ঢাকা, শুক্রবার 9 December 2016 ২৫ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ছাড়াছাড়ি

আহমেদ উল্লাহ্ : সাত বছরের সুখের সংসার এমন ধপ্ করে হঠাৎ ভেঙে যাবে, এটা জুনু কখনও কল্পনা করেনি। সংসার ভাঙার মতো এমন কোনো তর্ক-বিতর্ক, ঝগড়া বিবাদ কখনও হয়নি স্বামীর সঙ্গে। মাঝে মাঝে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কিছুটা মত-বিরোধ থাকলেও দুজনার চলাফেরা ছিল স্বাভাবিক।
আচমকা বাবাকে ডেকে এনে দেনাপাওনা বুঝিয়ে দিয়ে, ডিভোর্স লেটারসহ বিদায় করে দেয়ার সিদ্ধান্তটা বড়ই ব্যথিত করে তুলেছে জুনুকে! ঘটনাটা অনেকটা পিলে চমকানোর মতোই নয়, বরং ত্রিশ সেকেন্ডের একটা স্বপ্নের মতোই মনে হচ্ছে!
এমন ঘটনা কেমন করেই-বা ঘটতে পারে, যেখনে দুজনার আন্তরিকতার কমতি নেই এতটুকুও। পরশ যাকে ভালোবেসে বিয়ে করতে চেয়েছিল, কলেজে পড়াকালীন সময়েই ওই মেয়েটির অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায়। তারপর থেকেই সে মনস্থির করে রেখেছিলÑ কখনও বিয়ে করবে না। ওই মেয়েটির স্মৃতি নিয়েই জীবন কাটিয়ে দিবে।
এভাবে চলতে চলতেই বাবা একবার গ্রাম থেকে ঢাকায় ফিরে, পরশকে ডেকে সামনে বসিয়ে বলেছিলেন, ‘বিয়ের ব্যাপারে এবার তুই আর ‘না’ করতে পারবি না! আসার সময় পাশের গ্রামের একটি মেয়েকে দেখে এসেছি, নাম জুনু; কলেজে পড়ে। বাবা আর্মিতে চাকরি করতো, এখন অবসরে। মেয়েটি দেখাশুনায় যেমন সুন্দরী, তেমনি লম্বাচূড়াও। আমি বিশ্বাস করি, না দেখে বিয়ে করলেও তোর পছন্দ হবেই।’
কিছুটা নড়েচড়ে বসে পরশ বলেছিল, ‘আমি বিয়ে করবো না। আমার পার্সোনাল ব্যাপারে আপনি অযথা পেরেশান হবেন না।’  এই বলেই ঘর থেকে বের হয়ে যেতে চাইলে, তাকে ডেকে দাঁড় করিয়ে বাবা বলেছিলেন, ‘তাহলে তুমি চির কুমার হয়েই থাকতে চাও, তাই না? নাকি সন্ন্যাসী হয়ে যাবে! সন্ন্যাসী হতে চাইলে, চাকরির আর কী প্রয়োজন! সব ছেড়ে জঙ্গলে চলে গেলেও পারো!’
পরশকে কোনো প্রতিত্তুর করতে না দেখে, বাবা আবারও বলেছিলেন, ‘বিয়ে কর, আর নাই-বা কর, তাতে আমার বলার আর কিছু নেই। তবে, সময় হলে একবার গিয়ে মেয়েটিকে দেখে এসো। যে মেয়ে তোমাকে ছেড়ে চলে গেছে, তার জন্য অযথা কতই না দুঃখ করছো! এখন তোমার জীবনসাথী হওয়ার জন্য যার প্রস্তাব এসেছে, তাকে যদি একবার না দেখেই ফিরিয়ে দাও, তবে তার জন্য কতটুকু আক্ষেপ করবে; সেটা বোঝবে কী করে!’
পরশ চুপ হয়ে বাবার কথাগুলো শুনেছে, কিছুই বলেনি। চিন্তিত মনে তাকে চুপ হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে বাবা বলেছিলেন, ‘এবার যেতে পারো’...
পরশ নিঃশব্দে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
মন চঞ্চল হয়ে উঠেছিল, পরশের মনও তেমনি চঞ্চল হয়ে উঠেছিল জুনুকে একনজর দেখার জন্য।
কাউকে না জানিয়ে একদিন চলে গেল গ্রামের বাড়ি শিবনগরে। পাশের গ্রাম দূর্গাপুর, শিবনগরের পাশ ঘেঁষে অবস্থান করলেও, মাঝখান দিয়ে একটি চিকন খাল গ্রাম দুটিকে পৃথক করে রেখেছে। গ্রামের এক সহপার্ঠী শিশিরকে নিয়ে খাল পাড়ি দিয়ে দূর্গাপুরে গিয়ে হাজির হয়। অহেতুক বায়না ধরে দুজনে গিয়ে প্রবেশ করে মন্তাজ মন্ডলের বাড়িতে।
বাড়িতে প্রবেশ করেই দেখতে পেলÑ আঠারো কি ঊনিশ বছরের একটি বালিকা বারন্দার সামনের ফুলগাছে পানি ঢালছে। অপরিচিত লোকদের বাড়িতে না বলে ঢুকতে দেখে, মেয়েটি গলায় ঝুলানে উড়নি বুকে টেনে দ্রুত ভেতরের ঘরে চলে গেল। এরই মধ্যে পরশ তাকে দেখতে এতটুকুও অসুবিধা হয়নি।
বাড়িতে অপরিচিত লোকের অনুপ্রবেশ দেখে মন্তাজ মন্ডল বের হয়ে এসে তাদের পরিচয় জানতে চাইলে, শিশির বলেছিল, ‘এটা কি নূর আহমেদ এর বাড়ি?’
বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে মন্তাজ মন্ডল বলেছিল, ‘না, কিন্তু তোমরা কে?’
‘শিবনগর আমাদের বাড়ি। আমি শিশির, ওমর আলী প্রধানের ভাতিজা। আমার পাশে যে দাঁড়িয়ে আছে, সে ওমর আলী প্রধানের ছেলে পরশ।’
সাময়িক নীরবতার পর মন্তাজ মন্ডল বলেছিল, ‘এটা নূর আহমেদ এর বাড়ি নয়, ওদের বাড়ি আরো সামনে এগিয়ে।’
‘দুঃখিত! ভুল করে বাড়িতে ঢুকে গেছি বলে, আমাদের প্রতি বিরক্ত হবেন না।’ এই বলেই দ্রত দুজনে বের হয়ে যায় বাড়ি থেকে।
পুরো গ্রামময় ঘুরে বেড়িয়ে, ফেরার পথে মন্তাজ মন্ডলের বাড়ির পূর্ব দিকের ফসলের জামির আইল দিয়ে হেঁটে আসার সময়, আচমকা শিশিরের চোখ গিয়ে পড়েÑ মন্তাজ মন্ডলের পুকুরের পাড়ে। কৌতূহলবশত ঘন ঝোপঝাড়ে আবৃত্ত পুকুরের পাড়ে গিয়ে দাঁড়ানোর পরই দেখা গেলÑ ওই মেয়েটিই কলসিতে পানি ভরছে। পরশ এপার থেকে তীক্ষè দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে! হেঁটে হেঁটে কিছুটা নিকটে এসে বেশ ভালো করে তাকে দেখছে!
গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পরশ ভাবছেÑ বাহ! কী অপূর্ব! এক অজো পাড়াগাঁয়ে এমন ফুলের জন্ম হতে পারে, তা অবাক করার বিষয়! কলসি ভরে পানি নিয়ে মেয়েটি চলে যাওয়ার পর, পুকুরপাড় ত্যাগ করে বাড়ির দিকে পা বাড়ায় দুজনে।
পরদিন ঢাকায় গিয়ে অফিস করে বাসায় ফেরার পর খাবার খাওয়ার সময় টেবিলের অপরপ্রান্তের চেয়ারে বসে খেতে খেতে বাবা বলেছিলেন, ‘গতকাল বাসায় ফিরোনি কেন? কোথায় রাত কাটিয়েছ?’
পানি পান করে গলাটা পরিষ্কার করে অন্য দিকে তাকিয়ে পরশ বলেছিল, ‘গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম।’
চমক রাঙানো দৃষ্টিতে তাকিয়ে মুচকি হেসে বাবা বলেছিলেন, ‘বাহ! না-বলে গ্রামে যাওয়াটা এই প্রথম দেখলাম। নিশ্চয় মন্তাজ মন্ডলের মেয়েটিকে দেখে এসেছো!’
চুপ হয়ে নির্বাক খাবার খাচ্ছে পরশ, কোনো কথা বলছে না। ওমর আলী, স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে পুনরায় পরশের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘সিদ্ধান্তের কি কোনো পরিবর্তন ঘটেছে?’
গোগ্রাসে খাবার খেয়ে ত্বরিত হাত ধুয়ে রুম ছেড়ে বের হয়ে যাওয়ার সময় আমতা আমতা করে পরশ এটুকুই বলেছিল, ‘আমার কোনো সিদ্ধান্ত নেই, আপনারা যা ভালো মনে করেন, তাই করুন...
ওমর আলী চমকমাখা চাহনিতে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী বুঝলে পরশের মা?’
হাসিমাখা বাক্যে স্ত্রী বলেছিলেন, ‘মনে হয়Ñ মেয়ে দেখে পছন্দ হয়েছে ঠিকই!’
খিলখিল হেসে ওমর আলী বলেছিলেন, ‘তাহলে আর দেরি করার কী প্রয়োজন! কথাবার্তা শেষ করে ফেলি!’
স্বামীর প্লেটে তরকারি তুলে দিতে দিতে স্ত্রী বলেছিলেন, ‘যা করার শীঘ্রই করেন, কোনসময় মতের পরিবর্তন হয়ে যায়, তার ঠিক নেই।’
সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই ওমর আলী পুত্রকে বিয়ে করিয়ে বউ তুলে নিয়ে আসেন নিজ বসায়।
রূপ ও গুণের কোনো কমতি ছিল না জুনুর মাঝে। আচার আচরণ, মার্জিত ব্যবহার এবং স্বামীর প্রতি ভালোবাসা দিয়ে পরিবারে নিজের অবস্থান শক্ত করতে খুব একটা সময় লাগেনি তার। জুনুর ভালোবাসার অতলে নিজেকে ডুবিয়ে দিয়ে পরশ স্বর্গের সুখ উপভোগ করছে...
কয়েক বছর অতিবাহিত হতে না হতেই তাদের কোলজুড়ে প্রথম পুত্র সন্তান জন্ম নেয়। কিন্তু ওমর আলী নবাগতের মুখ দেখে যাবার সময় পায়নি। পরশের বিয়ের বছর খানেকের মধ্যেই হঠাৎ হার্টফেল করে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তবে, তার মৃত্যুর সময় তিনি কোনোপ্রকার আক্ষেপ করে যাননি। পুত্রের সংসারে সুখের ইঙ্গিত দেখেই তিনি পরজগতে যাত্রা করেন।
ওমর আলী পরজগতে গিয়ে বেশিদিন একলা থাকতে পারেননি। পৃথিবীতে বেঁচে থাকাকালীন সময়ে স্ত্রীকে সবসময় তার কাছেই রাখতে পছন্দ করতেন। অফিস থেকে ফিরে এসে বারান্দায় বসে বসে দুজনের গল্প করার সময়টা ছিল সবচেয়ে আনন্দঘন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দুজনে ছিল কাছাকাছি। মৃত্যুর সময় হাসপাতালের বেডে শায়িতাবস্থায় স্ত্রীর হাতের ওপর হাতটি রেখেই ওমর আলীর প্রাণবায়ু বের হয়ে যায়।
পরজগতের পাড়ি দেয়ার পর বছরখানেকের মধ্যেই স্ত্রীও একই পথের যাত্রী হন। পরশ বাবা-মা হারিয়ে বড়ই একা হয়ে গেল। পৃথিবীটা তার কেমন নির্দয় ও নিষ্ঠুর মনে হতে শুরু করে। স্ত্রীর সাথে শলাপরামর্শ করে মায়ের কুলখানি গ্রামে সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়।
সকল আত্মীয়-স্বজনের উপস্থিতিতে গ্রামে এসে মায়ের কুলখানির আয়োজন করে। বহুলোকের নিমন্ত্রণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান চলছে। দুয়েক গ্রামের খুব লোকই সেই অনুষ্ঠানের দাওয়াত থেকে বাদ পড়েছে। দিনভর চলছে ভোজনের মহাসমারোহ! কেউ খাচ্ছে, কেউ খেয়ে বিদায় হয়ে গেছে এবং অনেকেই খাওয়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।
পরশ ঘুরে ঘুরে মেহমানদের তদারকি করছে। ভাইবোনদের নিয়ে পুরো টেবিল দখল করে খাবার খাচ্ছে জুনু। এমন সময় দুরবর্তী একটি টেবিলে বসে কয়েকজন খাচ্ছে আর হাসাহাসি করছে। তাদেও বিদ্রুপময় হাসাহাসি দেখে পরশ সামনে গিয়ে দাঁড়ানোর আগেই শুনতে পায়, তারা জুনুর নাম উচ্চারণ করে কী যেন বলাবলি করছে। পরশ বেখেয়ালির ভাব ধরে তাদের পাশে দিয়ে দাঁড়িয়ে শুনতে পায়Ñ অপরিচিত একজন বলছে যে, ‘মন্তাজ মন্ডলের মাইয়্যা জুনুর দ্বিতীয় বিয়াটা সুখেরই হয়েছে।’
অন্যজন খাবার মুখে দিয়ে বলে, ‘সুখের হইবে না! প্রথম তো ভাইগ্যা গিয়্যা বিয়া বইছিল। পরেরটা মন্তাজ মন্ডল নিজ পছন্দে দিছে বইল্যাই সুখের হইছে।’
স্ত্রীর নামে এমন কু-কথা শুনে মাথার রক্ত গরম হয়ে উঠেছিল পরশের। নিজেকে সামলে টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে তাদের উদ্দেশ্যে হাসিমাখা বাক্যে পরশ বলল, ‘প্রথম স্বামীটা ছিল একটা জানোয়ার। কত চেষ্টা করেও জুনু তার ভাত খাইত্যে পারেনি।’
মুখ ফিরিয়ে জনৈক ব্যক্তি তার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি কেডায়, আমি চিনি না, তবে প্রথম স্বামীও ভালা পরিবারেরই ছিল, মাইয়্যা নিজ দোষেই তার ভাত খাইত্যে পারে নাই। তবে, এখন যেইখানে বিয়া হইছে, হেইডাও ভালা, বড়লোক; স্বামী শহরে চাকরি করে। দ্যহেন না, মা মরছে বইল্যা কতবড় জেয়াফত করছে। এমনডা কয়জনে করতো পারে!’
পরশের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে! নিঃশব্দে ভোজনাঙ্গন ত্যাগ করে দুরে চলে গেল।
জুনুর আগে বিয়ে হওয়ার কথা এতটা বছর গোপন থাকলেও, অবশেষে আর গোপন রইল না। গোপনে সকল ইতিবৃত্তই গ্রাম থেকে জেনে আসে পরশ। মায়ের মৃত্যুজনিত ঘটনায় কিছুদিন চুপ থাকলেও, একসময় এসে আর নিজেকে চুপ করিয়ে রাখতে পারেনি।
অফিস থেকে বাসায় ফিরেই নিজ বেডরুমে গিয়ে বিমর্ষ-মনে শুয়ে আছে। নিঃশব্দে চিন্তিত মনেক তাকে শুয়ে থাকতে দেখে, স্বামীর পাশে গিয়ে বসে বুকের ওপর হাত রেখে জুনু বলল, ‘ইদানিং কী হয়েছে তোমার! আমার প্রতি এমন অভিমান করছো কেন, বলো তো?’
বুকের ওপর থেকে হাতটি সরিয়ে অন্যদিকে ফিরে যায় পরশ। তার মুখ ফিরিয়ে এনে জুনু বলল, ‘কী হয়েছে, এমন করছো কেন?’ আমার কোথাও কোনো ভুল হয়ে থাকলে, বলো...
শোয়া থেকে ওঠে বসে পরশ বলে, ‘তোমার ভুল হবে কেন, ভুল তো করেছি আমি। তাই প্রায়শ্চিত্ত করবো আমি নিজেই...
হাত চেপে ধরে বিনয়ের সঙ্গে জুনু বলল, ‘বল, কী হয়েছে? প্লিজ...
সাময়িক নীরবতার পর স্ত্রীর চোখে চোখ রেখে পরশ বলল, ‘এত বড় একটি সত্য ঘটনা তুমি কেন এতদিন গোপন করে রেখেছো? আমি তো তোমাকে বিশ্বাস করতাম!’
চমকরাঙা দৃষ্টিতে তাকিয়ে জুনু বলল, ‘তুমি কোন সত্যের কথা বলছো! এতবছর সংসারের পর হঠাৎ আজ কেন এ ধরণের কথা বলছো! তা-ও আবার খুলে বলছো না!’
জুনুর চোখে চোখ রেখে পরশ বলল, ‘তোমার যে আগে একবার বিয়ে হয়েছিল...’
এসব তুমি কী আবোলতাবোল বলছো! আমার বিয়ে হয়েছিল মানে! ইয়ার্কি করছো বুঝি..’
মুচকি হেসে পরশ বলল, ‘স্কুলে পড়াকালীন সময়ে মির্জাপুরের সোহানকে নিয়ে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করোনি তুমি? তার সঙ্গে দুবছর সংসার করোনি?’
‘সোহান... সোহান আবার কে?’
রেগে ওঠে পরশ বলল, ‘সোহানকে তুমি চিনতে পারছো না! এখনো তুমি অস্বীকার করছো! ঠিক আছে, তোমার সঙ্গে তর্ক করব না। সময়ে সব বুঝিয়ে দেব।’
রেগে ওঠে পরশ রুম ছেড়ে বের হয়ে যায়। জুনু বিছানায় বসে কাঁদতে শুরু করে!
পরশ সিদ্ধান্ত নিয়েছেÑ জুনুর সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখবে না। প্রয়োজন হলে একমাত্র ছেলেটিকে নিয়েই জীবন কাটিয়ে দিবে; তবুও তার সাথে ঘর করবে না আর।
ইদানীং অফিস থেকে ফিরতে পরশের রাত হয়ে যায়। আগে কখনো এতটা দেরি করে বাসায় ফিরেনি। বাসায় এসেই স্ত্রীকে কাছে ডেকে নিয়ে সে বলে, ‘তোমার বাবাকে ফোন করেছিÑ ঢাকায় আসার জন্য।’
জুনু কিছুই না বলে, পরশের চোখে দৃষ্টি ফেলে চেয়ে আছে বিষণœ দৃষ্টিতে! অন্যদিকে দৃষ্টি দিয়ে পরশ বলে, ‘তোমার সঙ্গে আমি সর্ম্পক রাখব না। সকল দেনা-পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে, তোমার বাবার হাতে তোমাকে বুঝিয়ে দেব।’
চোখের পানি ছেড়ে জুনু বলে, ‘এসব তুমি কী বলছো পরশ!’
‘কী বলছি, তা বোধ হয় বেশ ভালো করেই বোঝতে পেরেছো! আর কোনো কথা বলার প্রয়োজন মনে করি না।’
কেঁদে কেঁেদ পরশের পায়ে পড়ে জুনু বলল, ‘এত বড় শাস্তি আমাকে দিয়ো না। আমি না হয় ভুল করেছি, অন্যায় করেছি। কিন্তু আমার সন্তানটি তো আর কোনো ভুল করেনি। তার দিকে তাকিয়ে হলে-ও তুমি এত বড় সিদ্ধান্ত নিয়ো না; ছেলেটিকে মাতৃহারা করো না অন্তত!’
আর কোনো কথা না বলে বসা থেকে ওঠে পরশ রুম ত্যাগ করে বারান্দায় চলে যায়।
সারারাত পরশের পায়ে পড়ে কেঁদেছে জুনু, বিনয়ের সহিত কতই না অনুরোধ করেছে। কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে অটল পরশ; তাকে নিয়ে আর সংসার করবে না। জুনু খুব বেশি বিরক্ত করতে থাকলে, পরশ ঘর থেকে বের হয়ে ছাদে গিয়ে দাঁড়ায়, বিষণœ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আঁধারাচ্ছন্ন প্রকৃতির দিকে। আর চোখ বেয়ে বেয়ে অবিরত অশ্রু ঝরছে বুক ভাসিয়ে! এত বছরের সংসার এমন করে ভেঙে দিতেও তার বুক কেঁপে উঠছে বারবার...; এখন কী করলে, ঠিক হবে, তা-ই ভেবে ভেবে অস্থিরমনে ছাদে পায়চারি করছে পরশ...

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ