ঢাকা, রোববার 11 December 2016 ২৭ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

জিডিপি’র আকার বাড়লেও বাড়ছে না বিনিয়োগ

এইচ এম আকতার : প্রতিটি অর্থবছরেই বাজেটের আকার বাড়ছে। বাড়ছে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি)’র আকারও। কিন্তু সে অনুপাতে বাড়ছে না বিনিয়োগ আর কর্মসংস্থান। গত সাত বছরে জাতীয় বাজেট তিন গুণ বাড়লেও শেয়ার বাজারে মূলধন বাড়েনি দিগুণও। বিদায়ী অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জন নিয়ে বির্তক তুলে বিশ্ব ব্যাংক এবং এডিবি। সরকার বলছে বিনিয়োগ এবং জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে সামঞ্জস্য রয়েছে। কিন্তু কোনো দেশের অর্থনীতির ইন্ডিকেটর হলো সে দেশের পুঁজিবাজার। আর দেশের শেয়ারবাজারের দিকে তাকালেই বুঝা যায় দেশে বিনিয়োগ নেই। উন্নত দেশেগুলোতে জিডিপির ১০ গুণ পুঁজিবাজারের মূলধন। আর বাংলাদেশে জিডিপির আকার ২২১ বিলিয়ন ডলার, আনুপাতিক হারে যা ১৫ দশমিক ৯০ শতাংশ। বিনিয়োগ পরিবেশ বিবেচনায় অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ। যা অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক ইঙ্গিত বলে মনে করা হচ্ছে।
২০০৯-১০ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল এক লাখ ১৩ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা। সাত বছরে তা তিনগুণ আকার ধারণ করেছে। চলতি অর্থবছর বাজেটের আকার বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। তবে সে অনুপাতে বাড়েনি শেয়ারবাজারের মূলধন। সাত বছরে এটি দ্বিগুণও হয়নি। একইভাবে বাড়েনি অন্যকোন খাতের বিনিয়োগও। ২০০৯-১০ অর্থবছরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধন ছিল এক লাখ ৯০ হাজার ৩২২ কোটি টাকা। বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৩২ হাজার ৪৩১ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রত বড় হয়েছে। সাত বছরে জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। ২০০৯-১০ অর্থবছরের ১০০ বিলিয়ন ডলারের জিডিপি ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দাঁড়ায় ২২১ বিলিয়ন ডলারে। শুধুমাত্র গ্রামীণফোন ছাড়া বিলিয়ন ডলারের কোনো কোম্পানি বাজারে আসেনি। বর্তমানে ডিএসইতে মাত্র চারটি বিলিয়ন ডলার কোম্পানি রয়েছে। এসব কোম্পানির কাছেই রয়েছে বাজার মূলধনের ২৯ শতাংশের বেশি। অথচ আকিজ, আবুল খায়েরের মতো বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী পুঁজিবাজার থেকে রয়েছে দূরে। এমনকি দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিপিসিকে পুঁজিবাজারে আনা যায়নি। পদ্মা সেতু নির্মাণের আগে পুঁজিবাজার থেকে তহবিল সংগ্রহের আলোচনা হলেও বাস্তবে তা হয়নি। ফলে অসীম সম্ভাবনার পুঁজিবাজারের ব্যবহার সীমিতই থেকে গেছে বাংলাদেশে।
এ প্রসঙ্গে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেএএম মাজেদুর রহমান বলেন, সামগ্রিক অর্থনীতির স্বার্থেই পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা দরকার। এজন্য অবশ্যই ভালো কোম্পানিগুলোকে বাজারমুখী করতে হবে। জিডিপিতে পুঁজিবাজারের অবদান বাড়াতে ভালো স্থানীয় ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্ত করতে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, একটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে পুঁজিবাজারের সম্পর্ক নিবিড়। কারণ অর্থনীতি যখন সমৃদ্ধির দিকে যায়, বিভিন্ন কোম্পানির উৎপাদন তখন বাড়ে। এতে কোম্পানিগুলোর মুনাফা বাড়তে থাকে, যার প্রভাবে শেয়ারমূল্যও বাড়ে। আবার অর্থনীতি মন্দার দিকে ধাবিত হলে পুঁজিবাজার নি¤œমুখী হয়। তখন মন্দার প্রভাবে বিভিন্ন কোম্পানির মুনাফা হ্রাস পায়, যা বিনিয়োগকারীদের অনুৎসাহিত করে।
নি¤œ-মধ্য আয়ের দেশগুলোতে এ মাত্রা সাধারণত বেশি হয়। চীনের বেইজিং ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি এবং ইউনিভার্সিটি অব ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস এন্ড ইকোনমিকসের যৌথ গবেষণায় এর প্রমাণও মিলেছে। ২০টি নি¤œ-মধ্য আয়ের দেশের ১৯৯০ থেকে ২০১২ সালের তথ্যের ভিত্তিতে এ গবেষণা পরিচালনা করেন বিশ্ববিদ্যালয় দুটি। ইমপ্যাক্ট অব স্টক মার্কেট ডেভেলপমেন্ট অন ইকোনমিক গ্রোথ: এভিডেন্ট ফ্রম লোয়ার মিডল ইনকাম কান্ট্রিজ’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়, একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) এক শতাংশ বাড়লে পুঁজিবাজার মূলধন দশমিক ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাবে পুঁজিবাজারের লেনদেন বাড়ে দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ। আর জিডিপি প্রবৃদ্ধি এক শতাংশ কমলে পুঁজিবাজারেও একই ধরনের বিপরীতমুখী প্রভাব দেখা যায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ গত বছর নি¤œ-মধ্য আয়ের দেশে প্রবেশ করেছে। এ দেশের প্রবৃদ্ধিও দ্রুত বাড়ছে। এর প্রভাব আগামীতে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারেও দেখা যাবে। যদিও বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পুঁজিবাজারের অবদান খুবই কম। অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে এ দেশের পুঁজিবাজারের ওঠানামার খুব বেশি সম্পর্কও দেখা যায় না।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের জিডিপি ও ডিএসই বাজার মূলধনের অনুপাত ১৬ শতাংশের নিচে, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের মধ্যে যা সবচেয়ে কম। বাংলাদেশের চেয়ে ছোট বা কাছাকাছি অর্থনীতির তুলনায়ও এ অনুপাত অনেক কম। প্রতিবেদনে দেখা যায়, বর্তমানে ডিএসই বাজার মূলধন ৩৫ বিলিয়ন ডলার, যেখানে বাংলাদেশের জিডিপির আকার ২২১ বিলিয়ন ডলার, আনুপাতিক হারে যা ১৫ দশমিক ৯০ শতাংশ। জিডিপির অনুপাতিক হারে বাজার মূলধন হওয়ার কথা ছিল প্রায় ২ হাজার বিলিয়ন ডলার।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, বিভিন্ন ধরনের কোম্পানি নিয়ে হয় শেয়ারবাজার। এ বাজার শক্তিশালী করতে মৌলভিত্তি কোম্পানির কোনো বিকল্প নেই। সরকারি-বেসরকারি ভালো কোম্পানিগুলোকে বাজারে নিয়ে আসতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সরকারকে আরও উদ্যোগী হতে হবে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, সরকারের পক্ষ থেকে সরকারি ২২ কোম্পানি পুঁজিবাজারে আনার উদ্যোগ নেয়া হলেও ছয় বছরে সেসব কোম্পানি বাজারে আসেনি। বিনিয়োগ বাড়লে দেশের পুঁজিবাজারেও মূলধন বাড়লে। কিন্তু বাজারে মূলধন সে অনুপাতে বাড়ছে না। যা অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক ইঙ্গিত বলে মনে হচ্ছে।
প্রতিবেদনে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের মধ্যে জিডিপি-শেয়ারবাজার মূলধন অনুপাত তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, এ অঞ্চলে জিডিপি-শেয়ারবাজার মূলধন অনুপাত সবচেয়ে বেশি হংকংয়ে। দেশটির জিডিপির ১০ গুণের বেশি শেয়ারবাজারের মূলধনের পরিমাণ। বর্তমানে হংকংয়ের জিডিপির আকার প্রায় ৩১০ বিলিয়ন ডলার। আর দেশটির পুঁজিবাজার থেকে বিভিন্ন কোম্পানি মূলধন সংগ্রহ করেছে তিন হাজার ৩০১ বিলিয়ন ডলার।
সিঙ্গাপুর এক্সচেঞ্জের বাজার মূলধন দেশটির জিডিপির দুই দশমিক তিনগুণ। সিঙ্গাপুরের পুঁজিবাজার থেকে বিভিন্ন কোম্পানি মূলধন সংগ্রহ করেছে ৬৭৪ বিলিয়ন লাখ ডলার। আর দেশটির জিডিপির পরিমাণ ২৯৩ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া মালয়েশিয়া, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড ও জাপানের জিডিপির দেশগুলোর পুঁজিবাজারের মূলধনের পরিমাণ বেশি। মালয়েশিয়ার জিডিপির পরিমাণ ২৯৬ বিলিয়ন ডলার ও বুরসা মালয়েশিয়ার বাজার মূলধন ৩৯৭ বিলিয়ন ডলার। তাইওয়ান স্টক এক্সচেঞ্জ করপোরেশনের বাজার মূলধন ৮৬২ বিলিয়ন ডলার এবং দেশটির জিডিপির পরিমাণ ৫২৪ বিলিয়ন ডলার। থাইল্যান্ড স্টক এক্সচেঞ্জের বাজার মূলধন ৪২৪ বিলিয়ন ডলার এবং দেশটির জিডিপির ৩৯৫ বিলিয়ন ডলার। আর টোকিও এক্সচেঞ্জের বাজার মূলধন পাঁচ হাজার ১১ বিলিয়ন ডলার এবং জাপানের জিডিপির আকার চার হাজার ১২৩ বিলিয়ন ডলার।
এদিকে ইন্দোনেশিয়ায় জিডিপি ও পুঁজিবাজার মূলধন অনুপাত প্রায় ৫১ শতাংশ এবং ফিলিপাইনে ৯১ শতাংশ। আর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের জিডিপি-পুঁজিবাজার মূলধন অনুপাত ৭৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ। দেশটির জিডিপির পরিমাণ দুই হাজার ৯১ বিলিয়ন ডলার আর বোম্বে স্টক মার্কেটের বাজার মূলধন এক হাজার ৬৬৩ বিলিয়ন ডলার। তবে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় জিডিপি এবং পুঁজিবাজার মূলধন অনুপাত তুলনামূলক কম হলেও বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। দেশ দুটিতে এ অনুপাত যথাক্রমে ২৮ দশমিক ৯৭ ও ২৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
এদিকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণায় দেখানো হয়, জিডিপিতে ব্যাংক খাতের অংশগ্রহণ ক্রমান্বয়ে বাড়লেও পুঁজিবাজারের অংশগ্রহণ এখনও আশানুরূপ নয়। ২০১১ সালে জিডিপিতে ব্যাংক খাতের অবদান ছিল প্রায় ৪৪ শতাংশ। আর শুধু প্রাথমিক গণপ্রস্তাাব বা আইপিওর ভিত্তিতে শেয়ারবাজারের অবদান ছিল শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশ।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম সাইফুর রহমান মজুমদান বলেন, জিডিপিতে পুঁজিবাজারের অবদান বাড়াতে অর্থনীতির নীতিনির্ধারকদেরও পুঁজিবাজারের দিকে তাকাতে হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসিসহ সব নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে স্টক এক্সচেঞ্জের সঙ্গে মিলে কাজ করতে হবে। এটি হলে বিনিয়োগকারীরা দেখবে সরকারের পলিসিতে শেয়ারবাজারও গুরুত্ব পাচ্ছে।
তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে পুঁজিবাজারে ৮৩টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ড তালিকাভুক্ত হয়েছে। তবে সূচকের খুব বেশি উন্নতি হয়নি। সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার পয়েন্টের মধ্যে ওঠনামা করছে ডিএসইর সূচক। আর লেনদেনের তেমন উন্নতি না হলেও সম্প্রতি কিছুটা বেড়েছে। দৈনিক লেনদেন পাঁচশ কোটি থেকে আটশ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবন্ধ থাকছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১৪ সালে ডিএসইতে দৈনিক গড় লেনদেনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। এর পরের বছর দৈনিক গড় লেনদেন আরও কমে এসে দাঁড়ায় ৪২২ কোটিতে। গত পাঁচ বছরের একাধিক প্রণোদনাসহ আইনকানুন ও বিধিবিধান পরিবর্তনই হয়েছে। কারসাজি এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিচারে গঠন করা হয়েছে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। এরপরও পুঁজিবাজার কাক্সিক্ষত জায়গায় যেতে পারেনি। এজন্য ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হওয়াকে দায়ী করছেন পুঁজিবাজার বিশ্লেষক এ কাদির চৌধুরী। তিনি বলেন, পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী এবং এর ব্যাপ্তি ঘটাতে নতুন নতুন ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তির কোনো বিকল্প নেই। তালিকাভুক্তবিহীন কোম্পানিগুলোকে সর্বাত্মক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ট্যাক্স সুবিধাসহ বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজ সুবিধা দিয়ে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় দায়িত্ব। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এখনও আমাদের দেশে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর পুঁজির মূল উৎস বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান। অন্যান্য দেশে পুঁজিবাজারই মূলধন সংগ্রহের মূল উৎস। তাই বিভিন্ন কোম্পানিকে মূলধন সংগ্রহে পুঁজিবাজারমুখী করা গেলে এ বাজার বিকাশে বড় ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ