ঢাকা, শনিবার 17 December 2016 ৩ পৌষ ১৪২৩, ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮ হিজরী
Online Edition

একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বেসরকারি জুট মিল

খুলনা অফিস : এক সময়ে খুলনার শিল্পাঞ্চল খ্যাত মীরেরডাঙ্গা ও শিরোমণির অধিকাংশ ব্যক্তি মালিকানাধীন জুট মিল একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে শিল্পাঞ্চলটি এখন মৃত শিল্পাঞ্চলে পরিণত হয়েছে। নতুন মজুরি কাঠামো ঘোষণার পর থেকে ব্যক্তি মালিকানাধীন মিলগুলোর মালিকরা কৌশলে শ্রম আইন লঙ্ঘন করে একে একে মিলগুলো বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে এ অঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষ চাকরিহারা হচ্ছেন। শ্রমিকদের পাওনা টাকা পরিশোধ না করে দিনের পর দিন বন্ধ করে রাখা হচ্ছে মিলগুলো। পাওনা না পেয়ে এবং মিলগুলো দিনের পর দিন বন্ধ থাকায় শ্রমিক পরিবারগুলো মানবেতর দিনযাপন করছে। এক শ্রেণির সুবিধাবাদী শ্রমিক নেতাদের কারণে ন্যায্য অধিকার ফিরে পাওয়ার আন্দোলন সংগ্রাম সফল হয়নি বলে জানিয়েছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা।
সূত্র জানায়, এই এলাকার বেসরকারি জুট মিলগুলোতে ১৯৯১ সাল থেকে ২০১৩ সালের ২১ মে পর্যন্ত মাত্র ৫৬০ টাকা বেসিকে শ্রমিক-কর্মচারীরা কাজ করতো। বর্তমান বাজারের দ্রব্যমূল্যের সাথে সঙ্গতী রেখে সরকার শ্রমিকদের নতুন মজুরি কাঠামো দেয়ায় বেতন দাঁড়ায় ২৭শ’ টাকা। কিন্তু বর্ধিত মজুরি বেতন কাঠামোর টাকা শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের ভাগ্যে জোটেনি। মালিক পক্ষ অত্যন্ত কৌশলে মিলগুলো বন্ধ করে রেখেছেন।
সোনালী জুট মিল : সূত্র জানায়, নগরীর মীরেরডাঙ্গার সোনালী জুট মিল কর্তৃপক্ষ শ্রম আইনের কোন তোয়াক্কা না করে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিলটি আংশিক চালু রেখে স্থায়ী ২৭শ’ শ্রমিকের মধ্যে ৮শ’ শ্রমিককে নো ওয়ার্ক নো পে’র ভিত্তিতে কাজে রাখে। ফলে ১৯শ’ শ্রমিক বেকার হয়ে যায়। কোন নোটিশ না দিয়ে কারণ ছাড়াই এসব শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ না করেই কাজ বন্ধ করে দেয়। বন্ধ সোনালী জুট মিলের  শ্রমিকদের পাওনা প্রায় ৩৫ কোটি টাকা।
অভিযোগ রয়েছে, মেয়াদ উত্তীর্ণ সিবিএ কে ম্যানেজ করে মালিক পক্ষ মিলটি নামমাত্র আংশিক চালু রেখে শ্রমিকদের সকল পাওনা পরিশোধ বন্ধ রেখেছেন।
এজাক্স জুট মিল : বেসরকারি এই মিলটি দীর্ঘদিন বন্ধ ছিলো। শ্রমিক-কর্মচারীদের বকেয়া পাওনা এবং মিল চালুর দাবিতে আন্দোলন সংগ্রাম শুরু হলে মিলের মালিক পরিবর্তন হয়। শ্রমিকদের মনে স্বপ্ন জাগিয়ে বাগেরহাটের নিউ বসুন্ধরা গ্রুপের সাবিল গ্রুপ এজাক্স জুট মিলের শ্রমিক-কর্মচারী-কর্মকর্তাদের চূড়ান্ত বিল এবং আংশিক বেতনসহ প্রায় ৫০ কোটি টাকার ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে মিলটির দায়িত্ব গ্রহণ করে। তারা ২০১৫ সালের ১৪ জানুয়ারি নতুন উদ্যমে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে যাত্রা শুরু করে। শ্রমিকদের কয়েক দফা বকেয়া পাওনা প্রায় ১ কোটি টাকা পরিশোধও করে তারা। নতুন মালিকের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি-বেতনের চূড়ান্ত বিল পরিশোধ করতে না পারায় বর্তমানে মিলটি বন্ধ রেখেছেন।
মহসিন জুট মিল : বেসরকারি মহসিন জুট মিল শ্রমিকদেরও একই পরিণতি বরণ করতে হয়েছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা মিলটির মালিক ২০১৩ সালের ২৩ জুন আর্থিক সঙ্কট দেখিয়ে ৪৫ দিনের লে-অফ ঘোষণা করে এবং ৫ দফা লে-অফ করে। পরবর্তীতে ২০১৪ সালের ১৭ জুলাই মিলটি চালু করার পরিবর্তে মিলের ৬৬৬ জন শ্রমিক-কর্মচারীকে এক নোটিশে ছাঁটাই করা হয়। ছাঁটাইয়ের পর এ পর্যন্ত চূড়ান্ত বিলের প্রায় ১৮ কোটি টাকা পরিশোধ করেনি মিল কর্তৃপক্ষ।
এছাড়াও আফিল জুট মিলের ১ ও ২নং মিল বন্ধ থাকায় তাদের প্রায় ৯ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। সাগর জুট মিলের শ্রমিকদের গ্রাচুইটির ১১ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। জুট স্পিনার্সে কোটি কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সোনালী জুট মিলের সিবিএর সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাজিউর রহমান নজরুল বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের পর যখন একটি লক্ষ্যে পৌঁছাবো, ঠিক তখনই সিবিএ নেতাসহ একটি স্বার্থান্বেষী মহল মালিকের সাথে আঁতাত করে ষড়যন্ত্র করে আন্দোলন থেকে শ্রমিকদের দূরে রাখে। মিলের বর্তমান সিবিএ অবৈধভাবে ক্ষমতা ধরে রেখে মালিকের সাথে লুটেপুটে খাচ্ছে। তিনি অবিলম্বে মিলের সিবিএ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করে শ্রমিক বান্ধব নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানান।
এজাক্স জুট মিলের সিবিএ সভাপতি তৈয়বুর রহমান বলেন, কোন মালিকই শ্রমিকের স্বার্থ দেখে না, মিল চালু হোক আর নাই হোক- ন্যায্য পাওনা টাকা দিলে আমরা খুশি। অবিলম্বে মিলের শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা পরিশোধ করার দাবি জানান তিনি।
মহসিন জুট মিলের সিবিএ’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম রসুল খান বলেন, লে-অফ ঘোষণা শেষে চালু করার কথা থাকলেও অবৈধভাবে মিলটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। শ্রম আইন অনুযায়ী ছাঁটায়ের ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে বকেয়া পাওনা পরিশোধ করার কথা। কিন্তু মালিক ২ বছরের অধিক সময় দালাল চক্রের সহযোগিতায় বকেয়া পাওনা পরিশোধ না করে মিলটির প্রায় ৩৫শ’ শ্রমিককে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে। আইন থাকলেও আইনের প্রয়োগ না থাকায় মালিক পক্ষ অবৈধভাবে শ্রমিকদের ছাঁটাই করে তাদের পাওনা প্রায় ১৮ কোটি টাকা পরিশোধ না করে মিলটি বন্ধ করে রেখেছেন।
শ্রমিকরা বলেন, খুলনার আটরা শিল্পাঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত আলীম জুট মিল মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতায় ১৪ মাস টানা আন্দোলন সংগ্রামের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত আন্তরিকতায় গত ৬ আগস্ট বিজেএমসির তত্ত্বাবধানে উৎপাদন শুরু হয়। এলাকার বন্ধকৃত জুট মিলগুলো পুনরায় চালু হলে শিল্পাঞ্চলটি আবার প্রাণ চাঞ্চল্য ফিরে পাবে। আর এ মিলগুলো চালু করা হলে ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ