ঢাকা, শনিবার 10 December 2016 ২৬ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

নাসিক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডারদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে

গতকাল শুক্রবার দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার: নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন (নাসিক) নির্বাচনে ভোটের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই ক্ষমতাসীন আ’লীগ দলের নেতাকর্মী ও ক্যাডারদের দৌরাত্ম্যের মাত্রা ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। গতকাল শুক্রবার সকাল ১১ টার দিকে নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রহুল কবির রিজভী এ অভিযোগ করেন। রিজভী বলেন, এই ভীতির বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। তারা আওয়ামী সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য কমাতে কার্যকর কোন পদক্ষেপই নিচ্ছে না। উল্লেখ্য, আগামী ২২ ডিসেম্বরের ভোটকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে জমজমাট লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিএনপিসহ স্থানীয়রা বলছেন, নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে ধানের শীষের পক্ষের প্রার্থী বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন। তবে তফসিল ঘোষণার পর থেকেই বিএনপির প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন খান এবং দলের কেন্দ্রীয় নেতারা নির্বাচন নিয়ে নানা অভিযোগ তুলছেন।

নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করে রিজভী বলেন, নাসিক নির্বাচনে যদিও নির্বাচন কমিশনার জাবেদ আলী নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সিসিটিভির মতো স্বচ্ছ হবে বলে অঙ্গীকার করেছেন। তথাপিও এখন পর্যন্ত সেটির কোন নজীর দেখা যাচ্ছে না। ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ছাড়া অন্য দলের প্রার্থীরাও ধানের শীষের প্রার্থীর বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করেছেন। নারায়ণগঞ্জ এমনিতেই সন্ত্রাসকবলিত এলাকা, সুতরাং বৈধ অস্ত্র জমা এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কোন উদ্যোগ এখনও পর্যন্ত পরিলক্ষিত হয়নি। রাষ্ট্রক্ষমতায় স্বৈরাচারী শাসক থাকলে পুলিশ রাজনৈতিক সন্ত্রাসের হাতিয়ার হিসেবেই কাজ করে। পৃথিবীতে ভুরি ভুরি এই দৃষ্টান্ত দেখা যায়। আমি বিএনপি’র পক্ষ থেকে নির্বাচনী মাঠের সমতা আনয়নের জন্য অবিলম্বে নারায়ণগঞ্জ স্থানীয় প্রশাসনে নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের বসিয়ে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের জোর দাবি জানাচ্ছি। সুতরাং নাসিক নির্বাচনকে ভয়ভীতিমুক্ত করতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের কোন বিকল্প নেই। 

রিজভী বলেন, আপনারা বিভিন্ন মাধ্যমে জেনেছেন চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের বিষয়ে বাংলাদেশ-ভারত চুক্তি সই হচ্ছে। এ বিষয়ে আমাদের নৌপরিবহন সচিব গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘চট্টগ্রাম ও মংলাবন্দর ব্যবহার, পায়রা বন্দরে টার্মিনাল নির্মাণ এবং কোস্টাল ও প্রটোকল রুটে যাত্রী পরিবহনের বিষয়ে চুক্তি চূড়ান্ত করা হচ্ছে। ভারত কিভাবে বন্দর ব্যবহার করবে এটা নিয়ে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করে একটি এগ্রিমেন্ট চূড়ান্ত করছি।’ বাংলাদেশের নৌসচিব বলেন, সমুদ্র ও নৌপথে চলাচলে নির্দেশনামূলক বয়া, বাতিগুলো দুই দেশ কীভাবে একসঙ্গে পরিচালনা করবে এবং বয়া, বাতিসহ এগুলো যারা পরিচালনা করবে, তাদের প্রশিক্ষণ কীভাবে হবে- সেসব বিষয়ে আলোচনা করে একটি সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত করা হবে। আমরা প্যাসেঞ্জার ক্রুজ সার্ভিস চালু করব। টুরিস্টরা ভারত থেকে অবাধে বাংলাদেশে এসে যে কোনো জায়গা দেখতে পারবেন। আগে তো জাহাজের ক্রুরাও নামতে পারতেন না। এবারের চুক্তিতে দুই দেশের ক্রুদের তিন দিনের অন অ্যারাইভালের ভিসা দেয়ার কথা থাকবে। 

এছাড়াও বাংলাদেশের আকাশসীমা ও বিমানবন্দর ব্যবহার করতে ওপেন স্কাই সুবিধা চায় ভারত। গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে- এ বিষয়ে আলোচনা করতেও কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে ভারত। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা গত ২১ নবেম্বর সচিবালয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেননের সঙ্গে দেখা করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে এভিয়েশনের সেক্টরে কোনো প্রকল্প, প্রস্তাবনা, এজেন্ডা তুলে ধরা হবে কিনা এ বিষয়েও খোঁজ নেন হাইকমিশনার। ভারতীয় হাইকমিশনার ওপেন স্কাই সুবিধা দিতে প্রস্তাব তুলে ধরেন। সর্বশেষ গত ১ ডিসেম্বর শাহজালাল বিমানবন্দরে এক অনুষ্ঠানেও ভারতের হাইকমিশনার ওপেন স্কাইয়ের বিষয়ে প্রস্তাব করেন। সে অনুষ্ঠানে হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা বলেন, ‘যোগাযোগ ব্যবস্থা ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভারত নতুন পলিসিতে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে ওপেন স্কাই সুবিধাকে বাড়াতে যাচ্ছে। এতে করে দু’ দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটবে।’ : হাইকমিশনারের বক্তব্যের জবাবে একই অনুষ্ঠানে রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘হাইকমিশনার ওপেন স্কাইয়ের কথা বলেছেন। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্র্যাকটিকাল ওপেন স্কাই হয়েই আছে। এভিয়েশন খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, একটি দেশের বেসামরিক বিমান পরিবহনে অন্যদেশের আকাশসীমা ব্যবহার করতে অনুমতি লাগে। তবে ওপেন স্কাই চুক্তি থাকলে এ ক্ষেত্রে আলাদা অনুমতির দরকার হয় না। ওপেন স্কাই চুক্তি দুটি দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বা ততোধিক দেশের মধ্যেও হতে পারে। এ চুক্তির মাধ্যমে আকাশসীমা ব্যবহারের পাশাপাশি বিমানবন্দর ব্যবহারের সুযোগ থাকে। এছাড়া বিমানবন্দরে উড়োজাহাজের যাত্রীদের বোর্ডিং ছাড়া জ্বালানি সংগ্রহ, যাত্রীদের অন্য ফ্লাইটে কানেকটিং করার সুবিধা থাকবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘ওপেন স্কাই সুবিধা এই মুহূর্তে বাংলাদেশের দেয়া ঠিক হবে না। আমাদের যে ফ্রিকোয়েন্সি আছে সেটাই আমরা পুরো ব্যবহার করতে পারছি না। ওপেন স্কাই সুবিধা দিলে ভারতের আলাদা ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দ নেয়া লাগবে না। আকাশকে উন্মুক্ত করে দিলে ব্যবসা ভারতের হাতে চলে যাবে।’ তাছাড়াও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার বিষয়টিও এর সাথে জড়িত।

রিজভী বলেন, ভারত বাংলাদেশের বিভিন্ন বন্দর, সড়ক ও মুক্ত আকাশ সুবিধা নিলে আক্ষরিক অর্থেই আমাদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বলে কিছুই থাকবে না। বর্তমান বিনাভোটের সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সাথে একের পর এক চুক্তি করে যাচ্ছে। বাংলাদেশকে তারা ভারতের হাতে উজাড় করে দিচ্ছে। অথচ বিনিময়ে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত কিছুই পায়নি। ভারত একতরফাভাবে অভিন্ন নদীর পানি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এক লিটার পানিও তারা ছাড় দিচ্ছে না। ইতোমধ্যে বলতে গেলে বিনামূল্যেই ট্রানজিট সুবিধা দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ও বিশ্বজনমতকে উপেক্ষা ও অগ্রাহ্য করে ভারত জবরদস্তিমূলকভাবে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করতে গিয়ে বাংলাদেশের পরিবেশ, প্রতিবেশ, আবহাওয়া ধ্বংস করে বাংলাদেশী মানুষদের বিলুপ্তযুগের প্রাণীদের দলে ঠেলে দেয়ার আয়োজন চলছে। অথচ বিনাভোটের বাংলাদেশের নতজানু সরকার প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা. দূরদর্শিতা প্রদর্শনের বদলে বিধ্বংসী ভাঙ্গনের ছেলেখেলায় মেতে উঠেছে। 

তিনি বলেন, ভারতসহ পৃথিবীর অনেক দেশের সাথেই বাংলাদেশের আকাশ চুক্তি আছে। কিন্তু কোনো দেশের সাথেই মুক্ত আকাশ সুবিধা দেয়ার চুক্তি নেই। এতে বাংলাদেশের কোনো লাভ হবে না, এমনকি প্রয়োজনও নেই। শুধু ভারতের স্বার্থে সরকার এ চুক্তি করতে পারে। এতে বিমান ব্যবসা একচেটিয়াভাবে ভারতের কাছে চলে যাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের বাইরে নিজস্ব ফ্রিকোয়েন্সিতে ভারত বাংলাদেশের বিমানবন্দর ও আকাশ ব্যবহারের ফলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, আমাদের দেশের বিমান অবকাঠামো ও অন্যান্য সুবিধা এখনও সে পর্যায়ে যায়নি। আমাদের অবকাঠামো এখনও পর্যাপ্ত নয়। এমনিতেই অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে নিরাপত্তা হুমকিতে রেড এলার্ট জারি করেছে। যার ফলে এখনও বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে কার্গো সার্ভিস বন্ধ রয়েছে। এমতাবস্থায় যদি ভারতকে মুক্ত আকাশ সুবিধা দেয়া হয়, তাহলে সেটি হবে জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী এবং আমাদের অস্তিত্ব বিপন্নকারী পদক্ষেপ। বিএনপি’র পক্ষ থেকে আমি সকল প্রকার দেশবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসার জন্য সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানাচ্ছি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ