ঢাকা, মঙ্গলবার 6 December 2016 ২২ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

কড়াইল বস্তিজুড়ে কান্না-আহাজারি

নাছির উদ্দিন শোয়েব: পুড়ে যাওয়া কড়াইল বস্তিজুড়ে শুধু কান্না-আহাজারি। রোববার দুপুরে লাগা আগুনে শেষ সম্বলটুকু খুইয়ে নারী-শিশু-বৃদ্ধসহ সহস্রাধিক মানুষ এখন খোলা আকাশের নিচে। শীতের রাতে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু হারিয়ে অত্যন্ত কষ্টে আছেন তারা। হঠাৎ বস্তিতে আগুন লাগায় সহায়-সম্বল হারিয়ে তারা নিঃস্ব। মাথাগোাঁজার মতো কোনো আশ্রয় নেই। পুড়ে ছাই হয়ে গেছে সবকিছুই। অনেকের গায়ের কাপড় ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট নাই। শেষ সম্বলটুকুও হারিয়ে পথে বসেছেন।
জীবিকার সন্ধানে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা প্রায়-সর্বহারা যে মানুষগুলো রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে একটু মাথাগোঁজার ঠাঁই পেয়েছিলেন, আগুনের লেলিহান শিখা সর্বস্ব পুড়িয়ে পথে বসিয়ে দিয়েছে তাদের। গুলশান-বনানীর কাছেই গড়ে ওঠা এই বস্তি গার্মেন্টস শ্রমিক, রিকশাচালকসহ নিম্ন আয়ের বহু মানুষের ঠিকানা।
গতকাল সোমবার সকালে কড়াইল বস্তিতে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, পুড়ে যাওয়া ধ্বংসস্তূপে প্রচণ্ড রোদে বসে আছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো। শিশুরা ছাড়া কারো মুখে হাসি নেই; শূন্য চোখে তাদের সব হারানোর বেদনা।
পুড়ে যাওয়া বস্তির বাসিন্দা ঝর্ণা বেগম (২৭) কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন- কয়েকদিন আগে ছোট দুই ছেলে আর এক মেয়েকে ফেলে রেখে চলে গেছে স্বামী। থাকার মধ্যে ছিলো শেষসম্বল ঘরটুকু, সেটাও পুড়ে গেলো। কড়াইল বস্তিতে শেষ আশ্রয়টুকু হারিয়ে এসব বলেই আর্তনাদ করছিলেন এমন হাজারো ঝর্ণার কান্না-আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে কড়াইল বস্তি। নয় মাসের ব্যবধানে আবারও কড়াইল বস্তিতে আগুন লেগে পুড়েছে পাঁচ শতাধিক ঘর, আহত হয়েছেন ১৫ থেকে ২০ জন। সব হারিয়ে রাস্তায় বসার উপক্রম হয়েছে প্রায় তিন হাজার মানুষ।
অন্ধকারে ছাই হয়ে যাওয়া টিন ধরে চিৎকার করে কাঁদছেন হালিমা (৫৫), সারাজীবন মানুষের বাসায় কাজ করে একটা ঘর দিয়েছিলাম, স্বামী মারা গেছে ১৫ বছর। দুই ছেলের কেউই কোনো খোঁজ রাখে না, মানুষের বাসায় কাজ করে খাই। রাতে ঘরে ফিরে মনে হয়, আমার সব আছে, স্বামী আছে, ছেলে আছে। এই ঘরই আমার সব। এখন আমার কিছুই নেই। সবার ক্ষতি মিটে গেলেও আমি যা হারালাম সেটা কোনোদিনও  মিটবে না।
দুঃখ তুলনা করার মাপকাঠিতে মাপা যাচ্ছে না সব হারানো ভুক্তভোগীদের। ঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে আমার দুঃখ নেই, আমার বাপধনরে আমাকে ফিরত দাও, আমি আর কিছুই চাই না। দুর্ঘটনার সময় শত শত মানুষের, দিক-বিদিক ছোটাছুটির ভিড়ে পাঁচ বছর বয়সী রিপনকে হারিয়ে বার বার মূর্ছা যাওয়া মা ফরিদা এই ভাবেই বিলাপ করছিলেন।
একটি পোড়া ঘরের মেঝেতে দেখা গেল কয়েকজন নারী-পুরুষ বসে আছেন। তাদের একজন কুমিল্লার শ্যামল দাস; রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। স্ত্রী আদর রাণী দাস আর ছেলে নির্মল দাসকে নিয়ে শ্যামল খোলা আকাশের নিচে বসে আছেন সাহায্যের আশায়। তিনি বলেন, ‘পরনের গেঞ্জিটাও প্রতিবেশীগো কাছে ধার কইরা পরছি।  দেশে জমি-জিরাত নাই, সরকার কিছু ব্যবস্থা না করলে কি করমুু’। নুরুল মিয়া নামে অপর একজন বলেন,  দেশের বাড়ি কুড়িগ্রাম। দুই ছেলে-মেয়ে আর স্ত্রী নিয়ে ভিক্ষা করে সংসার চালাতেন।
বাকপ্রতিবন্ধী বিল্লাল হোসেন কম্পিউটারে নানা কাজও করতো বলে স্থানীয়রা জানান। সেই দোকানেই মাকে নিয়ে থাকতেন তিনি। পোড়া দোকানের সামনে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বিল্লাল। কিছু বলতে পারছে না, তবে চোখে সর্বস্ব হারানোর বেদনার ভাষা স্পষ্ট। বিল্লালের মা হাহাকার করে বলছিলেন, ‘গায়ের কাপড় ছাড়া কিছুই বাঁচাইতে পারি নাই’।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো আশায় আছেন, যদি সরকার বা কেউ তাদের জন্য কিছু করে। এর মধ্যে বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরা এসে বিভিন্ন ধরনের আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে। তবে সরকার বা কোনো সংস্থা এখনো এগিয়ে না এলেও এলাকাবাসী নিজেরা চাঁদা তুলে সেখানেই বড় বড় হাঁড়িতে উদ্বাস্তু মানুষদের জন্য খিচুড়ি রান্না করছেন। ঢাকার সবচেয়ে বড় এই বস্তিতে এর আগে গত ১৪ মার্চ আগুন লেগে অর্ধশত ঘর পুড়ে যায়, অন্তত দুইজন আহত হন। 
উল্লেখ্য, মহাখালীর কড়াইল বস্তিতে রোববার দুপুরে অগ্নিকা- ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের ওসি এনায়েত হোসেন জানান, বেলা আড়াইটার পর ওই বস্তিতে আগুন লাগার খবর পেয়ে তাদের ১৪টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে কাজ শুরু করে। পৌনে দুই ঘণ্টা চেষ্টার পর বেলা ৪টা ২০ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।  বস্তির বাসিন্দাদের অভিযোগ, বউবাজার লেপ-তোশকের দোকান থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। পরে আগুন দ্রুত বস্তিতে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনে পাঁচ শতাধিক ঘর পুড়ে গেছে। ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ