ঢাকা, বৃহস্পতিবার 8 December 2016 ২৪ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিপিএলেই কেন ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ?

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : টোয়েন্টি-২০ ক্রিকেটের আষ্ট্রেপৃষ্টেই কি লেগে থাকে জুয়াড়ীদের ছায়া। নয়তো পৃথিবীর যে প্রান্তেই খেলা হোক না কেন ম্যাচ পাতানোর অভিযোগ উঠতে দেয়া যায়। বাদ যায়নি বাংরাদেশের আসরও। ফ্র্যাঞ্চাইজি আসর হিসেবে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) প্রথম আসরটা অনেকটাই নির্বিঘেœ শেষ হয়েছে। কিন্তু গ-গোল বেধেছে দ্বিতীয় আসরে এসে। এতটা এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল যে মোহাম্মদ আশরাফুলের মতো ক্রিকেটার জড়িয়ে পড়েছিলেন ম্যাচ গড়াপেটায়। কলঙ্কের দাগ লাগানো আসরে যেন সেটাই হয়ে রয়েছে সবচেয়ে বড় কষ্টের নাম। আর আশরাফুলকে ফিরে আসার অপেক্ষা করতে হচ্ছে এখনো। বিপিএল খেলতে এ ক্রিকেটার আরো একটি বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তবে এবারের আসর বোধহয় সবকিছু ছাপিয়ে গেছে। বিশেষ করে মাঠ ও মাঠের বাইরের কেলেঙ্কারি ছাড়িয়ে গেছে সব রেকর্ড। সে কারণেই বিপিএল নিয়ে নতুন করতে ভাবনা চিন্তা করার জন্য নানাদিক থেকে চাপ আসছে। প্রথম পর্বটা বেশ ভালভাবেই শেষ হয়েছিল। যদিও আসর শুরু হওয়ার আগেই রংপুর রাইডার্স তাদের ক্রিকেটার জুপিটার ঘোষকে বহিষ্কার করে। ৪ নভেম্বর বাদ দিলেও অনেকটা হঠাৎই ২০ নভেম্বর বোমা ফাটিয়ে বসেন জুপিটার। তাকে ম্যাচ পাতানোর প্রস্তাব দিয়েছেন ম্যানেজার সানোয়ার হোসেন, এমন কথা মিডিয়ার সামনে বলে রীতিমতো তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। হঠাৎই ব্যস্ততা বেড়ে যায় বিসিবি’র এন্টি করাপশন ইউনিটের। সে কারণে বিসিবিও জুপিটারের পাশাপাশি সানোয়ারকে বিপিএল থেকে বহিষ্কার করে। ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক এ আসরের দ্বিতীয় সংস্করণে এই সানোয়ারের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছিল। সে সময় তিনি ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরসের ম্যানেজার ছিলেন। কিন্তু এবারের অভিযোগটা কিছুটা হলেও ভিন্ন। আর অনেকটা প্রমাণিত হয়ে আছে, জুপিটার হোটেলে নারী নিয়ে প্রবেশ করেছিলেন। কিছুক্ষণ অবস্থান করে আবারো সেই নারী নিয়ে বাইরে চলে গেছেন। ম্যাচ গড়াপেটার ছায়া এবার যেন ভর করেছে নারী কেলেঙ্কারির উপর। নয়তো আল আমিন হোসেন আর সাব্বির রহমান রুম্মানরা কেন এই কেলেঙ্কারিতে জড়াবেন? সাব্বির লাল-সবুজ জার্সি গায়ে অপরিহার্য সদস্য হলেও আল আমিন রয়েছেন আসা যাওয়ার মধ্যে। তাদেরকে দেওয়া হয়েছে কঠোর শাস্তি। সাব্বিরকে বিপিএলের পুরো পারিশ্রমিকের তিনভাগের এক ভাগ আর আল আমিনের অর্ধেকটা কেটে নেয়া হয়েছে। যদিও এখানে বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের অপরিপক্বতার প্রমাণ পরিষ্কারভাবেই মেলে। নয়তো অপরাধ করলে আর্থিক জরিমানার পাশাপাশি ম্যাচ থেকেও বহিষ্কারের বিধান রয়েছে। কিন্তু আর্থিক জরিমানা করে নিয়ম ভেঙেছে তারা। আর শাস্তির দিক থেকে বিসিবি অন্য যে কোন ফেডারেশন থেকে কিছুটা হলেও কঠোর। সাকিব আল হাসানের মতো ক্রিকেটারকে বড় রকমের শাস্তি দিয়েই ছাড়ে তারা। এবারো তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। কিন্তু বিপিএল-এ কেন নারী কেলেঙ্কারিতে জড়াতে হবে। তাহলে কি বিপিএল আসলেই ক্রিকেটারদের কোন না কোনভাবে আটকানোর ফাদ পাতা হয়? নয়তো জাতীয় দলে খেলার সময় তো এসব ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধে এতটা গুরুতর অভিযোগ ওঠেনা। তাই বিপিএল কি যন্ত্রনায় পরিণত হতে চলেছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য? বিপিএলে বিতর্ক আর অনিয়ম যেন হাত ধরাধরি করে চলে। নয়তো সেই প্রথম আসর থেকেই কোন না কোনভাবেই সংবাদের শিরোনাম হয়েছে এই টুর্নামেন্ট। প্রথম থেকেই পারিশ্রমিক নিয়ে যে জটিলতা ছিল, তা অব্যহত ছিল তৃতীয় আসর পর্যন্ত। অবশেষে বিসিবি নিজেদের হাতে ক্রিকেটারদের পাওনা পরিশোধের পুরো দায়িত্ব নিয়ে নিলে সেখানে স্বস্তি ফিরে আসে। কিন্তু সৃষ্টি হয় নতুন নতুন সমস্যার। ভারতের আইপিএলের সাথে পাল্লা দিয়ে ক্রিকেটারদের আকাশচুম্বী পারিশ্রমিক নির্ধারণ করে ফ্যাঞ্চাইজিদের বিপদে ফেলে দেয় বিসিবি। সে কারণে পুরো অর্থ প্রথম আসরে খুব কম ক্রিকেটারই পেয়েছেন। ফ্র্যাঞ্চাইজিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোন সুরাহা হয়নি। সে কারণে সে সময় যারা অর্থ পাননি তারা আশাই ছেড়ে দিয়েছেন! যদিও শুরুর সময়ের অনেক ফ্র্যাঞ্চাইজি এখন আর বিপিএল’র সাথে নেই। বেশিরভাগই বহিষ্কার তরা হয়েছে। প্রথম আসরের সেমিফাইনাল নির্ধারিত হওয়া নিয়ে যে কান্ড ঘটে যায় তা এখনো মনে আছে দর্শকদের। যে বরিশালকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেই দলের অষ্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার ব্র্যাড হজ চলে গিয়েছিলেন বিমানবন্দরে। কিন্তু তাকেই আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। দ্বিতীয় আসরে অনিয়ম আর অব্যস্থাপনার সাথে যোগ হয় ফিক্সিং বিতর্ক। সেখানে তো বিদেশী বেশ কয়েকজন ক্রিকেটারের সাথে মোহাম্মদ আশরাফুল ও ফ্র্যাঞ্চাইজি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার শিহাব চৌধুরীকে শাস্তি দেয়া হয়। এখানেই শেষ হলে ভাল ছিল। কিন্তু বিপিএল যেন বিতর্ক ছাড়া ভাল থাকতে পারে না। গত দুই আসরে বিসিবি অনেক চেষ্টায় একটা পর্যায়ে নিয়ে এসেছিল বিপিএলকে। বিশেষ করে বকেয়া নিয়ে ঝামেলা থেকে পাওয়া গেছে মুক্তি। এবার যোগ হয়েছে নতুন কেলেঙ্কারি। তাতে এবার আর বিদেশী কোন ক্রিকেটারের নাম জড়ায়নি, জড়িয়েছে শুধু বাংলাদেশী ক্রিকেটারের নাম। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের সাথে পার্টি, নাচ-গান নিত্য নৈমিত্তিক বিষয় হলেও আমাদের ক্রিকেটাররা তাতে অভ্যস্ত নয়। সে কারণেই নতুন নতুন বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছেন খেলোয়াড়রা। এটা এখন ক্রিকেট বিশ্লেষকদের বড় একটা অংশের অভিমত। যদিও বিপিএল বন্ধ করে দিতে অনেক কথা শোনা গেলেও বেশিরভাগেরই দাবী সমস্যা কাটিয়ে যেন আসরটি নিয়মিত করা হয়। কারণ শরীরের কোন জায়গায় ঘা হলে তাতে চিকিৎসা করিয়ে ভাল করে তুলতে হয়। সেই জায়গা কেটে ফেলার মধ্যে কোন সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়না। তাই বিপিএলকে নির্ঝঞ্ঝাটভাবে আয়োজনের জন্য মাঠ ও মাঠের বাইরে সচেতনতার বিকল্প নেই। সে কারণেই ত্যক্ত বিরক্ত না হয়ে বিপিএলকে আরো আকর্ষণীয় করার কোন বিকল্প দেখছেন না খেলোয়াড়, কোচ, কর্মকর্তারা। কারণ এই আসরেই কেবল ৭ জন বাংলাদেশীর সাথে ৪ জন বিদেশী খেলোয়াড় খেলে থাকেন। কুমার সাঙ্গাকারা, মাহেলা জয়াবর্ধনে, ক্রিস গেইল, শহীদ আফ্রিদি, ডোয়াইন ব্রাভোদের সাথে একটি মাস একই হোটেলে থেকে, এক সাথে অনুশীলন করে শেখার যে সুযোগ রয়েছে সেটাকে পায়ে মাড়িয়ে নষ্ট করার কোন মানে হয়না। এতে ক্ষতি হবে দেশের ক্রিকেটরই। কারণ ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক আসরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানান ধরনের অভিযোগ ওঠে। তবুও কোন আসরকেই বন্ধ করে দেয়া হয়নি। নিয়মের পরিবর্তন আনা হয়েছে। আর এই কাজটাই করতে হবে ক্রিকেট বোর্ডকে।
জুপিটার ঘোষের অভিযোগ
খেলোয়াড় হিসেবে তার আহামরি কোন পারফরম্যান্স নেই, নামটাও তেমন পরিচিত নয় ক্রিকেট মহলে। তবুও আলোচনায় জুপিটার ঘোষ। শুরুটা ভাল হলেও মাঝামাঝি সময়ে এসে বিতর্ক ছড়িয়েছে বিপিএল। ২৮ ম্যাচ মাঠে গড়ানো পর্যন্ত  ফিক্সিং এর অভিযোগ পাওয়া যায়নি। শেষ মুহূর্তে এসে রংপুর রাইডার্সের ক্রিকেটার জুপিটার অভিযোগ করেছেন তাকে ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। আর তাতে রাজি না হওয়াতে তাকে দল থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। জুপিটারের অভিযোগ তাকে দলের ম্যানেজার ও জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার সানোয়ার হোসেন ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন রংপুর রাইডার্সের চেয়ারম্যান ড. কাজী ইরতেজা হাসান ও ম্যানেজার সানোয়ার হোসেন। উল্টো জুপিটার ঘোষের বিপক্ষে দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও অনৈতিক কার্যকলাপের অভিযোগ করেন ম্যানেজার। তিনি বলেন, ‘জুপিটার যা বলেছেন তা একেবারেই মিথ্যা। তাকে আমরা দল  থেকে বিপিএল শুরুর আগেই বহিষ্কার করেছিলাম দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে। এই বিষয়ে বিসিবিও বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলও অবগত আছে। জুপিটার দলের পার্টি থেকে রুমে ফিরেছিল রাত দুইটার পর। অথচ সব ক্রিকেটারকে ১২টার মধ্যে রুমে ফেরার কথা জানানো হয়েছিল। এছাড়াও পার্টিতে  সে মদ খেয়ে বাজে আচরণ করছে। এমনকি তাকে আমরা রুম  থেকে মেয়ে নিয়েও বের হতে দেখেছি। সে কারণে আমরা তাকে ৪ নভেম্বর বহিষ্কার করি। তাকে শোকজ লেটারও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সে এতদিন পর বলছে যে তাকে ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলাম সেটি প্রতিশোধ নিতেই বলছে।’ রংপুর রাইডার্স দলটির অন্যতম মালিক ড. কাজী ইরতেজা হাসান বলেন, ‘এভাবে অভিযোগ করাটাও অখোয়াড়ীসুলভ আচরণ হিসেবে প্রমাণিত। এই ক্রিকেটার যে অভিযোগ করেছে তাকে আমরা নিয়েছিলাম দলের শেষ ব্যাক আপ ক্রিকেটার হিসেবে। তার একাদশে খেলার সম্ভাবনা ধরতে গেলে ছিলই না। সে যে অভিযোগ করেছে সেটি ভুল কারণ সাধারণ দলের যারা টপ পারফরমার হয় বা যাদের উপর জয়-পরাজয় নির্ভর করে তাদেরই ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব দেয়া হয়। তাকে কেন! আসলে তার বিরুদ্ধে দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গের কড়া অভিযোগ আছে।
মামলায় কি সমাধান?
রংপুর রাইডার্সের সম্মান ক্ষুণ্ন করায় মানহানির মামলা করতে পারেন ফ্র্যাঞ্চাইজিটির মালিকপক্ষ। অপপ্রচার চালানো ও দলের ভাবমুর্তি ক্ষুণ্ন করায় বহিষ্কৃত অলরাউন্ডার জুপিটার ঘোষের বিপক্ষে মানহানির মামলা করবে বলে জানিয়েছেন, দলটির  চেয়ারম্যান ড. কাজী এরতেজা হাসান। তিনি বলেন, ‘যে ক্রিকেটারকে আমি দলে নিয়েছি, আমার জেলার আশেপাশের মানুষ বলে। কিন্তু সে তো দলের নিয়মিত ক্রিকেটার নন। তাকে ব্যাকআপ ক্রিকেটার হিসেবে দলে নেয়া হয়েছে। আর এ রকম একজনের কথায় ম্যাচ ফিক্সিং হতে পারে বলে আমার বিশ্বাস হয়না। আমরা তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করার কথা ভাবছি। দলের পরিচালকরা আছেন, সবাই বসে আমরা এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিব।’ দিন কয়েক আগে একটি বেসরকারি  টেলিভিশনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে জুপিটার অভিযোগ করেন, তাকে ম্যাচ ফিক্সিংয়ে প্রস্তাব দিয়েছিলেন রংপুর রাইডার্সের ম্যানেজার সানোয়ার হোসেন। তার অভিযোগ, ‘সানোয়ার ভাই আমাকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন কেবল ম্যাচ ফিক্সিংয়ে রাজি হলেই তাকে একাদশে নেয়া হবে। কিন্তু আমি সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলে আমার ওপর তিনি নাখোশ হন।’ তার দাবি, এরপরই শৃঙ্খলা ভঙ্গের অজুহাত দেখিয়ে তাকে দল থেকে অন্যায়ভাবে  বের করে দেয়া হয়। সানোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবার নতুন নয়। এর আগেও জাতীয় দলের সাবেক এ ক্রিকেটারের উঠেছিল অভিযোগ। বিপিএল’র দ্বিতীয় আসরে স্পট ফিক্সিংয়ের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটর্সের ক্রিকেটার মোহাম্মদ আশরাফুল এবং দলটির মালিক সেলিম চৌধুরী এবং তার ছেলে সিহাব চৌধুরী হয়েছেন,  সেই ঘটনায় ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটর্সের টিম ম্যানেজার সানোয়ার  হোসেনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠিয়েছিলেন দলটির কোচিং স্টাফের একজন। টিম ম্যানেজার বলে ক্রিকেটারের হাতে সম্মানী এবং ভাতা তুলে দেয়ার দায়িত্ব অর্পিত হওয়ায় অনৈতিক প্রস্তাব তার পক্ষ থেকে দেয়া হতো বলেও মিডিয়ায় অভিযোগ করেছিলেন তিনি। এবার শেষটা কেমন হবে এটাই দেখার বিষয়। কারণ এটি এখন বাংলাদেশের ক্রিকেটের ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ