ঢাকা, বুধবার 7 December 2016 ২৩ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

জনগণের ঘাড়ে বিদ্যুতের বাড়তি বোঝা

বাঙ্গাল আবদুল কুদ্দুস : সরকার রেন্টাল-কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের মেয়াদ আবারো বাড়াতে যাচ্ছে বলে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে। ২০১৩ সালে রেন্টাল-কুইক রেন্টাল থেকে সরে আসার এবং ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশে ভাড়াভিত্তিক আর কোন বিদ্যুৎ কেন্দ্র থাকবে না বলে সরকার প্রতিশ্রুতি দিলেও এখন প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হচ্ছে না কেন? পিডিবি’র তথ্য থেকে জানা যায়, শুরুতে রেন্টাল-কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংখ্যা ছিল কয়েকটি। পরবর্তীতে এই সংখ্যা আরো বাড়ানো হয়েছে। ২০১৩ সালের পরেও বাড়ানো হয়েছে। ২০১৩ সাল পর্যন্ত এর সংখ্যা ছিল ১৪টি। বর্তমানে এর সংখ্যা ৩২-এ দাঁড়িয়েছে। রেন্টাল ১৪টি আর কুইক রেন্টাল ১৮টি। এগুলোর মধ্যে একাংশ তেলভিত্তিক, অপরাংশ গ্যাসভিত্তিক। জরুরি বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে রেন্টাল-কুইক রেন্টালের ভূমিকা স্বীকার করা হলেও একে রাষ্ট্রের জনগণের ঘাড়ে হাজার হাজার কোটি টাকার বোঝা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। দ্রুত এই বোঝা থেকে জনগণকে মুক্ত করা বড় বেশি প্রয়োজন হলেও এ দেশে দেখা যাচ্ছে এর ব্যতিক্রম। রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংখ্যা ও এর মেয়াদ দুই-ই বাড়ানো হচ্ছে। সরকার এমনটি করছে কেন? সরকারের বড় বড় কথা ছিল, দেশে বিশাল বিশাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে এবং সেসব কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করা হলে রেন্টাল-কুইক রেন্টাল থেকে সরে আসা হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বড় আকারের কোন বিদ্যুৎ কেন্দ্র এখনো কোন উৎপাদনে আসতে পারেনি কেন? কেন পারেনি, সরকারের কোন সদুত্তর নেই। সরকারের ব্যর্থতার এই প্রেক্ষাপটে রেন্টাল-কুইক রেন্টালের আবারও মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। কেন রেন্টাল-কুইক রেন্টালের সংখ্যা ও মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে সরকারের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, আমাদের অনেক বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে এসেছে। তবে যতোদিন পর্যন্ত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে না আসছে ততদিন রেন্টাল-কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র চলবে। তবে এ কথাটা না বলে পারা যায় না যে, সরকার সাত লাখ টন ঘি কবে পোড়াবে আর রাধা কবে নাচবে- কেউ জানেন কী?
রেন্টাল-কুইক রেন্টালের বিদ্যুৎ বেশি মূল্যে কিনে পিডিবিকে বরাবরই মোটা অংকের লোকসান গুণতে হচ্ছে। ভর্তুকি দিয়েও এ লোকসান কমিয়ে আনা যাচ্ছে না। রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় ও মূল্য দুই-ই বেশি। পিডিবি’র গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয় যেখানে ইউনিট প্রতি দুই টাকারও কম সেখানে গ্যাসভিত্তিক কুইক রেন্টালে এ ব্যয় ছয় টাকার উপরে। এমনকি বেসরকারি খাতের দীর্ঘমেয়াদী গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ইউনিট প্রতি উৎপাদন ব্যয় যেখানে গড়ে দুই টাকা সেখানে তেলভিত্তিক কুইক রেন্টালের উৎপাদন ব্যয় প্রতি ইউনিটে ১৬ থেকে ১৭ টাকা। প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ১৭ টাকা আর প্রতি ইউনিট দুই টাকা মূল্যে কিনলে পিডিবির প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় মূল্য দাঁড়ায় সাড়ে নয় টাকা। পিডিবি প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রি করে চার থেকে ছয় টাকায়। এ হিসাবে পিডিবিকে কত টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে তা সহজেই অনুমান করা যায়। অথচ এ সময়ের মধ্যে যদি রাষ্ট্রীয় বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো উৎপাদন করতে পারতো তাহলে পিডিবি বিদ্যুতের দাম কমিয়েও বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা লাভ করতে পারতো।
আসল সত্য কথা হচ্ছে, রেন্টাল-কুইক রেন্টালের নামে বিদ্যুৎ খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার লুটপাটের এক মহাউৎসব চলছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা গেছে যে, সরকার দরপত্র ছাড়া বিদ্যুৎ কিনে গত সাড়ে তিন বছরে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা গচ্চা দিয়েছে। এ সময় ১৩টি কুইক রেন্টালের কাছ থেকে গড়ে ১৪ লাখ ২৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে। দেখা গেছে, এই বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে প্রতি ইউনিট সাত টাকারও বেশি দামে। ২০১০ সালে এসব কুইক রেন্টালের কাছ থেকে গড়ে ১২ টাকা থেকে ১৮ টাকা ৭৫ পয়সা দামে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কেনার সিদ্ধান্ত হয় এবং ঐ দামেই কেনা হয়েছে। বিষয়টি ধরা পড়েছে দরপত্রের মাধ্যমে বিদ্যুৎ কেনার সিদ্ধান্ত হওয়ার পর। দেখা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠান প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছে গড়ে আট টাকা ২০ পয়সা দামে। এই হিসাবে গত সাড়ে তিন বছরে কেনা বিদ্যুতের জন্য বাড়তি দিতে হয়েছে ২৩ হাজার নয়শ’ কোটি টাকা। সরকারের বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত রেন্টাল-কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মালিকরা এই বিপুল অংকের জনগণের খাজনা-ট্যাক্সের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। শুধু তাই নয়, সরকারি দামে তেল ও গ্যাসের পর্যাপ্ত যোগান পেয়েছেন। একই সাথে পেয়েছেন হ্যাল্ডলিংয়ের জন্য নয় শতাংশ হারে সার্ভিস চার্জও।
এখন দরপত্রের মাধ্যমে বিদ্যুৎ কেনার সিদ্ধান্ত হওয়ায় হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের কিছুটা হলেও গোমর ফাঁস হয়েছে। রেন্টাল-কুইক রেন্টালের কাছ থেকে দরপত্র ছাড়া হাজার হাজার কোটি টাকার বিদ্যুৎ কেনার এমন নজির বিশ্বের আর কোন দেশে আছে কি? এর মাধ্যমে বস্তুত এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মালিক নামধারী লুটেরা চক্রকে লুটপাট করার বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়েছে। এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মালিক কারা, রাষ্ট্রের বিশেষ সংস্থার মাধ্যমে খোঁজ নিলে তা জানা কী অসম্ভব?
অবশেষে দরপত্রের মাধ্যমে বিদ্যুৎ কেনার যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে তা শুভ লক্ষণই বলতে হয়। তবে এর শংকার আরো একটি দিকও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় বিদেশ থেকে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য বর্তমান আইন সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তাতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য তেল আমদানি শুল্কমুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের ধারণা, এ প্রস্তাব গৃহীত হলে তেলের অবৈধ ব্যবসার রাস্তা খুলে যাবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য বিদেশ থেকে তেল আমদানি করে তা যে খোলাবাজারে বিক্রি করে মুনাফা লোটা হবে না, তার নিশ্চয়তা দেবেন কে? এমনকি তেল পাচারের অবৈধ কারবারের রাস্তাও খুলে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। বিদ্যুৎ নিয়ে দেশে এ যাবত যা কিছু করা হয়েছে এবং এখনও করা হচ্ছে, তা সত্যিই দুঃখজনক। জাতীয় স্বার্থেই আমরা এর অবসান কামনা করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ