ঢাকা, শনিবার 10 December 2016 ২৬ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটানোর চেষ্টা

আশিকুল হামিদ : বাংলাদেশে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটানোর চেষ্টা চলানো হচ্ছে বলে বেশ কিছুদিন ধরেই জোর আলোচনা চলছে। দেশের ভেতরে শুধু নয়, আলোচনা চলছে বিদেশেও। মাস কয়েক আগে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর বার্ষিক রিপোর্টে পরিষ্কার ভাষায় বলা হয়েছে, সরকার ক্রমেই ‘কর্তৃত্বপরায়ণ’ হয়ে উঠছে। বলা বাহুল্য, একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এগোতে থাকা কোনো সরকারই সাধারণত ‘কর্তৃত্বপরায়ণ’ হয়ে ওঠে। এর প্রমাণ একবার পাওয়া গিয়েছিল ১৯৭৪-৭৫ সময়কালে, যখন জাতির ঘাড়ে বাকশাল-এর একদলীয় শাসন চাপানো হয়েছিল। সে ইতিহাসেরই নাকি পুনরাবৃত্তি ঘটানোর চেষ্টা ও প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে! স্মরণ করা দরকার, ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে বাকশালী শাসন শুরু হয়েছিল। সেদিন জাতীয় সংসদের মাত্র ১১ মিনিট স্থায়ী অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের ইচ্ছা ও নির্দেশে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাস করা হয়েছিল। সংশোধনীর আগে পর্যন্ত শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, সংশোধনী পাস করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। সে ছিল এক বিচিত্র অবস্থা। চতুর্থ সংশোধনীর ফলে প্রচলিত সংসদীয় পদ্ধতি বাতিল হয়ে যায়, রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি প্রবর্তিত হয় এবং সকল রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে দেশে একটি মাত্র দল প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই সংশোধনীর ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিব ২৪ ফেব্রুয়ারি একমাত্র দল বাকশাল গঠন করেন। তার নির্দেশে তাকেই চেয়ারম্যান করে বাকশালের ১১৫ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয় ৬ জুন। সরকার নিয়ন্ত্রিত চারটি দৈনিক ছাড়া দেশের সকল সংবাদপত্র নিষিদ্ধ হয়ে যায় ১৬ জুন।
বাকশাল গঠনের পক্ষে বিভিন্ন সময়ে অনেক যুক্তিই দেখানো হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘বিশেষ পরিস্থিতিতে’ শেখ মুজিব নাকি ‘মহৎ উদ্দেশ্য’ নিয়ে ‘জাতীয় প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবে বাকশাল গঠন করেছিলেন! এ কথাও বলা হয়েছে যে, বাকশাল গঠনের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছিল জাতীয় সংসদে। অন্যদিকে বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস কিন্তু এসব যুক্তিকে সমর্থন করে না। যে ‘বিশেষ পরিস্থিতি’র যুক্তি দেখানো হয় তার জন্য দায়ী ছিল স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম আওয়ামী লীগ সরকারের সর্বব্যাপী দুর্নীতি, কালোবাজারি ও চোরাচালানসহ প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও অযোগ্যতা, সরকারের রাজনৈতিক নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড এবং সবশেষে ১৯৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। বাকশাল প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংসদে দেয়া শেখ মুজিবের ভাষণেও এ সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দরকার যখন ছিল ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগ ও নতুন সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান কিংবা জরুরি ভিত্তিতে একটি সর্বদলীয় সরকার গঠন করা, প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব তখন উল্টো রাজনৈতিক আন্দোলন ও সরকার বিরোধিতার সকল পথ বন্ধ করে দেয়ার পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এ লক্ষ্যে তিনি প্রথমে ১৯৭৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিলেন। তারপর পর্যায়ক্রমে এগিয়েছিলেন বাকশালের একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার পথে।
সমগ্র এই প্রক্রিয়া ও কর্মকাণ্ডের একমাত্র উদ্যোক্তা, নির্দেশদাতা, নিয়ন্ত্রক ও লাভবান ব্যক্তি ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। সর্বময় ক্ষমতাও তার হাতেই কেন্দ্রীভূত হয়েছিল। ‘জাতীয় প্ল্যাটফর্ম’ বলা হলেও বাকশাল বাস্তবে আওয়ামী লীগেরই নামান্তর মাত্র ছিল। কারণ, বাকশাল বলতে ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ বোঝানো হয়েছিল, ‘আওয়ামী লীগ’ নামটিকে বাদ দেয়া হয়নি! অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে এর প্রমাণ পাওয়া যাবে যদি আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ মিত্র দুই দল ন্যাপ (মোজাফফর) এবং সিপিবির শোচনীয় পরিণতির উল্লেখ করা হয়। স্বাধীনতার পর প্রাথমিক দিনগুলো থেকেই দল দুটি সরকারের লেজুড়বৃত্তি করে এসেছে, ১৯৭৩ সালের সেপ্টেম্বরে দল দুটিকে নিয়ে শেখ মুজিব ‘ত্রিদলীয় ঐক্যজোট’ও গঠন করেছিলেন। কিন্তু বাকশালের ১১৫ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটিতে নেতৃত্বের অবস্থান পাননি এমনকি ‘কমরেড’ মনি সিংহ এবং অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের মতো দলীয় প্রধানরাও। এই দু’জনকেসহ দুই দলের মাত্র ছয়জনকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে নেয়া হয়েছিল। তাদের ক্রমিক সংখ্যা ছিল ৭০-এর ঘরে। ওদিকে স্বাধীনতা সংগ্রামী জাতীয় নেতা মওলানা ভাসানীকে ১৯৭৪ সালের জুন থেকে সন্তোষে গৃহবন্দী রাখা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ বিরোধী অন্য নেতারা ‘আন্ডারগ্রাউন্ডে’ যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, কয়েকজন পালিয়ে বিদেশেও চলে গিয়েছিলেন। সুতরাং ‘জাতীয় প্ল্যাটফর্ম’ গঠনের যুক্তিকে রাজনৈতিক অসততা ছাড়া আর কিছু বলা যায় না।
‘সাময়িক কালের’ জন্য গঠন করা হয়েছিল ধরনের যুক্তিকেও গ্রহণ করা যায় না। কারণ, সে ধরনের কোনো বিধান চতুর্থ সংশোধনীর কোথাও কিংবা বাকশালের গঠনতন্ত্রে ছিল না। গঠনতন্ত্রের বিভিন্ন ধারা-উপধারা বরং প্রমাণ করেছে, রাষ্ট্রীয় সকল ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্দেশ্য নিয়েই বাকশাল গঠন করা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ও কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন এবং সংসদ সদস্যদের মনোনয়ন দেয়া থেকে বাকশাল, রাষ্ট্র ও সরকারের প্রতিটি বিষয়ে সর্বময় ক্ষমতা ছিল শুধু রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবের। তিনি এমন একজন চেয়ারম্যান ও রাষ্ট্রপতি ছিলেন, যাকে নির্বাচিত করার কোনো পন্থা বা বিধানেরই উল্লেখ ছিল না বাকশালের গঠনতন্ত্রে। ছিল না সংবিধানেও। অর্থাৎ পরোক্ষভাবে একথাই ঘোষণা করা হয়েছিল যে, শেখ মুজিব আজীবন রাষ্ট্রপতি এবং বাকশালের চেয়ারম্যান থাকবেন।
একথা অবশ্য ঠিক যে, চতুর্থ সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাস করা হয়েছিল। কিন্তু অনস্বীকার্য সত্য হলো, ১৯৭৩ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত সংসদ কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে একদলীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য জনগণের ম্যান্ডেট চাওয়া হয়নি। নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় জনগণকে জানানো হয়নি যে, ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগ এত মৌলিক ধরনের ব্যাপক কোনো পরিবর্তন ঘটাবে। সংশোধনী পাস করার পরও গণভোটের আয়োজন করা হয়নি। অথচ এ ধরনের মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোতে জনমত যাচাই এবং গণভোট অনুষ্ঠান করা গণতন্ত্রে একটি অবশ্যপালনীয় কর্তব্য- যেমনটি পরবর্তীকালে করেছিল বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট সংসদে শেখ মুজিব প্রবর্তিত প্রেসিডেন্ট পদ্ধতি বাতিল করে সংসদীয় পদ্ধতি প্রবর্তন করার উদ্দেশ্যে দ্বাদশ সংশোধনী পাস করা হয়েছিল। সর্বসম্মতিক্রমে পাস করা সত্ত্বেও এ প্রশ্নে গণভোট আয়োজন করেছিল সরকার। কিন্তু বাকশাল গঠন এবং চতুর্থ সংশোধনী পাস করার সময় শেখ মুজিব এ ধরনের গণতন্ত্রসম্মত চিন্তাই করেননি। 
প্রসঙ্গক্রমে এখানে পঞ্চম সংসদের সেই অধিবেশনের কথা স্মরণ করা যেতে পারে, যে অধিবেশনে শেখ মুজিবের চতুর্থ সংশোধনীকে কফিনে ঢোকানো এবং তার পরিবর্তে দ্বাদশ সংশোধনী পাস করা হয়েছিল। দ্বাদশ সংশোধনীর অর্থ প্রকৃতপক্ষে ছিল শেখ মুজিবের আরো একটি মৃত্যু। কিন্তু তারপরও সংসদে উপস্থিত আওয়ামী লীগের এমপিরা আনন্দে উল্লসিত হয়েছিলেন। দেশবাসীর প্রত্যাশা ও আকাক্সক্ষার পরিপ্রেক্ষিতে এই আনন্দ-উল্লাস স্বাভাবিক হলেও মরহুম শেখ মুজিবের মনোভাব ও চিন্তাধারার দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে কিন্তু মানতেই হবে যে, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মতো মুজিব-বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে মিলিতভাবে দ্বাদশ সংশোধনী পাস করার জন্য আওয়ামী লীগের উল্লসিত হওয়ার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। কেননা, দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাস্তবে শেখ মুজিবের সর্বশেষ ‘কীর্তি’কেই প্রত্যাখ্যান ও বাতিল করা হয়েছিল। অন্যদিকে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ এমপিদের উল্লাস দেখে মনে হচ্ছিল যেন তারা মরহুম নেতার কোনো চিন্তাধারাকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন!
এটা তাদের পরাজয়বরণ করে নেয়ার গণতন্ত্রসম্মত কৌশল হতে পারে। কিন্তু এভাবেই তারা একের পর এক মরহুম নেতার ‘কীর্তি’ ও চিন্তাধারাকে প্রত্যাখ্যান ও বাতিল করে এসেছেন। এই প্রক্রিয়ায় বাকশাল এবং সমাজতন্ত্রের মতো মৌলিক বিষয়গুলো পর্যায়ক্রমে পরিত্যক্ত হয়েছে। শেখ মুজিবের কন্যা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন কিন্তু বাকশাল প্রতিষ্ঠার ‘ঐতিহাসিক’ দিন ২৫ জানুয়ারিকে নিয়ে সামান্য উচ্চবাচ্য করেননি। এখনো করেন না। দিনটিকে সুকৌশলে পার করে দেয়ার মধ্য দিয়ে বরং একথারই স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে যে, বাকশাল গঠনের পদক্ষেপ ছিল গণতন্ত্র বিরোধী এবং চরম ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক। এ ব্যাপারে ভালো বলতে পারবেন সাজেদা চৌধুরী, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও তোফায়েল আহমদের মতো নেতা ও এমপিরা- যারা বাকশাল গঠন করার সময় যেমন, তেমনি দ্বাদশ সংশোধনী পাস করার সময়ও জাতীয় সংসদে উপস্থিত থেকেছেন এবং প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। মরহুম নেতার সম্মান বাঁচানোর জন্য এখন তারা অনেক কথাই বলতে চাইতে পারেন, কিন্তু একথা নিশ্চয়ই অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদের মতো ১৯৭৩-৭৫ সালের সংসদে তারা আনন্দে উল্লসিত হয়ে উঠতে পারেননি। পারেননি একজন অন্যজনকে জড়িয়ে ধরে নৃত্য করতেও। কারণ, পরিবেশ তখন এত খোলামেলা ছিল না। পরিস্থিতি বরং ছিল বিশেষ রকমের এবং বদ্ধ ওই সংসদে বিনা বাক্য ব্যয়ে প্রধান নেতা শেখ মুজিবের হুকুম পালন করা ছাড়া কারো কোনো উপায় ছিল না।
বাকশাল গঠনের সিদ্ধান্ত ভুল ও অন্যায় ছিল বলেই মুজিব-উত্তর কোনো বছর ২৫ জানুয়ারির মতো ‘ঐতিহাসিক’ একটি দিবসকে আওয়ামী লীগ কখনো যথাযথ ভাবগাম্ভীর্য ও সম্মানের সঙ্গে পালন বা উদযাপন করেনি। দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলগুলো দিনটিকে ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, অন্যদিকে আওয়ামী লীগ দিনটিকে পার করেছে নীরবে। দিনটির স্মরণে দলটি প্রকাশ্যে কখনো কোনো অনুষ্ঠান করেনি, এমনকি শেখ হাসিনা কোনো বছর একটি বিবৃতি পর্যন্ত দেননি। মাঝেমধ্যে দু’চারজন নেতাকে অবশ্য খুবই দুর্বল কণ্ঠে বাকশালের পক্ষে কৈফিয়ৎ দিতে বা ‘জাতীয় প্ল্যাটফর্ম’ ধরনের যুক্তি তুলে ধরার কসরত করতে দেখা গেছে। কিন্তু কারো পক্ষেই মরহুম নেতার সর্বশেষ ‘কীর্তি’ বাকশালকে গ্রহণযোগ্য করে তোলা সম্ভব হয়নি। এটা আসলে হওয়ারও কথা নয়।
কিন্তু সব জেনে-বুঝেও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটানোর লক্ষ্যে পা বাড়ানো হচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। প্রসঙ্গক্রমে তারা বিশেষ করে জেলা পরিষদ নির্বাচন এবং এর ভোটার তথা ইলেক্টোরাল কলেজের দিকে দৃষ্টি ফেরানোর পরামর্শ দিয়েছেন। উল্লেখ্য, গত ২৯ আগস্ট মন্ত্রিসভার নিয়মিত সাপ্তাহিক বৈঠকে অনুমোদিত এ সংক্রান্ত সংশোধিত আইনটিতে বলা হয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ এবং পৌর সভা ও সিটি করপোরেশনসহ জেলার চার স্তরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি ‘ইলেক্টোরাল কলেজ’ গঠন করা হবে। অর্থাৎ এই চার স্তরের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ইলেক্টোরাল কলেজের সদস্য তথা জেলা পরিষদ নির্বাচনের ভোটার হবেন। বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীসহ ২০ দলীয় জোটের সকল দল জেলা পরিষদ নির্বাচন সংক্রান্ত অইনটি বাতিল করার দাবি জানিয়েছে। একই দাবি জানিয়েছে সুশীল সমাজ এবং দেশপ্রেমিক বিভিন্ন মহল। ওদিকে তীব্র নিন্দা-প্রতিবাদ ও বিতর্কের মধ্যেও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে গত ২০ নভেম্বর জেলা পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। এই তফসিল অনুযায়ী ৬১টি জেলা পরিষদের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার তারিখ ছিল গত ১ ডিসেম্বর। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ১১ ডিসেম্বর। আর সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২৮ ডিসেম্বর।
বলা দরকার, একমাত্র আওয়ামী লীগ ছাড়া কোনো রাজনৈতিক দলই নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়নি। এমনকি জাতীয় সংসদের ‘প্রধান বিরোধী দল’ নামে পরিচিত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টিও এই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। গত ২০ নভেম্বর রাজধানীতে আয়োজিত দলীয় অনুষ্ঠানে অমন সিদ্ধান্তের কারণ জানাতে গিয়ে এরশাদ বলেছেন, বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ১৪৫ জন মানুষ মারা গেছে। ভবিষ্যতের নির্বাচনে কি হবে তা একমাত্র আল্লাহতা’লাই জানেন। সেজন্যই জাতীয় পার্টি জেলা পরিষদ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ দলটি ওই নির্বাচনে অংশ নেবে না। জাতীয় পার্টির পাশাপাশি আওয়ামী মহাজোটের অন্য দলগুলোও নির্বাচনে অংশ নেবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। দলগুলোর পক্ষে কারো মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার খবর শোনা যায়নি। সংসদের বাইরের প্রধান এবং ব্যাপকভাবে জনসমর্থিত রাজনৈতিক দল বিএনপিও ইতিবাচক অবস্থান নেয়নি। আরেক দল জামায়াতে ইসলামীকে তো সরকার রাজনৈতিক দলের তালিকা থেকেই ঝেঁটিয়ে বিদায় করে রেখেছে। অর্থাৎ জেলা পরিষদের যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে সে নির্বাচনে শুধু আওয়ামী লীগই অংশ নেবে। ফলে আরো একটি একদলীয় ও একতরফা নির্বাচনের রেকর্ড স্থাপিত হবে বলে ধরে নেয়া যায়।
আশংকার কারণও সৃষ্টি হয়েছে এমন সম্ভাবনার পরিপ্রেক্ষিতেই। এর সঙ্গে উদ্বেগের উপাদান যুক্ত করেছেন বিদায়ী কিন্তু বিতর্কিত প্রধান নির্বাচন কমিশনার। তিনি সম্প্রতি শেখানোর বা জ্ঞান দেয়ার স্টাইলে জানিয়ে দিয়েছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশেই ইলেক্টোরাল কলেজের মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। অর্থাৎ ক্ষমতাসীনরা আসলেও সম্ভবত অমন চিন্তাই করছেন। নাহলে সিইসি হঠাৎ ইলেক্টোরাল কলেজের কথা বলবেন কেন? সরকার সত্যিই তেমন সিদ্ধান্ত নিলে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটাধিকার ইতিহাসের বিষয়ে পরিণত হবে এবং নতুন পর্যায়ে ফিরে আসবে আইয়ুব খানের সেই ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার জনগণকে তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে দলীয় লোকজনকে ‘নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি’ বানানোর এবং তাদের মাধ্যমে সকল স্তরে নির্বাচন নামের নাটক মঞ্চায়নের চেষ্টা করবেন। 
মূলত এজন্যই আগামী নির্বাচন নিয়ে ভীতি ও সংশয়ের সৃষ্টি হতে শুরু করেছে। বলা হচ্ছে, সরকার যদি জেলা পরিষদ সংক্রান্ত আইনটি বাতিল না করে এবং ওই আইনের ভিত্তিতেই যদি নির্বাচন করা হয় তাহলে সারা দেশের সকল জেলা পরিষদই চলে যাবে আওয়ামী লীগের দখলে। তাছাড়া কখনÑ ২০১৭ না ২০১৮ সালে এবং ঠিক কোন পদ্ধতিতে আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সে বিষয়ে এখনো পরিষ্কার কিছু জানাচ্ছেন না ক্ষমতাসীনরা।
তারা শুধু সেই সংবিধানের দোহাই দিয়ে চলেছেন, যে সংবিধানের খোলনলচে তারা নিজেরাই পাল্টে ফেলেছেন। প্রসঙ্গক্রমে আশংকার কারণ হিসেবে প্রাধান্যে এসেছে ইলেক্টোরাল কলেজের প্রশ্নটি। দেশপ্রেমিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, জেলা পরিষদ নির্বাচনকে একটি ‘টেস্ট কেস’ বা ‘মহড়া’ হিসেবে ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে সরকার শেষ পর্যন্ত সংসদ নির্বাচনেও একই ইলেক্টোরাল কলেজকে ভোটার বানানোর পদক্ষেপ নিতে পারে। কারণ, ইলেক্টোরাল কলেজের প্রায় সকল ভোটার আওয়ামী লীগের লোকজন বলে জেলা পরিষদ নির্বাচনে সংঘাত-সংঘর্ষের তেমন সম্ভাবনা নেই। এ বিষয়টিকেই প্রাধান্যে নিয়ে আসার চেষ্টা চালানো হতে পারে। তেমন অবস্থায় এরশাদ হয়ে উঠতে পারেন ক্ষমতাসীনদের প্রকৃত ‘সেভিয়ার’। এরশাদকে এমনকি রাষ্ট্রপতিও বানাতে পারে আওয়ামী লীগ। কারণ, দলটির দরকার যে কোনোভাবে ক্ষমতায় যাওয়া এবং বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে ক্ষমতার, এমনকি সংসদেরও আশপাশে আসতে না দেয়া। সুতরাং এরশাদকে খুশি করার ব্যাপারে এবার অন্তত কন্জুসি করার ঝুঁকি নেবে না আওয়ামী লীগ। আর এ কথা তো সবারই জানা রয়েছে যে, এরশাদকে রাষ্ট্রপতি বানানো হলে তিনি এমপির সংখ্যার ব্যাপারে তো বটেই, রাজনৈতিক দলের সংখ্যার ব্যাপারেও টুঁ শব্দটি করবেন না। ওদিকে সংবিধান তো আগেই সাজিয়ে রাখা হয়েছে। সংসদেও তারা নিজেরাই ‘নির্বাচিত’ হয়ে হাজির হবেন। সব মিলিয়ে নতুন পর্যায়ে একদলীয় শাসন চাপিয়ে দেয়ার পথে কার্যত কোনো বাধাই থাকবে না। ফলে নতুন কোনো নামে হলেও বাকশালকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা তথা ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটানোও সম্ভব হবে বলে মনে করছেন ক্ষমতাসীনরা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ