ঢাকা, মঙ্গলবার 13 December 2016 ২৯ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

‘এক চীন’ নীতির প্রতি সমর্থন প্রত্যাহারের আভাস ট্রাম্পের

১২ ডিসেম্বর, দ্য গার্ডিয়ান : ‘এক চীন’ নীতির প্রতি মার্কিন সমর্থন বহাল রাখা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দেশটির নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ১৯৭৯ সাল থেকে তাইওয়ানের ব্যাপারে চীনের অবস্থানকে সম্মান জানিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, বাণিজ্য এবং অন্যান্য ইস্যুতে চীনের কাছ থেকে ছাড় না পেলে তাইওয়ান ইস্যুতে দেশটিকে সমর্থন দেয়া অব্যাহত রাখার তিনি কোনও কারণ দেখেন না। রোববার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমন অবস্থানের কথা জানান নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এদিকে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই দৃষ্টিভঙ্গিতে তার সমালোচনা করেছে বেইজিং। এশিয়ার পরাশক্তি চীন গভীর উদ্বেগও জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর মার্কিন রীতি ভেঙে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট সাই ইং ওয়েন-এর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ট্রাম্প। মূলত এর মধ্য দিয়ে তিনি এশিয়ার দীর্ঘ বিরোধ ও স্পর্শকাতর এ ইস্যুতে নতুন করে রসদ সরবরাহ করেন। ওই টেলিফোন আলাপের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কে অস্বস্তি দেখা দেয়। এ ইস্যুতে চীনা সমালোচনার জবাবে উল্টো বেইজিংকে এক হাত নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বেইজিং-এর উদ্বেগ প্রশমনে ওবামা প্রশাসন থেকে বেইজিংকে একটি ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়।
ফক্স নিউজকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “আমি জানি না আমাদের কেন ‘এক চীন’ নীতি বজায় রাখতে হবে; যদি না বাণিজ্যসহ অন্যান্য বিষয়ে তাদের সঙ্গে আমরা কোনও চুক্তি না করি।” ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেন, মুদ্রা সংক্রান্ত বিষয়ে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করছে না। উত্তর কোরিয়া কিংবা দক্ষিণ চীন সাগর নিয়েও একই কথা প্রযোজ্য।
১৯৭৯ সালের পর থেকে কোনও মার্কিন প্রেসিডেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলেননি। তবে নির্বাচিত হয়েই দীর্ঘদিনের রীতি ভাঙলেন ট্রাম্প। এ বিষয়ে ফক্স নিউজকে তিনি বলেন, তাইওয়ানের নেতার সঙ্গে তার আলাপের বিষয়ে বেইজিং সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘আমি চাই না; চীন আমাকে আদেশ করুক। এই কলটা আমাকে করা হয়েছিল। এটা ছিল বেশ চমৎকার একটা সংক্ষিপ্ত কল। অন্য কিছু দেশ এটা কিভাবে বলতে পারে যে, আমি একটি কল রিসিভ করতে পারি না? আমার কাছে মনে হয়েছে যে, এটা খুবই অসম্মানজনক।’
এর আগে তাইওয়ানের নেতার সঙ্গে বৈঠকের পর বেইজিং-এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার জবাবে টুইটারে দেওয়া একাধিক পোস্টে চীনকে এক রকম তুলোধুনা করেন নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এসব টুইটে তিনি চীনের মুদ্রানীতি এবং দক্ষিণ চীন সাগরে বেইজিং-এর কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেন।
টুইটারে ডোনাল্ড ট্রাম্প লিখেছেন, ‘চীন কি নিজেদের মুদ্রার মান কমানোর ব্যাপারে আমাদের জানিয়েছে? এর ফলে আমাদের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রতিযোগিতা করা কষ্টসাধ্য হয়ে যাচ্ছে।’ আরেক টুইটে তিনি লিখেছেন, ‘আমরা কি দক্ষিণ চীন সাগরে বিশাল সামরিক কাঠামো নির্মাণের জন্য তাদের অর্থ দেই? আমরা মনে হয়, না।’
এদিক বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ট্রাম্পের এ ফোনালাপকে কেন্দ্র করে চীনের সঙ্গে বিরোধ মীমাংসা করতে যুক্তরাষ্ট্রকে বেগ পেতে হবে। অনেকে মনে করছেন, তাইওয়ান এর মধ্য দিয়ে চীনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে যাচ্ছে।
যা নিয়ে চীন-তাইওয়ান বিরোধ : আনুষ্ঠানিকভাবে তাইওয়ান ও চীন উভয়েই চীনকে নিজেদের দেশ বলে মনে করে। ফলে উভয় দেশেই একে অপরের ভূখণ্ডের মালিকানা দাবি করে। এতেই সমস্যার শুরু। যা কয়েক দশক ধরে যুদ্ধের হুমকি সৃষ্টি করেছে। এ বিরোধের সূত্রপাত শুরু হয় ১৯২৭ সালে। যখন চীনজুড়ে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। মাও জে দংয়ের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা ১৯৪৯ সালে জাতীয়তাবাদী সরকারকে উৎখাতের মধ্য দিয়ে এ গৃহযুদ্ধের অবসান হয়। ওই সময় জাতীয়তাবাদী নেতারা পালিয়ে তাইওয়ান যান। এখনও ওই শক্তিই তাইওয়ান নিয়ন্ত্রণ করে। প্রাথমিকভাবে ওই সময় যুদ্ধ বন্ধ হয়ে পড়লেও উভয় দেশই নিজেদের চীনের দাবিদার হিসেবে উত্থাপন শুরু করে। তাইওয়ানভিত্তিক সরকার দাবি করে, চীন কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের দ্বারা অবৈধভাবে দখল হয়েছে। আর বেইজিংভিত্তিক চীনের সরকার তাইওয়ানকে বিচ্ছিন্নতাকামী প্রদেশ হিসেবে বিবেচনা করে।
এ বিরোধের জের ধরে বলা যায়, চীনের গৃহযুদ্ধ সম্পূর্ণ অবসান হয়নি আজও। তারওপর তাইওয়ানের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে রিপাবলিক অব চায়না। কমিউনিস্ট সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন চীন সরকারের নাম পিপলস রিপাবলিক অব চায়না।
এ বিরোধটি স্নায়ু যুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত হয়। ওই সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন কমিউনিস্ট নিয়ন্ত্রণাধীন সরকারকে চীনের বিধিসম্মত সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের জাতীয়তাবাদীদের স্বীকৃতি দেয়। ওই সময় এমনকি জাতিসংঘে চীনের আসনগুলো ছিলো তাইওয়ানেরই দখলে।
১৯৭০ দশকে এসে বিশ্ব বিভক্ত চীনকে গ্রহণ করতে শুরু করে। ১৯৭১ সালে জাতিসংঘে আসন ফিরে পায় চীন। তার পরের বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড এম নিক্সন চীন সফর করেন। ১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের পরিবর্তে বেইজিংকে স্বীকৃতি দেয়। বিশ্বের অপর দেশগুলোও যুক্তরাষ্ট্রকে অনুসরণ করে বেইজিংকে স্বীকৃতি দেয়।
কেন আলাদা হচ্ছে না চীন-তাইওয়ান? : আলাদা হওয়াটা উভয় দেশের জন্যই অত্যন্ত কঠিন। বেইজিং সরকার তাইওয়ানকে একত্রিত করার আশা কখনও ত্যাগ করেনি। আঞ্চলিক অখ-তা সব দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বেইজিংয়ের জন্য বিশেষ স্পর্শকাতর। কারণ চীনের আশঙ্কা তাইওয়ানকে স্বাধীনতা দিলে তিব্বত ও অপর প্রদেশগুলোও স্বাধীনতা দাবি করতে পারে। তাইওয়ান সরকার আছে উভয়মুখী সংকটে। দেশটি গণতান্ত্রিক হওয়ায় কমিউনিস্ট সরকারের অধীনস্ততা মেনে নিয়ে নাগরিকদের স্বাধীনতা খর্ব করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। একই সঙ্গে তাইওয়ান যদি স্বাধীনতার ঘোষণা দেয় তাহলে চীন যুদ্ধের হুমকি দিয়ে রেখেছে। ফলে তাইওয়ান চীনের অধিকার ছাড়তে পারছে না। কারণ এটা হবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া। এ পরিস্থিতি ১৯৯২ সালে অনানুষ্ঠানিকভাবে উভয় দেশ একমত হয় এক চীনের বিষয়ে। যা মূল চীন ও তাইওয়ান নিয়ে গঠিন। কিন্তু উভয়েই এর আসল অর্থ অস্বীকার করতেও একমত হয়।  বেইজিং তাইওয়ানকে পুনরায় একত্রিত করতে অনড়। কারণ তারা এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে। কিন্তু তাইওয়ানে বিষয়টি বিতর্কিত। অনেকেই মনে করেন, চীনের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্কের কারণে তাদের বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যরা বিশেষ করে তরুণরা বেইজিংকে বিশ্বাস করেন না। সময়ের পরিক্রমায় তাইওয়ানের নাগরিকরা নিজেদের তাইওয়ানিজ হিসেবে ভাবতে শুরু করেছেন। যা চীনা জাতীয়তার চেয়ে আলাদা। গত বছর নির্বাচিত বর্তমান প্রেসিডেন্ট সাই ইং-ওয়েনসহ অনেক তাইওয়ানের নেতাই ১৯৯২ সালের অনানুষ্ঠানকি সমঝোতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তিনি নিজের এই অবস্থানকে তুলে ধরতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তবে তা নিয়ে উচ্চবাচ্য করতে চান না। কারণ এতে বেইজিং মনে করতে পারে তাইওয়ান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছে।
মিস সাই-এর সঙ্গে ফোনালাপের পর ট্রাম্প তাকে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আখ্যায়িত করে টুইট করেছেন। যা যুক্তরাষ্ট্রের ‘এক চীন’ নীতিকে সমর্থনের চিরাচরিত অবস্থান লঙ্ঘন করেছে।
এক চীন নীতি কী? : তাইওয়ান ও বেইজিং একই অঞ্চলের মালিকানা দাবি করায় বিদেশী রাষ্ট্রগুলো উভয়কেই স্বীকৃতি দিতে পারে না। বেইজিং বাকি দেশগুলোকে এক চীন নীতি সমর্থনে চাপ দিয়ে আসছে। প্রায় সব দেশই বেইজিংয়ের এ অবস্থান মেনে নিয়েছে। চীনই এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ।
যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের সুনির্দিষ্ট এক চীন নীতি অনুসরণ করে। এর তিনটি উদ্দেশ্য রয়েছে: বেইজিংয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, তাইওয়ানকে রক্ষা ও সহযোগিতা করে গণতন্ত্রের পথ রক্ষা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা।
আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭৯ সালে তাইওয়ানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ছিন্ন করলেও দেশটিতে অলাভজনক মার্কিন প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যার নাম আমেরিকান ইনস্টিটিউট। অনানুষ্ঠানিকভাবে এ প্রতিষ্ঠানটি দূতাবাসের কাজ করে। তাইওয়ানে গণতন্ত্রের বিকাশ এবং সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করতে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করছে। যদিও সম্প্রতি এ অস্ত্র বিক্রির পরিমাণ কমে আসছে। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাইওয়ানকে স্বীকৃতি না দিয়েই সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্র। যদিও যুক্তরাষ্ট্র দেশটি যাতে স্বাধীনভাবে দেশ চালনা করতে পারে সে প্রয়াসও নিচ্ছিলো। এই নীতিকে বেইজিংয়ের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ সুবিধা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। বরং এটাকে মূল চীন ও তাইওয়ানের সঙ্গে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার নীতি ও যুদ্ধ এড়ানোর কৌশল হিসেবেই মার্কিনিরা মনে করে।
যুক্তরাষ্ট্র যখন গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়ের নীতি গ্রহণ করলো তখন উভয় পক্ষই মার্কিন অবস্থানকে অগ্রাহ্য করার কোনও ইঙ্গিত দেয়নি। ১৯৯৫ সালে তাইওয়ানি প্রেসিডেন্টকে ভিসা না দেওয়ার নীতি থেকে সরে আসে। বেইজিং ওই ঘটনাকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার ঘোষণা হিসেবে বিবেচনা করেছিল। এরপর তখন তাইওয়ান স্ট্রেইটে মিসাইল হামলা চালায়। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলটিতে দুটি বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে। যদিও ওই সময় এ সংকট শান্তিপূর্ণভাবেই সমাধান হয়েছিল। তবে ওই ঘটনা প্রমাণ করেছিল স্থিতিশীলতা রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ও যুদ্ধের আশঙ্কা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ