ঢাকা, শনিবার 10 December 2016 ২৬ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

শিশুর স্কুলব্যাগ

ডিজিটাল যুগে শিশুদের পিঠে বিরাটকায় এনালগ ব্যাগ ঝুলিয়ে ক্লাসে যেতে হবে, তা ভাবতেও যেন বিস্মিত হতে হয়। বাহুর সঙ্গে লটকিয়ে পিঠে বহন করা এ ব্যাগ কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তা স্বাস্থ্যবিজ্ঞানীরা অনেক আগেই জানিয়েছেন। কিন্তু একশ্রেণির শিক্ষক, পাঠ্যপুস্তক ব্যবসায়ী, এমনকি অনেক অভিভাবকও শিশুর পিঠে একগাদা পাঠ্যপুস্তক চাপানোকে যেন কৌলিন্যের প্রতীক ধরে নিয়েছেন। উল্লেখ্য, আমাদের শিশুর পাঠ্যপুস্তক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত পুস্তকের সংখ্যা খুব বেশি না হলেও স্কুল কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের সম্মতিক্রমে অতিরিক্ত বই পাঠ্য তালিকাভুক্ত করা হয়ে থাকে। ফলে শিশুশিক্ষার্থীদের পিঠে বহনের ব্যাগের আকার বড় হতেই থাকে। ফলে বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের শরীরে নানাবিধ স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যায়, ইনফেকশন পর্যন্ত সৃষ্টি হয়, যা তাদের সারাজীবন বয়ে বেড়ানো ছাড়া উপায় থাকে না। তাই একটি রিটের প্রেক্ষিতে মহামান্য আদালত নির্দেশ জারি করেছে যে, শিশুরা নিজ দেহের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি স্কুলব্যাগ বহন করতে পারবে না। আগামী ৬ মাসের মধ্যে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করতে হবে। অন্যথা হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে নেয়া হবে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। এ শাস্তির আওতায় প্রধানত স্কুল কর্তৃপক্ষ পড়বে তা বুঝতে নিশ্চয় কারুর অসুবিধা হবার কথা নয়। কারণ, স্কুল কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে যেমন পাঠ্যপুস্তকের বোঝা বেড়ে যায়, তেমনই শিশু-শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপও সৃষ্টি হয়। এছাড়া প্রাইভেট টিউশনির চাপও পড়ে শিশুদের ওপর স্কুল শিক্ষকদের কারণে। এক শ্রেণির শিক্ষক যেমন ছাত্রদের কোচিং সেন্টারে যেতে বাধ্য করান, তেমনই অতি উৎসাহী অভিভাবকরাও শিশুদের জন্য প্রায় প্রত্যেক বিষয়ে প্রাইভেট টিউটর রাখতে আগ্রহী। তাই স্কুল আর প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়তে গিয়ে হিমশিম খায় শিশুরা। এতে শিশুর জীবনের স্বাভাবিক গতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
বলতে দ্বিধা নেই, শিশুর শিক্ষা যেখানে আনন্দময় হবার কথা, সেখানে তাদের জীবন যেন বিষিয়ে যাচ্ছে। ফলে শিশুরা সারাজীবনের জন্য রোগগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। বাড়ছে মানসিক সমস্যাও। ব্যাগের বোঝা আর পড়ার চাপ শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ করছে ব্যাহত। ফলে আমাদের দেশ ও জাতি মেধাবী তারুণ্য থেকে যেমন বঞ্চিত, তেমনই অসুস্থ মানসিকতার ভবিষ্যৎ বংশধরদের নিয়ে বাড়ছে দুর্ভাবনাও। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা মোতাবেক মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে কয়েকটি বিষয় বাতিল করা হয়েছে। অনেক বিলম্বে হলেও কর্তৃপক্ষের এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। আমরা মনে করি, পাঠ্যপুস্তকের সংখ্যা আর বিষয়ের আধিক্য মেধাবী জাতি গঠনের সহায়ক সব সময় নাও হতে পারে। প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহ সুচারুরূপে পাঠদান করেও শিক্ষার্থীকে উপযুক্ত করে গড়ে তোলা সম্ভব। আমাদের শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ সবাইকে পাঠ্যপুস্তক ও বিষয়ের আধিক্য সম্পর্কে যেমন আরও গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে, তেমনই পাঠ্যপুস্তকসমূহে যেন আধুনিক চিন্তা-চেতনাসমৃদ্ধ জাতি গঠনের উপযোগী মানসিকতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিকাশ লাভ করে তার গুরুত্ব বিবেচনায় রাখতে হবে। অন্যথায় আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক জাতি ও সমৃদ্ধ দেশ গঠনে আমরা কেবল ব্যর্থই হবো না, আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে তো পারবোই না; অগ্রযাত্রার মিছিল থেকে জাতি হিসেবে আমাদের পেছনে পড়ে থাকতে হবে।
শিশুরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। আজকে যারা হাঁটি হাঁটি পা পা করে কাঁধে বা পিঠে পুস্তকের ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলে যাতায়াত করছে, কারুর সঙ্গে অভিভাবক হিসেবে কেউ থাকছেন, কোনও কোনও শিশুকে একা অভিভাবক ছাড়াই স্কুলে যাতায়াত করতে হচ্ছে। কিন্তু বণিক-মানসিতার একশ্রেণির শিক্ষক এবং আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কতটা সহায়ক তা নিশ্চিত নয়। এছাড়া একশ্রেণির শিক্ষক, এমনকি কোনও কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে পরিচর্যা না করে প্রতিহিংসার রাজনৈতিক দর্শনের দীক্ষা প্রদান করে। ফলে শিশু শিক্ষার্থীরা শিক্ষা-বান্ধব পরিবেশ না পেয়ে বখে যায়, পড়াশোনায় হয় অমনোযোগী। এমনকি নিজেদের জীবন-জীবিকা সম্পর্কে অনিশ্চয়তা নিয়ে তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বেরোয়। ফলে শৈশবে পিঠে ঝুলিয়ে বইয়ের বোঝাসহ স্কুলে যাতায়াত এবং উচ্চতর শিক্ষাঙ্গনে প্রতিহিংসার রাজনৈতিক দর্শন শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে বিপন্ন করে তোলে। এই দেউলেপনা থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্ত করতে না পারলে বিশ্বধারায় আমাদের কাক্সিক্ষত অবস্থান কঠিনতর হয়ে পড়বে বৈকি!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ