ঢাকা, শনিবার 17 December 2016 ৩ পৌষ ১৪২৩, ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

খালেদা জিয়ার প্রস্তাবের আলোকেই রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা করা হবে

স্টাফ রিপোর্টার : নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে দলের চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া যে প্রস্তাব দিয়েছেন তার আলোকেই রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বিএনপি আলোচনায় বসবে বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির মহাসচিব মির্জা অখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি আশা করছেন, এই সংলাপের মাধ্যমে নিরপেক্ষ ও যোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠন হবে। তিনি বলেন, অবৈধ সরকার জাতির অধিকার হরণ করেছে। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা আজ অনুপস্থিত। ক্ষমতাসীন আ’লীগের আচরণে গোটা জাতি আজ বিভক্ত হয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সকলকে শপথ নিতে হবে।
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে জাতীয় স্মৃতিসৌধ ও দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে শ্রদ্ধা জানানোর পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। এর আগে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায় বিএনপি। এরপর দলের নেতারা আসেন জাতীয় সংসদের চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়াউর রহমানের মাজার প্রাঙ্গণে। এখানে ফুল দেয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মির্জা ফখরুল।
জিয়ার মাজারে খালেদা জিয়া : মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। গতকাল দুপুরে দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে সংসদ ভবন এলাকায় সাবেক এই রাষ্ট্রপতির কবর প্রাঙ্গণে শ্রদ্ধা জানান তিনি। পরে নিরবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর দোয়া-মোনাজাত করেন খালেদা জিয়া। এর আগে বেগম জিয়া তার গুলশানের বাসা ফিরোজা থেকে সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে বের হন। রাস্তায় ভিড় থাকায় সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পৌঁছান বেলা ১১টায়। এরপর তিনি মুক্তিযুদ্ধে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। শহীদদের প্রতি  শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে স্বামী জিয়াউর রহমানের মাজারে আসেন তিনি। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাসসহ বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের হাজারো নেতাকর্মী।
নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে আগামীকাল রোববার রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে সংলাপে বসবে বিএনপি। তার দুই দিন আগে এই বিষয়ে জানতে চান সাংবাদিকরা।  বিএনপি মহাসচিব বলেন, তারা ১৩ দফা দাবি নিয়েই রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনায় বসবেন। তিনি বলেন, বিএনপির পক্ষ থেকে খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলন করে প্রস্তাব দিয়েছেন সেই প্রস্তাবের আলোকেই আলোচনা হবে।
এই সংলাপে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের বিষয়ে বিএনপি কোনো প্রস্তাব দেবে কি না-জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল কোনো জবাব না দিয়ে বলেন, আপনারা জানতে পারবেন। বিএনপি নেতা বলেন, সুষ্ঠু ও সত্যিকার অর্থে নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে সক্ষম হবে সেই ধরনের একটি যোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠন করার জন্য আমরা বারবার বলে এসেছি। সেজন্য একটা প্রস্তাবও দিয়েছেন আমাদের দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। আমরা সেই প্রস্তাব পেশ করব।
কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ফেব্রুয়ারিতে। এর আগেই নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন হবে। এই কমিশনের অধীনেই হবে আগামী সংসদ নির্বাচন। নতুন ইসি গঠনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেয়ায় রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদও জানান মির্জা ফখরুল। রোববার থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির আলোচনা শুরু হবে। এখন পর্যন্ত তিনি বিএনপি ছাড়াও জাতীয় পার্টি, ২০ দলের শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ এবং আওয়ামী লীগের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এখন পর্যন্ত বঙ্গভবনের আমন্ত্রণ পায়নি।
এদিকে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সঙ্গে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, বর্তমান সরকারের শাসন ব্যবস্থায় গোটা জাতি আজ বিভক্ত হয়ে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান শাসন ব্যবস্থায় মানুষ তার অধিকার হারিয়েছে। এখন এমন একটি অবস্থা তৈরি হয়েছে মানুষ নিজের ভোট দিতে পারে না। মুক্তিযোদ্ধা হওয়া সত্ত্বেও বিরোধী মত পোষণকারীদেরকে কোন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে ডাকা হয় না। তিনি বলেন, জাতির ঐক্য হরণ করে নেয়ায় গোটা জাতি আজ বিভক্ত হয়েছে। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সকলকে শপথ নেয়ার আহ্বান জানান মির্জা ফখরুল।
মির্জা ফখরুল বলেন, ১৯৭১ সালে আমরা যখন যুদ্ধ করি ও বিজয় ছিনিয়ে আনি তখন আমাদের সামনে স্বপ্ন ছিল একটি সত্যিকার অর্থেই স্বাধীন সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, সে স্বপ্ন আজও পূরণ হয়নি। তিনি বলেন, সরকার সম্পূর্ণ স্বৈরাচারি ও একনায়কতান্ত্রিক উপায়ে দেশ শাসন করছে। তাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বিরোধী দল ও ভিন্ন মতকে সম্পূর্ণভাবে দমন করে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।  এ সময় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারের দুঃশাসনে বর্তমানে গণতন্ত্র লুণ্ঠিত হয়েছে। তাই আজকের এই দিনে শপথ গ্রহণ করছি, ’৭১ সালে যে চেতনাকে সামনে নিয়ে আমরা লড়াই করেছি সেই চেতনাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আমরা ঐক্যবদ্ধ হবো। জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনবে। আজকের দিনে এই আমাদের প্রত্যাশা, শপথ ও প্রত্যয়।
নিন্দা ও প্রতিবাদ : বিজয় দিবস-এর অনুষ্ঠান পালন করতে গিয়ে গতকাল নেত্রকোণা জেলাধীন আটপাড়া উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম এবং ছাত্রদল নেতা নুর আহমেদ খান ফরিদ-এর ওপর যুবলীগ-ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়ে তাদেরকে গুরুতর আহত করার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল এক বিবৃতিতে বিএনপি মহাসচিব বলেন, বর্তমান ক্ষমতাসীনগোষ্ঠী গণতান্ত্রিক আচার আচরণ ত্যাগ করে অগণতান্ত্রিক পন্থায় জোরজবরদস্তিমূলকভাবে দেশ শাসন করছে। জনগণকে উপেক্ষা করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ভর করে দেশ শাসনের কারণেই দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীসহ সাধারণ নাগরিকদের জীবনযাত্রা এখন চরম হুমকির মুখে। বিজয় দিবস এর মতো একটি জাতীয় অনুষ্ঠান পালন করতে গিয়েও বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর যুবলীগ-ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের বর্বরোচিত হামলা প্রমাণ করে বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রটিকে এখন সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিণত করার প্রয়াস চলছে। দমন-পীড়ন চালিয়ে জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ এবং বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীদের ওপর ক্রমাগত জুলুম নির্যাতন ও গুম, খুন, অপহরণের যে হিড়িক চলছে তাতে দেশের মানুষ এখন সর্বদা আতঙ্কগ্রস্ত। এই ধরনের সহিংস জুলুম ও রক্তপাতের বিরুদ্ধে দেশের মানুষের ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া কোন বিকল্প পথ নেই।   বিএনপি মহাসচিব অবিলম্বে নেত্রকোণায় দলের নেতাকর্মীদের উপর হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানান। তিনি আহত রফিকুল ইসলাম এবং নুর আহমেদ খান ফরিদ-এর আশু সুস্থতা কামনা করেন।
অনুরূপ এক বিবৃতিতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপি’র উদ্যোগে আয়োজিত বিজয় র‌্যালির পেছন থেকে আওয়ামী সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়ে অর্ধশত নেতাকর্মীকে আহত এবং পুলিশ কর্তৃক প্রায় ১০ জন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আহতদের মধ্যে জেলা বিএনপি’র সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এম এন আফসারসহ দু’জনের অবস্থা আশংকাজনক। তারা এখন হাসপাতালে মুমূর্ষু অবস্থায় চিকিৎসাধীন। বিজয় র‌্যালি থেকে পুলিশ খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান মিল্লাত, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এম এন আফসার (যিনি হামলায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন), খাগড়াছড়ি পৌর বিএনপি’র সহ-সভাপতি নাসির আহমেদ তালুকদার এবং খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রদলের  সভাপতি আনিসুর রহমান আনিকসহ ১০ জন নেতাকর্মীকে আটক করেছে।
এই ধরনের ন্যক্কারজনক ও বর্বরোচিত ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, একটি গণতান্ত্রিক দেশে এখন রাজনৈতিক দলগুলোর সভা-সমাবেশের ওপরই কেবল বাধা দেয়া হচ্ছে না, বরং যেকোন জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানসূচির ওপরও ন্যক্কারজনক হামলা চালানো হচ্ছে। নেতাকর্মীদেরকে গ্রেফতার করা হচ্ছে।  তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনায় নিন্দা জানানোর ভাষা নেই। বিএনপি মহাসচিব অবিলম্বে খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপি আয়োজিত বিজয় র‌্যালির ওপর হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং আটককৃত নেতৃবৃন্দের নিঃশর্ত মুক্তির জোর দাবি জানান। তিনি আহত নেতাকর্মীদের আশু সুস্থতা কামনা করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ