ঢাকা, শনিবার 17 December 2016 ৩ পৌষ ১৪২৩, ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

হয়রানিমূলক মামলার কারণে কাজ করতে পারছেন না বিরোধী মতের জনপ্রতিনিধিরা

ইবরাহীম খলিল : রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলার কারণে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জনগণের ভোটে বিজয়ী হয়েও কাজ করতে পারছেন না সরকারের বিরোধী মতের জনপ্রতিনিধিরা। ফলে স্থবির হয়ে পড়ছে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রম। অভিযোগ রয়েছে, আইনের সুযোগ নিয়ে বিরোধীদলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বরখাস্ত করে দেয়া হচ্ছে। আর সেই সুযোগ নিচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন। বিশেষ করে বিরোধী মতের জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়ার কারণে এবং ক্ষমতাসীন দলের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করতে গিয়ে এর স্বাভাবিক কার্যক্রম এখন অনেকটা ভেঙে পড়েছে।
‘বিদ্যমান স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন,পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ,ইউনিয়ন পরিষদ) আইন অনুযায়ী কোনো জনপ্রতিনিধি যে কোনো ধরনের ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত হলে (আদালত কর্তৃক চার্জশিট গৃহীত হলে) কিংবা ওই প্রতিনিধি শারীরিকভাবে সক্ষমতা হারালে কিংবা পরিষদের সভায় পরপর তিনবার অনুপস্থিত থাকলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করতে পারে।’
ফলে আদালতে চার্জশিট গৃহীত হওয়ার পরপরই সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের সাময়িক বরখাস্ত করা হচ্ছে। এ সুযোগে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন প্যানেল মেয়রের তালিকায় থাকা আওয়ামী লীগের নেতারা। তবে বরখাস্তকৃতদের অনেকে উচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে দায়িত্বও ফিরে পেয়েছেন। তবে দায়িত্ব ফিরে পেলেও অনেকেই চেয়ারে বসতে পারছেন না।
দলীয় মামলা দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপির কেন্দ্রীয় আইনবিষয়ক সম্পাদক সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, সারা দেশেই আমাদের সমর্থিত সিটি মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর মেয়র, ইউপি চেয়ারম্যানসহ জনপ্রতিনিধিরা বরখাস্ত হচ্ছেন। মিথ্যা মামলায় অভিযোগপত্র দিয়ে এরই মধ্যে তিন শতাধিক জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত করেছে ক্ষমতাসীন সরকার। আরও কয়েকশ’ জনপ্রতিনিধি বরখাস্ত হওয়ার আতংকে দিন কাটাচ্ছেন।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর তিন ধাপে উপজেলা নির্বাচন সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপে নির্বাচন মোটামুটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়। এই নির্বাচনে বেশির ভাগ উপজেলায় বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয়ী হন। এই ফলাফলের পর পরবর্তী দুই দফার নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থীদের বিজয় ঠেকাতে নানা কৌশল গ্রহণ করা হয়। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা জোরজবরদস্তি আর কেন্দ্র দখলের মাধ্যমে নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করেন। পরবর্তীকালে পৌরসভা নির্বাচনে একইভাবে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা বিজয়ী হন।
এদিকে উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে ক্ষমতাসীন দলের জবরদস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণের পরও যেসব স্থানে বিরোধী দল সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন, তারাও স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। এসব জনপ্রতিনিধি যাতে দায়িত্ব পালন করতে না পারেন, সেজন্য শপথ গ্রহণের কিছু দিনের মধ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে তাদের কাছে পৌঁছে যায় বরখাস্তের নোটিশ। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পদগুলো দখলের উদ্দেশ্যেই মামলা ও হয়রানি করা হচ্ছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকারের চলতি মেয়াদে একাধিক মামলায় ৩১৪ জন জনপ্রতিনিধি সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন। তবে এ সংখ্যা কিছু কম-বেশিও হতে পারে। আদেশে সুনির্দিষ্টভাবে মামলার ধরন উল্লেখ না থাকলেও রাজনৈতিক সহিংসতার মামলার আসামী হওয়ার কারণেই বেশিরভাগ বরখাস্ত হয়েছেন। আরো শতাধিক প্রতিনিধি বরখাস্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় আছেন। এসব জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে রয়েছে শত শত মামলা। এদের বেশির ভাগই বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতির সাথে জড়িত।
খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র মনিরুজ্জামান, গাজীপুরের মেয়র অধ্যাপক আব্দুল মান্নান, সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, রাজশাহী সিটি মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের বিরুদ্ধে অনেকগুলো মামলা রয়েছে। মামলার দোহাই দিয়ে তাদেরকে বার বার বরখাস্তের শিকার হচ্ছে। এছাড়া ৪৪ জন কাউন্সিলরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। রাজধানীর বাইরে এই সিটি করপোরেশনগুলোতে জনপ্রতিনিধি না থাকায় উন্নয়ন ও সেবামূলক কার্যক্রম এক রকম স্থবির হয়ে পড়েছে। সিটি করপোরেশনের মেয়রের পর অনেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এক তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ২১ জন পৌর মেয়র, ৪৪ জন পৌর কাউন্সিলর, উপজেলা চেয়ারম্যান ৪৭ জন, ভাইস চেয়ারম্যান ৫৮ জন, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ৮৬ ও মেম্বার ৫৪ জনকে বরখাস্ত করা হয়। এতে সমস্যা দেখা যাচ্ছে, মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন ক্ষমতাসীন দলের কোনো কাউন্সিলর আবার উপজেলা চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন কোনো ভাইস চেয়ারম্যান বা নারী ভাইস চেয়ারম্যান। ফলে সিটি করপোরেশন ও উপজেলা পরিষদগুলোতে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
জানা গেছে, বিরোধী দল সমর্থিত জনপ্রতিনিধিদের বড় একটি অংশকে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের সময় বিভিন্ন ঘটনায় দায়ের করা মামলায় বরখাস্ত করা হয়েছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পদ দখলের উদ্দেশ্যে মামলা ও হয়রানি করা হয়। শত শত জনপ্রতিনিধিকে দায়িত্ব পালনে যেভাবে বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে, এ নিয়ে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এটা তো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে আইনের অপপ্রয়োগ হচ্ছে। একই সাথে জনগণের ম্যান্ডেট ভুল প্রমাণিত করা হচ্ছে। এটা গণতান্ত্রিক চেতনার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ