনসেশন তৈরি করা হয়। এর ফলে দুর্নীতি, অপকর্ম, স্বৈরতা চাপা পড়ে। মানুষ যুক্তিবাদী মনে নানা বিষয় ও কার্যক্রম বিচার-বিশ্লেষণ করার সুযোগ পায় না। সবাই তখন লেলিয়ে দেয়া ইস্যুর পেছনে পাগলের মতো ধাওয়া করে। হিটলার তার স্বৈরতা ও একনায়কত্ব কায়েমের প্রয়োজনে প্রবল জাতিগত বিদ্বেষ সৃষ্টি করেছিল। জার্মান জাতি উন্মাদের মতো প্রতিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে নিধনযজ্ঞে লিপ্ত হয়েছিল। হিটলারের কুকর্মের দিকে নজর দেয়ার সুযোগ পায় নি। তলে তলে হিটলার যে দানবের মতো পুরো দেশ ও জাতিকে গ্রাস করছে এবং সমগ্র বিশ্বকে একটি ভয়াবহ বিপদের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে, সেটা অনুধাবণ করার মতো পরিস্থিতি ছিল না; মানুষের মানসিকতাও ঠা-া মাথায় ভাবার স্তরে ছিল না। একই কাণ্ড করেছিল স্বৈরশাসক স্ট্যালিন। রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের উন্মাদনায় মানুষকে প্রচ-ভাবে ক্ষেপিয়ে দেয়া হয়েছিল। হাজার হাজার মানুষকে নির্যাতন শিবিরে পাঠিয়ে হত্যা করা হয়েছিল সমাজতন্ত্রের শত্রু নাম দিয়ে। বিরুদ্ধবাদী লিও ট্রটস্কিকে দূরদেশে হাতুড়ি দিয়ে মাথা থেঁতলে মেরেছিল ভাড়া করা হন্তারক পাঠিয়ে। তাৎক্ষণিকভাবে মানুষ ভেবেছিল সব কিছু ভালোর জন্যই করা হচ্ছে। মানুষের মধ্যে এমনই একটি বোধ ও ধারণাই প্রচার করেছিল স্বৈরশাসক। কিন্তু অচীরেই দেখা গেল, রাশিয়ায় মানুষ না খেয়ে মারা যাচ্ছে। আমলা ও সেনাপতিরা ফুলে-ফেঁপে ওঠছে এবং সমাজতন্ত্রের নাম ভাঙিয়ে স্ট্যালিন পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো যথা, চেকোস্লাভাকিয়া, হাঙেরি, বুলগেরিয়া ইত্যাদিতে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দখল করে নিয়েছে। প্রবল অগণতান্ত্রিক ও অমানবিক কাজকেও এক ধরনের উন্মাদনার মোড়কে চালিয়ে দেয়া হয়েছিল। অতএব মানুষ সাময়িকভাবে বোধ ও বিবেচনা শক্তি হারিয়েছিল এবং হত্যা-নির্যাতন, খুন-গুম, প্রতিপক্ষ নিধনকে মনে করেছিল বৈধ ও যৌক্তিক। পরবর্তীতে উত্তেজনা থিতিয়ে এলে সত্য উদ্ভাসিত হয়। স্ট্যালিন স্বৈরতন্ত্রের প্রয়োজনে অন্যায়ভাবে বহুজনকে নিধন করেছে মানুষের ভাবাবেগকে কৌশলে প্রভাবিত করে। 

হিটলার বা স্ট্যালিনের মতো এমন কুকর্ম এখনো চলছে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে। বহু শাসক সে পথ খুবই কৌশলে অবলম্বনও করছে। প্রতিপক্ষের ব্যক্তি, দল ও মানুষকে মারা হচ্ছে মানুষকে ভুল বুঝিয়ে বা ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে। ভুল ভাবে প্রভাবিত করার রাজনীতির আসল লক্ষ্য অবশ্যই মহৎ নয়, ব্যক্তি-দল বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের কুমতলবে পূর্ণ। যুক্তির বদলে জাতিগত, ধর্মগত, রাজনৈতিক আবেগগত উন্মাদনা সৃষ্টি গণতান্ত্রিক সুশাসনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। বরং সংখ্যালঘু বা ভিন্নমতের মানুষ ও দলকে নিধনের একটি বহু-ব্যবহৃত ও বহু-চর্চিত অপকৌশল মাত্র। এই কৌশল অবশ্যই নিন্দনীয় এবং অকল্যাণকর। এই কৌশল কখনোই স্থায়ীভাবে কাজে লাগে না। সাময়িক ফায়দা এনে দেয় কুশাসকদের। মানুষের মানবিক চোখ এবং অন্তর্গত বিবেক জাগ্রত হলে পুরো কৌশলটিই পরাজিত হয়। মানুষ যখন দেখতে পায় তথাকথিত গণতন্ত্র, উন্নয়ন ইত্যাদি আসলে ছিল বাগাড়ম্বর এবং মিথ্যাচার, তখন কৌশলী স্বৈরশাসকদের পতন ঘটে। মানুষ যখন টের পায় যে, অপকর্ম আড়ালের জন্য আবেগ, উচ্ছ্বাস ও উন্মাদনা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং প্রতিপক্ষকে অন্যায়ভাবে নিধন করা হচ্ছে, তখন রুখে দাঁড়ায়। মানুষ যে আসলেই শান্তি চায়, আইন চায়, নীতি চায়, সত্য চায় এবং দ্বন্দ্ব-সংঘাত-হানাহানি ও অন্যায় আক্রমণকারী হতে চায় না; এটাই পরম সত্য। মানুষের এই চরম মানবিক শুভবোধের প্রতিই শেষ পর্যন্ত আস্থা রাখতে হয়। মানুষের শুভবোধের জাগরণের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। কারণ শেষ পরিণামে মানুষই প্রবল বিক্রমে অন্যায়, অবিচার ও স্বৈরতার অবসান সাধন করে। মানুষই মানুষের মুখে হাসি ফুটায়। 

ঐশ্বরিক বিধান হিসাবে পবিত্র কোরআনেও বলা হয়েছে, আগে নিজের ভাগ্য নিজেকে বদলাতে। ভালো ও কল্যাণের দিকে ভাগ্য বদলের কাজটিও তো মানুষকেই করতে হবে। অতএব বিপণœ পরিস্থিতিতে মানুষকে হতাশার দুষ্টচক্র ছেড়ে আশাবাদী পথে ইতিবাচকভাবে জেগে ওঠাই কর্তব্য। এই কর্তব্য-কর্ম পালনের মাধ্যমেই বর্তমানের দুঃখ ও বিরূপতার মোচন হয় এবং নির্মিত হয় কল্যাণময় ভবিষ্যত। এটাই মানব সভ্যতার পরীক্ষিত শিক্ষা। এই অমোঘ সত্য ও ঐতিহাসিক শিক্ষা থেকে বিচ্যুৎ ও বিস্মৃত না হওয়াই মানুষের চিরায়ত কর্তব্য।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ