ঢাকা, সোমবার 5 December 2016 ২১ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

কেমন আছেন রূপসার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষেরা

তিন সন্তানের জনক বাঁধন বসু। খুলনার রূপসা উপজেলার ঘাটভোগ ইউনিয়নের বান্দাখাল গ্রামের বাসিন্দা। আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোকই শুধু নয়, তিনি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি প্রকল্পের অর্থ সুবিধাভোগী ব্যক্তিও। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত)’- শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় খুলনা জেলার একমাত্র উপজেলা রূপসার ৬০ জনের মধ্যে একজন বাঁধন বসু জানেন না এ সহায়তা কোত্থেকে আসে। শুধুমাত্র লোকমুখে শুনেছেন ১০ লাখের মত টাকা এসেছে। যার মধ্য থেকে তিনি এ পর্যন্ত পেয়েছেন দু’হাজার টাকা। যা’ তার সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য শিক্ষাবৃত্তি হিসেবে দেয়া হয়। মাছ ধরা তাদের পেশা উল্লেখ করে বাঁধন বসু জানালেন, প্রকল্প, শিক্ষাবৃত্তি বা ঘের করার জন্য দেয়া টাকার হিসাব সবই জানেন সমিতির সভাপতি। এছাড়া সমিতির কি নাম সেটিও বলতে পারেননি তিনি। 

বাঁধন বসুর ন্যায় সেখানকার বলাই বৈরাগী, নরেশ বসুসহ অনেক আদিবাসীরই জানা নেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ প্রকল্প বা এর আর্থিক নিয়ম-অনিয়ম সম্পর্কে। এভাবে সাধারণ সদস্যদের কোন প্রকার সম্পৃক্ততা না থাকলেও সমিতির সভাপতিকেন্দ্রিক এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষে নতুন প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেয়া হয়েছে। এভাবেই প্রকল্পের পর প্রকল্প চললেও রূপসার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না।

সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, ঘাটভোগের বান্দাখাল বাজারের পাশের একটি ঘের সংলগ্ন সেখানকার একটি মিষ্টি দোকানের কারখানার বেড়া দেয়ার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে মৎস্য প্রকল্পের সাইনবোর্ডটি। যাতে লেখা রয়েছে- ‘বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা শীর্ষক কর্মসূচীর আওতায় ২০১২-১৩ অর্থবছরে রূপসা উপজেলা নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য মৎস্য চাষ প্রকল্প।’ বর্তমানে সেখানে মাছ চাষ হয় না বলেও উল্লেখ করেন মিষ্টি কারখানায় কর্মরত কারিগর।

একই বাজারের অপর দোকানদার মন্টু বালার কাছে গিয়ে দেখা যায় তার দু’টি সন্তানই দোকানে কাজ করছে। বড় ছেলে খুলনার একটি বেসরকারি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং ছোটটি রূপসার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। মাঝে-মধ্যে মন্টু বালার স্ত্রী লিপিকা বালা উপজেলায় গিয়ে ছেলেদের নামে শিক্ষাবৃত্তির টাকা আনেন উল্লেখ করলেও মন্টু বালা জানাতে পারেননি তিনি এ পর্যন্ত কত টাকা পেয়েছেন। তিনি নিজেও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে দাবি করলেও এ সংক্রান্ত কোন কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। বলেন, তিনি সদস্য এটুকুই জানেন, এর বাইরে তাকে কোন কাগজপত্র দেয়া হয়নি।

সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী তারাপদ বিশ্বাস একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। তিনি সম্প্রতি তীর্থ ভ্রমণ করে আসেন  বৃন্দাবন থেকে। এ সমিতি সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না। সভাপতি যেভাবে বলেছেন সেভাবেই তিনি স্বাক্ষর করে দিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তারাপদ বিশ্বাস। 

বান্দাখাল বাজারের কিছু দূরেই আদিবাসীদের সংগঠন ‘রূপসা উপজেলা আদিবাসী উন্নয়ন বহুমুখী সমবায় সমিতি লি.’এর একটি সাইনবোর্ড লক্ষ্য করা যায়। যেটি একটি বাড়ির আঙিনায় টানানো। পাশেই সমিতির সভাপতি রণজিৎ বিশ্বাসের বাড়ি। সমিতির রেজিস্ট্রেশন নেয়া হয় সমবায় অফিস থেকে। যার রেজি: নং-৭৩৭কে। ২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল রেজিস্ট্রেশন নিয়ে কার্যক্রম শুরুর পরই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয় মৎস্য চাষ প্রকল্পের। ২০১২-১৩ অর্থ বছরের জন্য ওই প্রকল্পের নামে এ পর্যন্ত দু’দফায় আট লাখ টাকা আনা হলেও এর মধ্যে তিন লাখ ফেরতযোগ্য বলে উল্লেখ করেন সমিতির সভাপতি রণজিৎ বিশ্বাস। সমিতির সদস্যদের জানানো হয়, উদ্বৃত্ত টাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে ফেরত দেয়া হয়েছে। 

কিন্তু সেখানে এখন পর্যন্ত কোন টাকা দেয়া হয়নি বলে জানান ইউএনও মো. ছাদেকুর রহমান। তবে শিক্ষাবৃত্তির জন্য দেয়া টাকা চেকের মাধ্যমে উপজেলায় বসেই বিতরণ করা হয় বলে জানান তিনি। এ পর্যন্তশিক্ষাবৃত্তির সাড়ে চার লক্ষাধিক টাকা  বিতরণ করা হয় বলেও উল্লেখ করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। 

সমবায় অফিস থেকে রেজিস্ট্রেশন নেয়া হলেও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আসা অর্থের কোন হিসাবের সাথেই সমবায় অফিসের সম্পৃক্ততা নেই বলে উল্লেখ করেন উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা প্রশান্ত কুমার ব্যানার্জী। তিনি বলেন, গত বছর নবেম্বর মাসে তিনি যোগদান করেই এমন একটি সমিতির নাম দেখে আগ্রহী হন এবং খোঁজ-খবর নেন। সম্প্রতি তিনি সমিতি পরিদর্শন করলেও কোন অফিস খুঁজে পাননি। তিনি বলেন, সমিতির ৬০ জন সদস্য থাকলেও সক্রিয় শুধুমাত্র সভাপতি। সমবায় অফিসের রেজিষ্ট্রেশন হলেও পরিদর্শনকালে সভাপতি রণজিত বিশ্বাস, উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ বিভিন্ন জনের সাথে কথা হলে পুরো বিষয়টি এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে অর্থ নিয়ে মৎস্য চাষ করা হলেও তাতে লোকসান দেখানো হয়। ইতোমধ্যে কমিটির মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। এজন্য সহকারী পরিদর্শক রবিউল ইসলামকে সভাপতি করে তিন সদস্যের নতুন কমিটি গঠন করে দেয়া হয়েছে। এ বিষয়টি নিয়ে তিনি বিস্তারিত প্রতিবেদন দিয়েছেন জেলা অফিসে। 

এ প্রকল্প নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন ঘাটভোগ ইউপি চেয়ারম্যান মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান মিজানও। তিনি বলেন, কিভাবে অর্থ আসে, কোথায় খরচ হয়, কারা এর সাথে সম্পৃক্ত তার কিছুই জানেন না তিনি। যদিও প্রকল্পটি তার ইউনিয়নকেন্দ্রিক। তিনি বলেন, ‘সমিতির সভাপতি রণজিৎ একা একা নেতাগিরি করেন। কাউকে কিছু বলেন না, ১০ লাখ টাকা নিয়ে খরচ করেছেন রণজিৎ বিশ্বাস। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের টাকা ফাও খাওয়া যাবে না। এটা নিয়ে তদন্ত হওয়া উচিত। তসরুপ হলে ব্যবস্থা নিতে হবে।’ 

সংশ্লিষ্ট এলাকার সংরক্ষিত ইউপি সদস্য স্বপ্নারানী পালেরও কিছু জানা নেই এ প্রকল্প সম্পর্কে। তিনি বলেন, একবার শুধু তার ও কাউন্সিলের কাছে কিছু নাম চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু নাম দেয়ার আগেই শোনা যায় নাম সংগ্রহ করেছে নিজেরা নিজেরা। ঘের করে সেখানে মাছ ছাড়া হয় এটুকুই তিনি শুনেছেন। অর্থাৎ কোন কিছুর সাথেই তাকে সম্পৃক্ত রাখা হয়নি। মৎস্য চাষ প্রকল্প সম্পর্কে সমিতির সভাপতি রণজিৎ বিশ্বাস বলেন, ঘেরে লোকসান হয়েছে। কিছু টাকা ব্যাংকে রয়েছে, তা’ ফেরত দেয়া হবে। মৎস্য প্রকল্প আর তিনি করবেন না উল্লেখ করে জানান, এতে লস হয়, মাছ দেয়া লাগে ফাও। সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধিদের মাছ দিতে দিতেই লোকসান বেশি হয়। যে কারণে নতুন প্রকল্পের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। শিক্ষাবৃত্তির জন্য দেয়া টাকা উপজেলায় বসে চেকের মাধ্যমে বিলি করা হয়েছে। সব হিসাব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তরে জমা আছে। চেক বিতরণের সময় সাংবাদিকরাও উপস্থিত থাকেন উল্লেখ করে তিনি জানান, তার মৎস্য প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশন পর্যন্ত রিপোর্ট করেছে। তিনি এমন কিছু করার আহ্বান জানান যাতে আরও প্রকল্প আসে, নৃ-গোষ্ঠীরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। 

আদিবাসী উন্নয়ন বহুমুখী সমবায় সমিতির নবগঠিত সভাপতি ও উপজেলা সমবায় অফিসের সহকারী পরিদর্শক রবিউল ইসলাম বলেন, তাকে সভাপতি করে নতুন কমিটি হয়েছে ঠিকই কিন্তু কোন কাগজপত্রই তাকে এখনও দেয়া হয়নি। কাগজপত্র পাওয়ার পরই পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করা হবে। রূপসা উপজেলার সাতটি গ্রামে এক হাজারেরও বেশি আদিবাসী রয়েছেন বলেও জানান তিনি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ