ঢাকা, শুক্রবার 16 December 2016 ২ পৌষ ১৪২৩, ১৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

জননী

তমসুর হোসেন : অফিস থেকে এসে মতিন দেখে ঘরের বারান্দায় বসে আছেন একজন মহিলা। মহিলাকে সে কোথায় যেন দেখেছে। বনেদী গৃহকর্ত্রীর ভাব তার বদনে। স্মৃতির ভান্ডারে তার অস্তিত্ব আন্দাজ করতে পারলো না মতিন। বসার ভঙ্গি দেখে স্বজন না ভেবে উপায় নেই। মহিলা কাঠি দিয়ে দাঁত খিলাল করছেন। তা দেখে মনে হলো সানু ওনাকে খাইয়ে দিয়েছে। মহিলা হয়তো দূরের আত্মীয়া। প্রশ্ন করার আগে আনন্দে কলকলিয়ে ওঠলো সানু।
‘জানো? উনি আমাকে মেয়ে বলেন।’
‘ওনার বাড়ি?’
‘ঐদিকে। গেটবাজারের পাশে।’
‘ঝামেলা বাড়িয়ো না। রক্তের খোঁজ নিতে হিমসিম খাচ্ছি।’
‘রক্তই কি সব। এর বাইরে কিছু নেই?’
‘কেন জড়িয়ে যাচ্ছো? নিজের মা কি নেই?’
‘আছে। সবাই জানে।’
‘মায়ের দাবী পুরণ করতে পারবে?’
‘কি দাবী পুরণ করবো ? ওনাকে দেখেই শান্তি লাগে।’
‘বেশ। খেতে দিয়েছো?’
‘উনি খেতে আসেন না। দেখেই চলে যান।’
বউয়ের পাগলামীতে নতুন কিছু যোগ হলো। মাদ্রাসার এক ছাত্র সদস্যের খাতায় নাম লিখিয়েছে। সহসা জননীর আবির্ভাব অবাক হওয়ার বিষয় নয়। বিকেলে চেম্বার আছে। বিশ্রাম নিতে হবে। শর্ষেবাঁটা লাউ, রুইমাছ মতিনের প্রিয় খাবার। এখন দেহে পা তুলে বসেছে তুমুল আলস্য। বালিশে মাথা রাখতেই মহিলা কুশল জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন,
‘জামাই। এত্তি আসনু কঙ মাইয়ঁক দেকি যাঙ।’
‘ভালোই হয়েছে। দু’দিন থেকে যান।’
‘না থাকোঙ। তোমরা বড়নোক। হামার উত্তি ব্যাড়বারও যাননা।’
‘বেড়ানোর সময় আছে? রোগীপত্র নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়।’
‘যতোয় উগি থাউক। সাগাইর বাড়িত যাওয়া নাগে।’
‘আপনি আসবেন। তাতেই হবে। আমাদের যাওয়ার কি দরকার।’
‘নিজের শ্বশড়ী হইলে দেইকপার গেইলেন না হয়। পাগলী মানুষ দেকি ঘিন করেন মোক।’
‘এটাকে ঘিন করা বলে। সময়ের অভাবে যেতে পারি না।’
সানুর প্রতি মহিলার স্নেহে বুঝতে পারে মতিন। শুনেছে ওনার মেয়ে নেই। অনেক জমি ছিলো। হালের গরু, তেল মাড়াইয়ের কল, আর ভাড়াতে খাটানোর নৌকা ছিলো। স্বামী আর তিন ছেলের সংসারে সুখের অন্ত ছিলো না। নদী ভাঙনে বিলীন হয়ে যায় জমিজমা। মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকারের বেয়নেটের আঘাতে স্বামী চলে যায় পরপারে। ছেলেরা আলাদা সংসার পাতে। নিজের ধান্দা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সবাই। অভাগী মায়ের খোঁজ কেউ করেনা। কোথায় যাবে রহিমা। ছেলে বউয়ের অনাগ্রহে চোখ বন্ধ করে কোনমতে জীবন কাটানো ছাড়া উপায় থাকলো না তার। এই মহিলার করুণ চোখে সানু তার জননীর প্রতিবিম্ব দেখতে পায়। কতো সুখ ছিলো রহিমার জীবনে! এখন শুধু নিগ্রহ আর লাঞ্ছনা। বউয়েরা অপদস্থ করলে ছেলেরা কিছু বলে না। যাদের অসুখে চোখের পাতা বন্ধ করতে পারেনি সেই ছেলেরাই পাশ কেটে চলে যায়। একটুও ভেবে দেখেনা মায়ের কী কষ্ট। রহিমার কষ্টের কথা শুনে সানুর অন্তর কেঁদে ওঠে। কী কাজে যেন মহিলা বেড়াতে এসেছেন। খুব পিপাসা লেগেছিলো। পানি পান করার জন্য প্রবেশ করেছে বাড়ির ভেতর। তার চেহারায় ছিলো গভীর বিষণ্নতা। কোন ভাষা ছিলো না মুখে। জীর্ণ বদনে স্পষ্ট হয়ে ছিলো অভুক্ততার চিহ্ন। শুধু পানি দিতে সংকুচিত হয়ে পড়ে সানু। ক্ষুধার কষ্ট উপলব্ধি করতে অসুবিধা হয় না তার। থালাভর্তি ভাত এগিয়ে দেয় বৃদ্ধার সামনে। তার ভক্ষণদৃশ্য অবলোকন করে নিকটে বসে। ক্ষুধাকম্পিত বদন দেখে বেদনায় ভরে যায় সানুর মন। সে ভাবে কেন নিষ্ঠুর পৃথিবীতে নারী হয়ে জন্ম নিয়েছি। গর্ভের সন্তান যদি কষ্ট দেয় তাহলে মায়ের কি মুল্য। কেন সন্তানের অবহেলায় জননীর চোখে অশ্রু ঝরে। সে মহিলাকে প্রশ্ন করে,
‘আজ ভাত খাননি?’
সানুর কথায় মহিলার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে। মনে হয় অঝোর ধারায় বৃষ্টি নেমেছে।
‘কোনটে পাঙ ভাত। বাঁচি থাক মা। জিউয়ত দম আনলু মোর।’
‘আপনার ছেলেমেয়ে নেই?’
‘আছে মা আছে। তিনটা নামের ব্যাটা আছে।’
‘তারা খোঁজ নেয়না?’
‘মরি গেইলে নিবে।’
‘এদিকে কোথায় এসেছেন?’
‘মেম্বরের দ্যাকা কইরবার। মেম্বর মোক কাড দিবার চাইচে।’
‘দুস্থ মাতার কার্ড নেবেন?’
‘টানবারে যে পাঙ না। মোর দুক্কে মেম্বর চউকের পানি ফ্যালাইচে।’
মহিলার সাথে কথা হয় সানুর। রাজাকারের নৃশংসতায় তার স্বামীর মৃত্যু সানুর মনে দুঃখের সঞ্চার করে। খানের মদতপুষ্ট হয়ে দেশের মানুষের ওপর কী অত্যাচার করেছিলো তারা! মইনুল, দোকলা, নওসের আর মান্নালের কী বার বেড়েছিলো রাজাকারে নাম দিয়ে। রাইফেল কাঁধে মধ্যরাতে ঘরে ঢুকে রহিমার স্বামী ছকমলকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। বাড়িতে থাকার সাহস হয়নি রহিমার। সীমান্তের কাছে দূর সম্পর্কীয় আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। দেশ স্বাধীনের পর বাড়ি ফিরে দেখে ভিটেয় কিছু নেই। শুধু রান্না ঘরটা একদিকে হেলে পড়ে  আছে। সেই ঘরে মাথা গোঁজে রহিমা। তারপর সুখের পাখি ধরা দেয়নি। আঘাতের পর আঘাত পাঁজর জরাজীর্ণ হয়েছে।
যুদ্ধের সময় সানুদের অবস্থাও করুণ ছিলো। বাবা ছিলেন শিল্পী এবং গীতিকার। যুদ্ধের গান লিখে বাবা খানদের বুকে আগুন জ¦ালিয়ে দিয়েছিলেন। বাবার গান আবালবৃদ্ধবণিতার মনে স্বাধীন দেশের স্বপ্ন জাগিয়ে তুলেছিলো। ফলে টগবগে যুবকেরা ঝাঁপিয়ে পড়েছে স্বাধীনতা যুদ্ধে। খবর পেয়ে বাবাকে ধরার জন্য গুপ্তচর লাগিয়ে দেয় খানরা। একরাতে তারা বাড়িতে হামলা করে। ভাগ্য ভালো। বাবা বাড়িতে ছিলেন না। জিনিসপত্র উল্টেপাল্টে বাবাকে তালাশ করে তারা। বাবাকে না পেয়ে সবাইকে মারধর করে কাবু করে ফেলে। বাড়িতে ছিলো এক অন্ধ দোতরাবাদক। রাইফেলের বাট দিয়ে তাকে থেঁতলে অচেতন করে ফেলে। ময়জুদ্দী নামের একজন কাজের লোক ছিলো। খানরা ওকে ধরে নিয়ে গুলি করে। এ অবন্থা দেখে মুক্তিযোদ্ধারা মল্লিক ম-ল নামক জনৈক লোকের বাড়িতে সরিয়ে নেয় ওদেরকে। খুবই খারাপ লাগে সানুর। বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র থাকার অভিজ্ঞতা তার নেই। খানেরা রাতারাতি খবর পেয়ে গেলো। মুক্তিযোদ্ধারা সেখানেও ওদের রাখলোনা। পরের দিন রাবাইতাড়ীর এক হিন্দুবাড়ি এবং দু’দিন পর বালারহাটের সংগীতপ্রেমী সহৃদয় ব্যক্তির বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো তাদের। সেখানে দশদিন থাকার পর জলপাইগুড়ির শরণার্থী শিবিরের কাছে এক বাড়িতে আশ্রয় জুটলো তাদের। সেখানে নয়টি মাস তাদের কেটেছে নতুন দেশের স্বপ্ন বুকে ধারণ করে।

ঘটনা শুনে রহিমা বিগলিত হয়। খানদের অত্যাচার হতে বাঁচতে কতো কষ্ট করেছে ওরা। কোথায় পেয়েছে একমুঠো খাবার। কোথায় পেয়েছে থাকার জায়গা। একজন গায়কের জীবন কেড়ে নেয়ার জন্য নরপশুরা কী নৃশংস পন্থা অবলম্বন করেছে! এসব কথা ভেবে রহিমা সানুর প্রতিসদয় হয়। সে চায় হৃদয়ের সমস্ত প্রেম দিয়ে সানুর মুখে হাসি ফোঁটাবে। পাঁচ বছর হলো সানুর মা মারা গেছে। জেনে রহিমার মন আরও নরম হয়ে যায়। সানুকে নিজের মেয়ের মতো স্নেহ মমতায় জড়িয়ে রাখবে সে। কিছু না থাকুক তবুও ভালবাসবে অন্তরের অনুভূতি দিয়ে। কষ্টের কথা সে বলবে অবলীলায় অসংকোচে। নিজের মেয়ে হলে কি বলতো না? সে রাতের ঘটনা সে বলে চোখের জলে ভিজে,
‘জননী, দোকলারা মোক বিদুয়া কইচ্চে।’
‘ওদের বাড়ি কোথায়?’
‘এ্যাকে জাগাত। আইত পোয়াইলে দেকা হয়।’
‘শত্রুতা ছিলে না এমনি মেরেছে?’
‘চেয়ারমেনি মেম্বরির ফাইট। সাতে জমির কাজিয়াও আইছলো।
‘এতোটুকুতে অতোবড় শত্রুতা?’
‘মাছ মাইরতে দোকলা ছওয়াক চুবকাইছিল। সেই বাদে বিচারোত নাক ছ্যাচড়া দিছিল মেম্বর।’
‘কতোদিন আগের কথা?’
‘সংগ্রামের আগের বছর।’
মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেককিছু হয়েছে। অস্ত্র পেয়ে রাজাকার আপনজনকে মারতে কসুর করেনি। গ্রামে ওরা নারকীয় হত্যাকান্ড করেছে। স্বামী হাট থেকে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরেছিলো। ঠান্ডার আমেজ ছিলো পৌষের শীতে। খাওয়ার পর এশা পড়ে দোয়া  জপে ঘুমিয়ে পড়েছিলো ছকমল। রহিমার চোখে ঘুম আসছিলো না। পেসাবের তলব হওয়ায় বার ঘর করছিলো সে। একাদশীর চাঁদ কখন তলিয়ে গেছে। আদমসুরত হেলে গেছে আকাশে। বাঁশবনে কালো পেঁচার গাবগুবও গেছে থেমে। তবুও রহিমার চোখে ঘুম আসছে না। অন্যদিন খাওয়া হলে সে ঘুমে ঢুলতে থাকে। রাতে সে একবারও হাতপা ধুতে বের হয়না। কিন্তু আজ চোখ থেকে কে যেন ঘুম কেড়ে নিয়েছে। রহিমা ডিব্বা খুলে পান দোক্তা খায়। কলসী থেকে পানি ঢেলে ঢকঢক করে গেলে। ছকমল সকালে বোনের বাড়ি যাবে। খানের অত্যাচার বেড়ে গেলে সবাইকে বোনের বাড়ি রাখতে হবে। বোনকে বলে আসতে হবে সে কথা। রহিমা ব্যাগ ঢেলে তরকারি বের করে কুটতে শুরু করে। সালুন রেঁধে রাখলে সকালে ভাত বসালেই হবে। সকালে বের না হলে ফিরে আসতে পারবে না। জিয়ল মাছে বেগুন মুলো রান্না করে হাঁড়িমাছায় তুলে রেখে রহিমা আকাশ থেকে পড়লো। জনাচারেক লোক রাইফেল ঘাড়ে হুড়মুড় করে বাড়িতে ঢুকে পড়লো। কোন উদ্দেশ্যে বাড়িতে ঢুকলো তারা। মাথামু- বুঝতে না পেরে রহিমা চিৎকার শুরু করলো। ওদেরকে চিনতে পেরে রহিমা অনুনয় শুরু করলো। দোকলা পেটে এমন একটা লাথি মারলো রহিমা প্রবল ব্যথায় আঙিনায় পড়ে থাকলো। বাচ্চারা প্রথম সন্ধ্যাতেই ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। তারা জানতেই পারেনি পিতা নির্মমভাবে খুন হচ্ছে। রহিমা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলো। জ্ঞান ফিরে দেখতে পেলো সব শেষ হয়ে গেছে। বেয়নেটের আঘাতে ছকমলের বুক এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেছে। রক্ত দিয়ে ভিজে গেছে বিছানা বালিশ।
কষ্টের কথা বলার একজন শ্রোতা পেয়েছে রহিমা । যার কাছে জীবন খাতার পাতা খুলে দিতে পারে। সানু তার কষ্টগুলো খুটে খুটে শোনে। সানুর চারপাশে প্রদক্ষিণ করে রহিমার অন্তর। নিজকে ভুলে সে সানুর কাছে ফিরে আসে। মনে হয় সে তাকে নিজের পেটে ধারণ করেছিলো। দশমাস নয় যেন অনেক বছর নিজ সত্তায় তাকে পরিপুষ্ট করেছে। আজ সে তাকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। জীবনকে প্লাবিত করতে চায় তার সান্নিধ্যের জোসনা দিয়ে। সানুর কাছে গল্প বলে হৃদয়মন নিবিষ্ট করে। গল্পের কেন্দ্রীয় বিষয় একটিই। রাজাকারের হাতে স্বামীর খুন হওয়া। বালিশে তাজা রক্তের দাগ। রহিমার স্বপ্ন গুঁড়িয়ে  দুঃখের সাগরে ভাসিয়েছে মানুষ নামের কয়েকজন যুবক। ওরা অন্য কেউ নয়। মইনুল আর দোকলা রহিমার চাচাত দেবর। রহিমার চোখের সামনে ওরা বড় হয়েছে। নওসের, মান্নাল ছকমলের খালাত ভাই। সব সময় ওরা ওদের বাড়িতে যাওয়া আসা করতো। এতো কাছের মানুষ এমন করে সবকিছু তছনছ করে দিতে পারে জানা ছিলো না রহিমার।
ঘুম থেকে জেগে রহিমা দরজা খুলে বসে থাকে। ক্ষুধায় পেট জ¦লে। বড়বউ ভাত রেঁধে বাচ্চাদের খেতে দেয়। বড়ছেলে মজিবর ভাত খেয়ে মাঠের কাজে চলে যায়। মাকে সে খেতে ডাকেনা। মেজোছেলে তজিবর বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে মুড়ি আর খেজুর গুড়ের পায়েস খায়। রাতে ওর সমুন্দি এসেছে। বড় মাছের চাকা দিয়ে খাওয়া হয় অনেক রাত অবধি। রহিমা ভেবেছে তজিবর তাকে ডাকবে। ছোটবেলায় মুখে পড়ে মা বলে ডাকতো। পেটে ভোক নিয়ে ছেলের আহ্বান শোনার জন্য অপেক্ষা করে সে। কিন্তু তজিবর ডাকেনি। সমুন্দির সাথে মজার মজার গল্প আর হাসি আনন্দে  তারা ঘুম গেছে। ছোটছেলে সজিবর বিয়ে করেছে শিক্ষিত ঘরে। তার বউয়ের সাথে কথা বলতে রহিমাকে অনেক হিসেব করতে হয়। ঝিয়ের মতো খেটে সজিবরের ঘরে এক মুঠ ভাত খাওয়া তার ভাগ্যে হয় না। ক্ষুধায় রহিমার পা টলে। চোখের সামনে সাদাটে জোনাকি উড়ে যায়। এটা কী তার বাড়ি! এই ছেলেরা কী তার ছেলে! ওই যে শিশুরা মজা করে লাফাচ্ছে ওরা কারা? কতো সুন্দর সন্তান আর নাতিপুতি পেয়েছে রহিমা! এলোমেলো পা ফেলে তজিবরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় রহিমা। কপালে হাত দিয়ে পুছ করে,
‘তুই ছকমালের ব্যাটা তজিবর?’
‘মোক চিনিস না। দিনদিন কানা হবার নাগচিস?’
‘কাক কানা কইস। কার দুদ খায়া বড় হচিস?’
‘মানুষ কার দুদ খায়। সেটা জানিস না?’
‘বড় হচিস। বিয়া করি বউ আনচিস। মাও পর হইচে?’
‘বিয়ানা উটি কি নাগাচিস? মাথা খারাপ হইচে তোর?’
‘তোর অসুকত মুই উলটকলম নেঙলিয়ার পাতা উটকি বেড়াইচঙ। দুগলার ডাল পিসি খোয়ইচঙ। মোক উপাস থুইয়া মাছ গোছ খাইস?’
‘তুই যদি না খায়া শুতিস সেটা কার দোষ?’
‘বাচ্চা থাইকতে মাও কয়া কাউলাইচিস। এ্যালা কটাই গেইল কাউল্যান?’
‘আয়। মুড়ি দিয়া পায়েস খা। গাও ধুইয়া এ্যালা ভাত খাবু।’
‘না খাঙ। মোর প্যাট দরিয়া হইচে। আল্লা ছাড়া দেখাইয়া নাই মোর। মুই ধল্লাত ঝাপ দিয়া মরিম।’
ছেলেরা অনেক চেষ্টা করেও রহিমাকে খাওয়াতে পারে না। সে প্রতিজ্ঞা করে কোন ছেলের ঘরে পানি স্পর্শ করবে না সে। সে বুঝে ফেলেছে ছেলেরা তার পর হয়ে গেছে। তার চেয়ে দু’চোখ যেদিকে চায় সেদিকে চলে যাবে। কম্পিত পায়ে হাঁটতে থাকে সে। নিজ বাড়ি, কাচা রাস্তা, চিরচেনা গ্রাম পাড় হয়ে সে পাকা রাস্তায় ওঠে এলোপাথাড়ি চলতে থাকে। সে রাস্তা ধরে ষোলই ডিসেম্বরের মিছিল করে যাচ্ছিল অনেক লোক। রহিমা ক্ষুধাক্লান্ত ঝাপসা চোখে যেন কিছুই দেখতে পাচ্ছিলো না। শুধু পায়ের ঠাহরে চলছিলো সে। কিন্তু বেশিদূর সে যেতে পারে না। রাস্তার পাশে পড়ে থাকা ইটের টুকরোয় হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়। পায়ে মারাত্মক জখম হয় তার। সে জখম বেয়ে দ্রুতবেগে রক্ত ঝরতে থাকে। মিছিল থেকে ক’জন ছেলে ছুটে এসে ঠেলায় তুলে তাকে হাসপাতলে পৌঁছে দেয়।
বিজয় দিবস উপলক্ষে গঠিত ইমার্জেন্সী টিমে ডিউটিরত ছিলো মতিন। রহিমাকে দেখে সে চিনতে পারে। সে বুঝতে পেরেছে এই মহিলা হলো সানুর প্রিয় ব্যক্তিত্ব। প্রচুর রক্তক্ষরণে রহিমার শরীরে এনিমিয়া এবং ডিহাইড্রেশন দেখা দিয়েছে। সেলাই ও ড্রেসিংয়ের পাশাপাশি তার রিসাস্সিটেশনের কাজও চলে পুরোদমে। ব্লাডপ্রেসার ফল করায় সকে গিয়েছিলো সে। কিন্তু সঠিক ম্যানেজমেন্ট হওয়ার কারণে অল্প সময়ের মধ্যে চেতনা ফিরে আসে। মতিনকে দেখে চিনতে পারে রহিমা। আড়ষ্ট কণ্ঠে কথা বলে সে,
‘জামাই। মুই ক্যা এ্যাটাই। মুই না মায়োক দেইকপার যাবার ধন্নু?’
‘আপনার পা কেটে গেছে। লোকেরা এখানে নিয়ে এসেছে। ভালো হয়ে যাবেন।’
‘মায়ো কোনটে?’
‘ও বাসায় আছে। সুস্থ হলে বাসায় যাবেন।’
‘তোমরা মায়োক আইসপার কন। মুই মায়োক দেকিম।’
‘বাসায় গেলে তো ওর সাথে দেখা হবে। ও হাসপাতালে আসতে চায়না।
‘মুই তোমার বাসা যাবার নঙ। মোর অন্য তাগদা আছে।’
মহিলার অবস্থা বেশি ভালো নয়। এনিমিয়া আর অপুষ্টিতে ভোগা শরীর থেকে যদি হিউজ রক্তপাত হয় তবে সেরে ওঠতে অনেক সময় লেগে যায়। মহিলার এটেনডেন্ট খোঁজখবর নেবে বলে মনে হয় না। ইনডোর বেডে অভিভাবকহীন পরে থাকলে তার চিকিৎসা চলবে কি করে। বেশ অস্বস্তিতে পড়ে মতিন। উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সের নার্সদের যা মানসিকতা তাতে মহিলাকে বেশিদিন ওয়ার্ডে টিকতে দেবে বলে মনে হয়না। খবরটা সানুকে জানানো প্রয়োজন। ও জানতে পারলে নিশ্চয় একটা পথ বের করবে। সানুকে কল করে মতিন।
‘হ্যালো। একটা খবর শুনেছো?’
‘কি খবর?’
‘সেই মহিলা একসিডেন্ট করেছে।’
‘কোন মহিলা?’
‘বুঝছো না কেন। আমাদের বাসায় যে মহিলা আসে।’
‘আমাদের বাসায় আসে মানে কি? বাসায় তো অনেকেই আসে।’
‘আরে সেই মহিলা। যাকে তুমি মায়ের মতো মনে করো। ওনার একসিডেন্ট হয়েছে। তোমাকে দেখতে চান উনি।’
‘আচ্ছা। আমি এখনই আসছি। ওনার যা দরকার দ্রুত ব্যবস্থা নাও তুমি।’
রহিমাকে দেখে চোখের জলে ভাসে সানু। হাসপাতাল থেকে তাকে বাসায় নিয়ে যায় সে। রহিমা তার কেউ নয়। সে একজন অসহায়া মা। দেশজননীর মতো অসুস্থ রোগজীর্ণ যার ছবি। হায়েনাদের আঘাতে যার দেহ জর্জরিত। সেই বঞ্চিতা জননীর চরণে আজ সে তার সব মায়া ঢেলে দেবে। তাহলে কষ্টার্জিত বিজয় স্বার্থক হবে। শোকবিহ্বল হাজারো মায়ের মুখে যদি হাসি না ফোঁটে তাহলে বিজয় উৎযাপন করে কি লাভ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ