ঢাকা, মঙ্গলবার 13 December 2016 ২৯ অগ্রহায়ন ১৪২৩, ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

কুরআনের আলোকে সম্পত্তিতে নারীর অধিকার

জিয়া হাবীব আহ্সান : ইসলামী শরীয়তে সম্পত্তিতে মুসলিম নারীর অধিকার নিশ্চিত করা হলেও আজ তারা উত্তরাধিকার থেকে নানা ভাবে বঞ্চিত। এতদসঙ্গে সঠিক জ্ঞান না তাকায় অনেকে ইসলাম নারীকে ঠকিয়েছে মর্মে মিথ্যা অপবাদ দেয়া হয়। ইসলামে উত্তরাধিকার আইনে পুরুষদের চেয়ে নারীদের সম্পদের অংশ কম দেওয়া হয়েছে। এর পিছনে যুক্তিসঙ্গত কারণ বুঝতে না পেরে অনেকে ইসলামী নীতিমালা সম্পর্কে ভুল ধরণা পোষণ করে থাকেন। তাঁদের ধারণা নারীদের প্রতি ইসলামের আইন হল বৈষম্যমূলক। পবিত্র কুরআনুল করীমের বিধান অনুযায়ী সম্পত্তিতে নারীর অধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়ন সম্পর্কিত সুস্পষ্ট ঘোষণা রয়েছে। এরপরেও মহাবিজ্ঞানময় পূর্ণ জীবনবিধান সম্পর্কে না বুঝে অনেকে কটাক্ষ করে থাকেন। সত্য অনুসন্ধিৎসু সুন্দর মনের অবলোকনের জন্য সম্পত্তিতে নারীর যে কুরআনিক অধিকার রয়েছে তা জানা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের সমাজে কুরআনের আইন মোতাবেক নারীরা সম্পত্তি সর্বক্ষেত্রে পাচ্ছে না বিধায় তারা আজ অধিকারহারা, সম্পত্তিহারা ও নির্যাতিতা। এজন্য মানবতার ধর্ম ইসলামকে কটাক্ষ করা মানে এর বিরোধিতা করা ছাড়া আর কিছুই না। আর বর্তমানে নারীর এই বঞ্চনার জন্য প্রকৃতপক্ষে প্রচলিত সমাজব্যবস্থা দায়ী।
ইতিহাস সাক্ষী বিশ্বমানবতার বন্ধু হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লামই সর্বপ্রথম অধিকারহারা নারী জাতির প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠার বাস্তব ঘোষণা দেন। প্রতিটি সভ্যতা ও মতবাদ নারীর অধিকার ও স্বাধীনতাকে কুক্ষিগত করে তাকে ব্যক্তিগত স¤পত্তি কিংবা ভোগ্যপণ্যে পরিণত করেছে। আধুনিক বিশ্বও তাকে স্বাধীনতার নামে আপনহারা ও বাঁধনহারা করেছে। তথাকথিত আধুনিকতা ও সমান অধিকারের সভা-স্লোগান দিয়ে নারীকে নিয়ে চলেছে মধ্যযুগীয় কালে। একশ্রেণির লোক নারীদেরকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলে বিজ্ঞাপনে পরিণত করেছে। তারা লক্ষ লক্ষ নারী ও শিশুর জীবনকে নৈতিক চরিত্রহীনতার স্তরে ঠেলে দিচ্ছে। নারীর মানবিকতাকে তুলে না ধরে শরীরকে তুলে ধরে সমাজে তাদের পণ্য হিসেবে প্রদর্শন করছে অহরহ। তাদের জঘন্য একটা পেশাকে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের যৌনকর্মী নামে অভিহিত করা হচ্ছে। অথচ ইসলাম বলেছে, “তোমরা জেনার কাছেও যেও না। এতে ইহকালীন ও পরকালীন শাস্তি অবশ্যম্ভাবী।” ইসলাম সর্বপ্রথম নারীকে একটি সত্তা হিসেবে এবং তার ব্যক্তিগত অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়ে তাকে প্রতিষ্ঠার বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করে। যখন নারীকে  মানুষ হিসাবেই স্বীকার করা হতো না, তখন ইসলাম এসে ঘোষণা করলো, “হে মানবজাতি, তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় করো, যিনি দু’জন হতে নর-নারী ছড়িয়ে দেন এবং আল্লাহ্কে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট আরজ কর এবং সতর্ক থাক জ্ঞাতি স¤পর্কে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তোমাদের উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন।” নারীদেরকে যখন অবরুদ্ধ করে রাখা হতো এবং তাদের পাওনা মোহরানা থেকে বঞ্চিত করে রাখা হতো, তখন কুরআন ঘোষণা করলো, “তোমরা তাদেরকে যা দিয়েছ তা হতে কিছু আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে তাদেরকে অবরুদ্ধ করে রাখবে না।”
ইসলামের সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণার পূর্বে পৃথিবীর কোন জাতিই নারীর কোন কিছুর উপর নিজস্ব অধিকারকে স্বীকার করতো না। ইসলাম এসে নারীজাতির অর্থনৈতিক স্বাধীনতা স্বীকার করেছে। যেমন কুরআনে বলা আছে, “পুরুষ যা অর্জন করে তা তার প্রাপ্য এবং নারী যা অর্জন করে তা তার প্রাপ্য।” ইসলামের দৃষ্টিতে নারী-পুরুষ উভয়েই তাদের কৃতকর্মের ফল ভোগ করবে। কুরআন পাকে বলা হয়েছে, “নারীদের ন্যায়সংগত অধিকার আছে, যেমন রয়েছে পুরুষদের।” নারীর সম্পত্তিতে অধিকার নিশ্চিত করে আল্লাহ্পাক রাব্বুল আলামীন বলেন, “পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনদের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষদেরও অংশ আছে এবং পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনদের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীদেরও অংশ আছে; অল্প হোক কিংবা বেশি। এ অংশ নির্ধারিত” (সূরা নিসা: আয়াত-৭)। ইসলাম একাধারে কন্যা, স্ত্রী, ভগ্নী, মাতা হিসেবে সম্পত্তিতে নারীর অধিকার নিশ্চিত করেছে। কুরআন নারীদের বঞ্চিত করেছে মর্মে যারা অজ্ঞতাপ্রসূত অভিযোগ করে তাদের উদ্দেশ্যে কুরআনের আলোকে স¤পত্তিতে নারীর অধিকারের বর্ণনা সংক্ষেপে তুলে ধরেছি।
(১) সম্পত্তিতে কন্যা ও মাতা হিসেবে নারীর অধিকার : আল্লাহ্ তোমাদের সন্তান সম্বন্ধে নির্দেশ দিয়েছেন, এক পুত্রের অংশ দু’কন্যার অংশের সমান, কিন্তু কন্যা দু’এর অধিক থাকলে তাদের জন্য পরিত্যক্ত স¤পত্তির ২/৩ (দুই-তৃতীয়াংশ) আর মাত্র এক কন্যা থাকলে তার জন্য ১/২ (অর্ধাংশ)। তার সন্তান থাকলে তার পিতামাতা প্রত্যেকের জন্য পরিত্যক্ত স¤পত্তির ১/৬ (এক-ষষ্ঠাংশ), সে নিঃসন্তান হলে এবং পিতামাতাই উত্তরাধিকারী হলে তার মাতার জন্য ১/৩ (এক-তৃতীয়াংশ), তার ভাইবোন থাকলে মাতার জন্য ১/৬ (এক-ষষ্ঠাংশ)। এসবই সে ওসীয়ত করে তা দেয়ার এবং ঋণ পরিশোধের পর। তোমাদের পিতা ও সন্তানদের মধ্যে উপকারে কে তোমাদের নিকটতর তা তোমরা জান না। এটা আল্লাহ্র বিধান, আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, বিজ্ঞানময়” (সূরা নিসা: ১১)।
ইসলামে কন্যার অংশের গুরুত্ব: কুরআনে কন্যাদেরকে অংশ দেয়ার প্রতি এতটুকু গুরুত্ব আরোপ করেছে যে, কন্যাদের অংশকে আসল ভিত্তি সাব্যস্ত করে এর অনুপাতে পুত্রদের অংশ ব্যক্ত করেছে। দুই কন্যার অংশ ও এক পুত্রের অংশের সমপরিমাণ বলার পরিবর্তে এক পুত্রের অংশ, দুই কন্যার অংশের সম্পরিমাণ বলে ব্যক্ত করা হয়েছে। অনেকেই বোনদেরকে অংশ দেয় না এবং বোনেরা এ কথা চিন্তা করে অনিচ্ছা সত্ত্বেও চক্ষুলজ্জার খাতিরে ক্ষমা করে দেয় যে, পাওনা যখন পাবেই না, তখন ভাইদের সাথে দর কষাকষির দরকার কি? এরূপ ভাইদের জিম্মায় তাদের হক পাওনায় থেকে যায়। যারা এভাবে ওয়ারিশী স্বত্ব আত্মসাৎ করে, তারা অত্যন্ত গুনাহ্গার, তাদের মধ্যে কেউ কেউ নাবালেগ কন্যাও থাকে। তাদেরকে অংশ না দেওয়া দ্বিগুণ গুনাহ্ (তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন, ২৩৬ পৃষ্ঠা)। 
(২) সম্পত্তিতে স্ত্রী হিসেবে নারীর অধিকার : কুরআনে বলা হয়েছে, “আর, তোমাদের হবে অর্ধেক সম্পত্তি, যা ছেড়ে যায় তোমাদের স্ত্রীরা যদি তাদের কোন সন্তান না থাকে। যদি তাদের সন্তান থাকে, তবে তোমাদের হবে এক-চতুর্থাংশ (১/৪) ঐ সম্পত্তির, যা তারা ছেড়ে যায়; ওসিয়তের পর, যা তারা করে এবং ঋণ পরিশোধের পর। স্ত্রীদের জন্যে এক-চতুর্থাংশ হবে (১/৪) ঐ সম্পত্তির, যা তোমরা ছেড়ে যাও যদি তোমাদের কোন সন্তান না থাকে। আর যদি তোমাদের সন্তান থাকে, তবে তাদের জন্যে হবে ঐ সম্পত্তির আট ভাগের এক ভাগ (১/৮), যা তোমরা ছেড়ে যাও ওসিয়তের পর, যা তোমরা কর এবং ঋণ পরিশোধের পর। যে পুরুষের ত্যাজ্য সম্পত্তি, তার যদি পিতা, পুত্র কিংবা স্ত্রী না থাকে এবং এই মৃতের এক ভাই কিংবা এক বোন থাকে, তবে উভয়ের প্রত্যেকে ছয় ভাগের এক ভাগ (১/৬) পাবে। আর যদি ততোধিক থাকে, তবে তারা এক তৃতীয়াংশ (১/৩) অংশীদার হবে ওসিয়তের পর, যা করা হয় অথবা ঋণের পর এমতাবস্থায় যে, অপরের ক্ষতি না করে। এ বিধান আল্লাহ্র। আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, সহনশীল” (সূরা আন নিসা: ১২)। “এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূলের আদেশমত চলে, তিনি তাকে জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন, যেগুলোর তলদেশ দিয়ে স্রোতস্বিনী প্রবাহিত হবে। তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। এ হল বিরাট সাফল্য” (সূরা: আন নিসা: ১৩)। “যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূলের অবাধ্যতা করে এবং তার সীমা অতিক্রম করে তিনি তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন। সে সেখানে চিরকাল থাকবে। তার জন্যে রয়েছে অপমানজনক শাস্তি” (সূরা: আন নিসা- ১৪)। “পিতা-মাতা এবং নিকটাত্মীয়গণ যা ত্যাগ করে যায় সে সবের জন্যই আমি উত্তরাধিকারী নির্ধারণ করে দিয়েছি। আর যাদের সাথে তোমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়েছ তাদের প্রাপ্য দিয়ে দাও। আল্লাহ্তায়ালা নিঃসন্দেহে সব কিছুই প্রত্যক্ষ করেন” (সূরা নিসা: ৩৩)।
স্ত্রীর মোহরানার অধিকার : ইসলামে স্ত্রীর মোহরানার অধিকার অলংঘনীয়। কোন ছলচাতুরীর মাধ্যমে স্ত্রীকে এ অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। কুরআনে বলা হয়েছে, “আর তোমরা স্ত্রীদেরকে তাদের মোহর দিবে খুশি মনে। তারা যদি খুশি হয়ে তা হতে অংশ ছেড়ে দেয়, তবে তা তোমরা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোগ কর” (সূরা নিসা: ৪)। পূর্বের মতো স্ত্রীদের মোহরের ব্যাপারে বর্তমান সমাজেও অনেক ধরনের অবিচার ও জুলুমের পন্থা প্রচলিত আছে। স্ত্রীর প্রাপ্য মোহর তার হাতে পৌঁছানো হয় না। বহুক্ষেত্রে মেয়ের অভিভাবকগণই তা আদায় করে এবং আত্মসাৎ করে। এই প্রথা উচ্ছেদ করার জন্যই কুরআন নির্দেশ দিয়েছে, “স্ত্রীর মোহর তাকেই পরিশোধ কর, অন্যকে নয়।” অন্যদিকে অভিভাবকগণকেও নির্দেশ দেয়া হয়েছে, “মোহর আদায় হলে তা যার প্রাপ্য তার হাতেই অর্পণ কর। তার অনুমতি ছাড়া অন্য কেউ যেন তা খরচ না করে।” ন্যায়সংগতভাবে মোহর প্রদান করে নারীকে বিয়ে করার নির্দেশ দিয়েছে ইসলাম। বলা আছে, “এবং নারীর মধ্যে তোমাদের অধিকারভুক্ত দাসী ব্যতীত সকল সধবা তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ, তোমাদের জন্য এটা আল্লাহর বিধান। উল্লিখিত নারীগণ ব্যতীত অন্য নারীকে অর্থব্যয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করতে চাওয়া তোমাদের জন্য বৈধ করা হলো, অবৈধ যৌন সস্পর্কের জন্য নয়। তাদের মধ্যে যাদেরকে তোমরা সম্ভোগ করেছো তাদের নির্ধারিত মোহর অর্পণ করবে। মোহর নির্ধারণের পর কোন বিষয়ে পরস্পর রাজী হলে তাতে তোমাদের কোন দোষ নেই। আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়” (সূরা নিসা: ২৪)। “আর তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি স্বাধীন মুসলমান নারীকে বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে না, সে তোমাদের অধিকারভুক্ত মুসলিম ক্রীতদাসীদেরকে বিয়ে করবে। আল্লাহ তোমাদের ঈমান স¤পর্কে ভালোভাবে জ্ঞাত রয়েছেন। তোমরা পরস্পর এক, অতএব, তাদেরকে তাদের মালিকের অনুমতিক্রমে বিয়ে কর এবং নিয়ম অনুযায়ী তাদেরকে মোহরানা প্রদান কর এমতাবস্থায় যে, তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে, ব্যভিচারিণী কিংবা উপ-পতি গ্রহণকারিণী হবে না। অতঃপর যখন তারা বিবাহ বন্ধনে এসে যায়, তখন যদি কোন অশ্লীল কাজ করে, তবে তাদেরকে স্বাধীন নারীদের অর্ধেক শাস্তি ভোগ করতে হবে। এ ব্যবস্থা তাদের জন্যে, তোমাদের মধ্যে যারা ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার ব্যাপারে ভয় করে। আর যদি সবর কর, তবে তা তোমাদের জন্যে উত্তম। আল্লাহ ক্ষমাশীল, করুণাময়” (সূরা নিসা: ২৫)।
মৃত্যু আসন্ন হলে স্ত্রীকে এক বছরের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করবে : “তোমাদের মধ্যে সপত্মিক অবস্থায় যাদের মৃত্যু আসন্ন তারা যেন তাদের স্ত্রীদিগকে গৃহ হতে বহিষ্কার না করে, তাদের এক বছরের ভরণ পোষণের ওসীয়ত করে যাবে। কিন্তু যদি তারা নিজ থেকে বের হয়ে যায়, তবে বিধিমত নিজেদের জন্য তারা যা করবে তাতে তোমাদের কোন পাপ নেই, আল্লাহ্ পরাক্রান্ত প্রজ্ঞাময়” (সূরা বাকারা : ২৪০)।
স্ত্রী পরিত্যাগ করতে চাইলে সম্পদ অধিগ্রহণ করো না :
“তোমরা যদি এক স্ত্রীর স্থলে অন্য স্ত্রী গ্রহণ করা স্থির কর এবং তাদের একজনকে আগাম অর্থ দিয়ে থাক, তবুও এটা হতে কিছুই ফেরত নিও না। “তোমরা কি মিথ্যা অপবাদ এবং প্রকাশ্য পাপাচার দ্বারা তা গ্রহণ করবে? কিরূপে তোমরা এটা গ্রহণ করবে, যখন তোমরা একে অপরের কাছে গমন করেছ এবং তারা তোমাদের নিকট হতে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি নিয়েছে” (সূরা নিসা: ২০-২১)।
মোহরানার গুরুত্ব : যদি স্ত্রীর মোহ্রানা পরিশোধ করা না থাকে, তবে অন্যান্য ঋণের মতই প্রথমে মোট তাজ্য স¤পত্তি থেকে মোহ্রানা পরিশোধ করার পর বাকী সম্পত্তি ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন করা হবে। মোহ্রানা দেয়ার পর স্ত্রী ওয়ারিশী স্বত্বে অংশীদার হবার দরুন এ অংশ নেবে। মোহরানা পরিশোধ করায় যদি মৃত স্বামীর সম্পত্তি অবশিষ্ট না থাকে, তবে অন্যান্য ঋণের মত সম্পূর্ণ সম্পত্তি মোহরানা বাবত স্ত্রীকে সমর্পণ করা হবে এবং ওয়ারিশ অংশ পাবে না।
(৩) ভগ্নী হিসেবে সম্পত্তিতে নারীর অধিকার : “মানুষ আপনার নিকট ফতোয়া জানতে চায়। অতএব, আপনি বলে দিন, আল্লাহ্ তোমাদিগকে কালালাহ এর মীরাস সংক্রান্ত সুস্পষ্ট নির্দেশ বাতলে দিচ্ছেন, যদি কোন পুরুষ মারা যায় এবং তার কোন সন্তানাদি না থাকে এবং এক বোন থাকে, তবে সে পাবে তার পরিত্যক্ত সম্পত্তির অর্ধেক অংশ এবং সে যদি নিঃসন্তান হয়, তবে তার ভাই তার উত্তরাধিকারী হবে। তার দুই বোন থাকলে তাদের জন্য পরিত্যক্ত সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩)। পক্ষান্তরে যদি ভাই ও বোন উভয়ই থাকে, তবে একজন পুরুষের অংশ দু’জন নারীর সমান। তোমরা বিভ্রান্ত হবে এই আশংকায় আল্লাহ তোমাদিগকে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছেন। আর আল্লাহ হচ্ছেন সর্ব বিষয়ে পরিজ্ঞাত” (সূরা নিসা: ১৭৬)।
সম্পত্তিতে কন্যা, মাতা ও স্ত্রীর অংশ সম্পর্কে ইসলাম : হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, সম্পদ সন্তানের জন্য ছিল আর পিতা-মাতার জন্য ছিল ওসীয়ত। তারপর আল্লাহতায়ালা তাঁর পছন্দ অনুযায়ী এর পরিবর্তন করলেন। ছেলের অংশ মেয়ের ২ (দুই) গুণ, পিতা-মাতা প্রত্যেকের জন্য ১/৬ (এক-ষষ্ঠাংশ), স্ত্রীর জন্য (যদি সন্তান থাকে) ১/৮ (এক-অষ্টমাংশ), না থাকলে ১/৪ (এক-চতুর্থাংশ), স্বামীর জন্য সন্তান না থাকলে ১/২ (অর্ধেক) আর থাকলে ১/৪ (এক-চতুর্থাংশ) (বুখারী শরীফ: ২৫৫১)।
(৪) নারী যা অর্জন করে তাতে নারীর অধিকার : “যা দ্বারা আল্লাহ্ তোমাদের কাউকে কারও উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন তোমরা তার লালসা করো না। পুরুষ যা অর্জন করে তা তার প্রাপ্য এবং নারী যা অর্জন করে তা তার প্রাপ্য অংশ। আল্লাহর অনুগ্রহ প্রার্থনা কর, আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ” (সূরা নিসা: ৩২)।
একটি মাত্র মেয়ে ওয়ারিশের জন্যও পূর্ণ সম্পদ রাখতে হবে :
হযরত সাদ ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, বিদায় হজ্বের বছর আমি মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর নিকটবর্তী হয়ে পড়ি। হযরত রাসূল পাক (সাঃ) আমাকে দেখতে আসেন। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রাসুল (সাঃ) আমার রোগ কি পর্যায়ে পৌঁছেছে তা আপনি দেখতে পাচ্ছেন। আমি একজন বিত্তবান লোক। আমার একটি মেয়ে ব্যতীত অন্য কোন ওয়ারিশ নাই। আমি আমার স¤পদের ২/৩ (দুই- তৃতীয়াংশ) আল্লাহ্র রাস্তায় ব্যয় করে দিব? তিনি বললেন, না। আমি বললাম, তবে কি ১/২ (অর্ধেক)? তিনি বললেন, না। আমি বললাম, তবে কি ১/৩ (এক তৃতীয়াংশ)? তিনি বললেন, এক-তৃতীয়াংশ করতে পার। এক-তৃতীয়াংশ অনেক বেশি। মানুষের কাছে হাত পেতে ফিরতে হবে, তোমার ওয়ারিশদেরকে এরূপ ফকির অবস্থায় ছেড়ে যাওয়ার পরিবর্তে তাদেরকে ধনী অবস্থায় রেখে যাওয়া উত্তম। আর যাই তুমি খরচ করবে তাই তোমার জন্য সদকা হবে। এমনকি যে লোকমাটি তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে তুলে দেবে, তাও (বুখারী শরীফ: ৩৬৩৯ (৪৮৫০)।
(৫) তিনটি কারণে স্ত্রীলোক ওয়ারিশ পেতে পারে : আবু ছাফা (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ৩টি কারণেও স্ত্রীলোক ওয়ারিশ পেতে যারে যথা- ১. নিজের আযাদকৃত গোলামের ওয়ারিশ, ২. লাওয়ারিশ কোন বাচ্চাকে যদি সে লালন পালন করে তবে তার ওয়ারিশ এবং ৩. ঐ সন্তানের ওয়ারিশ, যাকে গর্ভে ধারণ করে স্বামীর সাথে লিয়ান করে পৃথক হয়ে গেছে।
(৬) দাদী এবং নানীর অংশ : মুয়াত্তায় বর্ণিত আছে, একজন দাদী হযরত আবু বকর (রাঃ) -এর নিকট এসে তার ওয়ারিশ নিয়ে দেয়ার জন্য আবেদন করলেন। আবু বকর (রাঃ) বললেন, আল্লাহ্র কালামে তোমার জন্য নির্ধারিত কোন অংশ নেই। আর সুন্নাতে রাসূলেও এ স¤পর্কে আমি কিছু পাইনি। এখন যাও, এ ব্যাপারে পরামর্শ করে দেখি। তিনি সাহাবাদের নিকট এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। তখন হযরত মুগীরা ইবনে শোবা (রাঃ) বললেন, একবার এক বৃদ্ধা নবী করীম (সাঃ) এর নিকট এ ব্যাপারে এসেছিল। তখন তিনি তাকে ১/৬ অংশ দেবার হুকুম দিয়েছিলেন। আবু বকর (রাঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, তখন তোমার সাথে (এ ঘটনার সাক্ষী স্বরূপ আরো কেউ ছিল কি? একথা শুনে মুহাম্মদ ইবনে মুসলিম আনসারী দাঁড়িয়ে হযরত মুগীরার অনুরূপ সাক্ষ্য দিলেন। তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) ঐ দাদীর জন্য ১/৬ অংশ নির্ধারণ করেছিলেন।
হযরত উমর (রাঃ) এর শাসনামলে আরেক দাদী এসে মিরাসের আবেদন জানালে তিনি বললেন, আল্লাহর কিতাবে এবং রাসূলের সুন্নাতে তোমার জন্য কোন অংশ নির্ধারিত নেই। তবে ফারায়েজে তোমার জন্য এক ষষ্ঠাংশ (১/৬) নির্ধারণ করা হয়েছে। আবদুর রাজ্জাক তাঁর মুসান্নাফে বলেন, আমার নিকট হাদীস বর্ণনা করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তিন দাদীকে একত্রে ১/৬ অংশ দিয়েছেন। আমি ইব্রাহিমকে জিজ্ঞাসা করলাম, তারা কে কে ছিলো? বলা হল, একজন তার পিতার নানী, একজন তার পিতার দাদী এবং অপর জন স্বয়ং তার নানী।
(৭) ইসলামী আইনে পুত্র কন্যার দ্বিগুণ পায় মর্মে ভ্রান্ত ধারণা :
কুরআনের আলোকে নারীর সম্পত্তি পাওয়ার অধিকার -এর সামগ্রিক দিক আলোচনা না করে একটি মহল সম্পত্তিতে কন্যার চেয়ে পুত্র দ্বিগুণ পায় মর্মে খণ্ডিত আলোচনা করে অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছে। আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল (সাঃ) এর উপরে দৃঢ় ঈমান এবং ইসলামের পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞানময় জীবন ব্যবস্থার উপর ব্যাপক জ্ঞান ছাড়া এ বিভ্রান্তিমূলক অপপ্রচারের সামনে টিকে থাকা অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার। অথচ পবিত্র কুরআনে যাদের অংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, তাদের মধ্যে মাত্র ৪ জন পুরুষ, আর বাকী ৮ জনই হলো নারী। পবিত্র কুরআনে কন্যার অংশকে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। যা কন্যারা অবশ্যই পাবে। অপরদিকে একই পিতামাতার ঘরে জন্মগ্রহণ করার পরও পবিত্র কুরআনে পুত্রের অংশ নির্দিষ্ট করে তাদেরকে যাবিল ফুরুজের (নির্দিষ্ট অংশীদার) অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। পুত্রদেরকে রাখা হয়েছে আসাবা (অবশিষ্ট ভোগী) হিসেবে। উপরন্তু পুত্রের অংশ পাওয়ার ব্যাপারে কন্যার অংশকে আসল ভিত্তি করে সাব্যস্ত করা হয়েছে। এখানে কি প্রমাণিত হয় না যে, ইসলাম পুত্রের তুলনায় কন্যার অধিকারকেই প্রাধান্য দিয়েছে? ইসলামী উত্তরাধিকার আইন বৈষম্যহীন ইনসাফভিত্তিক একটি জীবনব্যবস্থা। পুত্র দ্বিগুণ সম্পত্তি পায় ঠিকই তবে সবকিছু মিলিয়ে হিসেব করলে দেখা যায়, কন্যার স¤পত্তির পরিমাণ পুত্রের চেয়ে কম নয়। ইসলাম পুত্র সন্তানের উপর সংসারের সামগ্রিক দায়-দায়িত্ব অর্পণ করেছে, কন্যাকে নয়। পিতার মৃত্যুর পর সংসারের সকল দায়-দায়িত্ব আসে পুত্রসন্তানের উপর। স্বামী হিসেবে স্ত্রী, পুত্র ও কন্যার ভরণ পোষণের দায়-দায়িত্ব, ভাই হিসেবে নাবালিকা বোনের বিয়ে শাদী ভরণ পোষণের দায়-দায়িত্ব, পিতা হিসেবে কন্যার দায়-দায়িত্ব, সন্তান হিসেবে মা-বাবার দায়-দায়িত্ব পুত্রকে গ্রহণ করতে হয়। মেয়েদের উপর স্বামীকে মোহরানা প্রদান কিংবা সন্তান, স্বামী, মা-বাবা কারো ভরণ পোষণের দায়িত্ব দেয়া হয়নি। তাছাড়া মেয়েরা স্বামী থেকে মোহরানাও পেয়ে থাকে। পুত্রসন্তানদের উপর সামগ্রিক দায়িত্ব অর্পিত থাকার পরও কন্যা হিসেবে নারীর অধিকারকে ইসলাম সবচেয়ে বেশি সুনির্দিষ্টভাবে প্রাধান্য দিয়েছে। গভীরভাবে ইসলামের উত্তরাধিকার আইন অধ্যয়ন করলে দেখা যাবে ইসলাম কন্যা হিসেবে নারীদের ঠকায়নি বরং পুরুষ -এর তুলনায় তাদেরকে বেশি লাভবান করেছে। পরিশেষে বলা যায়, সম্পদ ও সম্পত্তি থেকে অধিকারহারা বঞ্চিত নারীকে কন্যা হিসেবে, স্ত্রী হিসেবে, মা হিসেবে, বোন হিসেবে স¤পত্তি পাওয়ার যে চতুর্মুখী সুন্দরতম বিজ্ঞানভিত্তিক বিধান কুরআনে আল্লাহপাক ঘোষণা করেছেন পৃথিবীর অন্য কোন জাতি কিংবা সভ্যতা তা দেয়নি এবং দিতেও পারেনি। বরং নারীর শুভাকাক্সক্ষী সেজে তার সহায়-সম্পদ, ইজ্জত-আব্রুকে লুন্ঠন করে ব্যক্তিগত ফায়দা লুটার যাবতীয় কলাকৌশল অধিকার করেছে।
আসুন, আমরা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে মিলে ইসলাম প্রদত্ত নারী অধিকারসমূহ সমাজে সঠিকভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে নারী মুক্তি আন্দোলনকে সফল করি। কেননা মানুষের সৃষ্টিকর্তা, মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন প্রদত্ত রাসল (সাঃ) প্রদর্শিত বিধানাবলী সমাজে চালু না থাকার কারণেই আজ সমাজে নারীদের প্রতি অবিচার জুলুম চালু রয়েছে। নারীকে তার স¤পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করার পরিকল্পনাকারীদের আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন কঠিন শাস্তি দেবেন বলে সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন। এজন্য আল্লাহ্ পাকের নির্দেশ অনুযায়ী আমাদের কন্যা, স্ত্রী, মাতা, ভগ্নী প্রমুখের হক বা অধিকার আদায় করার মানসিকতা সৃষ্টির তওফিক দান করুন। আমাদের এই মুহূর্তে যেটা দরকার তা হল মুসলিম আইনে বর্তমানে নারীদের স¤পত্তিতে যে অধিকার দেওয়া হয়েছে তা পুরোপুরিভাবে কার্যকর করা। কারণ এখনও অধিকাংশ গ্রামগঞ্জে এমনকি শহরেও নারীদের তাদের পিতৃস¤পত্তি থেকে ব্যাপকভাবে বঞ্চিত করা হচ্ছে নানা রকম ছলচাতুরী দিয়ে। কখনোবা সরাসরি বলে দেওয়া হচ্ছে যে, পরিবারের কোন নারী সদস্যকে কোন প্রকার স¤পত্তি দেওয়া হবে না। তাই আমাদের আগে মুসলিম নারীর সম্পত্তিতে প্রাপ্য অধিকার স¤পর্কে সচেতন হতে হবে এবং কার্যকর করতে হবে।
-লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট, সুশাসন ও মানবাধিকার কর্মী

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ