ঢাকা, বৃহস্পতিবার 15 December 2016 ১ পৌষ ১৪২৩, ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর

সাদেকুর রহমান : আত্মসমর্পণের নির্দেশ পেয়ে ঢাকা সেনানিবাসে নিজের কক্ষে বসে প্রচ-ভাবে ভেঙে পড়েন কথিত পরাক্রমশালী পাকিস্তানী জেনারেল নিয়াজি। কিছুটা ধাতস্থ হয়ে রাত ২টার মধ্যে বাংলাদেশের সব জায়গায় অবস্থানরত হানাদার বাহিনীকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়ে তারবার্তা পাঠান। এ দিনটি মূলত দখলদার বাহিনীর চূড়ান্ত আত্মসমর্পণের দিন-ক্ষণ নির্ধারণের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়। হ্যাঁ, মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন উনিশ’শ একাত্তর সালের ১৫ ডিসেম্বরে এমনটাই ঘটে। আনুষ্ঠানিক বিজয় লাভের আগেরদিন দখলমুক্ত হয় বগুড়াসহ বেশ কয়েকটি জনপদ।
এদিকে গোটা জাতি এক মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায়। ঐতিহাসিক মুহূর্তের জন্য কেবল রাতের প্রতীক্ষা। আত্মসমর্পণের বিস্তারিত আয়োজনের জন্য এদিন বিকেল ৫টা থেকে পরদিন ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টা এবং পরে বিকেল ৩টা পর্যন্ত উভয়পক্ষ যুদ্ধ বিরতি কার্যকর করেছিলেন। সে সময় যৌথবাহিনীর পক্ষে জেনারেল নিয়াজীর সাথে প্রথম যোগাযোগ করেছিলেন টাঙ্গাইলের পথে আগত ভারতীয় মেজর জেনারেল নাগরা। নিয়াজীর সদর দফতরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে মুক্তিবাহিনীর একমাত্র প্রতিনিধি ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান, বর্তমান কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম। সেদিনই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান আয়োজনের ব্যাপারে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে যৌথবাহিনীর অধিনায়ক হিসেবে যোগ দিতে বিকেল সাড়ে ৫টায় হেলিকপ্টারযোগে সস্ত্রীক ঢাকায় এসেছিলেন ভারতের সেনা কর্মকর্তা লে. জে. জগজিৎ সিং অরোরা। তেজগাঁওস্থ ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অরোরাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন জেনারেল নিয়াজী। বিমানবন্দর থেকে যথাক্রমে বিজয়ী ও বিজিত দুই জেনারেল ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) গিয়েছিলেন। ডিসেম্বরের এ দিনই মূলত স্বাধীন হয়েছিল দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চল। বাকি ছিল শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণা।
মার্কিন সপ্তম নৌবহরকে মোকাবিলা করার জন্য বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত ভারতীয় নৌবাহিনীর সমর্থনে সোভিয়েত রণতরীর ২০টি জাহাজ ভারত মহাসাগরে অবস্থান নেয়। এরপর মার্কিন রণতরী সপ্তম নৌবহর যুদ্ধে অংশ নেয়া থেকে নিজেদের গুটিয়ে ফেলে। পাকিস্তানের মনে যুদ্ধে সাহায্য পাওয়ার যেটুকু আশা ছিল সেটাও এর সঙ্গে শেষ হয়ে যায়। এদিকে, দেশের অধিকাংশ রণাঙ্গনে চলছিল মুক্তিকামী জনতার বিজয়োল্লাস। অসংখ্য নদীনালা, খালবিলসহ নানা প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে ইতোমধ্যে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনী চারদিক থেকে ঘেরাও করে ফেলায় অবরুদ্ধ ঢাকা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। ঢাকাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় ক্রমাগতভাবে ভারতীয় মিগের একের পর এক বোমাবর্ষণ ও স্থলপথে মিত্রবাহিনীর আর্টিলারি আক্রমণে দখলদার বাহিনীতে চরম বিপর্যয় নেমে আসে।
চারদিক থেকে পরাজিত হতে হতে পাকিস্তানী বাহিনী বুঝে ফেলে যুদ্ধে তাদের পরাজয় নিশ্চিত। ফলে সকালে সব আশা ছেড়ে দিয়ে শর্তসাপেক্ষে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব নিয়ে বিদেশি দূতাবাসের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করেন নিয়াজী। ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের কর্মীরা সেই প্রস্তাব পাঠিয়ে দেয় দিল্লীর মার্কিন দূতাবাসে। সেখান থেকে পাঠানো হয় ওয়াশিংটনে। এরপর ওয়াশিংটন ইসলামাবাদের মার্কিন দূতাবাসের কাছে জানতে চায়, নিয়াজীর এই প্রস্তাবে পাক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সমর্থন আছে কিনা। তৎকালীন পাকিস্তানী লেফটেন্যান্ট কর্নেল সিদ্দিক শরীফ তার ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থে এ ঘটনার বর্ণনা লিখেছেন, কিন্তু তাতে ইয়াহিয়া খান চরিত্রটির বর্ণনা পাওয়া যায় না। ইয়াহিয়া তখন নিজের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করার জন্য কোথাও ব্যস্ত ছিলেন।
কিন্তু ভারত সরকার এ প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। ভারতীয় বাহিনী পাকবাহিনীকে এই আশ্বাস দিতে রাজি হয় যে, যুদ্ধবন্দীরা জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী ব্যবহার পাবেন। পাকিস্তানী  জেনারেল নিয়াজীর শর্তসাপেক্ষে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব পেয়ে ভারতীয় বাহিনী মনে করে এটি তার কৌশল। নিয়াজীর প্রস্তাবকে তাদের কাছে মনে হলো এটি যুদ্ধবিরতি, আত্মসমর্পণ নয়। কিন্তু মিত্রবাহিনী বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ ছাড়া কিছুতেই রাজি নয়।
জেনারেল নিয়াজির দেয়া যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের জবাবে বিকেলে ভারতীয় জেনারেল মানেকশ’ পাকিস্তানীদের জানিয়ে দেন, শর্তহীন আত্মসমর্পণ না করলে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে সম্মতি দেয়া হবে না। এ সময় প্রস্তাবের প্রতি মিত্রবাহিনীর আন্তরিকতার নিদর্শন হিসেবে ১৫ ডিসেম্বর বিকেল ৫টা থেকে ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টা পর্যন্ত ঢাকার ওপর বিমান হামলা বন্ধ রাখা হবে বলে পাকিস্তানী জেনারেলকে জানিয়ে দেয়া হয়। এমনকি আত্মসমর্পণ করলে মিত্রবাহিনী কোনো প্রতিশোধমূলক কর্মকান্ডে জড়াবে না বলেও পাকিস্তানী জেনারেলকে আশ্বস্ত করা হয়। তবে, সেই সঙ্গে পাকিস্তানী জেনারেলকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে এও বলা হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শর্তহীন আত্মসমর্পণ না করলে ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টা থেকে সর্বশক্তি নিয়ে আক্রমণ করা ছাড়া মিত্রবাহিনীর কোনো গত্যন্তর থাকবে না।
জেনারেল নিয়াজী তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে পাকিস্তান হেডকোয়ার্টারকে অবহিত করেন। শোনা যায়, নিয়াজী সেদিন সারা রাত ধরে ইসলামাবাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন, দূতাবাসের সাহায্য নেন। কিন্তু পাকি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তখন মিত্রবাহিনীর গোলার আওয়াজ বাড়তে থাকে। ঢাকার অসামরিক পাকিস্তানীরা ও কয়েকটি বিদেশি দূতাবাসও আত্মসমর্পণের চাপ বাড়িয়ে দেয় পাকহানাদার বাহিনীর ওপর। পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে ১৫ ডিসেম্বর গভীর রাতে পাকিস্তানের তখনকার প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় জেনারেল নিয়াজিকে নির্দেশ দেন যে, ‘ভারতের সেনাবাহিনী প্রধান পাকিস্তানীদের আত্মসমর্পণের জন্য যেসব শর্ত দিয়েছেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার জন্য তা মেনে নেয়া যেতে পারে।’
আবদুল ওয়াহেদ তালুকদার তার ‘৭০ থেকে ৯০ বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক গ্রন্থে উল্লেখ করেন, “হানাদার বাহিনীর প্রধান লে. জেনারেল এ কে নিয়াজী তার আত্মসমর্পণের জন্য (ভারতের) জেনারেল মানেক শ’র কাছে বার্তা পাঠিয়েছেন। জবাবে ভারতীয় আর্মি চীফ পরদিন ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টায় ঢাকায় পাকিস্তানী সৈন্যদের আত্মসমর্পণের সময় ধার্য করেছেন। আজ বিকেল পাঁচটা থেকে ভারতীয় বিমান বাহিনীর হামলা বন্ধের নির্দেশ দেয়া হলো। সকাল পৌনে নয়টা, মিরপুর ব্রিজের পাদদেশে দাঁড়িয়ে জেনারেল নাগরা টাইগার কাদের সিদ্দিকীর সাথে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নিলেন, এই মুহূর্তেই জেনারেল নিয়াজীর কাছে দূত পাঠাতে হবে। এরপর জেনারেল নাগরা একটা বার্তা লিখলেন জেনারেল নিয়াজীকে : ‘প্রিয় আব্দুল্লাহ, আমি এখন মিরপুর ব্রিজে। ঘটনার পরিসমাপ্তি হচ্ছে, আপনি আমার কাছে আত্মসমর্পণ করুন। সে ক্ষেত্রে আমরা আপনাদের দেখাশোনার দায়িত্ব নেবো। শীঘ্র আপনার প্রতিনিধি পাঠান। নাগরা।”
এ দিন ঢাকার বাসাবোতে ‘এস ফোর্স’-এর মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানী বাহিনীর ওপর তীব্র আক্রমণ চালায়। জয়দেবপুরেও মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপক আক্রমণে পর্যুদস্ত হয় তারা। টঙ্গী, ডেমরা, গোদনাইল ও নারায়ণগঞ্জে মিত্রবাহিনীর আর্টিলারি আক্রমণে বিপর্যস্ত হয় দখলদার বাহিনী। এছাড়া এ দিন সাভার পেরিয়ে গাবতলীর কাছাকাছি নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নেয় মিত্রবাহিনীর একটি ইউনিট। ভারতীয় ফৌজের একটি প্যারাট্রুপার দল পাঠিয়ে ঢাকার মিরপুর ব্রিজের পাকিস্তানী ডিফেন্স লাইন পরখ করে নেয়া হয়।
রাতে যৌথবাহিনী সাভার থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। পথে কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে কাদিরীয়া বাহিনী ভারতীয় ও বাংলাদেশ বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়। রাত ২টার দিকে যৌথবাহিনী পাক সৈন্যের মুখোমুখি হয়। যৌথবাহিনী ব্রিজ দখলের জন্য প্রথমে কমান্ডো পদ্ধতিতে আক্রমণ শুরু করে। ব্রিজের ওপাশ থেকে পাকবাহিনী মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণ করতে থাকে। এ সময় যৌথবাহিনীর আরেকটি দল এসে পশ্চিম পাড় দিয়ে আক্রমণ চালায়। সারারাত তুমুল যুদ্ধ চলে।
মার্কিন ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। যে কোনো মুহূর্তে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করবে। চারদিক থেকে ঢাকা অবরুদ্ধ। এদিন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় লেখা হয়, ‘ইয়াহিয়ার সৈন্যবাহিনীকে তাড়িয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। ভারতে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীরা মুক্ত বাংলাদেশে আসতে শুরু করে। দেশের ভেতর বাড়ি-ঘর থেকে বিতাড়িত লোকজনও বাড়িতে ফিরে আসতে শুরু করেছে।’
এদিকে হানাদার বাহিনী তাদের নিশ্চিত পরাজয় জেনেও আঘাত করেছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর। এদিনও অনেক বুদ্ধিজীবী শহীদ হন ঘাতকদের হাতে। ডা. আলীম চৌধুরী, ড. আবুল কালাম আজাদকে হত্যা করা হয় ১৫ ডিসেম্বর। দুইদিন পর ১৭ ডিসেম্বর বধ্যভূমি থেকে তাদের লাশ উদ্ধার করা হয় অসংখ্য বুদ্ধিজীবীর ছিন্নভিন্ন লাশের সঙ্গে।
অন্যদিকে বারবার আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেয়া সত্ত্বেও হানাদাররা আত্মসমর্পণ না করে মরিয়া হয়ে লড়াই করতে থাকে। এদিন চট্টগ্রামের দিকে অগ্রসরমান মুক্তিযোদ্ধাদেরকে ভাটিয়ারীতে ঘাতকরা বাধা দান করে। ফৌজদারহাট এবং কুমিরায়ও তারা প্রচ- চাপ সৃষ্টি করে। খাদেমনগরে ছিলো হানাদারদের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং মজবুত ঘাঁটি। মুক্তিযোদ্ধা এবং ভারতীয় গুর্খা বাহিনী রাস্তার দুই দিক থেকে অগ্রসর হতে থাকে। পরাজয়ের চরম পরিণতি এবং ভয়ে দিশেহারা হয়ে বগুড়া শহরের হানাদাররা শহর ছেড়ে পালাতে থাকে। পালাবার সময়ও তারা চারদিকে এলোপাতাড়ি গুলীবর্ষণ করেছিল। হানাদারদের হাতে নিহত হন দুই জন মুক্তিযোদ্ধা। খুলনা ও দৌলতপুরেও আজ হানাদাররা আত্মসমর্পণ না করে হত্যাকান্ড অব্যাহত রেখেছিল।
একাত্তরের এই দিনে ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর শহীদ হন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে মুক্তিবাহিনীর ৭ নম্বর সেক্টরে যোগ দেন। শৃঙ্খলা, কর্তব্যনিষ্ঠা এবং সাংগঠনিক ক্ষমতার কারণে অচিরেই সকলের শ্রদ্ধা ও বিস্ময় জাগিয়ে তোলেন। তিনি কোন বিশ্রাম না নিয়ে দিনের বেলা অপারেশনের পরিকল্পনা তৈরি করতেন এবং প্রতিরাতেই গেরিলাদের সঙ্গে অপারেশনে যেতেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ দখলের যুদ্ধে তিনি সরাসরি নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। মহানন্দা নদী পেরিয়ে তিনি একের পর এক শত্রু বাংকার দখল করে যখন প্রবল বিপদ উপেক্ষা করে এগুচ্ছিলেন তখন হঠাৎ মাথায় গুলী লাগে তার। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ