ঢাকা, বৃহস্পতিবার 15 December 2016 ১ পৌষ ১৪২৩, ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

আলেপ্পোয় দীর্ঘ ধ্বংসযজ্ঞের সংশয়পূর্ণ পরিসমাপ্তি অনিশ্চিত

১৪ ডিসেম্বর, দ্য গার্ডিয়ান/বিবিসি/আলজাজিরা : যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের সর্বশেষ শক্তিশালী ঘাঁটি পতনে আলেপ্পোতে সশস্ত্র যুদ্ধের অবসান ঘটেছে। এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে দেশটির সরকার-সমর্থিত বাহিনী। বিদ্রোহীদের ওই এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বিদ্রোহীরা এ বিষয়ক চুক্তিতে সম্মত হয়েছে। মঙ্গলবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি অধিবেশনে জাতিসংঘে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভিতালি চুরকিন এ তথ্য জানান। আলেপ্পো আবারও কেঁপে উঠেছে বিস্ফোরণের শব্দে। নতুন করে ঘটে যাওয়া এই বিষ্ফোরণ আলেপ্পোবাসির জীবনমুখী স্বপ্নকে ধূলিস্যাৎ করে দিয়েছে। অন্যদিকে জাতিসংঘ জানিয়েছে, সরকারপন্থী সেনারা পূর্ব আলেপ্পোয় ঘরে ঘরে ঢুকে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করছে।
এর আগে ভিতালি চুরকিন জাতিসংঘের জরুরি সেশনে বলেছেন, ‘সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী পূর্ব-আলেপ্পোতে সামরিক অভিযানের অবসান ঘটেছে।’ এর আগেই তিনি জানিয়েছিলেন, বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে আলেপ্পো ত্যাগ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই প্রস্তাব কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কার্যকরী হতে পারে। বিদ্রোহীদের পাশাপাশি বেসামরিক নাগরিকদেরও আলেপ্পো ত্যাগ করার সুযোগ থাকবে বলে জানান চুরকিন। তিনি বলেন, ‘ বেসামরিক নাগরিকরা সেখানে অবস্থান করতে পারেন, সেখান থেকে নিরাপদ কোনও স্থানেও চলে যেতে পারেন। বিদ্যমান মানবিক আয়োজনের সুযোগ তারা নিতে পারেন।’ বিবিসির খবরে বলা হয়, দীর্ঘ চার বছরেরও বেশি সময় ধরে সিরিয়ার আলেপ্পোতে বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর সংঘাত চলে আসছে। সিরিয়ার বেশিরভাগ জায়গা থেকেই নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল বিদ্রোহীরা। সর্বশেষ আলেপ্পোতেই তারা সুসংগঠিত রেখেছিল তারা। এখানে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন সহস্রধিক মানুষ। আলেপ্পোর নিয়ন্ত্রণ নিতে সিরিয়া সরকারকে সশস্ত্র সহযোগিতা দিয়েছিল রাশিয়াও। এখন উভয় পক্ষের মধ্যে চুক্তি হওয়ায় এই অঞ্চলটিতে সশস্ত্র যুদ্ধের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। আলেপ্পো থেকে সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, গত কয়েক ঘণ্টায় ওই এলাকায় বোমা হামলা বা লড়াই হয়নি। তবে এই চুক্তির খবর প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা আগেই জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। তাতে সিরিয়ার সরকার সমর্থিত বাহিনীর হাতে বেসামরিক নাগরিক হত্যার অভিযোগ করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই বাহিনীর হাতে বেসামরিক নাগরিক হত্যার পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ রয়েছে। জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের নৃশংসতার জন্য সিরিয়া সরকারের পাশাপাশি দায়ী করেছে সিরিয়ার মিত্রশক্তি রাশিয়া ও ইরানকে। তবে রাশিয়া এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
তারা নারী ও শিশুদেরকেও  রেহাই দিচ্ছে না বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় জানিয়েছে, চারটি এলাকায় অন্তত ৮২ জন নিহত হয়েছে। সেনারা যাকে যেখানে পেয়েছে সেখানেই গুলী করে মেরেছে। এ হত্যাকা-ের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণও আছে।
মানবাধিকার কার্যালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে “আলেপ্পোয় মানবিকতা বলতে আর কিছু অবশিষ্ট নেই।”
শহরটির এক চিকিৎসকের বরাত দিয়ে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ বলেছে, পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ১শ’রও বেশি শিশু পূর্ব আলেপ্পোয় প্রচণ্ড হামলার মুখে একটি ভবনে আটকা পড়ে আছে।
চারবছর ধরে পূর্ব আলেপ্পো নিয়ন্ত্রণে রাখা বিদ্রোহীরা পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা শেষ শহরগুলোতে হাজার হাজার মানুষ আটকা পড়ে আছে বলে খবর পাওয়া গেছে। সরকারপন্থি সেনারা অগ্রসর হতে থাকায় আটকাপড়া এ মানুষগুলো ব্যাপক বোমাবর্ষণের শিকার হচ্ছে।
বিবিসি জানায়, জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটি (আইসিআরসি) উভয়ই একটি নিরাপদ এলাকা দিয়ে বেসামরিক মানুষদেরকে শহর থেকে বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে বোমা হামলা বন্দে সিরিয়া সরকার ও এর মিত্র রাশিয়াকে আহ্বান জানিয়েছে।
জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক মুখপাত্র রুপার্ট কলভিল্লে আলেপ্পো থেকে পাওয়া নৃশংসতার খবরের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি জানান, ৮২ জনকে গুলী করে হত্যার খবর এসেছে। এর মধ্যে ১১ জন নারী এবং ১৩ জন শিশু। এর আগে রাস্তায় রাস্তায় মৃতদেহ পড়ে থাকার আরও মর্মান্তিক খবর পাওয়া গেছে। অনবরত বোমা বর্ষণের কারণে অধিবাসীরা পালাতে পারছে না। তাছাড়া, দেখামাত্রই গুলীতে প্রাণনাশের আশঙ্কায়ও আছে তারা।
বিবিসির প্রতিরক্ষা ও কূটনৈতিক প্রতিনিধি জোনাথন মারকাস লিখেছেন, পূর্ব-আলেপ্পো নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার মাধ্যমে এখন দেশটির বেশিরভাগ অংশই  কার্যত সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আলেপ্পো দেশটির সবচেয়ে জনবহুল শহর। গৃহযুদ্ধ শুরুর আগে শহরটি ছিল দেশটির অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র। এই শহরটির দখল নেওয়া কেবল বাশার আল-আসাদের জন্যই বিজয় নয়, এটি আল-আসাদের সমর্থক ইরান ও রাশিয়ার জন্যও বিজয় হিসেবে গণ্য হবে। মারকাস লিখেছেন, কৌশলগত দিক থেকে মস্কোর জন্য আলেপ্পো বড় কিছু নয়। তবে সেখানে বিদ্রোহীদের পতন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদের জন্য বড় একটি অর্জন। রাশিয়ার সমর্থন পাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট আসাদ খুব শক্তিশালী অবস্থানে ছিলেন না। তার সামরিক শক্তিও হ্রাস পাচ্ছিল। কিন্তু বহিঃশক্তির অন্তর্ভুক্তি তার উচ্চাকাক্সক্ষ্া পূরণে সিরিয়া সরকারকে ব্যাপকভাবে সহায়তা করেছে। সিরিয়ার ভবিষ্যতের ওপর তার সেই উচ্চাকাক্সক্ষ্া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
যুদ্ধের ক্ষত নিয়ে প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া আলেপ্পোতে এখনও যারা বেঁচে আছেন, তাদের এবার সরিয়ে নিতে হবে অন্যকোথাও। সিরিয়ার আলেপ্পোর পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর সেখান থেকে বিদ্রোহী ও বেসামরিকদের সরে যাওয়ার প্রশ্নে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে দুই পক্ষ। সিরিয়ার সামরিক সূত্র এবং বিদ্রোহী পক্ষের বরাত দিয়ে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা খবরটি নিশ্চিত করেছে।
রাশিয়া ও তুরস্কের পৃষ্ঠপোষকতায় সমঝোতাটি হয়েছে বলে রাশিয়ার দূত ভিটালি চারলিন বলেন, ‘এ সমঝোতা চুক্তি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কার্যকর হবে’। এদিকে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সিরিয়ার এক সেনা সূত্রও এ সমঝোতার খবর নিশ্চিত করেছেন। স্থানীয় সময় বুধবার ভোর ৫টা থেকে এলাকা ফাঁকা করার চুক্তিটি কার্যকর শুরু হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে সূত্রের খবরে বলা হয়, তবে এখনও শহর ছাড়তে পারেনি হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ। শহর ছেড়ে যেতে পারেনি বিদ্রোহীরাও। আলেপ্পোতে যুদ্ধের অবসান হওয়ার পর বেসামরিক নাগরিক ও বিদ্রোহীদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার কথা জানানো হলেও এখনও শহর ছাড়তে পারেনি কেউ। সিরিয়ার স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সূত্রে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, শহরে সন্ধ্যা নেমে আসার পরও কেউ আলেপ্পো ছাড়তে পারেনি। এতে জীবনের আহ্বানে আকুল আলেপ্পোবাসীর মনে দেখা দিয়েছে স্বপ্নভঙ্গের আশঙ্কা।
বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর একটি নুরেদ্দিন আল জিনকির রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলা হয়, ‘আলেপ্পোর বাসিন্দা, বেসামরিক নাগরিক এবং যোদ্ধাদেরকে তাদের হালকা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পূর্ব আলেপ্পো থেকে সরে যাওয়ার জন্য একটি সমঝোতা হয়েছে।’ রাশিয়া ও তুরস্কের পৃষ্ঠপোষকতায় সমঝোতাটি হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ সমঝোতা চুক্তি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কার্যকর হবে’।
এদিকে তুরস্কের সরকারি সূত্র এবং বিদ্রোহীদের সূত্রের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানও একইভাবে চুক্তি সম্পন্নের কথা বলা হয়েছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান সিরিয়ার এক সেনা সূত্রের বরাতে এ সমঝোতার খবর নিশ্চিত করেছেন।
উল্লেখ্য, কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রচণ্ড সংঘর্ষের পর মঙ্গলবার ১৩ ডিসেম্বর আলেপ্পোর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয় সরকারি বাহিনী। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাতিসংঘের নিয়োজিত রাশিয়ার দূত ভিটালি চারকিন ঘোষণা দেন যে পূর্ব আলেপ্পোতে সকল সামরিক কর্মকাণ্ড বন্ধ রয়েছে এবং সরকার ওই এলাকার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। তবে নিজেদের সর্বশেষ ঘাঁটিতে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার জন্য বিদ্রোহীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে কিনা এবং ওই অবস্থায় এলাকায় আটকে থাকা হাজারো বেসামরিকের পরিণতী কী হবে তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। এরপরও বেসামরিক নাগরিক ও বিদ্রোহীদের শহর ত্যাগ নিশ্চিত করতে দুই পক্ষের চুক্তির কথা জানা যায়। তারপর থেকে খেন পর্যন্ত কেউ শহর ছাড়তে না পারায় উদ্বিগ্ন বিদ্রোহীরা এখন নিপীড়ন আর মৃত্যু শঙ্কায় দিশেহারা সময় পার করছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ