ঢাকা, মঙ্গলবার 6 December 2016 ২২ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিজিপির গুলীতে নৌকা ডুবে ৪ শিশুসহ ১৫ রোহিঙ্গা নিহত ॥ ৩১ জন নিখোঁজ 

সংগ্রাম ডেস্ক : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর গণহত্যা ও গণধর্ষণ থেকে রেহাই পেতে পলায়নরত রোহিঙ্গাবাহী নৌকায় গুলী চালিয়েছে দেশটির সীমান্তরক্ষী পুলিশ (বিজিপি)।

গুলীতে তিনটি নৌকাডুবির ঘটনায় চার শিশুসহ অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ৩১ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

গত রোববার দিনগত রাতে রাখাইনের মংডুর উত্তরাঞ্চলে নাফ নদীতে এই ঘটনা ঘটে।

গতকাল সোমবার মিয়ানমার সময় সকাল ৭টার দিকে নাফ নদীর তীরে দুটি শিশু এবং একজন নারীর লাশ পড়েছিল। যুগান্তর।

এরমধ্যে একটি শিশু মাটিতে এমনভাবে পড়েছিল যার সঙ্গে গত বছরের ২ সেপ্টেম্বরে সিরিয়ার শরণার্থী শিশু আইলান কুর্দির মরদেহের সাদৃশ্য পাওয়া গেছে।

মালয়েশিয়াভিত্তিক রোহিঙ্গা ভিশন টিভির মাধ্যমে এই ছবিটি প্রচার হয়েছে যা এরইমধ্যে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গেছে। 

শিশু হত্যার এই বিভৎস চিত্র দেখে অনেকেই মিয়ানমারের হাত থেকে রোহিঙ্গা শিশুদের উদ্ধারে দেশটিতে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপেরও দাবি জানিয়েছেন।

শান্তির বার্তা বাহকরা কী বলছেন?

এদিকে শান্তির বার্তা বাহক (?) বৌদ্ধ ভিক্ষুরা কী বলছেন তা জানা যায় মিয়ানমার টাইমস’এর একটি প্রতিবেদন থেকে।

মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক রোহিঙ্গা গণহত্যা নিয়ে একটু প্রতিবাদ করেছেন। বিষয়টিকে নগ্ন হস্তক্ষেপ মনে করছেন, মিয়ানমারের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ। রোববার ইয়াঙ্গুনে মহাবান্দুলা পার্কে এক সমাবেশে মিয়ানমার ন্যাশনাল মঙ্ক (ভিক্ষু) ইউনিয়নের সেক্রেটারি উ থু সাতেত্তা বলেছেন, আমাদের যা খুশি আমরা তাই করব। যদি আমাদের অস্ত্র হাতে নিতে হয় তাই নেব। তারা আমাদের জাতীয়তা নিয়ে অপমানসূচক বক্তব্য দিচ্ছে। 

আরেক স্পষ্টভাষী বৌদ্ধ ভিক্ষুক হিসেবে পরিচিত ও মা বা থা উ উইরাথু’র সদস্য এমন একজন ভিক্ষু এক চিঠিতে বলেছেন, অপ্রিয় সত্য হচ্ছে কিছু মুসলিম দেশ অনেক টাকা খরচ করছে এবং বিভিন্ন কৌশলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অপবাদ রটাচ্ছে।

মিয়ানমার ন্যাশনালিস্ট নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক ও বৌদ্ধ নেতা কো নাউঙ নাউঙ ও মালয়েশিয়ার প্রধামন্ত্রীকে তার ভাষায় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের পাশে না দাঁড়াতে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, মিয়ানমারের সঠিক ইতিহাস জানুন, আমি বিশ্বকে জানিয়ে দিতে চাই এবং তা হচ্ছে মিয়ানমারে ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠী রয়েছে এবং রোহিঙ্গা বলে কিছু নেই।

কো নাউঙ নাউঙ ও যা বলেননি তা হচ্ছে, ব্রিটিশরা ১৩৯টি জাতিগোষ্ঠীর তালিকা করলেও রোহিঙ্গাদের সে তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করেনি। তিনি আরো বলেন নি, ২২ হাজার বর্গমাইল এলাকা নিয়ে রোহিঙ্গারা স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যা ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত টিকে ছিল এবং তা মিয়ানমার রাজা বোদাওফায়া দখল করে নেন। ইতিহাস থেকে আর একটি লাইন কো নাউঙ নাউঙ ও’কে মনে করিয়ে দেয়া যায় তা হচ্ছে ১৫৫৪ সালে আরকান মুদ্রার প্রচলন ঘটে যাতে আরবী ও ফার্সী ভাষায় ক্যালিওগ্রাফি অঙ্কিত ছিল।

ইতিহাসের কথা কে মনে রাখে। এখন যা হচ্ছে শান্তিতে নোবেল জয়ী অং সাং সুচির সরকারের শাসনামলে তাতে শত শত বছর ধরে দেশটিতে বসবাসরত রোহিঙ্গারা নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে কেন বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব সহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিচ্ছেন? বিদেশী সাংবাদিক ও ত্রাণ কর্মীদের রাখাইন অঞ্চলে না ঢুকতে দিয়ে মিয়ামার সেনাবাহিনী যে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে তার চিহ্ন তো প্রযুক্তির এই যুগে স্যাটেলাইট ইমেজে ধরা পড়ছে। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা এরপরও কি বলবেন, অহিংসা পরম ধর্ম, জীব হত্যা মহাপাপ, নাকি রোহিঙ্গা মুসলিম হত্যা মহাপাপের মধ্যে পড়ে না।

মোহসিনার সামনেই হত্যা করা হয় বাবা চাচা ও স্বামীকে : মিয়ানামারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলিম গৃহবধু এক সন্তানের জননী মোহসিনার চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। সেনা ও উগ্রগোষ্ঠি কর্তৃক দফায় দফায় ধর্ষণের শিকার হন মোহসিনা। এতে শেষ নয়, তার চোখের সামনেই নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় বাবা, চাচা ও স্বামীকে। বর্ণনা দিতে গিয়ে বিলাপ করে কাঁদছিলেন মোহসিনা। তবে এখন আর চোখ দিয়ে পানি গড়ায় না। বাপ-চাচা আর স্বামীর প্রবাহমান রক্তের সাথে চোখের পানিও ফুরিয়ে গেছে তার। 

রাখাইনের জাম্বুনিয়া থেকে চার বছরের শিশু আরকানকে নিয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আসা মোহসিনা বলেন ‘আমার চোখের সামনে বাবা-চাচা-স্বামীকে হত্যা করা হয় এবং আমাকে ধর্ষণ করা হয়’। মিয়ানমারের আরাকান স্টেটের নামে তিনি শিশুটির নাম রেখেছেন আরকান। মোহসিনা বেগমের কোলে ৪বছরের শিশু আরকান খালি গায়ে খেলা করছে। না ফেরার দেশে তার বাবা; সেই ভাবনার কাতারে নেই শিশু আরকান। কোলের শিশু আরকানকে নিয়ে ঠাঁই হয় টেকনাফের শরণার্থী থাকার জায়গা লেদা ক্যাম্পে। সেখানে বিধ্বস্ত চেহারা ও মলিন পোশাকে মোহসিনা বলছিলেন, ননেম্বরের ১২ তারিখ ঠিক কি ঘটেছিল মিয়ানমারে আমার ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এক কথায় সেই নৃশংসতা অবর্ণনীয়। “সকাল বেলা হঠাৎ করেই একদল লোক অস্ত্র হাতে তাদের বাড়িতে হামলা চালায়। বাড়ি ভাংচুর আর আগুন। বাড়ির পুরুষ, মহিলা শিশু সবাইকে আলাদা করে দাঁড়া করানো হয়। “মিয়ানমারের রাখাইনের জাম্বুনিয়া গ্রামে বাড়ি মোহসিনার। মোহসিনা বলছিলেন “পুরুষদের আলাদা করে দাঁড়া করায়, সেখানে আমার স্বামী, চাচা, আর বাবা ছিল। সাথে ছিল আরো ২৫ থেকে ২৭জন ওই এলাকার পুরুষ। আর মেয়েদের বলা হয় আলাদা লাইনে দাঁড়াতে।” এরপর তার চোখের সামনেই হত্যা করা হয় তার পরিবারের তিনজন পুরুষ সদস্যকে। “এরপর লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েদের মধ্যে যাদের বয়স অল্প তাদেরকে ধরে নিয়ে জঙ্গলের মধ্যে নিয়ে যায়। সেখানে তাদের উপর চালানো হয় নির্যাতন ও ধর্ষণ।”

মোহসিনা বলছিলেন “আমাকে সাতজন পালাক্রমে ধর্ষণ করে।” তিনি বলেন, “এখন চোখের পানিও শুকিয়ে গেছে, কান্দনও আর আসেনা।” জ্ঞান হারান মোহসিনা। চেতনা ফিরে আসার পর পালিয়ে আসেন সেখান থেকে। খোঁজেন কোলের শিশু আরকানকে। বাড়ি ফিরে শুধু আরকানকে পান। এরপর নাফ নদী পাড়ি দিয়ে যারা বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করছেন তিনি তাদের দেখা পাওয়ার আশায় নদীর উপকূলে আসেন। তবে তখন তিনি ততক্ষণে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। অবনতি হচ্ছে শরীরের অবস্থার। মোহসিনাকে উদ্ধার করেন হার মোহাম্মদ নামে জাম্বুনিয়ার এক ব্যক্তি। 

হার মোহাম্মদ বলেন “সেদিন রাতে নৌকায় করে নাফ নদী পাড়ি দিয়ে অনেকেই টেকনাফে আসার চেষ্টা করছিলেন। সেই দলেই অসুস্থ মোহসিনাকে নিয়ে উঠে পড়েন তিনি।” নৌ যোগে নদী পাড়ি দিয়ে টেকনাফে আসার জন্য অবশ্য তাদের দিতে হয়েছে নগদ টাকা। হার মোহাম্মদ আরো বলেন, মিয়ানমারে তার ভাষায়, দালালদের টাকা দিয়ে তারা নৌকায় উঠে পড়ে। মোহসিনার মত আরো অনেকেই নদী পাড়ি দিয়ে এভাবে টেকনাফে এসেছেন। তাদের সবার কাছে কম-বেশি নির্যাতনের বর্ণনা একই ধরণের। তবে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে কোন গণমাধ্যম বা মানবাধিকার কর্মী প্রবেশ করতে পারছে না।

ভিন্নপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে

কমরুদ্দিন মুকুল, উখিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা : সীমান্তে প্রহরাধীন বিজিবি ও বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক রোহিঙ্গাদের বিজিবি’র মাধ্যমে মিয়ানামারে ফেরত পাঠানো হলেও ওইসব রোহিঙ্গারা ভিন্ন পথে ফের অনুপ্রবেশ করছে। দালালের মাধ্যমে এসব রোহিঙ্গারা কুতুপালং বস্তি অথবা ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থানরত তাদের স্বজনদের কাছে আশ্রয় নিচ্ছে । সম্প্রতি কুতুপালং বস্তিতে আশ্রয় নেয়া এমন কয়েকটি রোহিঙ্গা পরিবারের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়। 

সূত্র মতে, উখিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের তুমব্রু, ঘুমধুম, জামবনিয়া, বালুখালি, রেজু আমতলী, ফারির বিল, নলবনিয়া, ধামনখালী, রহমতের বিলসহ প্রায় ১২টি পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গারা অনুপ্রবেশ করছে। উভয় সীমান্তে বসবাসরত কিছু দালালচক্র এসব রোহিঙ্গাদের নিকট থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে পারাপারে বা অনুপ্রবেশে সহযোগিতা করছে। 

কুতুপালং বস্তিতে আশ্রয় নেয়া মিয়ানমারের মংডু খেয়ারী প্রাং গ্রামের আব্দুল হামিদ (২৬) জানান, তারা ৭ সদস্যের একটি পরিবারকে বালুখালী বিজিবি সীমান্তের ঢেকিবনিয়া পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমারে পুশব্যাক করে। ৩ দিন তারা স্থানীয় এক দালালের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে পরের দিন মিয়ানমারের লম্বাবিল হয়ে হোয়াইক্যং সিকদার পাড়া দিয়ে কুতুপালং বস্তিতে আশ্রয় নেন। সে জানায়, বস্তিতে পৌঁছা পর্যন্ত দালাল, গাড়ি ভাড়া ও নৌকা ভাড়া মারফত তাদের দেড় লক্ষ (কিয়াত) গুণতে হয়েছে। এভাবে আরো কয়েকটি পরিবার ফের অনুপ্রবেশের কথা স্বীকার করে বলেন, তাদেরকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর কারণে হাত খরচের জন্য যে টাকা পয়সা ছিল তা শেষ হয়ে গেছে। 

তুমব্রু বিজিবি সুবেদার কালামের নিকট জানতে চাওয়া হলে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো রোহিঙ্গারা ফের অনুপ্রবেশ করছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারা সীমান্তের নোম্যান্স ল্যান্ড পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের পৌঁছে দেন এবং বাংলাদেশ সীমান্ত অতিক্রম করা পর্যন্ত তাদের পর্যবেক্ষণ করা হয়। তবে এসব রোহিঙ্গারা অন্য পথ দিয়ে পুনরায় অনুপ্রবেশ করলে তা জানার কথা নয়। 

কক্সবাজার ৩৪ বিজিবি’র অধিনায়ক লে.কর্ণেল ইমরান উল্লাহ সরকার সাংবাদিকদের জানান, ১ ডিসেম্বর থেকে ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত অনুপ্রবেশকারী কোন রোহিঙ্গা আটক হয়নি। তবে ১ নবেম্বর থেকে এ পর্যন্ত ৪৮২ জন অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাকে আটক করে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ