ঢাকা, সোমবার 5 December 2016 ২১ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

মিয়ানমারে ৪ শিশু সন্তানের সামনেই গলা কেটে হত্যা করা হয় মা-বাবাকে

কামাল হোসেন আজাদ, কক্সবাজার : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মগ সেনাবহিনী ও উগ্রগোষ্ঠি কর্তৃক নৃশংসতার শিকার হচ্ছে নিরীহ মুসলমানরা। নির্মমতা চলছে শিশু সন্তানদের মা-বাবার ওপর। রাখাইন রাজ্যের জামবনিয়া গ্রামে হামলা চালিয়ে ৪ শিশু সন্তানের সামনেই পৈশাচিক কায়দায় একের পর এক মা ও বাবা দু’জনকে গলাকেটে হত্যা করা হয়। উখিয়ার কুতুপালংরোহিঙ্গা বস্তিতে এক আত্মীয়ের বাড়িতে অবস্থান নেয়া মিয়ানমারের বলিবাজার লাগোয়া জামবনিয়া গ্রামের ৪ ভাইবোন শিশু ছমুদা বেগম (১২), রাশেদা (৯) ফারুক (৭) ও ৫ বছরের আয়াছ। এক মাস আগেও তাদের সংসার ছিল পরিপূর্ণ। পিতা-মাতার আদর-মমতায় ভরা সেই সংসারে অভাব ছিল না। কিন্তু মা-বাবা হারিয়ে তারা এখন এতিম। তাদের পিতা জালাল আহমদ ও মা আনোয়ারা বেগমকে মিয়ানমারের সেনারা গলা কেটে হত্যা করেছে। জ্বালিয়ে দিয়েছে বাড়িঘর। গত ৩০ নবেম্বর তাদের দুলাভাইয়ের সঙ্গে ঘুমধুম সীমান্ত পেরিয়ে কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তিতে এসে আশ্রয় নিয়েছে তারা। এতিম এ চার শিশু জানে না তাদের গন্তব্য কোথায়। এখন তাদের চোখেমুখে শুধুই কান্না, শুধু নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে “মা বুঝি আবার ফিরে আসবে!”। সূত্র জানায়, মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও রাখাইন সম্প্রদায়ের বর্বরতা শুরু হওয়ার পর থেকে একের পর এক স্বামী হারা স্ত্রী, সন্তান হারা পিতা, মা হারা  ছেলেসহ অসংখ্য অসহায়, সহায় সম্বলহীন পরিবারের দেখা মিলছে। কিন্তু পিতা-মাতা উভয়কে হারিয়ে এতিম ৪ শিশুর নির্বাক চাহনি ও কান্না অন্য সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। সরজমিনে কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তি পরিদর্শন করতে গিয়ে এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। এ ব্যাপারে তাদের দুলাভাই জেয়ায়ের (২৫) জানান, তারা মিয়ানমারের জামবনিয়া এলাকায় বসবাস করতো, প্রথমদিকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের গ্রামে আক্রমণ না করলেও পরবর্তীতে সেনারা ও রাখাইন যুবকরা মিলে তাদের গ্রামের প্রতিটি ঘরে ঢুকে যুবকদের হত্যা করার পাশাপাশি যুবতীদের পাশবিক নির্যাতন চালায়। আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে বসতভিটাসহ সহায় সম্পত্তি। তিনি আরো জানান, পাশেই শ্বশুরবাড়ি ছিল, মিয়ানমার সেনারা শ্বশুর-শাশুড়িকে গলা কেটে হত্যা করার পর ভয়ে সবকিছু ফেলে রাতের আঁধারে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে চলে এসেছি পরিবারসহ। সঙ্গে নিয়ে আসি ৪ শালা-শালিকে। এখন এদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি, একদিকে অভাব তাড়না, অন্যদিকে শ্বশুর-শাশুড়ির রেখে যাওয়া ৪ এতিম শিশুর যন্ত্রণা। চার এতিম শিশুর মধ্যে কথা হয় ১২ বছরের ছমুদার সঙ্গে। সে জানান, রাতে তারা ভাত খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল এমন সময় মিয়ানমার সেনারা বাবা মাকে ধরে গলাকেটে হত্যা করে। তারপর ছোট ভাইবোনদের নিয়ে আমি দুলাভাইয়ের সঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে রাতের আঁধারে বাংলাদেশে চলে আসি। সেই থেকে কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তির এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। এখনও জানি না কোথায় যাবো, কী করবো ছোট ভাই বোনদের নিয়ে। এদিকে প্রতিদিনই রোহিঙ্গারা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে কোন না কোনভাবেই অনুপ্রবেশ করছে বাংলাদেশে। আশ্রয় নিচ্ছে উখিয়ার কুতুপালং ও টেকনাফের নয়াপাড়া শরণার্থী শিবিরের পাশের রোহিঙ্গা বস্তিতে। বিজিবি অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারাদের পুশব্যাক অব্যাহত রাখলেও নির্যাতনের শিকার সহায় সম্বলহীন রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যাচ্ছে না। তারা বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত পয়েন্টগুলোর জঙ্গলে লুকিয়ে থেকে সুযোগ বুঝে নির্যাতন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। কক্সবাজার ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল ইমরান উল্লাহ সরকার জানান, যেসব এলাকা দিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে সেসব ফাঁকা স্থানগুলোতে বিজিবির নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। তিনি বলেন, যারা ঢুকে পড়ছে (রোহিঙ্গা) তাদের খাদ্য ও মানবিক সেবা দিয়ে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। তাছাড়া সীমান্তে দালালদের ব্যাপারে সতর্কতার মাধ্যমে কঠোর অবস্থানে রয়েছে বিজিবি।

কুতুপালং বস্তিতে স্বজনহারা রোহিঙ্গাদের আর্তনাদে রাতের আকাশ ভারী
উখিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা : মিয়ানমার সেনা ও পুলিশের আগুন অভিযান একটু কমলেও থামেনি পৈশাচিকতা। তাদের বর্বরতার শিকার আরো ১৫ পরিবারের শতাধিক নারী-শিশু গতকাল রোববার ভোর রাতে অনুপ্রবেশ করে কুতুপালং বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছে। বস্তিবাসীর দাবি এখানে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের অধিকাংশ মা-বাবা, ভাই-বোন ও স্বামী-সন্তানহারা। রাত নামলেই এসব স্বজনহারাদের কান্নায় বস্তির পরিবেশ ভারী হয়ে উঠে।
মিয়ানমারের মংডু সিকদারপাড়া থেকে পালিয়ে এসে কুতুপালং বস্তির এ ব্লকের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলমের ঝুপড়ি আশ্রিত স্বামী-সন্তান হারা বয়োবৃদ্ধ জুহুরা খাতুন (৬০) জানান, মগ সেনারা তার ছেলে আবু তৈয়ব (২২)কে নির্মম নির্যাতন করে গুলী করে হত্যা করেছে। চোখের সামনে তার মেয়ে রওশন বানু (৩০) ও বেগম বাহার (২৬)কে গণধর্ষণ শেষে নির্মমভাবে হত্যা করে। যাওয়ার সময় তারা বসতবাড়িটি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। এ নির্মম পৈশাচিকতার বর্ণনা দিয়ে জুহুরা খাতুন বারবার কেঁদে উঠছিল। সে জানায়, দিনের বেলায় কোনরকম সময় কাটালেও রাতে সে ভয়াবহ দৃশ্য চোখে ভেসে উঠে। যে কারণে কান্না থামাতে পারি না।
মংডু পোয়াখালী ছালিপাড়া থেকে আসা ইলিয়াছ (৩৫) জানায়, সেখানকার সেনাবাহিনী ও পুলিশ তার পিতা আব্দুস শুক্কুরকে জবাই করে হত্যা করেছে। এ সময় তার স্ত্রী রহিমা (২৫)কে লক্ষ্য করে গুলী করলে ভাগ্যক্রমে সে বেঁচে যায়। গুলীবিদ্ধ স্ত্রীকে নিয়ে অনেক কষ্টে এপারে চলে এসেছি। সে আরো জানায়, তার পাশের বাড়িতে থাকা বোন, তার স্বামী ও ছেলে মেয়েসহ ৫ জনকে সেনাবাহিনী ও পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। তারা বেঁেচ আছে কিনা জানি না।
শফিউল আলম (৩৫), স্ত্রী নুর বেগম (২৮) ও ৪ ছেলে মেয়েকে নিয়ে এসেছেন মংডুর পোয়াখালী গ্রাম থেকে। সে জানায়, সেনা সদস্যরা আসতে দেখে সে পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে লুকিয়ে পড়ে। তারা চলে যাওয়ার পর বাড়ি এসে দেখি বড় ভাই নুর মোহাম্মদের লাশ মাটিতে পড়ে আছে। পাশের বাড়ির আলী হোছন (৬০), আবুল বশর (২৮), লালু (৪০)সহ সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে গেছে। পরে শুনেছি তাদেরকে নির্মম নির্যাতন করে জবাই করে হত্যা করা হয়েছে।
কুতুপালং বস্তি ম্যানেজম্যান্ট কমিটির সভাপতি আবু ছিদ্দিকসহ একাধিক বস্তিবাসী জানান, রাত নামলে বস্তিতে আশ্রয় নেয়া স্বজনহারা রোহিঙ্গাদের কান্নায় অন্যান্য বস্তিবাসী ঘুমাতে পারে না। তিনি বলেন, বস্তিতে যেসব রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে তারা কেউ না কেউ আত্মীয়-পরিজনকে হারিয়েছে। সহায় সম্বলহীন এসব রোহিঙ্গারা একদিকে যেমন স্বজন হারানোর ব্যথা ভুলতে পারছে না, অন্যদিকে আশ্রয়হীন অবস্থায় অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে। যে কারণে রাত নামলেই নারী শিশুর কান্নায় বস্তি এলাকায় এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
সরেজমিন কুতুপালং বস্তি ঘুরে জানা যায়, গতকাল রোববার আরো ১৫ পরিবারের শতাধিক রোহিঙ্গা নারী-শিশু অনুপ্রবেশ করে বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছে। এদের মধ্যে একজন মংডুর খেয়ারীপ্রাং থেকে আসা ৯ সদস্যের পরিবারের নুরুল আমিন (৪৫) জানায়, তারা কুমিরখালী থেকে লম্বাবিল হয়ে দেড় লক্ষ (কিয়াত) দালালকে দিয়ে বস্তিতে এসেছে। তাদের সাথে ছিল খেয়ারীপ্রাং গ্রামের আরো ১৫ পরিবারের শতাধিক নারী-পুরুষ-শিশু।
উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ আবুল খায়ের জানান, অনুপ্রবেশের সত্যতা স্বীকার করে বলেন, দালালের মাধ্যমে এসব রোহিঙ্গারা অনুপ্রবেশ করতে সক্ষম হচ্ছে। কক্সবাজার ৩৪ বিজিবি’র অধিনায়ক লে.কর্ণেল ইমরান উল্লাহ সরকার জানান, অনুপ্রবেশ আগের তুলনায় অনেকটা কমেছে। কারণ সীমান্তের যেসব পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে সেসব পয়েন্টগুলো চিহ্নিত করে সেখানে বিজিবি’র নজরদারি আরো বাড়ানো হয়েছে।
কুতুপালং বস্তিতে ঢালাও ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ : স্থানীয় প্রশাসনের বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে কুতুপালং বস্তি এলাকায় আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ঢালাওভাবে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এনজিও সংস্থা আইওএম আশ্রিত ৩শ পরিবারের মধ্যে খাবার তৈরি সরঞ্জামাদি সরবরাহের কথা স্বীকার করলেও বিভিন্ন এনজিও সংস্থা বস্তি সংলগ্ন পাহাড় জঙ্গলে ত্রাণ বিতরণ করছে। সচেতন মহল মনে করছেন ঢালাওভাবে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হলে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
গতকাল রবিবার বেলা ১১টার দিকে বস্তি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বস্তি সংলগ্ন জঙ্গলার্কীণ পাহাড়ে কে বা কারা ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করছে। জানতে চাওয়া হলে, ইনানী রয়েল রিসোর্ট লিঃএর লোকজন দাবি করে তারা ব্যক্তি উদ্যোগে আশ্রিতা রোহিঙ্গাদের ত্রাণ সামগ্রী বিতরণের সত্যতা স্বীকার করেন। এর আগের রাতে বস্তির পাহাড়ে বিপুল পরিমাণ শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে বলে নিবন্ধিত নেতা ফয়সাল আনোয়ার জানিয়েছেন। এনজিও সংস্থা আইওএম’র প্রোগ্রাম ম্যানেজার সৈকত বিশ্বাস জানান, তারা সদ্য আশ্রিত ৩শ পরিবারকে খাবার তৈরির সরঞ্জামাদি সরবরাহ করেছে।
উখিয়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী জানান, অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের বিজিবি সদস্যরা আটক করে মিয়ানমারে ফেরত পাঠাচ্ছে। অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে তারা সীমান্তে রাতদিন পরিশ্রম করছে। এমতাবস্থায় আশ্রিত রোহিঙ্গাদের ঢালাওভাবে ত্রাণ বিতরণ করা হলে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে উৎসাহিত করার শামিল বলে তিনি দাবি করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ