ঢাকা, শনিবার 10 December 2016 ২৬ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

পটিয়ায় সুবিধাবঞ্চিত দেড়শ’ শিশুর আলোকযাত্রা

ওমর ফারুক : সকাল ৯ টা। ততক্ষণে মাদরাসা ছুটির ঘন্টা বেজেছে। পুতুলের মতো একদল শিশু তখন উল্লাস করে বেরিয়ে পড়লো শ্রেণিকক্ষগুলো থেকে। যেন আলো কুড়িয়ে তারা ঘরে ফিরছে। পিছিয়ে পড়া হতদরিদ্র পরিবারের শিশুদের শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন সৈয়দ খোরশেদ আলম নামের এক বিদ্যানুরাগী। এলাকার প্রায় দেড় শতাধিক হতদরিদ্র শিশুর জন্য চালিয়ে যাচ্ছেন এক নিভৃত আলোকযাত্রা! নিজের ব্যক্তিগত সামর্থ্যে তিনি কাজটি চালিয়ে যাচ্ছেন। এই উদ্যোগটি নিয়ে তিনি অনেক বড়ো স্বপ্ন দেখেন।
চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার বড়লিয়া ইউনিয়নের পেরলা গ্রামে অনাথ, দুস্থ ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য ব্যক্তিগত উদ্যোগে তিনি গড়ে তুলেছেন মা-বাবার নামে সৈয়দা  জারিয়া বেগম ফোরকানিয়া মাদরাসা ও সৈয়দ আহমদ মিয়া সওদাগর প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেখানে অধ্যয়ন করছেন দেড় শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী। যারা আগে কোনও শিক্ষার আলো পায়নি। যেখানে স্বাভাবিকভাবে শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ ছিলনা নানা পারিপার্শ্বিকতার কারণে, সেখানেই এখন পিছিয়ে পড়া শিশুগুলোর মাদরাসা ও বিদ্যালয় গড়ে উঠেছে।
মাদরাসার ইনচার্জ সৈয়দ সাইফুদ্দিন খালেদ জানান, ‘এলাকাটিতে শিক্ষার ক্ষেত্রে নানা প্রতিকূলতা ছিল। এর মধ্যেই পিছিয়ে পড়া হতদরিদ্র পরিবারের শিশুদের পাঠদান চলছে মাদরাসাটিতে। এ মাসে শুরু হবে সৈয়দ আহমদ মিয়া সওদাগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম। সেখানে ভর্তি হচ্ছে বিপুল সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী। পেরলার যে এলাকায় এ মাদরাসা ও স্কুলটির অবস্থান, সেখান থেকে অন্যসব সরকারি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় ১ কিলোমিটারেরও বেশি। ফলে এখানে হতদরিদ্র ও নি¤œবিত্ত পরিবারের শিশুরা কখনো ১ কিলোমিটার দুরে গিয়ে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায় না। এই মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় এলাকার সন্তানেরা শিক্ষা নেয়ার সুযোগ পাচ্ছে। চট্টগ্রাম বিপনী বিতান মার্চেন্টস ওয়েলফেয়ার কমিটির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ খোরশেদ আলমের এই মহৎ উদ্যোগে বদলে যেতে শুরু করেছে এলাকার শিক্ষার পরিবেশ।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, বড়লিয়া ইউনিয়নের পেরলা এলাকায় ৫ হাজার মানুষের বসবাস। প্রায় পরিবারের লোকজন মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের। এক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে নেই কোনও স্কুল ও মাদরাসা। তাই এখানে পড়ুয়া ছেলে-মেয়ে খুব কমই চোখে পড়ে। যাতাযত ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক দৈন্যদশার কারণে এখানকার শিশুরা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত ছিল। চলতি বছরের শুরুতে এলাকার একজন বিদ্যানুরাগীর প্রচেষ্টায় গড়ে উঠে সৈয়দা  জারিয়া বেগম ফোরকানিয়া মাদরাসা ও সৈয়দ আহমদ মিয়া সওদাগর প্রাথমিক বিদ্যালয়। মাদরাসাটির পাঠক্রম চলতি বছরের শুরুতে শুরু হলেও স্কুলটির কার্যক্রম শুরু হবে ডিসেম্বর থেকে। বর্তমানে দেড় শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী অধ্যয়ন করছে মাদরাসাটিতে। এ মাদরাসায় ছাত্রছাত্রীদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাঠদান করা হয়। বই খাতাসহ যাবতীয় শিক্ষা উপকরণও ফ্রি।
পড়ালেখার পাশাপাশি শিশুদের ইসলামী সঙ্গীত, হাতের কাজ, খেলাধুলা ইত্যাদি বিষয়েও পারদর্শী করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছে মাদরাসার ৩ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা। প্রতিষ্ঠান দুটিতে শ্রেণিকক্ষে কার্পেট,ফ্যান, আলমারি, লাইট, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাসহ আধুনিকভাবে সাজানো হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুটির প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ খোরশেদ আলম বলেন, এই শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য আমি প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত তাদেরকে বিনা খরচে লেখাপড়া করাচ্ছি। নিরক্ষরতা দূরীকরণে তিনি তার এই ক্ষুদ্র উদ্যোগকে অনেক বড়ো আকারে রূপ দিতে চান। গ্র্যাজুয়েশন ও মাস্টারস পর্যন্ত পড়ানোর সহায়তা দিতে চান এই শিশু-কিশোরদের। মাদরাসার ক্ষুদে শিক্ষার্থী কামাল, মুহাম্মদ নাজিম, নারগিস আকতার, কহিনূর আকতারসহ আরও অনেকে জানান, মাদরাসা থেকেই তাদের সবধরনের সুযোগ সুবিধা দেয়া হয়। পড়ালেখার মানও ভাল। মুহাম্মদ মিনহাজ নামের এক শিক্ষার্থী বলেন,  আমি আমজুর হাটে একটি ওয়ার্কশপে কাজ করি, আমার পড়াশোনার খুব ইচ্ছা তাই আমি এখানে মাদরাসায় এবং স্কুলের ক্লাস টু’তে ভর্তি হয়েছি। শিক্ষার হার বাড়াতে এমন উদ্যোগকে উৎসাহিত করা দরকার বলে জানালেন স্থানীয় মুহাম্মদ ফয়সল করিম। প্রতিষ্ঠান দুটির প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ খোরশেদ আলম বলেন, পেরলা এলাকায় প্রায় ২ শতাধিক শিশু রয়েছে। যারা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত। ক্রমান্বয়ে সব শ্রেণির শিশুদের মটিভেশনের মাধ্যমে শিক্ষার আলো দেয়ার চেষ্টা চলছে। তিনি জানান, তার নিজ উদ্যোগে এলাকায় একটি কমিউনিটি হাসপাতাল এবং একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। এলাকার বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন শরিফ ও ছাত্রলীগ নেতা আনিসুর রহমান জানান, মাদরাসা ও স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় তাদের সন্তানদের শিক্ষা দেয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এতে তারা ভীষণ খুশি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ