বুধবার ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১০
Online Edition

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি আলোকিত এক টুকরো গ্রাম

মহিউদ্দিন টিপু: জ্ঞানার্জনের এক অনন্য মাধ্যম হলো লাইব্রেরি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন ছাড়াও মানব সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিকাশের ক্ষেত্রে গ্রন্থাগারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের সমৃদ্ধ গ্রন্থাগারগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার অন্যতম। এই গ্রন্থাগারটি এ অঞ্চলের জ্ঞান বিতরণে রেখে যাচ্ছে অনন্য ভূমিকা। জ্ঞান বিস্তারে এর পূর্ণ ব্যবহার করা যাচ্ছে না কিছু অব্যবস্থাপনার কারণে। ১৯৬৬ সালের নবেম্বর মাসে কয়েকজন কর্মকর্তা নিয়ে গ্রন্থাগারটির যাত্রা শুরু। ভবনের নিচতলায় ১২০০ বর্গ ফুট বিশিষ্ট একটি কক্ষে তখন এর বই সংখ্যা ছিল মাত্র ৩০০টি। পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালে বর্তমান প্রশাসনিক ভবনের (মল্লিক ভবন) দক্ষিণ পার্শ্বে মানবিক ও সমাজ বিজ্ঞানের ওপর ১৪ হাজার বই নিয়ে অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে গ্রন্থাগারটির প্রতিষ্ঠা হয়। এর কিছু সময় পরে অস্থায়ী গ্রন্থাগারকে বর্তমান ভবনে স্থানান্তরিত করা হয়। ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বর মাসে কিছুদিনের জন্য গ্রন্থাগারটি বর্তমান প্রশাসনিক ভবনে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। বর্তমানে ৫৬ হাজার ৭শত বর্গফুট পরিমিত গ্রন্থাগারের অবস্থান হলো কলা অনুষদের দক্ষিণ পার্শ্বে চাকসু ভবনের পূর্ব পার্শ্বে ও দৃষ্টিনন্দন আইটি ভবনের পশ্চিম পার্শ্বে। বর্তমান আধুনিক মোজাইক ফ্লোর বিশিষ্ট গ্রন্থাগারটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তৎকালীন ভিসি আলমগীর মোঃ সিরাজ উদ্দিন ১৯৯০ সালে। গ্রন্থাগার ভবনে কলা, বিজ্ঞান, বাণিজ্য, সমাজবিজ্ঞান, আইন অনুষদের পৃথক পাঠকক্ষ রয়েছে, এই গ্রন্থাগারে দেশী-বিদেশী বই, জার্নাল পর জরিমানা প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার। ১২টি কম্পিউটার ও একটি সার্ভার ও স্থাপন করা হয়। গ্রন্থাগার ভবনে পাঠক-পাঠিকাদের ব্যবহারের সুবিধার্থে পাঠকদের জন্য রয়েছে আলাদা পাঠকক্ষ। এছাড়া সেমিনার সিম্পোজিয়াম এর জন্য একটি আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সমৃদ্ধ মিলনায়তন যাতে বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের বিভিন্ন অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। পাঠকদের সুবিধার্থে এই গ্রন্থাগারটিকে বিভিনন্ন স্তরে ভাগ করা হয়েছে। গ্রান্থাগার ভবনের নিচ তলায় রয়েছে প্রশাসনিক শাখা। গ্রন্থাগারিকের অফিস অ্যাকুইজিশন শাখা, প্রসেসিং শাখা, বাইন্ডিং শাখা, সার্কুলেশন শাখা, এছাড়া নিচ তলায় কলা অনুষদের ছাত্রছাত্রীদের পাঠকক্ষ ছাড়াও রয়েছে অডিটরিয়াম ও দৈনিক পত্রিকা পাঠকক্ষ। গ্রন্থাগার ভবনের প্রথম তলায় রয়েছে বিজ্ঞান, বাণিজ্য, আইন এবং সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের ছাত্রছাত্রীদের পাঠকক্ষ। এর পাশাপাশি এখানে রয়েছে হস্তলিপি ও দু্রাপ্য শাখা। এছাড়া ফটোকপি ও কম্পিউটার ল্যাব রয়েছে এখানে। মোজানীন (দুইটি তলার মধ্যে নিচু একটি তলা) তলার রয়েছে রেফারেন্স শাখা। জার্নাল ও সাময়িকী শাখা। এছাড়া ইন্টারনেট সার্ভিসকক্ষ এবং গবেষণাকক্ষ ও এখানে বিদ্যান। গ্রন্থাগারের সংগৃহীত পাঠসামগ্রীকে ৫ ভাগে ভাগ করা হয়। সেগুলো প্রধান সংগ্রহ, জার্নাল সংগ্রহ রেফারেন্স সংগ্রহ, চবি প্রশাসন থিসিস সংগ্রহ দু্রাপ্য সংগ্রহ। প্রধান সংগ্রহগুলো নিচতলায় এবং প্রথম তলায় বিদ্যমান বিভিন্ন ফেকাল্টির আওতাভুক্ত সব গ্রন্থ এ সংগ্রহশালায় আছে। জার্নাল শাখায় দেশী-বিদেশী সম্প্রতি প্রকাশিত চাহিদা-সাময়িকী ছাড়াও পুরাতন সংখ্যাগুলো বাঁধাই করে ডিডিপি পদ্ধতি অনুসরণ করে সাজিয়ে রাখা হয়। এই শাখায় প্রায় ৩২ হাজার বাঁধাইকৃত সাময়িকী আছে। রেফারেন্স শাখায় রয়েছে গবেষণা রিপোর্ট, বিশ্বকোষ অভিধান, হ্যান্ডবুক, ম্যানুয়েল, পঞ্জিকা, গ্লোব, এনজিও প্রকাশনা, ন্যাড়া, আইএলও ইউনেস্কো, বিশ্বব্যাংক আইএমএফ, ইউনিসেফ বিবিএস, বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা। যেগুলো সাধারণ ছাত্রছাত্রী ছাড়াও পিএইচডি এবং এমফিল ছাত্রছাত্রীদের জন্য সহায়ক। গ্রন্থাগারের দুাপ্য এবং পান্ডুলিপি শাখায় এমন কতগুলো সংগ্রহ আছে যেগুলো প্রাচীন ভূজপত্র, তানপত্র, তুনট কাগজে লেখা। এই শাখায় রয়েছে গবেষকদের গবেষণাকর্মের উপাত্ত হিসেবে চিহ্নিত প্রাচীন পান্ডুলিপি দুর্লভ বই, দলিল, রয়েছে পুঁতি সংগ্রাহক আবদুল সাত্তার চৌধুরী সংগৃহীত পুঁথি, পুস্তক ও পান্ডুলিপি নিয়েই গ্রন্থাগারে প্রথম দু্রাপ্য শাখা খোলা হয়। পরবর্তীতে মুন্সী আবদুল করিম সাহিহ্যবিশারদ প্রদত্ত সংগ্রহ প্রফেসর ড. আবদুল করিম সংগ্রহ (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি) প্রফেসর ড. আবদুল গফুর প্রদত্ত সংগ্রহ, ইবনে গোলাম নবী প্রদত্ত সংগ্রহ, বাবু কাসেম চন্দ্র রক্ষিত প্রদত্ত সংগ্রহ রশীদ আল ফারুকী প্রদত্ত সংগ্রহ, প্রফেসর ড. ভূঁইয়া ইকবাল প্রদত্ত সংগ্রহও এ শাখাকে করেছে সমৃদ্ধ। এই শাখায় আরো রয়েছে হাতে তৈরি তুনট কাগজ তানপাতা ও বাঁশ বন্ডের উপর বাংলা সংস্কৃত, পালি, আরবি, ফার্সি ও উর্দু ভাষায় লেখা ৫৬৫ পান্ডুলিপি। এই গ্রন্থাগারটি এই অঞ্চলের সুনাম বৃদ্ধি করার পাশাপাশি শিক্ষা বিস্তার অনন্যা সাধারণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দু্রাপ্য শাখায় এমন কিছু সংগ্রহ আছে খা বাংলাদেশের অন্য কোন গ্রন্থাগারের সংগ্রহে নেই। এ শাখায় ১৮৭২ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রকাশিত প্রায় সাড়ে তিন হাজার পুরোনো সাময়িকী রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে অঞ্জলি, অনুসন্ধান পূর্ব পাকিস্তান, অগ্রগতি, সীমান্ত, পূরবী পাঞ্জজন্য সাধনা, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পত্রিকা প্রবাসী ভান্ডার প্রতিভা, প্রকৃতি ঢাকা রিভিউ, পূর্ণিমা ছায়াবীথি, বার্তাবহ সাপ্তাহিক এডুকেশন গেজেট, আলো ইসলাম প্রচারক, আল-ইসলাম, ভারতী মার্যাব্রু ইত্যাদি। এই গ্রন্থাগারে রয়েছে সফর আলী, গোলে হরুমুজ খান, গয়াস রচিত ‘বিজয় হামজা' আবদুল নবী রচিত ‘বিজয় হামজা' জিন্নত আলী রচিত ‘মনিউল বেদায়াত' সৈয়দ গাজী রচিত ‘হর গৌড়ির পুঁথি।' হামিদুল্লাহর খাঁ রচিত ‘ধর্ম বিষাদ' পরাগান খাঁর মহাভারত উল্লেখ করার মত। ইতিহাস সাহিত্য, সমাজবিজ্ঞান ধর্ম বিষয়ক প্রায় ৩ হাজার বই ছাড়াও এখানে রয়েছে দুর্লভ কুরআন, হাদীস ফেকাহ শাস্ত্রের পান্ডুলিপি, সেই সাথে ১৯৬৮ সাল থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা বাঁধাই করে সংরক্ষণ করা হয়। এছাড়া ৭শ' রঙ অধিক সিডিও রয়েছে এ সংগ্রহশালায়। পাহাড়ের ভেতর জ্ঞানের এই মহামসমুদ্রকে আরো সমৃদ্ধশালী করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত প্রায় হাজারখানেক প্রকাশনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিদিন প্রকাশিত জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকাগুলো বাঁধাই করে রাখা হয়েছে এই গ্রন্থাগারে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই খাতের বাজেট কমেছে দিন দিন জানালেন এই গ্রন্থগারের প্রধানের দায়িত্বে থাকা এম আবু তাহের। ২০০৬-২০০৭ অর্থ বছরে এক বাজেট রাখা হয়েছে ৩৮ লাখ টাকা। যা প্রয়োজনের তুলনায় ৩ গুণ কম। অতীতে এ গ্রন্থাগারের জন্য ১ কোটি ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে এই খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে জ্ঞানের পথকে প্রসারিত না করে মামলা পরিচালনায় কয়েক লাখ টাকা ব্যয় অযুক্তিপূর্ণ। তাই এখনই উচিত হবে এই খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের কল্যাণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া। লাইব্রেরি সূত্র জানা যায়, ২০০৫ সালে গ্রন্থাগারের জন্য বই ৮ হাজার ৭শ' ৫০টি সাময়িকী (বাঁধাইকৃত) ১ হাজার ২শ'টি থিসিস ১শ' ৫০টি, সিডি রম ১শ' ২০টি, চাঁদার মাধ্যমে স্থানীয় ও বিদেশী প্রায় ৪শ' ৫০টি সাময়িকী সংগ্রহ করা হয়। গ্রন্থাগারিক দৈনিক সংগ্রামকে জানিয়েছেন, বই সংগ্রহকে আরো গতিশীল করার লক্ষ্যে প্রশাসন কর্তৃক বরাদ্দ অর্থ অনুপাত হারে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ বণ্টন করে দেয়া হয়। বিভাগীয় সভাপতিগণ ক্রয় কমিটির মাধ্যমে নগদ মূল্যে স্থানীয় বাজার থেকে তাদের প্রয়োজনীয় বই ক্রয় করে থাকেন। প্রকাশকের নিকট বিদেশে সরাসরি চাঁদা প্রেরণ করে বিদেশী জার্নাল/সাময়িকী সংগ্রহ করা হয়। একই নিয়মে সংগ্রহ করা হয় দেশী প্রকাশনাসমূহ। গ্রন্থাগারিকের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এখানে ৮৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী গ্রন্থাগারের প্রশাসনিক কার্যক্রমসমূহ চালনা করছেন। এর মধ্যে কর্মকর্তা ১০ জন এবং কর্মচারী ৭৬ জন। গ্রন্থাগারের বর্তমান গ্রন্থাগারিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এসএম আবু তাহের। তিনি গত ১ ডিসেম্বর ২০০১ সালে ঐ পদে দায়িত্ব নেন। জানা যায় গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে দশজন গ্রন্থাগারিকের দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে প্রথম প্রতিষ্ঠাতা সহকারী গ্রন্থাগারিক ছিলেন আতাউর রহমান, তিনি গত ৩১ অক্টোবর ১৯৬৬ থেকে ১৬ অক্টোবর ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্বে ছিলেন। সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দুই শিফটে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। গ্রন্থাগারের যাবতীয় প্রতিষ্ঠানিক কাজ-কর্ম সমাধা হয় সংগ্রহ শাখার মাধ্যমে। স্থানীয়, বিদেশী বই এবং সাময়িকী সংগ্রহ করা হয়। বর্তমান চবি গ্রন্থাগারকে আধুনিকায়ন করে কম্পিউটার সিস্টেমের আওতায় আনা হয়েছে। এতে করে বই সংগ্রহ এবং বইয়ের অবস্থান জানার জন্য ছাত্রছাত্রীদের বেশি সময় ব্যয় করতে হয় না। তবে কম্পিউটারে যে বইয়ের সংখ্যা এবং অবস্থান উল্লেখ আছে সে অনুযায়ী বই আলমারীতে না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে ছাত্রছাত্রীদের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ