ঢাকা, বৃহস্পতিবার 8 December 2016 ২৪ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

স্বস্তি আর আক্ষেপ নিয়ে মাশরাফির চ্যাম্পিয়ন কুমিল্লার বিদায়

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : প্রবাদ আছে, ‘শেষ ভালো যার-সব ভালো তার’। বিপিএল শুরুর প্রথম দিকে ধারাবাহিকভাবে পরাজয়ের স্বাদ নেয়া গতবারের চ্যাম্পিয়ন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স শেষদিকে জ্বলে উঠলেও প্রাথমিক পর্ব থেকেই তাদের বিদায় নিতে হয়েছে। বাংলাদেশের সফল ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফির নেতৃত্বাধীন এ দলের এমন পরাজয় ভক্তরা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। যদিও টিম ম্যানেজমেন্টের সাথে সেরা একাদশ গঠন নিয়ে কিছুটা দূরত্ব ছিল অধিনায়কের। খেলার মাঝপথে সেটির অবসান হলেও বেশ দেরি হয়ে গেল এই ভুল বুঝাবুঝির ফল পেতে। মাত্র ৫ ম্যাচে তারা জয় পেয়েছে। যদি আরেকটি ম্যাচ জিততে পারতো তাহলে হয়তো সেরা চারে সুযোগটা পেতেও পারতো পরিকল্পনা মন্ত্রীর মালিকানাধীন এই কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স। তবে গত বিপিএলে শেষ ম্যাচটি জিতেছিল কুমিল্লা। এবারও জিতল নিজেদের  শেষ ম্যাচ। তবে সেটি ছিল ফাইনাল। এবার এটি প্রাথমিক পর্ব!  সেবারের জয়ে ধরা দিয়েছিল শিরোপা। এবারের জয় বাড়াল আক্ষেপ। ভক্তদের ভাষায়, এই জয়ের ধারা যদি শুরু হতো আরেকটু আগে, যদি থাকত অন্তত আরেকটি জয়!
টানা চার জয়ের স্বস্তি আর আরেকটু না পারার আক্ষেপ নিয়ে শেষ হলো কুমিল্লার বিপিএল। প্রাথমিক পর্বের শেষ দিনের প্রথম ম্যাচে রংপুর রাইডার্সকে ৮ রানে হারিয়েছে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স। কুমিল্লার ১৭০ রান তাড়ায় রংপুর তুলতে পারে ১৬২। কুমিল্লাকে বড় স্কোরের ভিত্তি গড়ে দেয় ইমরুল কায়েস ও খালিদ লতিফের উদ্বোধনী জুটি। গতবার ফাইনালে দারুণ অর্ধশতক করা ইমরুল এবার প্রথম অর্ধশতক করেছেন শেষ ম্যাচে এসে। পরে কয়েকজনের টুকটাক অবদানে কুমিল্লা স্পর্শ করে ১৭০। রান তাড়ায় রংপুরের শুরুটা ছিল দারুণ। তবে সেটা কেবলই একজনের সৌজন্যে। মোহাম্মদ শাহজাদের ব্যাটে যখন ঝড়, এক পাশে সৌম্য সরকার তখন স্রেফ দর্শক। তবে নিজের সহজাত প্রবৃত্তিকে দমিয়েও রানে ফেরা হয়নি সৌম্যর। নাবিল সামাদকে ফ্লিক করে উড়িয়ে ফিরলেন ক্যাচ হয়ে। ৩৪ বলে ৪৮ রানের উদ্বোধনী জুটি যখন ভাঙল, সৌম্যর রান ১২ বলে ৫! নাবিল পরে ফেরান লিয়াম ডসনকে। মিঠুনকে থিতু হতে দেননি মাশরাফি। কুমিল্লা অধিনায়ক পরে ইনকাটারে ফেরান শাহজাদকে। আফগান ওপেনার করেছেন ৩১ বলে ৪৫। ৯ রানের মধ্যে ৪ উইকেট হারিয়ে তখন ম্যাচ থেকে ছিটকে যাওয়ার পথে রংপুর। স্তিমিত আশা আবার জেগে ওঠে শহীদ আফ্রিদির ব্যাটে। কুমিল্লার বাজে বোলিংয়ে সুযোগ নিয়ে পাকিস্তানি অলরাউন্ডার করেন ১৯ বলে ৩৮। বিপজ্জনক হয়ে ওঠা আফ্রিদিকে ফেরান রশিদ খান। নিজের আদর্শ ক্রিকেটারকে দারুণ এক গুগলিতে বিভ্রান্ত করেন আফগান লেগ স্পিনার। রশিদ এর আগেই ফিরিয়েছেন রংপুর অধিনায়ক নাইম ইসলামকে। আফ্রিদির বিদায়ে মনে হচ্ছিল রংপুরের আশারও সমাপ্তি। জিয়াউর রহমান তবু হাল ছাড়েননি। চেষ্টা করেছেন। তবে পেরে ওঠেননি শেষ পর্যন্ত। ২২ বলে অপরাজিত থাকেন ৩৮ রানে। কাছে গিয়ে হারায় তবু খুব বড় ক্ষতি হয়নি রান রেটের। রান রেটের সমীকরণ মেলাতেই এ দিন টস জিতে ফিল্ডিং নেয় রংপুর। কিন্তু তাদের বোলারদের দিশাহারা করে ছাড়েন ইমরুল ও লতিফ। ৬২ বলে ৮৮ রানের উদ্বোধনী জুটি গড়েন দুজন। কুমিল্লার জয়ে প্লে অফ নিশ্চিত হয়ে গেল রাজশাহী কিংসের। চিটাগং ভাইকিংস, খুলনা টাইটানস ও রংপুরের সমান ১২ পয়েন্ট রাজশাহীর। তবে রান রেটে এগিয়ে চিটাগং ও রাজশাহী। রংপুরের চেয়ে রান রেটে পিছিয়ে খুলনা। এবারের আসরের শেষ ম্যাচের দিকে তাকিয়ে ছিল ঢাকা ডায়নামাইটস। রংপুর তাকিয়েছিল ওই ম্যাচের দিকে। খুলনা জিতলে তারাই খেলবে প্লে অফে, হারলে উঠে যাবে রংপুর। কিন্তু শেষ ঢাকাই জয় পেলো।
গত তিনটি বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ (বিপিএল টি-২০) আসরে দলকে নেতৃত্ব দিয়ে শিরোপা জিতেছেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। বিশেষ করে গত আসরে নবাগত কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের দুর্বলতর দলকেও নেতৃত্বগুণে চ্যাম্পিয়ন করেছেন। এবার সেটা পারেননি। প্রথমবারের মতো অন্য কেউ শিরোপা জিতবে। লীগপর্ব থেকে বিদায় নিলেও ৫ জয়ে শেষ করায় সন্তুষ্ট মাশরাফি জানান, জাতীয় দলের সতীর্থ কারও শিরোপা জয় দেখে উপভোগ করবেন এবার। চলতি আসরে জাতীয় দলের অনেক ক্রিকেটারই দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখিয়েছেন। একই সঙ্গে কয়েকজন ব্যর্থ হয়েছেন। নতুনদের মধ্যে অনেকে নজর কেড়েছেন। তবে জাতীয় দলের আসন্ন নিউজিল্যান্ড সিরিজে এদের সবার জন্যই চ্যালেঞ্জ দেখতে পাচ্ছেন মাশরাফি। তিনি মনে করেন, যারা ভাল করেছে তারা হয়তো কিছুটা আত্মবিশ্বাসী থাকবে- কিন্তু নিউজিল্যান্ডের পরিবেশে ভাল করা কঠিন হবে।
এবার বিপিএল শুরুর পর থেকেই টানা পরাজয়ে পিছিয়ে পড়েছে কুমিল্লা। শেষ মুহূর্তে টানা চার ম্যাচ জিতে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় দলটি। এরপরও লীগপর্ব থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। এ বিষয়ে দলের অধিনায়ক মাশরাফি বলেন, আমরা পাঁচ-ছয়টা ম্যাচ পর্যন্ত সবার নিচে ছিলাম। ছয়ে শেষ করলেও ১০টা পয়েন্ট নিয়ে শেষ করতে পেরেছি। আমি মনে করি খেলোয়াড়দেরও সবার খুব ভাল লাগছে। আমারও ভাল লাগছে। জাতীয় দলের কোন্ সতীর্থ এবার শিরোপা জিতবেন- এটা দেখাও সন্তুষ্টির বলে মনে করেন তিনি। এ বিষয়ে মাশরাফি বলেন, এবার দেখে শান্তি পাব। শেষ তিনবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। অবশ্যই ভাল লেগেছে। এবার আমাদেরই সতীর্থ কেউ হবে। তো আফসোসের কিছু নেই। অবশ্যই উপভোগ করব। এবার বিপিএল-এ তরুণ নাজমুল হোসেন শান্ত, মেহেদী মারুফসহ অনেকেই আলো ছড়িয়েছেন। তবে ব্যর্থ হয়েছেন সৌম্য সরকার। এ বিষয়ে মাশরাফি বলেন, ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টে ১৮, ১৯ বা ২০ বছরের ছেলে যারা তাদের জন্য আরেকটু কঠিন হয়ে যায়। তারপরও ভাল যে ওরা কামব্যাক করেছে। সৌম্য হয়তো বড় রান করতে পারেনি। এখন উইকেটগুলো আর ওরকম নেই। বরং বাংলাদেশের উইকেটে রান করা আরও কঠিন এখন। নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকার কথা শুনলেই আমরা ভাবি যে সিমিং কন্ডিশন। আসলে ওই রকম কিছুই থাকে না। বরং আপনি দেখবেন ওখানকার উইকেটে ৩৫০-৪০০ রান করে খেলা হয়। শটস খেলতে ব্যাটসম্যানদের সুবিধা আরও অনেক বেশি। আমার কাছে মনে হয় এখান থেকে ওখানে রান করায় ব্যাটসম্যানদের জন্য সুবিধা হবে যদি মানসিক প্রস্তুতি ঠিক থাকে।
আগামী ২৬ ডিসেম্বর থেকে জাতীয় দলের নতুন চ্যালেঞ্জ শুরু নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ওয়ানডে দিয়ে। সফরে ৩ ওয়ানডে, ৩ টি-২০ ও ২ টেস্ট খেলবে বাংলাদেশ দল। বিপিএলে যারা সফল কিংবা ব্যর্থ হয়েছেন তারা নিউজিল্যান্ডের মাটিতে কি করবেন? এ বিষয়ে মাশরাফি বলেন, টি-২০ দিয়ে যদি বড় পরিসরে তাকান তাহলে ওই খেলোয়াড়ের সঙ্গে অন্যায় করা হবে। প্রথমত এখানে টি-২০তে আমি কোন খেলোয়াড়কে বিচার করি না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যদি বলেন এখান থেকে যারা ভাল করছে তাদের যদি পরিচর্যা করা যায় তাহলে আলাদা কথা। কিন্তু সরাসরি যদি ওই পর্যায়ের কথা ভাবেন, এটা এমন না যে ১৯-২০ পার্থক্য- অনেক অনেক বেশি পার্থক্য। তবে বিপিএল-এ সফলদের জন্য নিউজিল্যান্ডে ভাল করার ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস জোগাবে। এ বিষয়ে মাশরাফি বলেন, ‘আমরা যে ক্রিকেট খেলতে যাব কিংবা জাতীয় দল যে খেলতে যাবে এটার সঙ্গে সেটার কোন মিল নেই। যদি এটা চিন্তা করেন যে এখানে ভাল খেলেছে ওখানেও ভাল হবে- তা হবে না। কারণ ওখানে প্রথমত কন্ডিশন ভিন্ন, উইকেট ভিন্ন। যারা রান করেছে তারা আত্মবিশ্বাসী থাকতে পারে। বোলিংয়ে এখানে যেমন করেছে ওখানে আরও কঠিন হবে। বোলারদের আরও কাজ করতে হবে। তারপরও যারা উইকেট পেয়েছে, যারা রান পেয়েছে তারা আত্মবিশ্বাস নিয়ে যেতে পারবে যে তারা রান করেছে, উইকেট পেয়েছে।’
প্রথম তিনটি বিপিএলেই ফাইনাল শেষে দেখা গেছে একটি ছবি, ট্রফি হাতে হাস্যোজ্জ্বল মাশরাফি বিন মুর্তজা। বিপিএলে শিরোপার স্বাদ পাওয়া একমাত্র অধিনায়ক মাশরাফিই। এবার সেই স্বাদ পাবেন অন্য কেউ, তিনি দেখবেন। সেই দেখার মাঝেই শান্তি খুঁজে নিচ্ছেন মাশরাফি। প্রথম দুবার ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটর্স, গতবার কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের হয়ে শিরোপা জিতেছেন অধিনায়ক মাশরাফি। এবারও তার কাঁধে ছিল কুমিল্লার ভার। কিন্তু শেষ চার ম্যাচ জিতলেও কুমিল্লা ছিটকে গেছে প্লে অফের আগেই। এই প্রথম তাই প্লে অফ আর ফাইনালে মাশরাফি থাকবেন কেবলই দর্শক। “এবার দেখে শান্তি পাবো! শেষ তিনবার চ্যাম্পিয়ন হযেছি। অবশ্যই ভালো লেগেছে। এবার আমাদেরই সতীর্থ কেউ হবে। আফসোসের কিছু নেই্। এ ধরনের টুর্নামেন্টে এমনই হয়। অবশ্যই উপভোগ করবো। বিশেষ করে তিনটি সেমি-ফাইনাল (প্লে অফ) হবে, একটা ফাইনাল। উপভোগ করবো।” ট্রফির ছোঁয়ার দৌড়ে মাশরাফি আপাতত এগিয়ে রাখছেন বাংলাদেশ জাতীয় দলে তার সহকারী অধিনায়ক সাকিব আল হাসানকে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ