ঢাকা, বৃহস্পতিবার 15 December 2016 ১ পৌষ ১৪২৩, ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

রোহিঙ্গাদের পক্ষে লিখে বিপদে মিয়ানমারের সাংবাদিক মিন মিন

১৪ ডিসেম্বর, ডয়েচে ভেলে : মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের এক সাংবাদিক রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিয়ে প্রতিবেদন লেখায় বৌদ্ধ কট্টরপন্থিরা তার মাথার দাম ২৯ হাজার ডলার ধার্য করেন। এ বছর মার্চ মাসে তার বাড়িতে বোমা হামলা চালানো হয়, পরিবারকে বাধ্য করা হয় ইয়াঙ্গুনে চলে যেতে।
মিন মিন এর মুখেই শুনুন রাখাইনের কাহিনি। “হাসপাতালে একজন সন্তান সম্ভবা নারী তার স্বামীকে ফোন করতে চাইলে আমি আমার ফোন তাকে দিই। এসময় সেখানকার চিকিৎসক বলেন, ‘ঐ মেয়েটিকে সাহায্য করো না, সে একজন মুসলিম।’ এই একটি কথাতেই মিন মিন-এর মনে আমূল পরিবর্তন এনে দেয়। মিন মিন জানান, চিকিৎসক ঐ নারীকে বলেন ফোনের জন্য যাতে সে তাকে পয়সা দেয়।”
মিয়ানমানরের পশ্চিমাঞ্চলের রাখাইন রাজ্যের রাজধানী সিতওয়েতে মিন মিন-এর বাস। যে এলাকাটি বৌদ্ধ ও মুসলিমদের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে এখন বেশ পরিচিত। বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ট দেশটি সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিমদের নাগরিকত্ব দিতে নারাজ। অথচ এই রোহিঙ্গারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রাখাইন রাজ্যে বসবাস করছে। মিয়ানমারের বেশিরভাগ নাগরিকও সরকারের সঙ্গে একমত। তাদের মতে, রোহিঙ্গারা অবৈধ অভিবাসী। জাতিসংঘ বলছে, ১১ লাখ রোহিঙ্গা বিশ্বের সবচেয়ে নিগৃহীত সংখ্যালঘু।
রোহিঙ্গা মুসলিমরা তাদের উপর নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার জন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে দায়ী করেছে। মিন মিন একজন সাংবাদিক। যিনি জার্মান সংবাদ মাধ্যম ডিপিএ-কে জানালেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি জেনে এসেছেন মুসলমানরা তাদের জন্য একটা হুমকি। তাই রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে রাখাইন রাজ্য ফিরে পেতে হবে তাদের। তবে দীর্ঘ পাঁচ বছর থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় থাকার পর মিন মিন বাস্তব অবস্থা বুঝতে পেরেছেন। হাসপাতালে চিকিৎসকের ঐ একটি কথায় তিনি উপলব্ধি করেছেন মিয়ানমারের মুসলমানদের উপর কী ধরনের অত্যাচার হচ্ছে।
এরপর থেকেই মিন মিন রাখাইন রাজ্যে শরণার্থী শিবিরে থাকা রোহিঙ্গাদের নিয়ে লেখালেখি শুরু করেন। তিনি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তুলে ধরেন সেখানকার রোহিঙ্গারা কী কী মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এমনকি চিকিৎসা করাতেও তাদের কী ধরনের বাধার সম্মুখীন হতে হয় তাও তার লেখায় ফুটে উঠেছে।
সংবাদ সংস্থা ডিপিএ-কে দেয়া সাক্ষাৎকারে মিন মিন বলেন, দু’পক্ষের কেউই কারো কথা শোনে না। তাই এ সমস্যার সমাধান হওয়া প্রায় অসম্ভব। তবে মিন মিন-এর প্রতিবেদনের কারণে রাখাইনের অধিবাসীরা তার উপর ক্ষুব্ধ হন। চলতি বছরের মার্চ মাসে তার সিতওয়ের বাড়িতে বোমা হামলা চালানো হয়। তার পরিবারকে ইয়াঙ্গুনে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। বৌদ্ধ কট্টরপন্থিরা তার মাথার দাম ধার্য করেন ২৯ হাজার ডলার। এত হুমকির পরও মিন মিন পিছিয়ে থাকেননি। এই মাসেই নতুন পত্রিকা প্রকাশ করেছেন তিনি। নাম দিয়েছেন ‘রুট’ বা শেকড়। সেখানে লেখা প্রতিবেদনগুলোতে তিনি নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেছেন। না বৌদ্ধ না মুসলিম কারো পক্ষেই কথা বলেননি তিনি। রাখাইন রাজ্যটি অত্যন্ত দরিদ্রদের এলাকা। অক্টোবর থেকে এই এলাকাটিতে আবারও শুরু হয়েছে সংঘাত। মিয়ানমার সরকারের দাবি রোহিঙ্গারা ন’জন সীমান্ত রক্ষীকে হত্যা করেছে। ঐ ঘটনার পর রাখাইন রাজ্যের সাড়ে তিন হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা ঘিরে রাখে সেনাবাহিনী। তাদের দাবি, এ সময় রোহিঙ্গারা ছুড়ি আর দা নিয়ে তাদের উপর হামলা চালায়। ঐ ঘটনার পর থেকে অন্তত ২০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে পালিয়ে গেছে। এ ঘটনায় নিহতের সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি, শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এখনও সংঘাতপূর্ণ এলাকায় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ