ঢাকা, বৃহস্পতিবার 8 December 2016 ২৪ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

দিনের বেলায় রাজধানীজুড়ে গ্যাসের তীব্র গ্যাস সংকট ॥ জনদুর্ভোগ চরমে

ইবরাহীম খলিল : দিনের বেলায় রাজধানীতে গ্যাসের চরম সংকট দেখা দিচ্ছে। একারণে গ্যাস ব্যবহারকারীদের দৈনন্দিন কাজ তীব্রভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে রান্নাবান্নার কাজে ভোগান্তিতে পড়ছেন গৃহিণীরা। দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাস না থাকায় কেউ কেউ রাত জেগে রান্নার কাজ সেরে নিচ্ছেন। কেউ আবার বাধ্য হয়ে হোটেল থেকে খাবার এনে খাচ্ছেন। আবার কেউ গ্যাসের বিকল্প হিসেবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে রান্নার কাজ সেরে নিচ্ছেন। অনেকে তিনবেলার খাবার একসঙ্গে রান্না করছেন অথবা একসঙ্গে তিন-চার দিনের খাবার রান্না করে ফ্রিজে সংরক্ষণ করছেন। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে অনেকে রাইস কুকার, ওভেন ও মাটির চুলায় রান্নার কাজ সারছেন।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দার অভিযোগ, বেশ কিছুদিন ধরেই তারা গ্যাস সংকটে ভুগছেন। তারা জানান, কোন কোন এলাকায় সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত আবার কোথাও বিকাল ৩টা পর্যন্ত গ্যাসের দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কিছু এলাকায় সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গ্যাসের দেখা মিলছে না। বিভিন্ন এলাকার মধ্যে রাজধানীর মুগদাপাড়া, রামপুরা, বনশ্রী, ওয়ারী, গোপীবাগ, গেন্ডারিয়া, কমলাপুর, নাখালপাড়া, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, গাবতলী, কল্যাণপুর, মিরপুর, জিগাতলা, শেওড়াপাড়া, ধানমন্ডি, দক্ষিণ মুগদা, যাত্রাবাড়ী, রায়েরবাজার, রূপনগর, পল্লবী, মাদারটেক, দক্ষিণখান, আশকোনা ও কামরাঙ্গীরচরে গ্যাস সংকট তীব্র।

তিতাস গ্যাস সূত্র জানিয়েছে, শীত এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সার কারখানাগুলো চালু হওয়ার কারণে সমস্যা হচ্ছে ঠিকই; কিন্তু এত সংকট হওয়ার পিছনে রয়েছে অবৈধ সংযোগ। কিছু এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আধা ঘণ্টাও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সাধারণত সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১টা, কোনো কোনো এলাকায় বিকাল ৩টা পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। আবার কোথাও সকাল ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত গ্যাসের চাপ থাকে না। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির জরুরি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে প্রতিদিন ব্যাপক হারে অভিযোগ আসছে। এছাড়া অনেক জায়গায় লাইন ছিদ্র হয়ে গ্যাস বের হলেও মেরামতের কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না।

গৃহিণীরা জানান, বর্তমানে বিদ্যুৎ ও সিলিন্ডার দিয়ে রান্নার কাজ করতে হয় তাদের। আর যাদের এই ব্যবস্থা নেই, তারা মাটির চুলায় রান্না-বান্নার কাজ করছেন । হাজারীবাগ বাড্ডানগর পানির ট্যাংকি এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী লিজা আক্তার বলেন, গ্যাস নিয়ে এখন আমাদের সঙ্গে সরকার তামাশা করছে। রাত জেগে রান্না করে, দিনের বেলায় কেরোসিন তেল দিয়ে স্টোভ জ্বালিয়ে কখনওবা সিলিন্ডারের চুলায় তা গরম করে খেতে হয়। সকাল ৭টার আগেই গ্যাস চলে যায়। বাসাবো এলাকার বাসিন্দা তুলি আক্তার জানান, সকালে কোনো রকম গ্যাস থাকলেও বেলা ১১টার পর থেকে কমতে থাকে। তখন চুলা জ্বলে মিটমিট করে। দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকে না। ফলে রান্না বান্নার কাজ আগেই শেষ করে রাখতে হয়। একই এলাকার ফাতেমা খাতুনের বক্তব্য হলো- গ্যাসের সমস্যার কথা বলে লাভ নেই। সকালে কোনো রকম রান্নাবান্না করতে পারলেও দুপুরের পর থেকেই করুণ অবস্থা তৈরি হয়। 

এদিকে সিএনজি স্টেশনসহ অন্যান্য শিল্প-কারখানায়ও গ্যাসের সংকট রয়েছে। শিল্প মালিকদের দাবি দেশের বেশির ভাগ শিল্প-কারখানাই গ্যাসভিত্তিক। গ্যাস সংকটের কারণে চলমান শিল্প উৎপাদন ইতিমধ্যে তিন ভাগের একভাগ কমে গেছে। তবে গ্যাসের উৎপাদন স্বাভাবিক রয়েছে বলে দাবি করছেন পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা। তাদের মতে, শীতকালে এমনিতেই গ্যাসের পাইপলাইনে প্রেসার কম থাকে। ফলে হঠাৎ করেই গ্যাসের মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে।

মুগদা পাড়ার গৃহিণী মারুফা খাতুন এ প্রতিবেদককে জানান, ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। এরপর সামান্য গ্যাস এলেও তা দিয়ে রান্না করতে সময় লাগে। তিনি জানান, সমস্যা এতই তীব্র হয়ে উঠেছে যে, গৃহকর্তাকে অফিসে যেতে হচ্ছে নাস্তা না খেয়ে। আর বিকেলে অফিসে গেলে দুপুরের খাবার রান্না করে দেয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে রেস্টুরেন্টে খেয়ে নিতে হচ্ছে তাকে। সময় মতো রান্না করতে না পারলে পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়েও পড়তে হয় বিপাকে। তিনি জানান, এতদিন ফ্রিজ ছিল না। এখন বাধ্য হয়ে ফ্রিজ কিনলাম। যাতে রান্না করে রেখে দেওয়া যায়। 

কমলাপুরের গৃহিণী তাহেরা জানান, সারা দিন গ্যাস থাকে না। রাত সাড়ে ১১টার পর এলেও ভোর হওয়ার আগেই চলে যায়। এ পরিস্থিতিতে রাত জেগে রান্নার কাজ সারতে হয়। বাসায় মেহমান এলে রাইস কুকার ব্যবহার করে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, দেশব্যাপী তীব্র গ্যাস সংকটের মুখে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির যৌক্তিকতা কি?

এদিকে গ্যাস সংকটের কারণে কুকারিস সামগ্রীর বিক্রি বেড়ে গেছে। বিশেষ করে রাইসকুকারের কদর বেড়েছে বলে দোকানীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে। রাজধানীর খিলগাঁওয়ের একটি ইলেকট্রনিক্স পণ্যের বিক্রেতা জানান, গ্যাস সংকটের কারণে তাদের রাইস কুকারের বিক্রি বেড়ে গেছে। শীত আসায় গ্যাস সংকট তীব্র হওয়ায় গ্রাহকদের অনেকেই এখন রাইস কুকার কিনছেন।

২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার আগে গ্যাসের দৈনিক গড় উৎপাদন ছিল ১ হাজার ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমানে দৈনিক ২ হাজার ৭৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের ক্ষমতা রয়েছে পেট্রোবাংলার। বর্তমানে দৈনিক চাহিদা রয়েছে ৩ হাজার ৩০০ ঘনফুট। গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৩৪ লাখ।

গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিসন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির এক কর্মকর্তা বলেন, শীতকালে গ্যাসের কিছু সমস্যা থাকে। অবৈধ লাইনের কারণে বৈধরা ভোগান্তিতে আছেন। তিনি বলেন, পাঁচজনের খাবার দশজনে খাইলে যেটি হয়, তা-ই হচ্ছে। গ্যাস সংকট নিয়ে বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক বলেন, শীত আসলেই পুরানো লাইনের উপর তৈরি করা স্টেশনগুলো গ্যাসের সংকটে পড়ে। তিনি জানান, সারাদেশে গ্যাসের যে চাহিদা তার ৪ দশমিক ৮ শতাংশ গ্যাস তারা ব্যবহার করেন।

 এ প্রসঙ্গে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিসন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী আলী আশরাফ বলেন, রাজধানী এবং আশপাশের এলাকায় তিতাসের প্রায় ২০ লাখ গ্রাহকের মধ্যে আবাসিক গ্রাহকের সংখ্যা বেশি। রাজধনীর এসব গ্রাহকের চাহিদা ২৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে ১৭০০ ঘনফুট গ্যাস। তিনি জানান, শীতে একটু গ্যাসের সংকট থাকে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও সারকারখানাগুলো চালু হওয়ায় এ সমস্যা তীব্র হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ