ঢাকা, মঙ্গলবার 13 December 2016 ২৯ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

ফারাক্কার ফাঁদে আজও কাঁদছে বাংলাদেশ

আখতার হামিদ খান : ‘বিস্তীর্ণ দুপারে অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনেও, নিঃশব্দ নীরবে/ও গঙ্গা তুমি, গঙ্গা বইছো কেন’- প্রখ্যাত শিল্পী ভুপের হাজারিকার এই গান আজ আমাদের হাহাকারের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি। তবে এপার বাংলা অর্থাৎ বাংলাদেশে গঙ্গা এসে পদ্মা নাম ধারণ করেছে। এখন শুধু গঙ্গার দুই পারেই হাহাকার নেই, ফারাক্কা বাঁধ আমাদের অনেক নদীর নাব্য কেড়ে নিয়ে পাড়ের মানুষদেরই হাহাকারের মধ্যে ফেলেনি; মরা নদী এবং আরও অনেক অনেক বেশি বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষকে ধীরে ধীরে দরিদ্র থেকে হতদরিদ্র করে দিচ্ছে। ফারাক্কা কি আমাদের মরুভূমি করে দেবে? আমাদের কি আর কৃষি জমি থাকবে না? ভারত-বাংলাদেশ ফারাক্কা চুক্তি থেকে পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে আমাদের কি আবারও লংমার্চ করতে হবে? ১৯৭৪ সালের ১৬ মে ইন্দিরা-মুজিবের সেই যৌথ ঘোষণার কি কোনো সুফল আমরা পাব না? প্রতিবেশী দেশ ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে স্বার্থসংশ্লিষ্ট এই ইস্যুতে এবার কি ছাড় দেবে? নাকি আবারও কোনো লংমার্চের আয়োজন করতে হবে?
ফারাক্কা বাঁধের সেই শুরুর সময় বাংলার মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী ১৯৭৬ সালের ১৬ মে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চের আয়োজন করেছিলেন। সেই দিন থেকে ১৬ মে ফারাক্কা দিবস নামে পরিচিত। এখনো বাংলাদেশ পানির ন্যায্য হিস্যা পায়নি।
ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশ মরুভূমি হতে চলেছে। কৃষি কাজের জন্য পানির তীব্র হাতাকার তৈরি হচ্ছে। মাটির তলা থেকে কাক্সিক্ষত পানি পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীর নাব্য কমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। ফারাক্কা বাঁধের গোড়ার দিকে মজলুম জননেতা করে দিয়েছিলেন। সে সময় ফারাক্কাবিরোধী এক প্রবল জনমত গড়ে ওঠে এ দেশের মানুষের মধ্যে। মওলানা ভাসানী ফারাক্কা অভিমুখে ঐতিহাসিক এক লং মার্চের আয়োজন করে। লং মার্চ করার আগে ভাসানী তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে চিঠি লিখে এই বাঁধ বন্ধের আহ্বান জানান।
বাংলাদেশের সঙ্গে ফারাক্কার পানি বণ্টন চুক্তি : বাংলাদেশ-ভারত ফারাক্কা নিয়ে আলোচনার গোড়াপত্তন হয় ১৯৫১ সালের ২৯ অক্টোবর তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের আমলে। মূলত ভারতই তাদের নিজেদের প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঠেকাতে গঙ্গার পানি প্রত্যাহার নিয়ে ফারাক্কা বাঁধ নামক এক ফাঁদ পাতে। আন্তর্জাতিক নদী কমিশন আইনের তোয়াক্কা না করে ভারত তাদের সিদ্ধান্ত নেয় এবং সে সময়ই কাজ শুরু করে দেয়। সে পরিস্থিতিতে পাকিস্তান সরকার ভারতের বিষয়টি জানার চেষ্টা করলেই বিষয়টি সবার নজরে আসে। এ সময় বিষয়টি পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশের নজরে আসে। এ দেশের রাজনীতিক-গবেষক-বিশেষজ্ঞরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। পাকিস্তান এই পানি প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া নিয়ে ভারতের কাছে তাদের পরিকল্পনা জানতে চায়। জবাবে ১৯৫২ সালে ভারত জানায়, পরিকল্পনাটি মাত্র প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে পাকিস্তানের উদ্বেগ সম্পূর্ণ অনুমাননির্ভর। এ ঘটনা থেকেই গঙ্গার পানি বণ্টন-সংক্রান্ত আলোচনার দীর্ঘ ইতিহাসের সূত্রপাত। এরপর দীর্ঘ দিন আর এ নিয়ে কোনো আলাপ আলোচনা হয়নি।
কিন্তু ভারত বিষয়টি নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা ও গবেষণা চালিয়ে গেছে। তারা এক মুহূর্তের জন্যও তাদের লক্ষ্য থেকে সরে আসেনি। ভারত ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে তাদের সিদ্ধান্ত ও নীতি চূড়ান্ত করে। এত অংশ হিসেবে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান ও ভারত সরকার বিশেষজ্ঞ  থেকে শুরু করে সরকার প্রধান পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে গঙ্গার প্রবাহ বণ্টনের ব্যাপারে বহুবার আলোচনায় বসেছে।
বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে ১৯৮২ সালের অক্টোবরে পরবর্তী দুই বছর অর্থাৎ ১৯৮৩ ও ’৮৪ সালের জন্য গঙ্গার পানি বন্টন-সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। কোনো সমঝোতা চুক্তি না থাকায় ১৯৮৫ সালে গঙ্গার পানি এককভাবে ভারত প্রত্যাহার করে নেয়। ১৯৮৫ সালের নবেম্বরে দুই দেশের মধ্যে ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৮- তিন বছরের জন্য ফারাক্কা থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে বর্তমান সরকারের প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরে পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন বলেন, ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীর যৌথ ঘোষণাটি ছিল ঐতিহাসিক। চুক্তি অনুযায়ী পানি বণ্টিতও হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বিষয়টি অন্য রকম হয়ে যায়। পরবর্তী সরকারগুলো আর এ ব্যাপারে কোনো ধরনের চেষ্টাই করেনি। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় পর আবার ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তৎকালীন পানিসম্পদমন্ত্রী আবার পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আরেক দফা সমঝোতা ফারাক্কার পানিবণ্টন নিয়ে খুব বেশি একটা সংকট হয়নি। তিনি বলেন, এবার আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় আসার পরও বিষয়টি তারা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। ফারাক্কাসহ দ্বিপক্ষীয় সব বিষয়ে দুই দেশের স্বার্থ রেখেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরো জোরদার হবে। ইতিমধ্যে ফারাক্কার পানিবণ্টনসহ দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কোন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বেশ কিছু বিষয়ে আলোচনা সফর হয়েছে। ফারাক্কার পানিবন্টন ইস্যুতে বাংলাদেশের ব্যর্থতা নিয়ে রমেশ চন্ত্র সেন বলেন, ‘আমি আগেই বলেছি, বিগত সরকারগুলো এসব ব্যাপারে উদাসীন ছিল। সবচেয়ে বড় কথা, সরকারগুলো ব্যস্ত ছিল ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য।’
বণ্টনের ওপর আরেকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারায় বাংলাদেশ পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছিল।
১৯৮৯ সালের পর শুষ্ক মওসুম থেকে পানি ভাগাভাগি সংক্রান্ত কোনো সমাঝোতা ছিল না। এ সময় ভারত এককভাবে পানি প্রত্যাহার করে নেয়। যার মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের ওপর। এক তথ্যমতে জানা যায়, প্রাক-ফারাক্কা আমলে মার্চ মাসে হার্ডিঞ্জ সেতুর কাছে যেখানে গঙ্গার প্রবাহ ছিল প্রতি সেকেন্ডে এক হাজার ৯৮০ কিউবিক মিটার, ১৯৯৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ২৬১ কিউবিক মিটারে।
গঙ্গা বিধৌত বাংলাদেশ : বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম বদ্বীপ অঞ্চল। ৫৮টি আন্তর্জাতিক নদীসহ কমপক্ষে ২৩০টি নদ-নদী বিধৌত একটি প্লাবন ভূমি। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক নদীগুলোর মধ্যে ৫৫টির উৎপত্তি ভারত থেকে এবং তিনটি মিয়ানমার থেকে। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার উপনদী এবং শাখা নদী বিধৌত মোট এলাকার পরিমাণ ১৭ লাখ ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার। এই এলাকার শতকরা সাত ভাগ বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত।
বর্ষা মওসুমে পানি বৃদ্ধির ফলে দেশের প্রায় এক-চতুর্থাংশ স্থলভাগ জলমগ্ন হয়, আবার শুষ্ক মওসুমে অধিকাংশ নদীতে প্রবাহ হ্রাস পাওয়ার ফলে জলের অভাব দেখা দেয়। উভয় পরিস্থিতিই জনজীবনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। এসব নদীর ভাটি অঞ্চলে বাংলাদেশের অবস্থানহেতু নদীগুলোর জলপ্রবাহের ওপর এ দেশের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সাত হাজার মিটার উচ্চতায় হিমালয়ে হিমবাহে উৎপন্ন গঙ্গা নদী ভারতের উত্তর প্রদেশ, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মধ্য দিয়ে দুই হাজার ৫৫০ কিলোমিটার পথ প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশের গোয়ালন্দের কাছে ব্রহ্মপুত্র নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। বাংলাদেশের গঙ্গার দৈর্ঘ্য ২৬০ কিলোমিটার। গঙ্গা বিধৌত মোট অঞ্চলের আয়তন ১০ লাখ ৮৭ হাজার ১ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে ৮ লাখ ৬০ হাজার বর্গকিলোমিটার ভারতে, এক লাখ ৪৭ হাজার ১৮১ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশে। গঙ্গা বিধৌত এই বিপুল আয়তনের অঞ্চল আক্ষরিক অর্থেই বিরান মরুভূমি হতে চলেছে।
ফারাক্কার প্রভাব : কলকাতা বন্দরকে পলির হাত থেকে রক্ষার অজুহাতেই মূলত ভারত ফারাক্কা বাঁধের পরিকল্পনা করে। বাংলাদেশের ১৮ মাইল উজানে মনোহরপুরের কাছে নির্মিত এই বাঁধ এ দেশের জীবন ও জীববৈচিত্র্যের জন্য হয়ে ওঠে হুমকিস্বরূপ।
দীর্ঘ ৩৬ বছরে ভারত কর্তৃক গঙ্গার একতরফা পানির প্রত্যাহার বাংলাদেশের জীবন ও জীববৈচিত্র্যই ধ্বংস করেনি; ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে এ দেশে হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা কৃষি, শিল্প, বনসম্পদ ও প্রাণ বৈচিত্র্য। ফারাক্কা পূর্বকালে খুলনায় সর্বোচ্চ লবণাক্ততার পরিমাণ ছিল ৫০০ মাইক্রোসোম এবং ফারাক্কায় প্রবাহ প্রত্যাহারের ফলে খুলনার লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৫০০ মাইক্রোসোম। এই লবণাক্ততা খুলনার উত্তরে ২৮০ কি.মি. পর্যন্ত উজানে সম্প্রসারিত হয়েছে। এছাড়া ফারাক্কায় প্রবাহ প্রত্যাহারের ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নদ-নদীসমূহ বর্তমানে প্রায় মৃত।
প্রয়োজন শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি : ভারত তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বড়ভাই সুলভ আচরণ করে থাকে। যার ফলে এই উপমহাদেশের প্রায় প্রত্যেকটি দেশের জনগণের মধ্যে ভারতের বিরুদ্ধে আক্রোশ তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশে ভারত বিরোধীকে সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ভেদ বিচারের মধ্যে ফেলে দিয়ে বিচার করলে তা হবে আত্মঘাতী। মাওলানা ভাসানী সেই আত্মঘাতী কাজ করেননি।
আঞ্চলিক সহায়তা ছাড়া কোনো একক ক্ষুদ্র দেশের পক্ষে শান্তি, নিরাপত্তা শক্তিগুলোর সঙ্গে আরও দৃঢ় অর্থনৈতিক সম্পর্ক নির্মাণের মধ্য দিয়ে ভারতের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ আত্মমর্যাদাশীল আলোচনায় উপনীত হওয়া সম্ভব। আর এক্ষেত্রে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর শিক্ষা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি একই সঙ্গে বড় বাধা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি। সকলের সঙ্গে যেমন শত্রুতা করে চলা যায় না, তেমনি সকলের সঙ্গে বন্ধুত্বও হয় না। এখন প্রয়োজন সময় উপযোগী বাস্তব প্রতিবেশি দেশসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক করা হবে। তা না হলে ফারাক্কা টিপাইমুখসহ এরকম জাতীয় মানব সৃষ্ট দুর্যোগ আমাদের কাঁধের ওপর সিন্দাবাদের ভূতের মত চেপে বসবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ